বিশ্বাসঘাতক

সুজিত বসাক

—“ডোন্টওয়ারি মিসেস বাসু। এভরিথিং উইল বি ফাইন, আই প্রমিস।”

হাতটা বাড়িয়ে দিলেন অতীন সেন। ভরসার হাত নাকি বিশ্বাসঘাতকের হাত, ঠিক বুঝে উঠতে পারল না শিউলি। মারা যাবার কিছুদিন আগেই রাজীব তাকে বলেছিল, আমাকে পিছন থেকে ছুরি মারার চেষ্টা চলছে।‌ শিউলি রাজীবকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি তাদের চেনো? রাজীব হেঁয়ালি ভরা উত্তর দিত, চিনি আবার চিনিও না, প্রমাণ ছাড়া তো কিছু বলা যায় না, একবার হাতে প্রমাণ এলেই আমার সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়া ঘুচিয়ে দেব। সে সুযোগ রাজীব পায়নি।

রাজীবের মৃত্যুটা নির্ভেজাল অ্যাক্সিডেন্ট, অন্তত পুলিশের ধারণা। প্রমাণহীন খুন অ্যাক্সিডেন্ট বলেই পরিগণিত হয় পুলিশের খাতায়।‌ শিউলি নিশ্চিত, এটা পরিকল্পিত খুন। কিন্তু একটা ঝাঁকড়া গাছ এমনভাবে ব্যাপারটাকে গার্ড করে আছে, ফাঁকফোকর দিয়েও সত্যের আলো সামনে আসবে না। চেঁচামেচি করে একটু শোরগোল ফেলে দেওয়া যেতে পারে, তাতে খুনি ধরা পড়বে না।‌ শিউলি জানে একমাত্র ভরসা সময় আর ঈশ্বর।

আরও পড়ুন: বীরদের নগর আর উলার মেলা

অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাত মেলাল শিউলি। অতীন সেন রাজনীতির লোক, অনেক ক্ষমতা। এই মুহূর্তে ওঁর সাহায্য খুব দরকার। রাজীব আর নেই, সংসার নামক গাড়িটাকে সচল রাখতে হবে তাকেই। দু’টি সন্তান, বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি তার মুখ চেয়েই রয়েছে।

মৃদু হেসে অতীন বললেন— “বেশিরভাগ মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের খারাপ চোখে দেখে, এটাই বাস্তব, আমি জানি। তবু তারা আমাদের পিছনে ঘুর-ঘুর করে মূলত দু’টি কারণে— এক, ভয়ে; দুই, লোভে। তুমিও কি আমাকে সেরকম নেতা ভাব?”

থতমত খেল শিউলি। সামলে নিয়ে বলল, “না না তা কেন ভাবব? রাজীবকে আপনি নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন… আমি জানি। রাজীবও আপনাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করত। সব সময় বলত, অতীনদার মতো দু’চারটে মানুষ আছে বলে রাজনীতির জগৎটা এখনও পুরোপুরি নর্দমা হয়ে যায়নি। নইলে যা অবস্থা…”

একটু থমকালেন অতীন। শিউলির কথাগুলো প্রশংসা না খোঁচা, বুঝতে একটু সময় লাগল। তারপর স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসিটি ঠোঁটে খেলিয়ে বললেন— “তা ঠিক। ওসব কথা ছাড়ো, বলছিলাম তুমি চাইলে একটা চাকরি-বাকরির বন্দোবস্ত করা যেতে পারে। তুমি কি রাজি আছ?”

খুব দ্রুত আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছেন ভদ্রলোক। হয়তো খুবই ছোট ব্যাপার, তবুও ভালো লাগল না শিউলির।

সবিনয়ে বলল— “না না দাদা, আমি রাজীবের ব্যবসাটাই দেখতে চাই। জানি প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হবে, আসলে আমি ব্যবসায়ী ঘরের মেয়ে, বিয়েও হয়েছে ব্যবসায়ী ঘরে, এটুকু বিশ্বাস আছে চেষ্টা করলে হয়তো পেরে যাব।”

—“বেশ, অ্যাজ ইওর উইশ। কোনোরকম অসুবিধা হলে জানিও, সাধ্যমতো হেল্প করার চেষ্টা করব।”

অতীন চলে গেলে শিউলির শাশুড়ি বললেন— “প্রস্তাবটা তো উনি ভালোই দিয়েছিলেন। তুমি মেয়ে মানুষ ব্যবসার ঝক্কি সামলাতে পারবে? তার চেয়ে একটা চাকরি পেলে নিশ্চিন্তে থাকতে পারতে।”

বিছানায় শয্যাশায়ী শ্বশুর বললেন— “এই তোমাদের দোষ। মেয়েরা কিছু করতে গেলেই নেগেটিভ কিছু শুনিয়ে দাও। ব্যবসা কাজটা অত সহজ নয় আমিও জানি। কিন্তু দুঃসাধ্য তো নয়। যে চ্যালেঞ্জ নিতে জানে, সে পারবে না কেন? তুমি অবশ্যই পারবে মা। আমার শরীর ঠিক থাকলে তোমাকে হেল্প করতে পারতাম।

শাশুড়ি বিরক্ত গলায় বললেন— “কী জানি বাপু… তোমাদের বোধবুদ্ধি আমার মাথায় ঢোকে না। যা ভালো বোঝো, তাই করো। আমার কথা কে কবে শুনেছে?”

প্রথম প্রথম নিজেকে অচেনা আগন্তুক মনে হলেও ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে নিতে লাগল শিউলি। রাজীবের সাপ্লাইয়ের বিজনেস। স্প্যানটা বেশ বড়। বহু টাকা ইনভেস্ট করা আছে। কিন্তু শেষ দিকে সেভাবে রিটার্ন আসছিল না।‌ সবমিলিয়ে দশজন স্টাফ রেখেছিল রাজীব। শিউলি ঘাটতি মেটাতে প্রথমেই কাউকে স্যাক করল না। বরং বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল, এমপ্লয়িদের মধ্যে কে কতটা পজিটিভলি কাজ করে।‌ কয়েক দিন  দিনরাত খেটেখুটে ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়িয়ে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল। তারপর এক এক করে সমস্ত স্টাফের সঙ্গে আলাদা করে কথা জানার চেষ্টা করল, কোম্পানি নিয়ে কে কী ভাবছে। এতে কোথায় গলদ রয়েছে, কী করলে তার সমাধান হতে পারে তার একটা আভাস পেয়ে গেল।

অ্যাকাউন্ট সেকশনের বিশ্বাসবাবু রাজীবের প্রিয় মানুষ ছিলেন। ওঁর কথা রাজীব খুব বলত। ভীষণ রেসপনসিবল আর সিনসিয়ার। রাজীব দরকারি কাজে বাইরে গেলে ওঁকেই অফিসের দায়িত্ব দিয়ে যেত। শিউলি একদিন ওঁকে নিজের চেম্বারে ডেকে জিজ্ঞেস করল— “লাস্ট ইয়ারে কোম্পানির টার্নওভার এতটা কমে যাওয়ার কারণটা কী?”

বিশ্বাসবাবু বললেন— “পবন জালানি ম্যাডাম। ও মার্কেটে আসার পর আমাদের বিজনেস হঠাৎ করে কমে গিয়েছে। ভীষণ আনএথিক্যাল বিজনেসম্যান, কোনও নিয়মনীতির ধার ধারে না। রাজীব স্যার ভালো মানুষ ছিলেন, ওর সঙ্গে পেরে ওঠেননি। শক্ত হাতে না ধরলে আপনিও পারবেন না।”

—“আপনারা রাজীবকে কোন পরামর্শ দেননি?”

—“দিয়েছি ম্যাডাম। বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু স্যার শোনেননি। মনিবের মুখের ওপর বেশি কথা বলা সাজে না।”

বিশ্বাসবাবুর মাথা নীচু। শিউলি জলের বোতলে চুমুক দিয়ে বলল— “এই মুহূর্তে আপনি আমাকে কী করতে বলেন? কী করলে কোম্পানির ভালো হবে বলে আপনার মনে হয়? আপনি এই কনসার্নে দীর্ঘদিন ধরে আছেন, অভিজ্ঞতা যথেষ্ট, আমি মনে করি আপনার মতামতের যথেষ্ট মূল্য আছে।”

বিশ্বাসবাবু অবাক চোখে তাকালেন— “আমি সাধারণ একজন এমপ্লয়ি… এ-ব্যাপারে আমি কী বলব বলুন!”

—“তার মানে কোম্পানির ভালো-মন্দ নিয়ে কোনো চিন্তাই করেন না?”

—“নিশ্চয়ই করি। কিন্তু সেসব বলা কি শোভন দেখাবে?”

—“আমার চিন্তাভাবনা আপনার স্যারের চেয়ে একটু অন্যরকম। আমি মনে করি আমার স্টাফ আমার উইঙ্গস, আমার আইস, আমার ক্যাপিটাল। আমি ক্যাপ্টেন হলেও জাহাজটা কিন্তু আপনারই চালান। আপনাদের অ্যাক্টিভিটি আমার কাছে ভীষণ ভাইটাল। আপনাদের মতামতও। তবে একজন পিওনের মতামত তো আর আমি নেব না।”

বিশ্বাসবাবুর চোখে পলকা বিস্ময়। পরমুহূর্তেই একগাল হেসে বললেন— “দ্যাটস দ্য স্পিরিট। আপনি পারবেন ম্যাডাম। যদি আমার পরামর্শ চান তাহলে পরিষ্কার বলব, টিট ফর ট্যাট। পবন জালানি যেমন ওর সঙ্গে ঠিক তেমনভাবেই লড়তে হবে।”

দুই

মেঘ ও মালা শিউলির দুই সন্তান। মেঘের বয়স সাত, মালার সাড়ে চার। রাজীবের দেওয়া নাম। মেঘ মায়ের মতো আর মালা বাবার মতো দেখতে হয়েছে। রাজীবের ইচ্ছে ছিল ছেলেকে এমবিএ করাবে এবং মেয়েকে বানাবে ডাক্তার। রাজীবের স্বপ্নটাকে বাস্তবায়িত করবে শিউলি। অন্তত তার যথাসাধ্য ক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা তো করবেই। মনুষ্য জীবনে নিশ্চিত ফ্যাক্টর বলে কিছু হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় মানুষের ভাবনা একদিকে চলে, আর বিধাতা পুরুষের ভাবনা সম্পূর্ণ অন্যদিকে। এসবের কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই অনিশ্চয়তার নামই বুঝি জীবন। চেষ্টাই মানুষের একমাত্র নিয়তি, ঘটন-অঘটনের ডোর অন্য কারো হাতে। নইলে এমন তো হওয়ার কথা ছিল না!

সাতসকালে ফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠতেই শিউলির মনে পড়ে গেল, আজ তার জন্মদিন। নিশ্চয়ই ছোড়দার ফোন। এই একটা মানুষ, কোনোদিন তার জন্মদিনটা ভোলে না। শতসহস্র কাজের মধ্যে থাকলেও ঠিক ফোন করবেই। মনিটরে চোখ যেতেই খুশিতে ভরে গেল মন। পরক্ষণেই আবার নিভেও গেল। গত জন্মদিনেও রাজীব বেঁচেছিল। নিজেই আয়োজন করেছিল সুন্দর একটা ঘরোয়া পার্টি। অসাধারণ একটা সারপ্রাইজ গিফট দিয়েছিল হিরের নেকলেস পরিয়ে। সেসব কি অত সহজে ভোলা যায় !

—“হ্যাপি বার্থডে মাই সিস্টার।”

ছোড়দার প্রতিবারের মতোই আন্তরিক উচ্ছ্বাস। সে এখন সুইডেনে। পৃথিবী চষা চাকরি ওর। ‌সেই কবে কলকাতা ছেড়েছে! ছোড়দাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে আজকাল। বছর পাঁচেক আগে মা মারা যাওয়ার সময় এসেছিল। সেটাই শেষ দেখা।

—“থ্যাঙ্ক ইউ। তোরা সবাই ভালো আছিস তো?” সংক্ষিপ্ত জবাব দিল শিউলি।

—“আমরা বিন্দাস আছি। তোরা সবাই ভালো আছিস…”

বলতে গিয়েও আটকে গেল ছোড়দার গলা। বোধহয় রাজীবের মৃত্যুর কথা মনে পড়ে গেল। আনমনভাবে বলল—“কিছুতেই ম্যানেজ করে উঠতে পারিনি জানিস। যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। ওই সময় তোর পাশে থাকতে পারলে আমারও ভালো লাগত। তোর জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত একটা ট্রাজেডি ঘটে গেল।”

ট্রাজেডি অনাকাঙ্ক্ষিতই হয়। ট্রাজেডির কোনও সময়গত ধ্যান-ধারণা থাকে না। তবুও শিউলি জানে ছোড়দা মিথ্যে কথা বলছে না। অতদূরের দেশ থেকে হুটহাট করে সবসময় আসা সম্ভব হয় না। বড়দা থাকে দিল্লিতে, সে-ই এসেছিল মাত্র এক বেলার জন্য। নেহাত এড়িয়ে যেতে পারে না, তাই আসা। যাবার সময় বলেছিল, কোনো অসুবিধা হলে জানাবি, আমি সবসময় তোর সঙ্গে আছি। কতকগুলো কাগজের নোটের লোকসান বোনের জীবনের চেয়ে মূল্যবান মনে হয়েছিল বড়দার কাছে।‌ টুকরো টুকরো অভিমানগুলো জমে আছে শিউলির মনে।

“ছাড় ওসব কথা। বউদি, নন্দু ওরা সব কেমন আছে?”

—“ভালো। ভাবছি এবার চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে যাব। নিজস্ব একটা বিজনেস শুরু করব। এই পরিযায়ী জীবন আর ভালো লাগছে না।”

—“এ তো খুব ভালো কথা। আমিও চাই তুই চলে আয়। এলে দেখবি কতকিছু পালটে গিয়েছে।”

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: উজ্জয়িনী

ছোড়দার এই প্রবাসী জীবন বেছে নেওয়ার কারণ জানে শিউলি। মালাকে ভালোবাসত ছোড়দা। শিউলিরই সহপাঠিনী। একই পাড়ায় থাকত। দেখতে অসাধারণ সুন্দরী ছিল। কিন্তু মালা কোনোদিনই ভালোবাসেনি। তবুও খেলাচ্ছলে বেশ কিছুদিন ভালোবাসার অভিনয় করে গিয়েছে। ওর অভিনয় শিউলিও বুঝতে পারেনি। একদিন হঠাৎ করে শুনল বেঙ্গালুরুর এক সুদর্শন ডাক্তার পাত্রের সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। ছোড়দাকে দিব্যি ঝেরে ফেলে ও চলে গেল ডাক্তারবাবুর আদুরে বউ হয়ে। ধাক্কাটা নিতে পারেনি ছোড়দা। কিছুদিন দেবদাস হয়ে ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানোর পর হঠাৎ করে একটা চাকরি জোগাড় করে ফেলল বহুদূরের দেশে। বাবা, মা, বড়দা, শিউলি সবাই নিষেধ করলেও কোনো কথা শোনেনি ছোড়দা। আসলে ও সেদিন পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। নিজের হেরে যাওয়া এক সত্তার কাছ থেকে।

জন্মদিনের সকালটা মন খারাপ করে কাটাতে চাইল না শিউলি। হাসিমুখে মেঘ ও মালাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে, খাইয়ে-দাইয়ে স্কুলে পাঠাল। তারপর শ্বশুর মশাইয়ের ঘরে গিয়ে কিছুটা সময় তার সঙ্গে গল্প করল। শাশুড়ি কাজের মেয়ে গোলাপির সঙ্গে অহেতুক ক্যাট-ক্যাট করছে দেখেও কিছু বলল না। ধীরে সুস্থে বাথরুমে ঢুকল অফিসে যাওয়ার জন্য।

আজ একটু দেরি করেই ঢুকল অফিসে। দিনভর কাজকর্ম ভালোই চলল। ছুটির সময় এক বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হল। পার্সোনাল অ্যাসিসট্যান্ট মিনার্ভা এসে বলল— “ম্যাডাম আপনাকে একটু কনফারেন্স রুমে যেতে হবে।”

—“আজ কারও সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে নাকি? আগে বলোনি তো? শিউলি বেশ অবাক হয়েই বলল।

—“গেলেই দেখতে পাবেন।” মিনার্ভা বেশি কথা বাড়াল না। আগে আগে চলতে লাগল। ভেজানো দরজা ঠেলে বলল— “আসুন ম্যাডাম।”

শিউলি অন্ধকার ঘরে ঢুকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তখনই জ্বলে উঠল ধবধবে টিউব লাইট। চমকানো চোখে শিউলি। দেখল, পুরো ঘরটা বেলুনে সাজানো। ডানদিকের দেওয়ালে বড় আর্ট পেপারে লেখা ‘হ্যাপি বার্থডে’। এসব তার জন্য? পুলকিত হল শিউলি। কিন্তু এরা কি করে জানল, আজ তার জন্মদিন?

মিনার্ভা একগাল হেসে বলল— “সোশ্যাল মিডিয়া সব জানিয়ে দেয় ম্যাডাম। সবাই মিলে সামান্য একটু আয়োজন করেছি। আপনার পারমিশন ছাড়াই করেছি, সেজন্য রাগ করবেন না প্লিজ।”

কেক কাটল শিউলি। ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভাল। ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ…’ গানে মুখরিত হয়ে উঠল কনফারেন্স হল। এই অজানা প্রাপ্তিটুকু শিউলির মন ভরিয়ে দিল। ভালোমন্দের মিশেল অফিস স্টাফকে কিছুক্ষণের জন্য ভীষণ আপন মনে হল। যদিও ম্যাডামসুলভ গাম্ভীর্য বজায় রেখে কপট রাগ দেখিয়ে বলতেই হল, “এসবের কী দরকার ছিল?”

বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে গেল। অফিসের স্টাফরা আজ এক কাণ্ড করল বটে! ছোট আয়োজন, কিন্তু কোনো ত্রুটি রাখেনি। সাধ্যমতো উপহারও দিয়েছে সবাই। ওরা এতটা করল, শিউলিও চুপ করে থাকে কেমন করে? নামি রেস্তরাঁ থেকে খাবার আনাল সবার জন্য। মিনার্ভা আর দেবোপম মিলে পুরো ব্যাপারটাকে একটা ঘরোয়া পার্টিতে রূপান্তরিত করে ফেলল। সবার উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে বেশ লাগছিল শিউলির। এই টুকরো টুকরো ভালো লাগাগুলো মহামূল্যবান, প্রাণদায়ী অক্সিজেনের মতো। শেষপর্যন্ত খানাপিনা নাচাগানা কোনোকিছুই বাদ গেল না। সবার উপরোধে পড়ে ওয়াইনের গ্লাসে পর্যন্ত সিপ দিতে হল। ভীষণ দুষ্টু মিনার্ভাটা! এসবের মাঝে আরও একটা জিনিস আবিষ্কার করে ফেলল শিউলি, মিনার্ভার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে দেবোপম। তাই বোধহয় ওর মতো তুখোড় ছেলে তুলনামূলক কম মাইনেতে আটকে আছে এই কোম্পানিতে। প্রেম বড় বিষম বস্তু, শুধুমাত্র একটু সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য কতকিছু করে প্রেমিক-প্রেমিকা!

এই প্রথম বাড়ি ফিরতে এতটা রাত হল। বেজার মুখে দরজা খুলে দিতে দিতে শাশুড়ি বললেন— “ছেলে-মেয়ে দু’টো হাপিত্যেশ করে বসে আছে তোমার মুখ চেয়ে। এই তোমার ফেরার সময় হল?”

রাজীবের মা রাজীবের মতোই, কাট-কাট কথা বলেন। শিউলি শুধু বলল— “হ্যাঁ, দেরি হয়ে গেল।”

কৈফিয়ত দেওয়ার পথে হাঁটল না। সুযোগ পেলেই কথার ইট সাজাতে শুরু করবেন ভদ্রমহিলা। একটা মুহূর্তও ছেলে-মেয়ে দু’টোকে বঞ্চিত করতে ইচ্ছে করল না শিউলির। নিজের ঘরে যাবার আগে একবার শুধু শ্বশুরমশাইয়ের ঘরে উঁকি মারল। দেখল টিভি দেখছেন। পায়ের শব্দেই অবশ্য টের পেয়ে গেলেন।

—“বউমা এলে? এত দেরি হল কেন মা?”

জন্মদিনের কথাটা নতুন করে জানানোর প্রয়োজন মনে করল না। মনে হয় ওদের স্মৃতিতে নেই। বলল— “একটা জরুরি কাজ শেষ করে আসতে হল বাবা। আপনি ওষুধগুলো ঠিকমতো খেয়েছেন তো? সোমবার কিন্তু আপনার চেকআপের ডেট আছে। আমি ডাক্তারবাবুকে ফোন করেছিলাম।”

—“হ্যাঁ, মনে আছে। তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও গে তাও।”

মেঘ-মালার অভিমান ভাঙাতে একটু সময় লাগল। ওদের ফেভারিট চকোলেট আর গেমিং টুলস ব্যাগ থেকে বের করতেই খুশিতে ঝলমল করে উঠল দু’টি শিশু মুখ। সেগুলো নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতে না করতেই বিভাকর এলো, ওদের আর্টের টিচার। ওদের বসিয়ে দিয়ে অবসর পেল শিউলি। সোফার উপর শরীর ছেড়ে দিল। এবার যেন বেশ ক্লান্ত লাগছে।‌ হুটোপাটি, হইহুল্লোড় তো কম হয়নি! ধকলটা টের পাচ্ছে এবার। তেষ্টা পেয়েছে খুব, ফ্রিজ থেকে ঢকঢক গলায় খানিকটা ঠান্ডা জল ঢাললে হয়। উঠতে ইচ্ছে করছে না, তবুও জোর করে উঠে পড়ল। গরমে চ্যাটচ্যাট করছে গা, স্নানটাও সেরে ফেলতে হবে, নইলে এই ক্লেদ যাওয়ার নয়।

আরও পড়ুন: আঁধার আমার ভালো লাগে

ওদের দেওয়া উপহারগুলো অফিসে নিজের আলমারিতে রেখে এসেছে, ইচ্ছে করেই। পরে ধীরে ধীরে আনবে। শিউলিকে নিয়ে শাশুড়ি মায়ের অসম্ভব কৌতূহল। ওই সব উপহার দেখলে উনি নিশ্চিতভাবে দায়িত্বশীল অভিভাবক হয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন। সেটা ভালো করেই জানে শিউলি।‌ তাই আগ বাড়িয়ে মাথা দেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারেনি। দেখতে দেখতে কয়েক মাস পার হয়ে গেল। অনেকটাই সড়গড় হয়ে উঠেছে শিউলি। মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। ইচ্ছে আর লক্ষ্যটাই আসল। মেয়েরা আজকাল অনেক কিছুই করছে। ব্যবসা জিনিসটা টাফ, কিন্তু সব চাকরিই কি সহজ! ব্যবসার টাফনেস নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে, ফিল্ডে নামার পর আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে শিউলির। পবন জালানি রাজীবকে ডিসটার্ব শুরু করেছিল। ওর পুরো বিজনেস নেটওয়ার্ক স্টাডি করার পর ওকে বধ করার শক্তিশেল খুঁজে বের করে ফেলল শিউলি। তারপর ছোট ছোট কয়েকটা স্টেপ নিতেই অনেকটা দমে গেল জালানি। জালানি সম্পর্কিত ইনভেস্টিগেশনের পুরো দায়িত্ব শিউলি দিয়েছিল দেবোপমকে। ভীষণ ডায়নামিক এবং ইন্টেলিজেন্ট ছেলে। ক্রিটিক্যাল প্রবলেম সলভ করতে পারে খুব সহজ দক্ষতায়। অথচ রাজীব আগাগোড়া বিশ্বাস করে গিয়েছে শুধু ওল্ড ফেলো বিশ্বাসবাবুকে।

তিন

দেবোপম হেসে বলল— “ইউ আর জিনিয়াস ম্যাডাম। কিছু মনে করবেন না, প্রথমে আপনার সম্পর্কে ধারণা খুব একটা ভালো ছিল না। মনে যথেষ্ট সন্দেহ হচ্ছিল, যেভাবে স্যারের বিপরীত ধারায় শুরু করেছেন, তাতে সামলাতে পারবেন তো? ইভেন একটা সময় এটাও মনে এসেছিল, এই ফার্ম ছেড়ে অন্য কোথাও জয়েন করি। এখন আর কোনো সন্দেহ নেই।”

শিউলি হাসল— “সরাসরি কোনোদিন বিজনেসে জড়াইনি বটে, কিন্তু ছোট থেকেই বাবা, বড়দাকে দেখেছি, ওদের কাজ, ডিসিশন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছি। সেই নজরটাই কাজে লাগছে। ওঁরা দু’জনেই পাক্কা বিজনেস ম্যান। বাবা নেই, বড়দা যাকে বলে বিজনেস টাইফুন। সেই রক্ত আমার শরীরে বইছে। তবে কোনোদিন বিজনেসে নামতে হবে ভাবিনি, সেটা সম্পূর্ণ পরিকল্পহীনভাবে হয়ে গেল।”

একটা ফাইল টেনে অন্যমনস্কভাবে বাঁধন খুলল। চশমা পরে ফাইলে চোখ রেখে বলল— “জীবনের চেয়ে বড় টিচার তো আর নেই। প্রয়োজনমতো ঘেঁটি ধরে শিখিয়ে নেয়।”

দেবোপম বলল— “স্যারকে আমি অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু উনি প্রেজেন্ট সিচুয়েশন বোঝার চেষ্টা করতেন না। কিংবা হয়তো ভাবতেন, আমার সাবঅর্ডিনেট হয়ে জ্ঞান মারছে? সবসময় নেগলেক্ট করার চেষ্টা করতেন।”

শিউলি চশমার ওপর দিয়ে তাকাল দেবোপমের দিকে। ভ্যাবাচ্যাকা খেল দেবোপম।

—“সরি, আসলে গড়বড়টা দেখতে পেয়েও স্যার দেখছেন না দেখে রাগ হত। যেখানে কাজ করছি সেখানকার ভালোমন্দ আমাকে বিচলিত করে।‌ আবার ভালো কিছু করতে পারলে দারুণ একটা স্যাটিসফেকশন হয়। আপনি সে সুযোগ দিলেন, সেজন্য ধন্যবাদ। ভাববেন না আমি স্যারের বদনাম করছি।”

শিউলি কোনো জবাব দিল না। ‍কী জবাব দেবে? নিজের মনেও একই প্রশ্ন উঠে আসছে। দেবোপম যেটা বলল সেটা কি খুব অপ্রাসঙ্গিক? নিজের বউকেই কি খুব বেশি পাত্তা দিত রাজীব? ব্যবসা সংক্রান্ত তো দূরের কথা, সামান্য পারিবারিক কোনো সমস্যার বিষয়েও কোনো মতামত রাখতে গেলে রাজীব অঙ্কুরেই তা খারিজ করে দিত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। কখনো কখনো তো শোনার প্রয়োজনটুকুও বোধ করত না। ভাবটা এমন করত, মেয়েমানুষ আবার কী বুদ্ধি দেবে? ইচ্ছে করেই নিজেকে গুটিয়ে রাখত শিউলি।

হঠাৎ শিউলি বলে উঠল— “আমার মন বলে তোমার স্যারের মৃত্যুটা আন-ন্যাচেরাল ডেথ। এ বিষয়ে তোমার কী মনে হয় দেবোপম?”

ঘাবড়ে গেল দেবোপম। হতভম্ব হয়ে বলল— “সেভাবে তো ভাবিনি ম্যাডাম। আমি জানি সিম্পল অ্যাক্সিডেন্টের কেস। পুলিশও তো তাই বলেছে শুনেছি। হঠাৎ আপনার এরকম মনে হল কেন? এনি ডাউট?”

—“না, সেরকম কিছু নেই। তবুও কেন যেন মনে হয়। জানি এই মনে হওয়াটা কোনো কাজের কথা নয়, কিছু থাকলে পুলিশ ঠিক তার সন্ধান বের করে ফেলত। খুব বিরক্তিকর এই মনে হওয়াটা। মাঝেমাঝে বাইরেও চলে আসে, ডোন্ট মাইন্ড।”

—“স্যারের মৃত্যু নিঃসন্দেহে শকিং। কতই বা বয়স হয়েছিল। বুঝতে পারছি, আপনার মন সেটা নিতে পারছে না। সেটাই স্বাভাবিক। আপনার সাবকনশাস মাইন্ড অন্য কিছু বিশ্বাস করে ফেলেছে।”

শিউলি বিষণ্ণ হাসি হাসল— “তাই হবে হয়তো। নিজেই নিজেকে কাউন্সিলিং করতে হচ্ছে…”

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৫ম অংশ)

রাজীব একটা বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল, শিউলি সবটাই জানত। মহিলা ডিভোর্সি, এক ছেলের মা, অসাধারণ রূপসি। রাজীব অবশ্য স্বীকার করত না। বলত, জাস্ট বন্ধুত্বের সম্পর্ক। মহিলা নাকি অসহায়, বিজনেস ইন্টারেস্টেড এবং কিছু টাকা ইনভেস্ট করতে চান। তাই রাজীব তাকে হেল্প করে। হেল্প! কত ধরনের হেল্প হয় পৃথিবীতে! শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ যেদিন পেল শিউলি, ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণায় কেঁদেছিল ঘরের কোণে বসে, কাউকে বলতে পারেনি কিছু। কাকে বলবে? কী বলবে? কে শুনবে তার কথা? পরে মনে অদ্ভুত একটা প্রশ্ন জেগেছিল, ভালোবাসা বলে সত্যি কি কিছু হয়? যদি হয় তবে সেটা জল মেশানো দুধ, লক্ষ কোটিতে দু’একজন তার স্বাদ অনুভব করতে ও করাতে পারে। নিঃশব্দে, নীরবে আরও অসংখ্য বঞ্চিত নারীদের ভিড়ে নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছিল।

তবুও রাজীব ছিল, সিঁথিতে সিঁদুরের উৎস হয়ে। যে সিঁদুর পরতে গিয়ে কতবার যে হাত থেকে পড়ে যেত সিঁদুরের কৌটোটা। শাশুড়ি তার জন্য খোটা দিতে ছাড়েননি। তবুও পড়ত। শাশুড়ি বুঝতেন না, এটাই ছিল রাজীবের বিরুদ্ধে শিউলির প্রতিবাদ। একই বিছানার মাঝে তৈরি করে দিয়েছিল সাত সমুদ্রের ব্যবধান।

—“ম্যাডাম… ম্যাডাম… কী ভাবছেন?”

ভাবনার তার ছিঁড়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসবাবু। শিউলি বলল— “কিছু বলবেন?”

—“বললাম মিসেস সেন ফোন করেছিলেন। বারবার তাগাদা দিচ্ছেন। ওঁর পঁচিশ লক্ষ টাকা তুলে নিতে চান। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, আপনার নির্দেশমতো না করে দিয়েছি।”

—“ভালো করেছেন। ওঁর সঙ্গে দেখা করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। ওঁর সঙ্গে রাজীবের এগ্রিমেন্ট ছিল টাকাটা যখন চাইবেন দিয়ে দিতে হবে। আমি দেখেছি সেই কাগজ। পাকা কাজ। কিন্তু এই মুহূর্তে এতগুলো টাকা আমাদের পক্ষে একটু সমস্যা তো হবেই। সবে পায়ের তলায় একটু শক্ত মাটি পাচ্ছি।”

—“এগজ্যাক্টলি ম্যাডাম। হঠাৎ করে এতগুলো টাকা তুলে ফেললে অ্যাসেসমেন্টে সমস্যা হবে।”

—“আপনি ওঁকে বুঝিয়ে বলুন আর একবার। তিন চার মাস সময় চেয়ে নিন। উনি যাতে ভুল না বোঝেন তার জন্য ওয়ানথার্ড পেমেন্ট করে দিন।‌ তাহলে নিশ্চয়ই উনি বুঝবেন আমাদের কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই। সেইসঙ্গে এটাও বলে দিন, এই দেরির ইন্টারেস্টও আমরা পে করে দেব।”

—“যদি রাজি না হন?”

—“হবেন, আপনি বলেই দেখুন। না হলে আমি তো আছি।”

মিসেস সেন, রাজীবের প্রেমিকা! ব্যবসা, পরকিয়া দু’টোই একসঙ্গে চালিয়েছিলেন ভদ্রমহিলা। গত দু’বছরের মধ্যে কলকাতার বুকে দু-দু’টো ফ্ল্যাট কিনেছেন। তার পিছনে রাজীবের অবদান যে নেহাত মন্দ নেই, তা সহজেই অনুমান করে নিতে পারে শিউলি। কিন্তু সেসব ইনভেস্টের বাইরের হিসাব, ধরার কোনো উপায় নেই। হঠাৎ করে ক্যাপিটাল সর্টেজ থেকে কিছুটা অনুমান করা যায় মাত্র। বিশ্বাসবাবু যখন কিছুটা ধরতে শুরু করেছিলেন, তখন খুব সুন্দর। ভাবে তার মাথায় পবন জালানির তত্ত্ব ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মানেননি মিসেস সেন, জানালেন বিশ্বাসবাবু। সেইসঙ্গে বললেন, রীতিমতো হুমকি দিলেন, বললেন কোর্টে যাবেন, জেলের ঘানি টানিয়ে ছাড়বেন।”

শিউলি হাসল— “তাই?”

—“আপনি হাসছেন? আমার কিন্তু ভয় করছে।”

—“এসব তো থাকবেই, এত ভয় পেলে চলবে? উনি টাকা পান, আমরা তো বলিনি টাকা দেব না, শুধু একটু সময় চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ওঁর মুখোমুখি হব না, ঘুরেফিরে সেটাই হতে হবে দেখছি। আপনি ওঁর সঙ্গে আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করুন। অফিসে নয়, আমি ওঁর বাড়িতেই যাব।”

আরও পড়ুন: এক সমুদ্রকন্যা ও তার সমুদ্র-সুতো তৈরির গল্প

অভিজাত এলাকার সুদৃশ্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। মনমাতানো ইন্টিরিয়র। দেওয়ালে দামি পেইন্টিংস, অ্যান্টিক শো পিস, ইমপোর্টেড ঘড়ি… চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় ডুবে যেতে যেতে শিউলির মনে হল, এই আরামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা মিশে আছে। একটা সুবেশা মেয়ে হাসিমুখে সামনে দাঁড়িয়ে বলল— “কী নেবেন ম্যাম, ঠান্ডা না গরম?”

—“নাথিং।”

মেয়েটা চলে গেল। রোবট মার্কা চলন। একটু বাদেই ঘরে ঢুকলেন মিসেস সেন। পরনে নেভি ব্লু কালারের দামি হাউজকোট। গায়ের রং যেন আলতা মেশানো দুধ। সরু নাক। বড় বড় টানা চোখ। শিউলি অপলক চোখে তাকিয়ে আছে দেখে মুচকি হাসলেন।

শিউলি বলল— “পুরুষ মানুষকে খুব একটা দোষ দিই না। সত্যি সুপার্ব! আমার স্বামীও একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন।”

তারপরেই আবার হেসে বলল— “ডোন্ট টেক ইট আদার ওয়াইজ মিসেস সেন। আই অ্যাম জাস্ট জোকিং।”

গম্ভীর হল মিসেস সেনের মুখ। ফর্সা গাল লাল হয়ে উঠল। সেদিকে নজর না দিয়ে শিউলি বলল— “বিশ্বাসবাবু বলছিলেন আপনার টাকাটা ইমিডিয়েট দিতে বলেছেন, নইলে কোর্টে যাবেন। কোর্টে গেলে আপনি জিতবেন আমি জানি এবং ঘটিবাটি বিক্রি করে হলেও টাকাটা আমাদের দিতে হবে। আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ, যদি একটু সময় দেন।”

মিসেস সেনের মুখে তির্যক হাসি— “আমি জানতাম আপনি আসবেন … না এসে যাবেন কোথায়?”

—“কী করে বুঝলেন?”

—“কমনসেন্স। কারো স্বামী যদি কেউ ছিনিয়ে নেয় এবং সেটা যখন সে জানতে পারে, তখন তো তাকে আসতেই হয়। আপনি কি সব জেনেই এসেছেন?”

—“অনেক দিন আগে থেকেই জানি। রাজীবকে পথে আনার অনেক চেষ্টা করেছি। নানা ভাবে বুঝিয়েও কোনো কাজ হয়নি। একটা সময় আমার নিজেরই মনে হয়েছে, রাজীব আমার চেয়ে আপনাকে অনেক বেশি পছন্দ করে। টাকা-পয়সার ব্যাপারগুলো অবশ্য পরে জানলাম।”

—“রাগ হয়নি?”

—“রাগের চেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে। রাজীবকে আমি সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছিলাম। আমার ভালোবাসা, আমার বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে রাজীব। আমি সব সইতে পারি, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা সহ্য করতে পারি না। তাই তো দু’টো কাজ একসঙ্গে করেছি।”

—“কী কাজ?”

—“একদিকে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি দিয়েছি, অন্যদিকে আমার ভালোবাসার মর্যাদা রাখার জন্য রাজীবের পরিবার ও ব্যবসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছি।”

—“মানে?”

—“মানেটা একদমই সহজ। আমিই কন্ট্রাক্ট কিলার দিয়ে রাজীবকে মেরেছি, আপনার সামনে অকপটে স্বীকার করছি। হয়তো আপনি খুব খারাপ ভাবছেন। একটা মেয়ে কীভাবে নিজের স্বামীকে হত্যা করাতে পারে… ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আপনি কি আমার চেয়ে খুব ভালো? একধরনের মেয়ে আছে যারা নিজেদের গেম স্পেশালিস্ট ভাবে। জীবনের সবকিছুতেই গেম খেলতে চায়। দু’চারটে জিতে ভাবে আমি অপরাজিতা। যখন সত্যি সত্যি কোনো দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বীর সামনে পড়ে, তখন সব খেলা ঘুচে যায়।”

মিসেস সেনের মুখটা রক্তহীন বেলে মাছের মতো। বিবর্ণ, যেন ভূতুড়ে অবয়ব।

শিউলি বলেই চলে— “আমার স্বামীকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আপনি কোনো আনন্দ পাননি। কারণ আনন্দ জিনিসটা লুকোনো থাকে ভালোবাসার মধ্যে। যেটা পেয়েছেন, সেটা হল কিছু টাকা আর মূল্যহীন ভোগসুখ। তবুও আপনি এসব নিয়েই প্রাউড ফিল করেন। আপনি তো এমনই! নইলে সেদিন… যাকগে ভেবেছিলাম কোনোদিন আপনার সামনে আসব না… কিন্তু আপনি বাধ্য করালেন। যে টাকার জন্য আপনি ছটফট করছেন, সেটা তো আসলে রাজীবেরই টাকা। কিন্তু যে টাকায় অবিশ্বাসের ছোঁয়া লেগেছে, সে টাকা আমি চাই না। রাজীবকেই ত্যাগ করে দিলাম!”

মিসেস সেন কোনোরকমে বললেন— “আপনি রাজীবকে মারতে পারলেন?”

আরও পড়ুন: ত্রাসের‌ ‌কবিতা‌ ‌

শিউলি বিষণ্ণ হেসে বলল— “হ্যাঁ পারলাম। যেদিন প্রথম রাজীবের সমস্ত কীর্তিকলাপ জানতে পারলাম, সেদিন আমার মনেও একটা প্রশ্ন উঠেছিল, রাজীব আমার সঙ্গে এরকম করতে পারল? যেদিন প্রথম আমি আপনার পরিচয় পেয়েছিলাম সেদিনও আমার মনে একটা প্রশ্ন উঠেছিল, একটা মেয়ে কী করে এসব করতে পারে? আপনারা এতকিছু পারেন আর আমি কিছুই পারব না? খুন করিয়েছি বলে আমার অপরাধটা বেশি? একটু মন দিয়ে ভাবুন মিসেস সেন, এই যে আপনারা দু’জন মিলে একটা মেয়ের বিশ্বাস, ভালোবাসাকে ধীরে ধীরে ঠান্ডা মাথায় শেষ করে দিয়েছেন সেটা কি খুনের চেয়ে কম কিছু?”

—“তাহলে তো আপনার আমাকেও মারা উচিত ছিল।”

—“আমার বিশ্বাসের সঙ্গে আপনার কোনো প্রত্যক্ষ যোগ নেই। আমার কাছে আপনার চেয়ে অনেক বড় বিশ্বাসঘাতক হল রাজীব। আপনার বিচার অন্য কেউ করবে। তবে আপনিও রেহাই পাবেন না। মানুষের বিশ্বাস এমন এক অমূল্য সম্পদ যার উপর ভিত্তি করে টিকে থাকে সমস্ত সম্পর্ক। আপনি যে সঠিক নন, সেই ধারণা আশা করি ভেঙে গেল আপনার। এর আগেও বিশ্বাস ভেঙেছেন আপনি। হেঁয়ালি লাগছে আমার কথা? একটু অপেক্ষা করুন, সব দেখবেন। এবারে উঠি। আর হ্যাঁ, টাকাটা নিয়ে অযথা টেনশন করবেন না, তাগাদাও দেবেন না প্লিজ।‌ যথাসময়ে আমি ঠিক ফিরিয়ে দেব। আমি সবকিছুই যথাসময়ে ফিরিয়ে দিই… মনে হয় না আপনার মনে আর কোনো সন্দেহ রইল। নমস্কার মিসেস সেন… চলি।” শিউলি ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল হনহন করে। হতভম্ব, স্তম্ভিত মিসেস সেন ওরফে মালা সেনের মনে হল একটা কালবৈশাখী ঝড় যেন সবকিছু তছনছ করে দিয়ে এই মুহূর্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *