বিদ্রোহী কবির প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

মীম মিজান

একজন কবি স্বপ্ন দেখান। স্বপ্ন দেখিয়ে জাতিকে জাগিয়ে তোলেন। আর জাতির যোদ্ধা ছেলেদের হৃদয় গভীরে স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের ঢেউ তোলেন। এভাবেই কবি হন আগামীর স্বপ্নদ্রষ্টা। ফলে মুক্তির স্বাদ আস্বাদনকারী জাতি কবিকে দেন মনের সিংহাসনে আসন।

Kazi Nazrul Islam - The New Nation

বিলেতি শোষকদের রক্তচক্ষু দৃষ্টে তৎকালীন প্রায় সকলই পরিতোষণের নীতি অবলম্বন করেছিলেন। কবিগণ লিখেছিলেন বেনিয়া স্তূতিকাব্য। উপহারস্বরূপ পেয়েছিল রাজন্য সুবিধা। ঠিক সে সময়ে যিনি স্রোতের বিপরীতে হেঁটেছিলেন। বজ্র্যকণ্ঠে প্রতিবাদ করেছিলেন ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিকতার। কাব্যের ভাষায় সুনামি তুলেছিলেন বর্গিদের দুরাচারী ক্ষমতার মসনদে। তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

আরও পড়ুন: অবিরাম শিবরাম

Our rebel poet: A timeless inspiration | Dhaka Tribune

মানবতার মুক্তির পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনীকে তিনি রেখেছিলেন অব্যাহত। বাংলা কাব্য ও সংগীতে কাজী নজরুল ইসলাম এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছিলেন। নজরুল সংগীত, গজল ইত্যাদি তাঁর এক চিরঞ্জীব অনন্য সৃষ্টি।

Kazi Nazrul Islam: The Rebel Poet | IndiaFactsIndiaFacts

লেখক সুভাষ বসুর নজরুলকে নিয়ে বলা একটি উক্তি করছি, যে উক্তিতে তিনি বলেন, “আমরা যখন যুদ্ধে যাব— তখন নজরুলের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব— তখনও নজরুলের গান গাইব।” আমরা তাই নজরুলকে শুধু কবি পুরোধা দিয়ে আবদ্ধ করতে চাই না। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক উচ্ছল যৌবনা নদীর ন্যায়। নদীর ঢেউ যেমন বয়ে চলে নিরবধি, ঠিক তেমনি নজরুলও তাঁর কলমকে চালিয়েছিলেন সাহিত্যের সকল শাখায়। তিনি যেমন কবি, তেমনি একজন ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। যেমনি একজন সম্পাদক তেমনি একজন নাট্যকার ও অনুবাদক। প্রাবন্ধিক বা চলচ্চিত্র পরিচালকও তিনি।

আরও পড়ুন: কবিতার, সাম্যের, মস্করার শিব্রাম

Kazi Nazrul Islam and his family | Rare photos, Old photos, Photo

ব্রিটিশ-বেনিয়াদের বুকে ঝড় তোলা কবি নজরুল ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ, নাটক, চলচ্চিত্র নির্মাণ, পত্রিকা সম্পাদনা সবক্ষেত্রেই আমরা তাঁর সফল পদচারণা দেখেছি এই সব্যসাচী কবির, যা আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে বিরল। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের জীবনের মাত্র ৪২ বছর বয়সে সৃজনশীলতায় অনন্য এ কবি আক্রান্ত হন পিকস্ ডিজিজে। বন্ধ হয় তাঁর ক্ষুরধার লেখনী।

File:Kazi nazrul islam with Setar.jpg - Wikimedia Commons

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিশেষ উদ্যোগে তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। জাতীয় কবির জন্য ধানমন্ডিতে বসবাসের জন্য বাসভবন বরাদ্দ করা হয় এবং তাঁর চিকিৎসা ও পরিচর্যার যাবতীয় ব্যবস্থাও করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে।

কলম যে বন্দুকের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে, তা তিনি প্রমাণ করেছেন তাঁর ক্ষুরধার আগুনঝরা লেখনীর দ্বারা। তাঁর কলমকে ভয় করত ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী, এজন্যে তাঁর পাঁচটি গ্রন্থ ও বেশকিছু কবিতা, প্রবন্ধ এবং গান ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। যে পাঁচটি বই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, সেগুলো হল— (১) যুগবানী, (২) বিষের বাঁশি, (৩) ভাঙার গান, (৪) প্রলয় শিখা এবং (৫) চন্দ্রবিন্দু। নজরুল যেমন তাঁর আসল দুশমন চিনেছিলেন, এজন্য সেই দুশমনরা তাঁর পেছনে লাগিয়েছিল গোয়েন্দা, তাঁকে পাঠিয়েছিল এই সুন্দর বসুন্ধরার ফুলে-ফলে ভরা সবুজ-শ্যামল গাছপালার অক্সিজেনযুক্ত আলো-বাতাসের পরিবেশের পরিবর্তে-হতশ্রীর আবছা আলো আবছা আঁধারে নিমজ্জিত কারাগারে। কিন্তু তারা (ব্রিটিশ শাসক) অসির চেয়ে ধারালো শক্তিশালী নজরুলের কলম বন্ধ করতে পারেনি। তিনি কারাগারে থেকেই ডাক দিয়েছিলেন—


“কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙে ফেল কররে লোপাট
রক্তজমাট শিকল পুজোর পাষাণবেদী
ওরে ও তরুণ ঈশাণ, বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ
ধ্বংস নিশান উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদী”

Nazrul's 43rd death anniversary being observed | theindependentbd.com

দীর্ঘ প্রায় তিনদশক নির্বাক থাকার পর সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র) ইন্তেকাল করেন। কবির মনে-প্রাণে পরকালীন অনুভূতি ছিল সজাগ। তাই তিনি কালজয়ী ও মনোবাসনামূলক একটি গান লিখেছিলেন—


“মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা যাবে
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে
গোর-আজাব থেকে এ গুণাহগার পাইবে রেহাই।”

Feroza Begum next to Kazi Nazrul Islam... - Kazi Nazrul Islam কাজী নজরুল  ইসলাম | Facebook

কবির সেই ইচ্ছে পূরণে ঢাবি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্য যাঁকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল তিনি হলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর চেতনা ও আদর্শ চিরভাস্বর হয়ে আছে আমাদের জীবনে। আজ ব্রিটিশদের বুকে কাঁপনতোলা সেই বিদ্রোহী কবির ৪৪তম প্রয়াণদিবস। তাঁর প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ শ্রদ্ধাঞ্জলি!

Yet another falsity - Frontline

লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিলে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে গবেষণারত। তাছাড়াও অনুবাদ করেন। ভালোবাসেন প্রবন্ধ ও গল্প লিখতেও।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *