রক্তাক্ত ভাষ্য বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

দেবাশিস ঘোষ

বীরেন্দ্র সমগ্র তৃতীয় খণ্ডের ভূমিকায় তাঁর কবিতা নিয়ে বলতে গিয়ে একটা খুব জরুরি কথা লিখেছেন সব্যসাচী দেব। ‘‘উত্তরকাল দূরে দাঁড়িয়ে ইতিহাস ও কবিতাকে মেলানোর দায় স্বীকার না করে হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারে এ কি কবিতা! কখনো বা সমকালও শিল্পের অভিমানে ঈষৎ অবজ্ঞা দেখায়, বলে— এ কবিতা হয়নি। কিন্তু বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জানতেন শিল্পের থেকেও বড় মানুষ আর তার জীবন। শিল্প অপেক্ষা করতে পারে, তার পাওনা পরেও মেটানো যেতে পারে, মানুষ আর জীবনের দাবি অতটা অপেক্ষা করে না।” তাঁর কবিতায় সবার আগে জীবন, দেশ, কাল। সাহিত্য শূন্যতার সাধনা নয়। মাটিকে ছেড়ে আকাশে ভাসমান কল্পনার প্রাসাদও নয়। এটাকে মাথায় রেখেই পড়তে হবে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে।

আরও পড়ুন: খাদ্য-আন্দোলন: শহিদ দিবস

বীরেন্দ্রর কবিতায় শিশুর রক্ত, গুলি, মন্ত্রী, সাংবাদিক, খুনি, গুন্ডা, লাশ, খিদে, ফ্যান, কান্না এইসব কিছুই আছে। থাকবেই তো। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তুর আগমন, খাদ্যাভাব, কালোবাজারি এইসব কিছুই তার চারপাশে ঘটে চলেছে। একজন সংবেদী কবি সেসব ভুলে থাকতে পারেন না। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ৩০-৩১ ডিসেম্বর, ১৯৬৭-তে তিনি লিখছেন জেলখানার কবিতা/২। তাঁর কবিতায় বিষয়ের বৈচিত্র্য লক্ষ করার মতো। সুকান্ত, নজরুল, মাও সেতুংয়ের লং মার্চ, ম্যাক্সিম গোর্কি আর রয়েছে রক্ত। পঙ্‌ক্তিতে পঙ্‌ক্তিতে রক্ত ঝরা সময়কে তিনি ধরেছেন।

আরও পড়ুন: ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’

‘পোয়েট্রি কনফারেন্স’-এ সুতীব্র স্যাটায়ার সমকালীন অনেক কবি, বুদ্ধিজীবীদের প্রতি। ‘‘দেড়-আঙুলে বামনেরা সভা করে শুকনো খালে বিলে/ব্যাঙের গলার চেয়ে অধিক বিকট কোনো কন্ঠস্বরে আওড়ায় বক্তৃতা,/অথবা কবিতা পড়ে; পরের পয়সায় ছাপাখানা থেকে বের করে/সুভেনির পোয়েট্রি স্পেশাল।” কবি লেখকদের আরও বলছেন, ‘যা লেখো কবিতা লেখো’ কিন্তু খবরদার সাপের লেজে পা দিও না। ‘বোদলেয়ার ভেঙে খাও, স্বপ্নে দেখো নাজিম হিকমত, অনুবাদ করো পাবলো নেরুদা’ কিন্তু সাবধান নিষিদ্ধ রক্তের দিকে তাকিও না, তোমার স্বদেশ যে বধ্যভূমি তা বলা চলবে না, দেশপ্রেম যে হাজার শিশুর রক্ত এসব লেখা চলবে না।

Poet Birendra Chatterjee is turning 100 Years this year - Anandabazar

হ্যামলেটকেও তাঁর কবিতায় পাই যেখানে কবি লিখেছেন কলকাতার ফুটপাথে রাত কাটায় এক লক্ষ উন্মাদ হ্যামলেট, তাদের জননী জন্মভূমি এক উলঙ্গ পশুর সঙ্গে সহবাস করে আর জলে ভেসে আসে ওফেলিয়া। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় যে তীব্রতায় সমাজ সচেতনতা ধরা পড়েছে, তা অন্য কারোর কবিতায় এত ডিটেলে ধরা পড়েনি। ‘‘এ রাজপথ রাজার এবং ভিক্ষুকের। এই দেশ/ইন্দিরার এবং যে জেলখানায় রাত কাটায় তার।” কী তীব্র উচ্চারণ। যে জেলখানায় রাত কাটায় তাঁর এই দেশ। আসলে সে মানুষ দেশকে এভাবে চায়নি। সে দেশের যন্ত্রণা, রক্তক্ষরণ চেনে তাই সে প্রতিবাদী, তাই সে জেলে। বাকিরা গয়ংগচ্ছ।

কবি বলেছেন, এই দেশ ফুটপাথে শুয়ে থাকা উলঙ্গেরও। কিন্তু যে আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘুমোয় তার নয়। আপাত সরল এই পঙ্‌ক্তির ভিতরে কতখানি বারুদ ভরা, তা মনোযোগী পাঠে ধরা দেয়। বীরেন্দ্রর কবিতা পড়লে সময়ের ডিটেল ইতিহাস পড়া হয়। ভিয়েতনাম হয়ে ওঠে কলকাতা। কার্জন পার্কে কিশোর প্রবীর দত্ত খুন হয়ে যায়। তাঁর মা রাত জেগে ছেলের অপেক্ষায় থাকে। ছেলে ফেরে না। কলকাতা তখন সুন্দর বনের জঙ্গল। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় সময়ের রক্তদাগ পড়তে পড়তে পাঠকেরও বোধে রক্ত দাগ ধরবে, সেখানেই তার অক্ষরের সার্থকতা।

রাজা আসে যায় বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়... - কবিতার খাতা ⌠ Kobitar Khata ⌡ |  Facebook

দেবাশিস ঘোষ, জন্ম ও বেড়ে ওঠা রানাঘাটে। পেশায় শিক্ষক। কবিতা দিয়ে লেখার জগতে প্রবেশ। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঈশ্বরের বিরুদ্ধে (২০০৪), দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘ যাপনের দু’এক ছটাক’ (২০২০)। কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্প ও প্রবন্ধ লেখেন। দেশ পত্রিকা সহ বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও ওয়েবজিনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • Swapn Mukhopadhyay

    সুন্দর গোছানো নিবন্ধগুলি। গুরুত্বপূর্ণও বটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *