Latest News

Popular Posts

প্রতিমার শেষ মাস

প্রতিমার শেষ মাস

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

বলুন তো ভারতের কোন মহিলা লোকসংগীত শিল্পী রাজপরিবারে জন্মেছিলেন? বলতে পারবেন কোন শিল্পীর জীবনের শেষ দু’টি দিনে কোন মুখ্যমন্ত্রী হাসপাতালে অহর্নিশ তত্ত্বাবধান করেছিলেন? জানেন কি ভারতে প্রথম কোন লোকসংগীত শিল্পীর প্রয়াণের পরে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন হয়েছিল?

গুয়াহাটি বামুনি মৈদান-এ প্রতিষ্ঠিত প্রতিমা (চিত্র: শ্রাবস্তী ঘোষাল)

আপনারা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজুন, ততক্ষণে আমি এক দিনের বিবরণ শোনাই। উত্তর বাংলার সীমান্তগঞ্জ কামাখ্যাগুড়ি থেকে আমরা (মানে আমার কন্যা গানের পাখি ঋত, আমার বউ ঝর্ণা ও আমি) চলেছি অসমের গৌরীপুর। ২০০২ সালের চৌঠা ডিসেম্বরে উত্তরবঙ্গের সকাল অথচ শীত নেই! সে কি প্রতিমা দর্শনের উত্তেজনায়! শীতের সকালে ‘লুকাল’ বাসে চেপে চলেছি বক্সিরহাট, সেখান থেকে আবার ধুবুরিগামী বাসে গৌরীপুর। বাংলার সীমান্ত ছাড়িয়ে অসমের গোয়ালপাড়া।

মাটিয়াবগ বাসস্টপে থামলাম, নামলাম, চায়ের দোকানে আলাপ হল সোনা শেখের সঙ্গে— সে-ই চিনিয়ে নিয়ে গেল তার দিদির প্রাসাদে। উচ্চাবচ ভূমিতে এক টিলার ওপর এক সুবিশাল প্রাসাদ ‘হাওয়ামহল’। এখানেই অধিষ্ঠান করেন লোকসংগীতের সুরপ্রতিমা! হা হতোস্মি! ডানপাশের এক শুঁড়িপথ দিয়ে সোনা শেখ আমাদের নিয়ে এলো ভিতর আঙিনায়, দেখি এ তো শতচ্ছিন্ন এক ঘরের কঙ্কাল!

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ৩০)

ঋত ও প্রতিমাদি

কিন্তু মানুষের শিল্পী কি আর রাজপ্রাসাদের মহিমায় তুষ্ট থাকতে পারেন? তাঁকে পেলাম প্রখ্যাত বাংলাঢোল বাদক কলুদার বাড়িতে। দিদি উত্তেজক পানীয়ভরা কাপ হাতে বসে আছেন একটা মোড়ায় সারিন্দায় রয়েছেন সীতানাথদা, ঢোলে কলুদা (নাম মনে নেই দোতরাশিল্পীর)। এখানেই স্বচ্ছন্দ তিনি তাই অকপটে বলতে পারেন “আর, এসব আমার কেমন বাড়ি জানেন? আমার নিজের বাড়ি। এরা আমার খুব নিজের লোক।”

আর হাওয়ামহল রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে তাঁর পর্ণকুটির কেমন? দিদির ভাষায়, “আমার হাজবেন্ড থাকেন রাজকীয় বিছানায় আর আমি কুটিরের মধ্যে। উনি যখন রাতে আসবেন, তখন দরজাটা দয়া করে খুলবেন— আমি ঢুকব।”

প্রতিমাদির গান রেকর্ড করছে ঋত

ভূমিকাংশ থেকে প্রথম প্রশ্নের উত্তর: লোকসংগীত বিশেষত গোয়ালপরিয়া / ভাওয়াইয়া গানের অবিসংবাদী সম্রাজ্ঞী প্রতিমা বড়ুয়া জন্মেছিলেন অসমের সুবিখ্যাত বড়ুয়া বংশে। তাঁর জ্যাঠামহাশয় প্রমথেশ বড়ুয়া ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব। পিতা প্রকৃতিশচন্দ্র বড়ুয়া ছিলেন অবিভক্ত ভারতের একমাত্র হস্তী-বিশেষজ্ঞ। পিসিমা নীহার বড়ুয়া ছিলেন লোকসংস্কৃতির পরিচর্যায় নিবেদিত এক মুক্তমনের মানুষ।

আরও পড়ুন: শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের কবিতাভুবন: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

গানে বিভোর প্রতিমা বড়ুয়া

সেই প্রতিমা বড়ুয়ার সামনে হেঁটমুন্ডে বসে আছি আমরা। তিনি রস পান করছেন কাপ থেকে, আমরা রস পান করছি আমাদের কান আর মন দিয়ে। তিনি একের পর এক গান গেয়ে চলেছেন, কখনও কলুদার মেয়েকে ধমক দিচ্ছেন, কখনও ইচ্ছা হলে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। একের পর এক ঋতের গান শুনে কখনও তারিফ করছেন, কখনও শুধরে দিচ্ছেন। সুযোগ পেয়ে দিদির গান দিদির সামনেই গেয়ে নেয় ঋত, দিদিও পরম শুশ্রূষায় গানগুলো ঠিক করে দেন। সকাল গড়িয়ে দুপুরও কখন যেন খর হয়ে ওঠে। কলুদার মেয়ে এবার খেতে ডাকে, সব্বাইকে। ভাঙাচোরা ঘরের মালিক মনটাকে এমন উদার করে রেখেছেন কলুদা, যে সসংকোচেই তাঁদের আন্তরিক ডাকে সাড়া দিতেই হল।

গোধুলির রাঙা আলোকে সাক্ষী রেখে বেরোতেই হল। বিকেল ৫টায় শেষ বাস বক্সির দিকে। রিকশায় উঠতে গিয়ে দেখি কলুদা, তাঁর বাড়ির সবাই আর আমাদের প্রিয় দিদি প্রতিমা বড়ুয়া রাস্তা পর্যন্ত চলে এসেছেন। বাসে উঠে নীরবতা ভেঙে ঋত বলেছিল: “ধন্য হলাম ‘মাটির প্রতিমা’কে প্রণাম জানিয়ে।”

আরও পড়ুন: আদিবাসী জনজীবন ও পশুপাখি

দিলীপ বড়ঠাকুর, ঝর্ণা, ঋত প্রতিমাদির সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত

ভূমিকার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা এরকম: আমরা ফেরার দিন পনেরো পরে দিদি হঠাৎই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২১/১২/০২-এর দৈনিক সংবাদ প্রতিদিনে তাঁর অসুস্থতার খবর প্রকাশিত হয়। ওই পত্রিকার গুয়াহাটির সাংবাদিক বন্ধুর কাছে খবর পাই যে, অসমের জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রীতরুণ গগৈ দিদিকে গৌরীপুর থেকে উদ্ধার করে এনে গুয়াহাটির সেরা একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। ক্রমাগত প্রতিমা বড়ুয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ২৪ তারিখে তিনি মুম্বই থেকে একজন প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞকে উড়িয়ে আনেন। শেষ দু’দিন নাকি মুখ্যমন্ত্রী শ্রীগগৈ হাসপাতাল থেকে কোথাও যাননি। চিকিৎসার খুঁটিনাটি সব তিনি নিজে তত্ত্বাবধান করেছিলেন। কিন্তু শেষ যুদ্ধটা আর যুঝতে পারলেন না। ২৭/১২/২০০২ রাতে ই-টিভি জানায়, প্রতিমা ভাসানের দুঃসহ দুঃসংবাদ।

আরও পড়ুন: নৌকাডুবি ও নেতো-পদ্মার অন্যান্য কৌশল

প্রতিমাদির আপন ঘরের তিনজন, দোতরাশিল্পী, ঢোলশিল্পী কলুদা ও সারিন্দাশিল্পী সীতানাথদা

‘গদাধরের পাড়ে পাড়ে’ গান গাইতেন প্রতিমা বড়ুয়া। শ্রীগগৈ দিদির প্রয়াণের পরে গুয়াহাটি থেকে তাঁর দেহ প্রিয় ভূমি গৌরীপুরে আনার নির্দেশ দেন। এবং গদাধরের পাড়ে শ্মশানঘাটে স্বয়ং উপস্থিত থেকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন করেন। আমার জানা এটিই ভারতে কোনও লোকসংগীত শিল্পীকে প্রথম পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মান-সহ বিদায় জানানোর ঘটনা।

আরও পড়ুন: হারিয়ে যাওয়া গবেষণাগারের খোঁজে

বিশেষ মুডে প্রতিমা বড়ুয়া (ফোটো: ঋত)

প্রিয় প্রতিমা বড়ুয়ার প্রয়াণ কুড়ি বছর হয়ে গেল! তবু মনে হয়, এই তো সেদিন দিদি ইচ্ছা প্রকাশ করলেন আমাদের ঘরে এসে থাকবেন!

কামাখ্যাগুড়ি থেকে বাড়ি ফিরেই আমাদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার লিপিবদ্ধ করে ফেলেছিলাম। কিন্তু ২৭/১২/০২-এ তাঁর প্রয়াণ সংবাদ পাওয়ার পরে লেখাটা পুনর্মার্জন করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ডা. সুদর্শন সেনশর্মা সম্পাদিত ‘কারুকথা’ পত্রিকায়। ‘মাটির প্রতিমা ও লোকসঙ্গীত’ শিরোনামের এই লেখাটিই ছিল প্রতিমা বড়ুয়ার শেষ সাক্ষাৎকার। ২০০৩-এর বইমেলা সংখ্যা কারুকথায় লেখাটি সযত্নে প্রকাশিত হয়েছিল।

[যে-কথা অনিচ্ছাসত্বেও বলতেই হচ্ছে, তা হল― ২০০৫-এ বইমেলায় আগরতলার জ্ঞানবিচিত্রা প্রকাশ করে দামি একটা সংকলন ‘মাহুত বন্ধু রে’। সেই দামি গ্রন্থের সংকলক (প.ব. বিজ্ঞানমঞ্চের সভাপতি অধ্যাপক) শ্যামল চক্রবর্তী মহাশয় সৌজন্যটুকু পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে আমাদের প্রকাশপূর্ব সম্মতি না নিয়ে এমনকী প্রকাশোত্তর কোনও সম্মান না দেখিয়ে তিনি আমাদের সেই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেন ‘শেষ সাক্ষাৎকার: মাটির প্রতিমা ও লোকসঙ্গীত’ শিরোনামে (পৃঃ ১২৫-১৫০)। এই হীনতাকেও তো বোধহয় প্লেজিয়ারিজম বলে!]

Related Posts

One thought on “প্রতিমার শেষ মাস

  1. প্রতিমা বড়ুয়ার সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারের বিবরণে একটা হারানো সুন্দর সময়কে তুলে ধরা হল। ঐতিহ্যকে ভুললে, অবহেলা করলে নিজের পায়ে কুড়ুল চালানো হয়। তাই এই সুন্দর সাক্ষাৎকারটি একটি মূল্যবান পাঠ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *