‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’

প্রণব বিশ্বাস

আগস্টের ২৯ তারিখ আবার ফিরে এসেছে। তারিখটা ভোলার নয়; দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এক কবির নাম। সাল ১৯৭৬,বার রবি, দুপুর তখন ১২টা ৩০ হবে। সেসময় বেশ মনে আছে বিবিধভারতীর এক অনুষ্ঠানে আমাদের কারও কারও মন-প্রাণ বেশ সমর্পিত থাকত। বিজ্ঞাপনী অনুষ্ঠান, কিন্তু সাংস্কৃতিক মানে অনন্য বললেও মনে হয় কম বলা হল। কী না থাকত সে অনুষ্ঠানে, জিঙ্গলস, নাটক, গল্প পড়া, গান আর বিখ্যাত মানুষজনের সাক্ষাৎকার। খুব ভুল না হলে এ অনুষ্ঠানে মনে হয় সত‍্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকারও শুনেছি।

Kamat's Potpourri:Picture Explorer : Kazi Nazrul Islam

হেমন্ত মুখোপাধ‍্যায়, সুচিত্রা মিত্র, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, জহর রায়দের কথা তো মনেই পড়ছে। ছিলেন আরও অনেকেই। আর ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ‍্যায়, সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অতীন বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ প্রমুখ লেখকেরা। সবচেয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম আশাপূর্ণা দেবীর কথা। সম্ভবত সেই প্রথম তাঁকে শোনা।

কাজী সব‍্যসাচী একদিন পড়েছিলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টোপ’ গল্পটি। সেই শোনার স্মৃতি কখনও ভোলার নয়।’ তেলেনাপোতা আবিষ্কার’, ‘শ্বেতময়ূর’-এর মতো গল্পও পড়া হয়েছিল মনে পড়ে। অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন শ্রাবন্তী মজুমদার ও কাজী সব‍্যসাচী। শ্রাবন্তীর গলায় ‘সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলীন’ এই জিঙ্গলস এতটাই প্রিয়তা অর্জন করেছিল যে অনেকেরই গলায় এই সুর তখন গুনগুনিয়ে উঠত।

সেই রবিবারের দুপুরও সুরভিত ছিল বোরোলীনের গন্ধে। হঠাৎ সুর কাটল। নিস্তরঙ্গ বেতারযন্ত্র। তবে কি যান্ত্রিক কোনও গোলমাল? একটু বেশি সময়ের নীরবতার পর জানা গেল খারাপ এক খবর। সেই খবরের জন্য এদেশে কারোরই কোনও মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। সকালের খবরের কাগজে এমন কোনও ইঙ্গিত ছিল না। সেই দুপুরের খবরকেই বোধহয় বলা যায় বিনা মেঘে বজ্রপাত। ছোট্ট ঘোষণার পর নির্ধারিত অনুষ্ঠান বন্ধ। পরিবর্তে বিভিন্ন শিল্পীর গলায় নজরুলের গান। ঢাকায় কাজী নজরুল ইসলাম প্রয়াত।

Feroza Begum next to Kazi Nazrul Islam... - Kazi Nazrul Islam কাজী নজরুল  ইসলাম | Facebook

সদ‍্য স্বাধীন বাংলাদেশে কবিকে সাদরে নিয়ে গিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিছুদিন সেখানে থেকে আবার তিনি ঘরে ফিরবেন এরকমই স্থির ছিল। কবির দুই ছেলে, ছেলের বউয়েরা ও নাতি-নাতনি সবাই আমন্ত্রিত হয়েছিলেন নতুন দেশে। সেদেশের সরকার কাজী নজরুলের থাকার জন্য ধানমণ্ডিতে বিশাল এক বাড়ির ব‍্যবস্থা করেছিলেন। আদর যত্নেরও কোনও ত্রুটি রাখেননি। নজরুলকে সেখানে রেখে পরিবারের প্রায় সবাই দেশে ফিরে এলেন। কবির দেখাশোনার জন্য সেখানে রয়ে গেলেন সব‍্যসাচীর স্ত্রী উমা ও তাঁর মেয়েরা— খিলখিল আর মিষ্টি। মুজিবুর রহমান চাইলেন দু-এক বছর কবি সেখানে থাকুন। পরিবার শেখ মুজিবরের অনুরোধ উপেক্ষা করবেন না এটাই স্বাভাবিক ও সংগত। বাংলাদেশ সরকার দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদকে কবিকে সম্মানিত করলেন। দেশের নাগরিকত্বও প্রদান করলেন।

কলকাতা তো তাঁর জন্য প্রশস্ত, পরিচ্ছন্ন একটি বাসস্থানের ব‍্যবস্থা পর্যন্ত করে দিতে পারেনি। সে লজ্জার দায় তো আমরা অস্বীকার করতে পারি না। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘন কৃষ্ণবর্ণের মেঘ জমতে শুরু করেছে একটু একটু করে অলক্ষে। এদেশে এখন যেমন ধর্মদর্শনের সঙ্গে সংযোগহীন এক হিন্দুত্ববাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের আবহে মুক্ত চিন্তা, তর্ক-বিতর্কের পরিসর ক্রমক্ষীয়মান বাংলাদেশের অবস্থাও তখন খানিকটা তাই। শেখ মুজিবর রহমান ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত আধুনিক বিজ্ঞাননির্ভর ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক এক দেশগঠনের স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু মৌলবাদ তাঁকে সে সুযোগ দেবে কেন? মৌলচিন্তাকে ঘুঁটি হিসেবে ব‍্যবহার করতে সর্বদা প্রস্তুত থাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা কূটকৌশল। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির আগে-পরে মুক্ত চিন্তার মানুষজনের নির্বিচার হত্যার মধ্যে তার ইঙ্গিত ছিল। আত্মপ্রত‍্যয়ী মুজিবর রহমান তা বুঝতে পারেননি। তাঁকে সতর্ক করার পরেও নয়। ইতিমধ্যে সেই ষড়যন্ত্রে সেনাও শামিল। দেশে-দেশে সেনা ষড়যন্ত্রে কত না গণতন্ত্রের অকালমৃত্যু ঘটেছে।

আমাদের দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই গণতন্ত্রের দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণে সযত্ন ছিলেন। তাই সংখ‍্যাগুরুর আড়ালে থাকা সাম্প্রদায়িকতার বিপদ আর সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজনীতি ও শাসনযন্ত্রের ঐক‍্য স্থাপনের ভয়াবহতা বিষয়ে সতর্ক থাকতে ও সতর্ক করতে সচেষ্ট থেকেছেন।

Depart Magazine|List Your Ad

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সকালে এদেশ যখন স্বাধীনতার বার্ষিকী উদ্‌যাপনে ব‍্যস্ত, তখনই পার্শ্ববর্তী দেশে ঘটে গেল নৃশংসতম দুর্ঘটনা। শেখ মুজিবর রহমান সপরিবারে নিজের বাড়িতে নিহত হলেন। মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বস্ততম নেতৃবর্গ কারান্তরালে চরমতম নির্যাতনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। বিচারের প্রহসনটুকু করার সময়ও তাঁরা দেননি। রাতারাতি বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চেতনা ও চর্চায় ছেদ পড়ল। রাষ্ট্রধর্ম হল ইসলাম। কিন্তু শতসহস্রযোজন দূরে থাকল ইসলামের চিরায়ত শান্তিকল‍্যাণের সুমহান চিন্তার উত্তরাধিকার।

Poet 'Kazi Nazrul Islam' is enjoying... - Bangladesh Old Photo Archive |  Facebook

নজরুল ততদিনে সে দেশের জাতীয় কবি। অনিরুদ্ধ ততদিনে প্রয়াত (১৯৭৪)। সরাসরি কোনও খবর আসেনি কাজী সব‍্যসাচীর কাছে। তবু খবর জেনে তিনি দ্রুত ঢাকামুখী হলেন। বিমানবন্দরে নেমেই তাঁরা জানতে পারলেন, ততক্ষণে কবি সমাহিত। বাংলাদেশের জাতীয় কবিকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সমাহিত করা হল। বেশিরকম দ্রুততার সঙ্গে কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল যা এতদিন পরেও বিস্ময়ের মনে হয়। কাজী সব‍্যসাচীরা জানিয়েই ঢাকাগামী হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের জন্য অপেক্ষা করার সৌজন‍্যটুকুও‌ ভুলে থাকলেন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ।

এ রাজ‍্যে পরদিন ছুটি ঘোষিত হল। বিকেলে রবীন্দ্র সদনে রাজ‍্য সরকার আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠান। আগে আগে পৌঁছনো সম্ভব হয়েছিল বলে প্রেক্ষাগৃহে বসা গিয়েছিল। উপচানো ভিড় সেদিন রবীন্দ্র সদনে। বসার আসনের বাইরে অসংখ্য মানুষ চারিদিকে দাঁড়িয়ে ও মেঝেতে বসে। দরজার বাইরে অসংখ্য মানুষের জমায়েত। সভায় সারাক্ষণ উপস্থিত ছিলেন সেসময়ের মুখ‍্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। সংক্ষিপ্ত অথচ মূল্যবান কথায় সমৃদ্ধ ছিল তাঁর সেদিনের শ্রদ্ধা নিবেদন। অন্নদাশঙ্কর রায় থেকে কে না ছিলেন সেদিনের সভায়! সভা চলাকালীনই সদনে এসে পৌঁছলেন কাজী সব‍্যসাচী, কল‍্যাণী কাজীও সম্ভবত। মুখ‍্যমন্ত্রী তাঁদের মঞ্চে ডেকে নিলেন। ঢাকা থেকে সরাসরি তাঁরা এসেছেন। বিধ্বস্ত, অভিমানাহত সব‍্যসাচী। গলায় স্বর ফুটছে না যেন। ঢাকার অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন অল্প কথায়। বললেন, চুরুলিয়ায় পারিবারিক সমাধিক্ষেত্রে মায়ের সমাধির পাশেই বাবাকে সমাধিস্থ করার পারিবারিক ইচ্ছে পূরণ না হওয়ার খেদ সারাজীবনেও যাবার নয়। তবে ঢাকায় বাবার সমাধি থেকে আনা একমুঠো মাটি রেখে মায়ের সমাধির পাশে বাবার সমাধি বেদি তাঁরা তৈরি করবেন। নিজের ক্ষোভ-অভিমান ব‍্যক্ত করেছিলেন তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছেও। তবে সমাধি হয়ে যাবার পর মৌখিক ক্ষোভ প্রকাশ ব‍্যতীত আর কি-ই বা করার ছিল! প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকেই গেল।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *