মনোহর আইচ: পান্তা ভাতের জল, তিন জোয়ানের বল

দীপন ভট্টাচার্য্য

“খেলার ছলে ষষ্ঠীচরণ হাতি লোফেন যখন তখন।

দেহের ওজন উনিশটি মণ, শক্ত যেন লোহার গঠন।”

সুকুমার রায় কাকে দেখে ষষ্ঠীচরণ চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন সেটা হয়তো আর জানার কোনো উপায় নেই। তাছাড়া ষষ্ঠীচরণ কতদিন বেঁচে ছিলেন সেটাও আমাদের অজানা। কিন্তু বাস্তবের ষষ্ঠীচরণ হাতি না লুফলেও শতবর্ষ পার করেছিলেন অনায়াসেই।

বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ। বাঙালির এক অন্যতম আইকন। মাত্র ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার মানুষটির বুকের ছাতি ছিল ৫৪ ইঞ্চি। ৯৫ বছর বয়সেও ওজন তুলেছেন হেলায়। ১০০ বছর বয়সে প্রাতঃভ্রমণ ছিল যার নিত্য অভ্যাস। সেই বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ কিন্তু সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাননি। অবিভক্ত ভারতের কুমিল্লায় (অধুনা বাংলাদেশ) ১৯১২ সালের ৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চরম দরিদ্রতা সত্ত্বেও বাঙালিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মনোহর আইচ। অনেকেই ভাবেন বাঙালি আড্ডা, সাহিত্য এবং পড়াশোনায় এগিয়ে থাকলেও শরীরচর্চায় তেমন মন নেই। বাঙালির ওপর চাপানো এই মিথ্যা অপবাদকে ভুল প্রমাণিত করে ১৯৫২ সালে মি. ইউনিভার্স খেতাব লাভ করেন। তার দু’বছর আগে মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই মি. হারকিউলিস খেতাব পান। তাঁর ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার জন্য বিশ্বের দরবারে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘পকেট হারকিউলিস’। মনোহর আইচ ঢাকার জুবলি স্কুলে পড়তেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই শরীরচর্চার দিকে ছিল তাঁর ভীষণ ঝোঁক। কিন্তু বিধিবাম। তাঁর সেই ইচ্ছায় বাদ সাধল কালাজ্বর। মাত্র ১২ বছর বয়সে এই মারণব্যাধির শিকার হন তিনি। সেই সময় এই রোগের কোনো সঠিক চিকিৎসা ছিল না। ফলে শরীর ভাঙতে শুরু করে। কিন্তু ভগবান যাঁর কপালে শতায়ু লিখে পাঠিয়েছেন, তাঁকে আটকায় কার সাধ্যি! প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন মনোহর আইচ। মনকে শক্ত করলেন। তারপর শরীরে বল ফিরে পাবার জন্য শুরু করলেন শরীরচর্চা। অপরিসীম মনের জোর, নিষ্ঠা আর সংযম এই তিনটি জিনিস ছিল শেষ দিন অবধি তাঁর সঙ্গী। আর একটি জিনিস ছিল তাঁর চতুর্থ সঙ্গী— পান্তাভাত। পকেট হারকিউলিসের কথায় “পান্তা ভাতের জল, তিন জোয়ানের বল”। দিনে চার বেলা পান্তা ভাত আর বারো ঘণ্টা অনুশীলনই তাঁকে এনে দিয়েছে বিশ্বশ্রী খেতাব।

আরও পড়ুন: ‘পকেট হারকিউলিস’ হার মেনেছিলেন

কী খেতেন:

২৫ থেকে ৬০ বছর

• সকালে এক কাঁসি পান্তা ভাত

• দুপুরে ভাত, ডাল, প্রচুর শাক-সবজি, চুনো মাছ, দুধ

• খাওয়ার পরে যেকোনও একটা ফল

• রাতে পান্তা ভাত, মসুর ডালের বড়া, শুকনো লঙ্কা ভাজা

• শেষ পাতে দুধ।

৬০ থেকে ৯০ বছর

• সকালে এক কাঁসি পান্তা ভাত

• দুপুরে ভাত, ডাল, সবজি, এক টুকরো মাছ অথবা দু’টুকরো মুরগির মাংস, দুধ

• খাওয়ার পরে একটা কলা

• রাতে ভাত, ডাল, অল্প সবজি, পাতলা মাছের ঝোল, দুধ।

৯০ বছরের পর থেকে

• সকাল ৮টা: এক কাপ কফি, ২টি বিস্কুট

• সকাল ৯টা: দুধ, চিঁড়ে সেদ্ধ

• দুপুর ১২টা: ভাত, ডাল, গলানো সবজি, মাছের পাতলা ঝোল

• দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট: একটি পাকা কলা

• বিকাল ৪টে ৩০ মিনিট: এক কাপ কফি, ২টি বিস্কুট

• রাত ৮টা ৩০ মিনিট: ভাত, মাছের পাতলা ঝোল, শেষ পাতে দুধ।

আরও পড়ুন: প্রকৃতি ও পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান

স্কুলে পড়ার সময় তিনি নিয়মিত যেতেন রূপলাল ব্যায়াম সমিতিতে। কিন্তু শুধুমাত্র শরীরচর্চা করলেই তো চলবে না। পেট চালাবার জন্য রোজগার করতে হবে। আর সেই রোজগার যদি শরীরচর্চার মাধ্যমেই হয়, তাহলে তো কথাই নেই। নেশা যেখানে পেশা হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে জীবনের শক্তি দ্রুত মানুষকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। ঠিক এমনটাই হয়েছিল মনোহর আইচের সঙ্গে। উনি যে স্কুলে পড়তেন মানে ঢাকার জুবিলি স্কুলে একবার এলেন পি সি সরকার সিনিয়র। তিনি মনোহরবাবুর নানা কৌশল দেখে এতটাই উৎফুল্ল হয়েছিলেন যে, তৎক্ষণাৎ তিনি মনোহরবাবুকে নিজের দলে ডেকে নেন। এরপর পি সি সরকার সিনিয়রের সঙ্গে জুটি বেঁধে নানা জায়গায় শো করতে থাকেন মনোহর আইচ। সেখানে তিনি যে খেলাগুলো দেখাতেন তার মধ্যে দাঁত দিয়ে লোহার রড বাঁকানো, খোলা তলোয়ারের ওপর পেট দিয়ে শুয়ে পড়া, পনেরশো পাতার বই শুধুমাত্র হাত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা প্রভৃতি। এর কিছুকাল পর ব্রিটিশ ভারতের এয়ার ফোর্সে যোগদান করেন মনোহর আইচ। সেখানেও চলতে থাকে শরীরচর্চা। শরীরচর্চার প্রতি তাঁর এই নিষ্ঠা নজর কাড়ে রিউব মার্টিন নামে এক ব্রিটিশ অফিসারের। অতঃপর এই মার্টিন সাহেবের অধীনে চলতে থাকে বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতিতে মনোহর আইচের শরীরচর্চা। এর ফলে তাঁর দেহ সৌষ্ঠব এতটাই সুন্দর হয়ে ওঠে যে, ব্রিটিশ অফিসাররাও তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যান। তবে কেউ যদি মনে করেন ব্রিটিশদের প্রশংসার ফলে মনোহর আইচ তাঁদের গোলাম হয়ে গিয়েছিলেন, তাহলে ভুল করবেন। একবার সেনাবাহিনীর এক ব্রিটিশ অফিসার ভারতীয়দের সম্পর্কে কটূক্তি করলে মনোহর আইচ তাঁকে কষিয়ে এক চড় মারেন। যার শাস্তিস্বরূপ জেলে যেতে হয় বিশ্বশ্রীকে। কিন্তু এতেও তাঁর মনোবলকে দমিয়ে রাখা যায়নি। জেলের ভেতরে তিনি নিয়মিত চালিয়ে যেতে থাকেন শরীরচর্চা। এমন একজন নিষ্ঠাবান ব্যায়ামবীরকে দেখে যারপরনাই খুশি হন জেল কর্তৃপক্ষ। মনোহর আইচের জন্য তারা বন্দোবস্ত করে দেন বিশেষ খাবারের। যাতে তাঁর শরীর হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। এই বিষয়টিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। তিনি বুঝতে পারেন যে, মিস্টার ইউনিভার্স খেতাব তাঁকে হাতছানি দিচ্ছে। সেই কারণেই আরও কঠোর ভাবে শুরু করেন তাঁর অনুশীলন। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলে অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গে ছাড়া পান মনোহর আইচ। ছাড়া পাবার পরও দরিদ্রতা তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়। তাই নানা ছোটখাট কাজ করার সাথে চালিয়ে যেতে থাকেন শরীরচর্চা। রোজ তিনি হাজারটা করে ডন-বৈঠক করতেন। তার সঙ্গে কত ফরোয়ার্ড এবং সাইড বেন্ডিং। সবই এক হাজারটা করে। তাঁর এই নিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায় ও সংযম শেষ অবধি স্বীকৃতি পায়। ১৯৫০ সালে মিস্টার হারকিউলিস খেতাব পেয়ে ১৯৫১ সালে নাম দেন মিস্টার ইউনিভার্স খেতাব জয়ের দৌড়ে। কিন্তু আর এক বাঙালি মনোতোষ রায়ের কাছে হেরে যান। দ্বিতীয় হন তিনি। তবে স্বপ্ন ধরা দেয় ঠিক তার পরের বছরই। ১৯৫২ সালে তাঁর মাথায় ওঠে বিশ্বজয়ের মুকুট। জগৎসভায় ভারত শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পায়। বিশ্বের দরবারে পরপর দু’বার মাথা তুলে দাঁড়ায় বাঙালি। বিশ্বজয়ের সময় তাঁর বাইসেপ ছিল ৪০ সেন্টিমিটার ও ফোর আর্ম ছিল ৩৬ সেন্টিমিটার। নয়াদিল্লি (১৯৫১), ম্যানিলা (১৯৫৪) ও টোকিও (১৯৫৮) এশিয়ান গেমসে তিন তিনটি করে সোনা পান তিনি। এরপর আর থেমে থাকেননি। একের পর এক প্রতিযোগিতায় দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। ৯৫ বছর বয়সে ওজন তুলেছেন তুড়ি মেরে। জীবনের শেষ শো করেছেন ৯০ বছর বয়সে। উদীয়মান বডিবিল্ডারদের জন্য তিনি খুলেছিলেন নিজের ব্যায়ামাগার। তাঁর সুযোগ্য শিষ্য প্রেমচাঁদ দেগরা ১৯৮৮ সালে মি. ইউনিভার্স খেতাব পান। এছাড়াও তাঁর ব্যায়ামাগারের অন্যান্য রত্নদের মধ্যে ছিলেন সত্য পাল, সত্যেন দাস, হিতেশ চ্যাটার্জির মতো দিক্‌পালরা। শুধুমাত্র বাঙালি বা ভারতীয়রাই নন, বিশ্বশ্রী মনোহর আইচের গুণমুগ্ধ ভক্ত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছেন। এর মধ্যে একজন হলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা এবং বডিবিল্ডার আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার। মনোহর আইচ জীবিত থাকতে বারবারই একথা বলেছেন যে, তাঁর আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগারের সিনেমা দেখতে বড়ই ভালো লাগে। তিনি আর্নল্ডের সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু জীবিত অবস্থায় তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। বিশ্বশ্রী মারা যাবার পর আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার নিজে একটি টুইট করে জানিয়েছিলেন যে, মনোহর আইচ তাঁর অনুপ্রেরণা। তিনি পকেট‌ হারকিউলিসের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন: অতিমারি: স্পর্শ, বৌদ্ধিক মুদ্রা ও শ্রুশ্রূষা

২০১৬ সালের ৫ জুন ১০৪ বছর বয়সে বিশ্বশ্রীর নশ্বর দেহ আমাদের ছেড়ে যাত্রা করে অমৃতলোকে। কিন্তু বাঙালির মনের মণিকোঠায় সর্বদা উজ্জ্বল থাকবেন পকেট হারকিউলিস মনোহর আইচ।

পরিশেষে এইটুকুই বলব যে, শতায়ু অতিক্রম করেও যে চিরতরুণ থাকা যায়, তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ হলেন মনোহর আইচ। পরিমিত আহার ও নিয়মিত শরীরচর্চা করে শরীরকে ঠিক রাখতে পারেন অনেকেই। কিন্তু আসল হল মন। মনের জানলা খুলে মনকে সতেজ রাখাই হল দীর্ঘ আয়ুর রহস্য, আর সেটা করতে পেরেছিলেন বলেই বিশ্বশ্রীর দীপ পৃথিবীকে উজ্জ্বল করে রাখবে আগামী দিনগুলিতে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

One comment

  • Dhiman brahmachari

    খুব ভালো একটা লেখা।অনেক কিছু জানা গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *