সূর্যাস্তের সূর্য সেন

অর্কপ্রভ সেনগুপ্ত

১৯৩৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহ প্রায় তিন বছর সম্পূর্ণ করতে চললেও ইন্ডিয়ান রিপাব্লিকান আর্মি জালালাবাদে যে অগ্নিশিখা জ্বালিয়েছিল, ব্রিটিশ সরকার সক্ষম হয়নি তাকে প্রশমিত করতে। বরং কালক্রমে তা পরিণত হয়েছে দাবানলে। চাঁদপুর থেকে ধলঘাটে সেই আগুন প্রসারিত হয়েছে। তার আঁচ পড়েছে ঢাকা, কুমিল্লা, মেদিনীপুর ও কলকাতায়। গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, লোকনাথ বল, সুবোধ রায়-সহ যুব বিদ্রোহের বহু নেতাই গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু শত প্রচেষ্টাতেও ব্রিটিশ পুলিশ বিদ্রোহের নায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনকে ধরতে সক্ষম হয়নি। শরৎচন্দ্রের পথের দাবী-র সব্যসাচীর তিনি পৃথিবীর সবথেকে ক্ষমতাশালী সরকারের পুলিশ ও গুপ্তচরদের চোখে ধুলো দিতে সক্ষম হয়েছেন বারংবার। ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি তার কার্যকলাপ তো কমেইনি, বরং মাস্টারদা সংগঠনের দ্বার মেয়েদের জন্যও উন্মুক্ত করায় তার শক্তি বর্ধিত হয়েছে বহুগুণ। ভারতের I.R.A তার অগ্রগণ্য সেনানীর মধ্যে পেয়েছে কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বা শান্তি চক্রবর্তীর মতো সৈনিককে। ১৯৩২ সালেরই ২৪ সেপ্টেম্বর পাহাড়তলির ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণের পর শহিদের মৃত্যুবরণ করেছেন বীরাঙ্গনা প্রীতিলতা। ব্রিটিশ সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও সন্ধান পাচ্ছে না মাস্টারদার― বিপুল অঙ্কের ইনাম ঘোষণা করার পরেও। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা এই দেশের মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। ইতিহাস সাক্ষী, ভারতে ব্রিটিশ শাসন বিশ্বাসঘাতকতা ব্যতীত প্রতিষ্ঠিত হওয়াই দুরূহ বিষয় ছিল। এই দিন, আবারও ভারতের ইতিহাসে রচিত হল বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসের আর এক কালো অধ্যায়ের।

আরও পড়ুন: ‘উঠে যাওয়া’ গানের কলকাতায় চলুন…

২ ফেব্রুয়ারি গৈরলা গ্রামে ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে ছিলেন মাস্টারদা। সঙ্গে ব্রজেন সেন, মণি দত্ত, সুশীল সেনগুপ্ত, কল্পনা দত্ত ও শান্তি চক্রবর্তী। এই ‘লাস্ট সাপার’-এ জুডাস-এর ভূমিকা পালন করেছিলেন ব্রজেন সেনের ভাই নেত্র সেন। ১০,০০০ টাকার ইনামের বিনিময়ে সে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে বিপ্লবী দলের অবস্থানের কথা জানিয়েই দেয়নি, বাড়ি চিনিয়ে দেওয়ারও দায়িত্ব নিয়েছিল। সন্ধ্যার আঁধার যখন নেমে আসছে, তখন ব্রজেন সেন দেখলেন কেউ একজন আলোর সংকেত দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করলেন, পুলিশ তাঁদের সন্ধান পেয়ে গেছে। তারা বাড়ি পুরো ঘিরে ধরার আগেই পেছনের দরজা দিয়ে বিপ্লবীরা পালানোর চেষ্টা করলেন। তাঁদের আগ্নেয় অস্ত্রগুলির ক্রমাগত অগ্ন্যুৎগারের সামনে পুলিশ কিছুটা পিছু হটল। কিন্তু মিলিটারি রাইফেলের ইল্যুমিনেশন রকেট, বিপ্লবীদের অন্ধকারের মধ্যে সাপ্রেসিং ফায়ারের মাধ্যমে পুলিশকে দিগ্‌ভ্রষ্ট করার পরিকল্পনায় বাধ সাধে। ব্রজেন সেন আহত হলেন আর গোর্খা সেনার হাতে ধরা পড়ে গেলেন মাস্টারদা।

আরও পড়ুন: একসময় কলকাতায় নানান ধরনের উপধারার গান নিজস্ব সম্পদ হয়ে উঠেছিল

মাস্টারদা আর ব্রজেন সেনকে হাতে পেয়েই তাঁদের উপর শুরু হল অকথ্য অত্যাচার। ঘুসি, লাথি, বন্দুকের কুঁদ দিয়ে প্রহার কিছুই বাকি থাকল না। শতচ্ছিন্ন কাপড়ে, রক্তাক্ত অবস্থাতেই তাঁদের প্রায় তিন মাইল হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। সূর্য সেনকে প্রাথমিকভাবে রাখা হয়েছিল পটিয়ার ডাকবাংলোয় মিলিটারি ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া একটি ছোট ঘরে। কিন্তু অচিরেই সেখান থেকে তাঁকে সরাতে হল। কারণ মাস্টারদা ওখানে আছেন শুনেই ভেঙে পড়েছিল মানুষের ভিড়। স্থানান্তরিত করা হল চট্টগ্রাম জেলে। সেখানেও নির্জন কুঠুরিতে বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে রাখা হল তাঁকে। এই সাবধানতার কারণ ছিল। সরকার আশঙ্কা করছিলেন বিপ্লবীরা যেকোনও মুহূর্তে তাঁদের প্রিয় মাস্টারদাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে আক্রমণ করতে পারে। এই শঙ্কা অমূলক ছিল না। ইতিমধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার রক্তমূল্য দিয়েছে নেত্র সেন আর বিপ্লবী অনন্ত সিংহের স্মৃতিকথার সূত্রে আমরা জানি, মাস্টারদাকে উদ্ধার করার একটি আলোচনা বিপ্লবীদের মধ্যে সত্যিই চলছিল। কিন্তু ১৮ মে গহিরা গ্রাম থেকে ধরা পড়েন দলের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড তারকেশ্বর দস্তিদার ও বিপ্লবী কল্পনা দত্ত। I.R.A-এর কাছে এও ছিল কঠিন আঘাত। এর পরেও সুখেন্দু দত্ত, অমূল্য বিশ্বাসের মতো কর্মীবৃন্দ মাস্টারদাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করতে লাগলেন, বিপ্লবীদের প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু সরকারি কর্মচারীও এতে সাহায্য করছিলেন। কিন্তু সেই ঘটনাচক্রে ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেল। সফল হলে ইতিহাসের চাকা ঘুরে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রবল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে তা হল না। 

আরও পড়ুন: যদুনাথ সরকার: ইতিহাস চর্চার কলম্বাস

বিচারের নামে প্রহসনে কল্পনা দত্তের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল, মাস্টারদা আর তারকেশ্বরের হল ফাঁসির আদেশ। ভীতিহীন, বেদনাহীন, নৈরাশ্যহীনভাবে তাঁরা এই দণ্ডের সংবাদ শুনলেন। ফাঁসির আগের কয়েকদিন মাস্টারদা গোপনে সহকর্মীদের নির্দেশ পাঠালেন, আত্মীয়-সজনকে চিঠির মাধ্যমে সান্ত্বনা দিলেন। শেষের দিনগুলিতে তাঁর সঙ্গী ছিল ‘গীতা’, ‘মহাভারত’ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রোজ গীতা পাঠ করতেন সকালে, বিকেলে মহাভারত। সুযোগ পেলেই গুনগুন করতেন কবিগুরুর কবিতা। জেলের কয়েদখানা মুখরিত হত তাঁর গানে। সাম্রাজ্যবাদের প্রহরীরা কান পেতে শুনত মাস্টারদা গাইছেন রবীন্দ্রনাথের গান― ‘‘তরুণ হাসির অরুণ রাগে/ অশ্রু সজল করুণ রাগে/ যাবার আগে যাও গো আমায়/ জাগিয়ে দিয়ে,/ রক্তে তোমার চরণ দোলা―/ লাগিয়ে দিয়ে…”। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মাস্টারদার দৃষ্টি ছিল জীবনের দিকে। জেলের জানলা দিয়ে তাঁর চোখ চলে যেত বাইরের গাছের নতুন পাতার দিকে, কালো আকাশে উদিত চাঁদের দিকে।  

অবশেষে এগিয়ে এল সেই কালো দিন, ১২ জানুয়ারি, ১৯৩৪। রাত প্রায় ২টো নাগাদ খুলে গেল কারাকক্ষের দ্বার। ঘুমন্ত অবস্থাতেই মাস্টারদার উপর বর্ষিত হতে লাগল ‘সভ্য’ শাসকদের লাথি ঘুসি কিল চড়। আঘাত করা হল হাতুড়ি আর লোহার দণ্ড দিয়ে। মাস্টারদা আর তারকেশ্বর দস্তিদারের রক্তাক্ত দেহ দেখে কয়েদিরা আর রাজনৈতিক বন্দিরা সকলেই নিরুপায় দুঃখে ও রাগে ফুঁসতে লাগলেন। দু’টি দেহকে যখন টেনে নিয়ে যাওয়া হল ফাঁসির মঞ্চের দিকে জেলখানা কেঁপে উঠল ‘বন্দেমাতরম’, ‘মাস্টারদা জিন্দাবাদ’ ‘তারকেশ্বর অমর রহে’ ধ্বনিতে। ফাঁসির নিয়মরক্ষা শেষ করার পর দুই বীরের মৃতদেহ ভারী পাথরে বেঁধে নিক্ষেপ করা হল কর্ণফুলি নদীতে। ফাঁসির দুই দিন পরে মাস্টারদার সহোদর কমল সেন সংবাদ পেলেন তাঁর অগ্রজর ফাঁসি হয়েছে।

আরও পড়ুন: সারফারোশি কি তামান্না: বিসমিল ও তাঁর সহযোগীদের আত্মত্যাগের কথা

শাসক গোষ্ঠী উল্লাসের চোটে বোধ হয় এই আপ্তবাক্য ভুলে গিয়েছিল― ‘‘মানুষ মরণশীল কিন্তু মতাদর্শ চিরন্তন’’। মাস্টারদা তাঁর যে অন্তিম বিদায় ভাষণ লিখে গেছিলেন, তাতেই তিনি I.R.A-এর গৌরবের ইতিহাস স্মরণ করে লিখেছিলেন―

‘…১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিলচট্টগ্রামের ইস্টারবিদ্রোহ এই দিনটির কথা কখনও ভুলো না স্মৃতিবাসরে চির অম্লান করে রেখো জালালাবাদ, জুলদা, চন্দননগর ধলঘাটের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস স্বাধীনতার মৃত্যুযজ্ঞের বেদীমূলে যে সব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের নাম স্মরণের মন্দিরে রক্তের অক্ষরে লিখে রাখো

আমার একান্ত আবেদন তোমাদের কাছেআমাদের সংগঠনে যেন বিভেদ না আসে যারাতোমরা কারাগারের ভিতর বাইরে রয়েছো তাদের সকলকে আমার প্রাণের ভালবাসা আশীর্বাদ জানাই বিদায় বন্ধু, বিদায়

চট্টগ্রাম জেল,
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক
১১ই জানুয়ারি, ১৯৩৪ বন্দেমাতরম ! সন্ধ্যা ৭ ঘটিকা।”

তাই ব্যক্তি সূর্য সেনের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশ শাসক মুছে দিতে পারেনি তাঁর নির্দেশ মেনে মানুষের স্মৃতির মন্দিরে খোদাই করা রক্তরের আখরে লেখা বিপ্লবীদের নাম ও আদর্শ। অন্তিম বার্তায় মাস্টারদা চট্টগ্রামের সংগ্রামকে তুলনা করেছেন ইস্টার বিদ্রোহের সঙ্গে। হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সেই সূত্র ধরেই বলেছেন মাস্টারদা তুলনীয় সেই আয়ারল্যান্ডের ইস্টার বিদ্রোহের নায়ক ও আর এক I.R.A (Irish Republican Army)-এর সর্বাধিনায়ক বিপ্লবী জেমস কনোলির সঙ্গে। এই তুলনা যথার্থ। কনোলির মতোই তিনি দেখেছিলেন জাতীয় মুক্তি প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবের মাধ্যমে নিপীড়িত সর্বজনের সদুত্থানের স্বপ্ন। মাস্টারদার মৃত্যুর পর সেই স্বপ্নের পথই অনুসরণ করেছেন তাঁর যোগ্য ছাত্র গণেশ ঘোষ, সুবোধ রায়, অনন্ত সিংহ, কল্পনা দত্তরা। তাই আজ, মাস্টারদা সূর্য সেনের শহিদ দিবসে, সর্বশেষে যে কথাটি স্মরণে রাখতে হবে― সূর্য সেন আজও ভীষণ ভীষণভাবে জীবিত, আমাদেরই মাঝে, আমাদেরই মনে, আমাদেরই সাহসে, আমাদেরই প্রতিরোধে, আমাদেরই প্রতিবাদে। কবি শামসুর রহমান তাই তো লিখেছেন―

“মাস্টারদা, আপনি কখনো
হাতঘড়ি পরতেন কিনা জানি না; জানবার
প্রয়োজনও নেই তেমন। অমরতা
জ্যোতির্বলয়ের মতো রাখী পরিয়ে দিয়েছে
আপনার কব্জিতে।

আপনার হাত সূর্যোদয়ের প্রসন্নতা নিয়ে
প্রসারিত হয়ে আছে সেই বিশাল ভূখণ্ডের দিকে,
ভাবীকাল যার ডাকনাম।

এবং একটি অলৌকিক হাতঘড়ি, যা আপনি
হয়তো পরেননি, অথচ আপনারই নামাঙ্কিত
ক্রমাগত বেজে চলেছে
আমাদের হৃৎপিণ্ডে অনন্তের রৌদ্র-নিঃসীম ঝালরে।”

Facebook Twitter Email Whatsapp

2 comments

  • Paromita Ghosh

    আবেগ এবং আবেগ এর মৃত্যু…
    শুনলে মন টা বারবার কেঁদে ওঠে… ওদের অশ্রু আর রক্ত দিয়েই আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি শুধু সেই স্বাধীনতা আর তাঁদের আত্ম বলি দান ই ইবারবার আমাদের সোচ্চার হতে সাহস যোগায়….
    বন্দেমাতরম

  • Debashis Majumder

    Darun Nibandha. Samriddha Holam.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *