আবার সত্যি ভূতের গল্প

দেবব্রত হাজরা

বিহারের (অধুনা ঝাড়খণ্ড) রেলওয়ে জংশন। সিনি টাউনের একটা ফাঁকা রেস্ট হাউসে আজ রাতে আমি একমাত্র অতিথি। রেস্ট হাউসের কেয়ারটেকার চাবি, একটা লম্ফ আর একটা দেশলাই হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেছে। চাবি, যাতে বাইরে গেলে আর শোবার আগে ভেতর থেকে দরজায় তালা লাগাতে পারি। লম্ফ আর দেশলাই দিয়েছে দরকারে রাতভিতে জ্বালাতে, কারণ এখানে নিরন্তর লোডশেডিং চলছে। সকালের ট্রেন থেকে নেমে বৃষ্টি মাথায় করে এখানে এসে জেনেছিলাম, স্থানীয় কোনও পরবে সিনির অফিসে আজ ছুটি। কলকাতার অফিসের বড়কর্তার পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ চিঠি নিয়ে অফিসের কাজে এসেছিলাম সিনির অফিসে হ্যান্ডওভার করতে। কিন্তু বিধিবাম। অফিস বন্ধ আজ এখানে থেকে যেতে হয়েছে। নইলে এতক্ষণে তো আমি নাগপুরগামী ট্রেনে।

সকালের ট্রেন থেকে নেমে অফিসের ছুটি শুনে গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটা হ্যান্ডওভার করার মরিয়া প্রচেষ্টায় বৃষ্টিতে আধভেজা হয়ে এখানকার বড়বাবুর কোয়ার্টারে যখন পৌঁছলাম, শুনলাম উনি বাজারে গেছেন। অপেক্ষা করলাম। বড়বাবু মিনিট কুড়ির মধ্যে ফিরলেন। বৃষ্টিভেজা দিন, তার উপর আরামের ছুটির দিন। আমার মুখে সব শুনে বেজার মুখে মাথা নেড়ে নিস্পৃহ গলায় বড়বাবু বললেন, ‘ছুটির দিন তো! একমাত্র মেজ সাহেব মানে দত্ত সাহেবের কাছে যেতে পারেন। তিনি কোয়ার্টারে আছেন, নিলেও নিতে পারেন। দেখুন।’ তো গেলাম মেজ সাহেবের কাছে এবং যথারীতি নিলেন না।

আরও পড়ুন: সত্যি ভূতের গল্প

সন্ধ্যা হয়েছে। একটা হোটেলে খেয়ে, কেরোসিনের লম্ফ জ্বালিয়ে রেস্ট হাউসের আধো অন্ধকারে বসে আছি। এখন বড় সাহেবই ভরসা। তবে অফিসের বড় সাহেবকে রাত নটার আগে পাওয়া যাবে না। সকালে বড়বাবুর কাছে শুনেছিলাম, উনি কলকাতার অফিসে গেছেন। রাতের ট্রেনে ফিরবেন। ও, হ্যাঁ, কথাটা বলে রাখি, বড়বাবু স্ত্রী যিনি এই মুহূর্তে দিদি হয়ে গেছেন, দুপুরে আমার স্নান আহারের ব্যবস্থা অতি যত্ন নিয়ে করেছেন ওনাকে আমার মনে থাকবে।

সন্ধ্যায় রেস্ট হাউসের কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘বিদ্যুৎ কখন আসবে?’ শুনে বিড়ি টানতে টানতে কেয়ারটেকার হেসে ফেলল। বলল, ‘বাবু, বলুন কখন নয়, কবে আসবে?’ কেয়ারটেকার আরও জানাল, বিজলি দশ বারো দিনের আগে আসে না। যদিবা আসে, কতক্ষণ থাকবে তার কোনও গ্যারান্টি নেই। আজ রাতে আশা না করাই ভালো। জানতে চাইলুম, ‘রাতে আপনি আসবেন না?’ বলল, ‘নাহ, আমি কোয়ার্টারে থাকব। রাতটা একলাই কাটান। কাল সকালে দেখা হবে। আর আপনি যদি আরও আগে বেরোন…’ টেবিলটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘তালা চাবি লম্ফ দেশলাই ওইখানে রেখে যাবেন।’

কেয়ারটেকার অনেকক্ষণ হল তার কোয়ার্টারে ফিরে গেছে। ঘড়িতে তখন রাত পৌনে নটা। কাগজপত্র চিঠি ইত্যাদি নিয়ে টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় বড় সাহেবের কোয়ার্টারের দিকে রওনা দিলাম। কোয়ার্টারের কলিংবেলের বোতামে হাত রাখতে বেলের আওয়াজে ভিতরে প্রথম একটা কুকুরের গর্জন তারপর বড় সাহেব এর আবির্ভাব, ভয়ংকর কুকুরটা যথারীতি বড় সাহেবের পাশে। উনি দরজা খুলে কঠিন গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হু আর ইউ?’ নিজের পরিচয় দিয়ে কলকাতার অফিসের চিঠি আর কাগজপত্র বড় সাহেবের দিকে আগিয়ে দিলে সেগুলির উপর তিনি গুরুত্ব সহকারে চোখ বোলাতে লাগলেন। কিন্তু সাহেবকে ধমক দিতেই হয়, ধমক দিয়ে বললেন— ‘আপনি এখানে কখন এসেছেন?’ সকাল থেকে সারাদিন চিঠি আর কাগজপত্র হ্যান্ডওভার করার বৃথা চেষ্টার কথা বিশদে জানালাম। বড় সাহেব রিসিপ্ট-এর উপর সই করতে করতে রাগত স্বরে বললেন, ‘দত্ত সাহেব নেহি লিয়া না? ঠিক হ্যায়।’ ক্রুদ্ধ ও শ্রান্ত বড় সাহেবের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে রেস্ট হাউসে ফিরে এলাম।

এখনকার কাজ শেষ। মনটা হালকা লাগছিল। কাল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নাগপুরের ট্রেন ধরতে হবে। তাড়াতাড়ি বিছানায় যাওয়া দরকার। রেস্ট হাউসের মাঝামাঝি একটা খাটে বিছানা করেই রেখেছিলাম। বেশ লম্বা রেস্ট হাউস। দুই সারিতে উত্তর দক্ষিণে দশ-বারোখানা শোবার খাট পাতা। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। দক্ষিণ দিকে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা, তারপর টয়লেট। উত্তর দিকে দেওয়াল ঘেঁষে চেয়ার, টেবিল, আয়না ইত্যাদি রাখা। অজানা জায়গায় এত বড় ঘরে আমার একলা রাত কাটানোর ঘটনা আজকের আগে কখনও ঘটেনি। বেশিক্ষণ জেগে বসে থাকলে লম্ফয় তেল শেষ হয়ে যাবে। রাত্রে দরকারে লম্ফ জ্বালাতে পারব না। তাই আর দেরি না করে শুয়ে পড়লাম। শোবার আগে কেরোসিনের লম্ফর আলোয় আলো-আঁধারি ঘরের পরিবেশটা বেশ থমথমে লাগছিল। আর এখন তো আলো নেভালাম, একেবারেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। শুনতে পাচ্ছি ট্রেন আসছে যাচ্ছে। কোনওটা থামছে, কোনওটা থামছে না। শুনতে-শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।

আরও পড়ুন: ছাঁকনি

গভীর রাতে যখন আমার ঘুম ভাঙল, মনে হল ঘরের মধ্যে আমি একা নই। আরও কেউ আছে। আর সে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে! চোর নয় তো? দরজায় তালায় চাবি দিয়ে তালা টেনে দেখে নিয়েছিলাম, স্পষ্ট মনে আছে। চাবি কোথায়? শোবার সময় অত খেয়াল করে রাখিনি। অন্ধকারে বালিশের তলা থেকে বিছানা পর্যন্ত হাতড়াতে লাগলাম। খাটিয়ার এক পাশ থেকে পেলাম। মেঝের উপর হাঁটার শব্দ আসছে। টয়লেটের ওদিকের ফাঁকা জায়গা থেকে আমার খাটের পাশে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আলমারি আর আয়নার ওদিক পর্যন্ত। যে হাঁটছে তার পায় বুট জুতো। একেবারে সাহেবি বুট জুতো। হাঁটছে আর মচমচ করে শব্দ হচ্ছে। পুরো রেস্ট হাউসের মেঝে জুড়ে যাচ্ছে আর আসছে। আতঙ্কে আমার গলায় আর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠছে। পাশ ফিরে শুতে ভুলে গেছি। যেন পাথর হয়ে গেছি। সারা মেঝে থেকে একটানা বুট পরা পায়ে হাজার শব্দ উঠছে… মচ মচ মচ! আতঙ্কের মধ্যে একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম। স্টেশনে ট্রেন এসে থামল বুটের শব্দ থেমে যাচ্ছে। ট্রেন চলে গেলেই আবার মচ মচ মচ মেঝে জুড়ে। একটু একটু করে ধাতস্থ হলাম। দেশলাই খুঁজতে শুরু করলাম। পেলাম। লম্ফ জ্বালাব নাকি? জ্বালিয়ে কী দেখব কে জানে! সাহস করে জ্বালিয়ে ফেললাম। আলো জ্বলল। বুটের শব্দ থেমে গেল। কেউ কোথাও নেই। একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। বিছানা থেকে উঠে লম্ফ নিয়ে রেস্ট হাউসের দরজায় গেলাম। দরজায় তালা ঠিকই দেওয়া আছে। লম্ফ নেড়ে দেখলাম, তেল বিশেষ নেই। বেশিক্ষণ জ্বেলে রাখলে সময়ে জ্বালাতে পারব না। তেল ফুরিয়ে গেলে অন্ধকারে বসে জেগে একটানা অশরীরীর বুটের মচ মচ শব্দ শুনতে হবে। কিছু করার থাকবে না। লম্ফর আলোই এখন অশরীরীর আতঙ্ক থেকে বাঁচতে একমাত্র হাতিয়ার। লম্ফ নিভিয়ে নাগালের মধ্যে রেখে মুঠিতে দেশলাই নিয়ে বাকি রাতের জন্য শুয়ে পড়লাম।

সবেমাত্র তন্দ্রা এসেছে। শোবার মিনিট পনেরো হবে বোধ হয়। টয়লেটের দিক থেকে মচ মচ মচ শব্দে আবার শুরু হল সবুট পদচারণা। আমার বিছানার পাশে এলো গেলো। ভাবলাম রেস্ট হাউসের দরজা খুলে বাইরে পালাই। আবার ভাবলাম এই গভীর রাতে রেস্ট হাউসের বাইরে বেরিয়ে এর থেকে আরও বেশি বিপদে পড়ব না তো? রেস্ট হাউস থেকে কোয়ার্টারগুলোও বেশ দূরে দূরে। বেরিয়েও কোনও সাহায্য পাব না। তাছাড়া বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। ভেতরের অশরীরীর তো শুধু পায়ের শব্দ। ঠিক করলাম, যা আছে কপালে, অশরীরীর সঙ্গেই রাত কাটাই। লম্ফ আবার জ্বালালাম। আর ঘণ্টাখানেক জ্বললেই হবে। ভোর হয়ে যাবে। লম্ফ জ্বেলে ঠায় বসে রইলাম। যথারীতি অশরীরীর বুট জোড়ার মচমচা নেই বন্ধ। পুব আকাশ ধীরে ধীরে ফর্সা হয়ে এল। লম্ফও নিভু নিভু। বিছানা ছেড়ে উঠে স্নান সেরে নাগপুরের জন্য তৈরি হয়ে নিলাম। কেয়ারটেকারের কথামতো তালা, চাবি আর রাতের বিশ্বস্ত সঙ্গী লম্ফ ও দেশলাই টেবিলের উপর রেখে টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্যে শরীরে অশরীরীর সঙ্গে রাত জাগার ক্লান্তি নিয়ে স্টেশনের দিকে পা বাড়ালাম। ওহ, যা একটা রাত গেল!

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *