সত্যি ভূতের গল্প ১

দেবব্রত হাজরা

শীতকালের বেলা। সূর্যদেবের বাড়ি ফিরতে যেন তর সয় না। ঝুপ করে বেলা পড়ে এল। খেলা শেষ করে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই প্রায় অন্ধকার। বিকালে মা ছাই আর একটুকরো কাপড় ছেঁড়া দিয়ে হ্যারিকেনের কাচ পরিষ্কার করে হ্যারিকেন, লম্ফ জ্বেলে, মুখ আঁধারী সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বেলে আর শাঁখ বাজিয়ে তুলসী তলায় সন্ধ্যা দিচ্ছে। আমি এসে দাঁড়াতেই মা বলল, ‘হাত পা ধুয়ে বোনেদের নিয়ে পড়তে বসে যা।’ মা লম্ফ নিয়ে রান্নাঘরে গেল। তক্তপোষটা আমাদের তিনজনের পড়ার জায়গা। হ্যারিকেনটাকে ঘিরে চাদর মুড়ি দিয়ে আমাদের তিনজনের পড়া শুরু হল, সমবেতভাবে ভিন্ন ভিন্ন সুরে। পড়া যখন বেশ জমে উঠেছে, মাথাসুদ্ধু চাদর মুড়ি দেওয়া শ্যামল দরজা ঠেলে ঘরের ভেতর এল। আমরা পড়া থামালুম। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাতে শ্যামল চাপা গলায় বলল, ‘বেলতলার মোড়ে পুলিশ এয়েচে। মোড়ের দোকানিদের জিজ্ঞেস করতেচে। কেলাব আর গেরামের মাথাদের খুঁজতেচে। আমি বাড়ি চননু ভাই।’ বলেই বেরিয়ে গেল। ঘটনা এই। ক’দিন ধরে বেলতলার মোড়ে একটা শ্মশান সংস্কার করে তৈরি করা ফুটবল মাঠের দখলদারি ঘিরে দু-গ্রামের দুটো ক্লাবের মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আর আজ খোঁজখবর নিতে পুলিশ অকুস্থলে হাজির। মনে হল যাই তামাশা দেখে আসি। মাকে কিছু বললুম না। বোনেদের বললুম, ‘যাব আর আসব, তোরা পড়।’ বলে মাথায় চাদর ঢেকে বাইরে বেরিয়ে এলুম।

আরও পড়ুন: ভূতেরা ফিরে আসে যে দিনগুলোয়

ছবি সংগৃহীত

বাইরে পৌষের কনকনে ঠান্ডা আর মিশকালো আলকাতরা অন্ধকার। রাস্তায় কাউকে দেখতে পেলুম না। শীতের প্রকোপে নয়তো পুলিশের ভয়ে আগেভাগে বাড়ি ফিরে পড়েছে। হি-হি করতে করতে এগোলুম। পুলিশ যখন এসেছে তখন কোনও ক্লাবেরই কোনও মাথাকে ওখানে পাওয়া যাবে না। শীতের সন্ধে রাত্রি, পথে-ঘাটে সাপের ভয় নেই। তাই হাতে কোনও আলো নেই। অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে বাঁশঝাড় আর গাবতলা পেরিয়ে এক জায়গায় থামলুম। বাস রাস্তায় উঠতে মাটির উঁচু রাস্তাটা ছেড়ে রাস্তা শর্টকাট করার জন্য মাঠে নেবে পড়লুম। জমির উপর পায়ে চলা পথ। অন্ধকারেও বেশ দেখা যাচ্ছে। শিশির পড়ে কিছুটা পিচ্ছিল। মাঠ থেকে ধান তোলার সময় ধানের বোঝা নিয়ে যেতে পায়ে-পায়ে চাষিরা তাদের সুবিধামতো পথ করে নিয়েছে। পায়ে চলা সরু আঁকাবাঁকা পথ জমি থেকে আলে উঠেছে। আবার কোথাও আল থেকে জমিতে নেমেছে। ঝাঁকড়া বাবলা আর লম্বা তালগাছগুলো জমির আলে আরও ঝাপসা কালো মূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঠের পথে মোড় ফিরতি কাউকে দেখলাম না।

আরও পড়ুন: ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ’

ছবি সংগৃহীত

এক জায়গায় পায়ে চলা পথ জমি থেকে আলে উঠেছে। আলে দুটো বাবলা গাছ। গাছ দুটো পেরিয়ে আবার মাঠের পথে নামতে হয়। অন্ধকারে এতক্ষণে চোখ সয়ে গেছে। দেখলুম বাবলা গাছ দুটোর মাঝে পায়ে চলার রাস্তা জুড়ে দুটো বাচ্চা বসে আছে। ঠিক দুটোতে বসে নেই, একজন বসে আর একজন তার কোলে মাথা দিয়ে দিব্যি শুয়ে আছে। ওদের হাত তিনেক দূরে দাঁড়িয়ে বকা দিয়ে বললুম, ‘অ্যায়, এটা তোদের শোবার জায়গা? বাড়িতে কি তোদের কেউ খোঁজ নেয় না? ওঠ, যেতে দে।’ বারবার রাস্তা থেকে উঠতে বললেও ওদের রাস্তা থেকে ওঠার কোনও নাম নেই। মুখে কোনও কথাও নেই। বাচ্চা দুটো আমাকে কোনও গ্রাহ্যের মধ্যেই আনছে না। চারদিকে চেয়ে দেখলুম দূরে দু-একটা বাড়ি থেকে এখনো অস্পষ্ট আলোর আভাস। একটু পরে ওগুলোও নিভে যাবে। অন্ধকারে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে বাচ্চা দুটোর উপর ভারি বিরক্ত হলুম, রাগও হল। রেগে ধমক দিয়ে বললুম, ‘রাস্তা ছাড়, না হলে দু-চার ঘা দিয়ে দোবো।’ এবারে আমার কথা শুনে একজনের কোল থেকে অন্যজন উঠে বসল। সরে রাস্তা দেওয়া তো দূরের কথা, ধমকের কোনও তোয়াক্কা না করে উঠে বসে দু’জনে আচমকা খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। হাসি থামানোর নামই নেই। ওদের হাসির ধরনে অন্ধকারে মাঠের মাঝে আমার গা ছমছম করে উঠল। কোনও বাড়ির বাচ্চারা অন্ধকারে মাঠের মধ্যে বসে এরকম হাসতে পারে, আমার ধারনাই ছিল না। এরা কারা? আমি ‘মারের’ কথা বলতে যেন ওরা দু’জনে বেশ মজা পেয়েছে। আর নাগাড়ে হেসে যাচ্ছে। চকিতে আমার ভাবনায় এল, আচ্ছা, শীতে আমার পরনে ফুলহাতা শার্ট, লুঙ্গি, তার উপর চাদর মুড়ি; বাচ্চা দুটোর পরনে কিছুই নেই। এই শীত সহ্য করছে কি করে! আমার কেমন মনে হতে লাগল এরা মানুষের বাচ্চা নয়। আর ঘাঁটাতে সাহস হল না। দ্রুতপায়ে ওদের সামনে থেকে আলের পায়ে চলা পথ ছেড়ে মাঠেতে নেমে পড়লুম। ওদের আর বাবলা গাছের পাশ দিয়ে কিছুটা আগিয়ে মাঠ ছেড়ে আবার আলের উপর দিয়ে পায়ে চলা রাস্তায় উঠলুম। কম বয়সের সাহস! তাই এ-দুটো সত্যিই ভূত কিনা পরখ করতে ওদের থেকে দশ-বারোহাত দূরে পিছন ফিরে দাঁড়ালুম। ততক্ষণে ওরা কথা বলতে শুরু করেছে। আর বলছে নাঁকি সুরে, যা এতদিন আমি অন্যদের মুখে গল্পে শুনে এসেছি! কিছু ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার কান মাথা গরম হয়ে উঠছে। পা আর বসে থাকতে চাইছে না। পড়ি মরি ওই জায়গা ত্যাগ করলুম।

ছবি সংগৃহীত

বেলতলার মোড়ে যখন পৌঁছলুম, পুলিশ ততক্ষণে ওখান থেকে চলে গেছে। বাড়ি ফেরার পথে কয়েকজন সঙ্গী পেয়ে গেলুম। মাঠ দিয়ে ফেরার কথা অবশ্য কেউই তুলল না। তবে কিছুক্ষণ আগেকার ঘটনা নিয়ে কাউকে কিছু বললুম না। পরের দিন বেলতলার মোড়ে কথায় কথায় আগের রাতের ঘটনার কথা গ্রাম-সম্পর্কে এক বয়স্ক মামাকে বললুম। মামা খানিকক্ষণ আমাকে দেখে নিয়ে বলল, ‘তুমি তো তাদেরকে বসে থাকতে দেকেচ। দিন কতেক আগে আমাদের গেরামের রোতে মাতাল রেতে মাঠ দিয়ে ফিরতেছিল, আর এই বাচ্চা দুটোকে মাঠে খেলতে দেখে মাতালের নেশা তো চৌপাট। বাড়ি ফিরে বউয়ের হাতে এক ঘটি জল খেয়ে তবে শরীরে কাঁপুনি থামে। সেই থেকে রোতে রেতের বেলা মাঠের রাস্তা ছেড়ে দিয়েচে। তা তোমার তেমনি কিছু হয়নি তো ভাগ্নে!’ আমি না বলতে মামা আমাকে সতর্ক করে বলল, ‘তা বাবু তুমি আর রেতের বেলায় একলা মাঠ ঝাঁপিয়ে আসা-যাওয়া কোরোনি, বলা তো যায়নে কি থেকে কি হয়।’ হেসে মামার কথা মেনে নিয়ে বললুম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

কভার ছবি সৌজন্য সাগর রায়

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *