তুৎ পাখি উড়া দিলে…

পৌষালী চক্রবর্তী


অথ প্রব্রজন কথা

এ এক অন্য প্রব্রজনের কথা। খুব বেশি দিন আগেকার নয়। তা ধরো, এই একুশ শতক। ধরা যাক, ল্যাটেরাইট মাটির দেশে কোনও এক পাহাড়ের মাথায় তারা থাকত। সে গ্রামের নাম হতে পারে শালবেড়া অথবা তালবনি কিংবা পানিচ্যাটানি। ঠিকভাবে নাম আমরা লেখাজোকার ভাষায় দিতে পারব না। কারণ সেখানে আদমশুমারি হতে ভুল হয়ে গিয়েছিল বেশ কয়েকবার।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৭ম অংশ)

মানুষ ছাড়া, কার আর ভিটে-ঘর-পাড়া-গ্রাম-শহর-কলোনি-ঘেটো-বস্তি হয় বলো! সে যাকগে। ওসব কাগজপত্রের কথা থাক। ওদের আকাশ আছে, জঙ্গল আছে, ঝরা পাতা আছে, পাহাড়তলির একটু দূরে নদী আছে— আম্রুহাঁসা নদী; নতুন হাঁটতে শেখা শিশুর মতো তার ক্ষীণস্রোত টলমল করে চলে। এই জল, এই আলো এই হাওয়ায় রেণুরেণু হয়ে মিশে আছে সেসব পূর্বপ্রাণ। তাদেরই কেউ একজন গাছের গোড়া কেটে বসতি স্থাপন করেছিল— খুঁটকাট্টি পূর্বনারী। আর আছে তাদের পিতৃপুরুষের আশিসমাখা জাহের থান— সারি সারজম রূপ নিয়ে। আছে জঙ্গলের ভয়। সমতলের ভয়। সে ভয়ের কথাই তোমাদের এখন বলব।

আরও পড়ুন: ব্রাজিলের সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মাচাদো দ্য আসিসের ‘ডম কাসমুরো’

তোমরা তো জানো না, এই পাহাড়ে ওঠার পথ কতটা কঠিন। এমনকী শখ করেও শহর থেকে সহজে কেউ পাহাড় পেরোতে আসে না। এদিকে তারা মোটে পনেরো ঘর লোক। একজনের জন্য কোটি কোটি টাকা দিয়ে কি রাস্তা বানানো যায় বলো? শুধু শহরতলির খোঁড়া দিদিমণির কষ্ট দেখার মতো। তিনি রোজ পাহাড় ভেঙে ওঠেন প্রাইমারি স্কুল খুলে দামাল শিশুগুলিকে পড়াতে। যখন বর্ষার পাহাড়ে হরপা বান নামে, যখন তাদের অসুখ ছোঁয় কিংবা কেউ মা হয়, সে কি কষ্ট!

এদিকে তারা তো পাহাড় থেকে মোটে নামবে না। তাদের মেষবালিকারা মেঘের চিহ্ন ধরে পাহাড়ে পাহাড়ে করে পেড়িয়ে যায় অনেকটা পাহাড়ি পথ, সাদা কাপড় উড়িয়ে। কার উদ্দেশে? বনতলে তারা কাঠ, পাতা, বনজসম্পদ কুড়ায়। বৃষ্টিদিনে বড় কষ্ট। কে আর কবে তাদের স্থায়ী জীবিকার কথা বলেছে! তারা যখন গোধূলিবেলায় ঘরের দিকে ফেরে, চকিতে দেখা দিয়ে হারিয়ে যায় বনময়ূর, পুরনো নেউল। তুৎ পাখির ডানায় চেপে সন্ধে নামে; রাঁধন দাওয়ার ফাঁকে চাঁদ ওঠে, আর মাদল ঘিরে ধরে জোনাক আলো, গাঁওবুড়া বলে বোঙাবুঙির কথা— কীভাবে হাঁস ও হাঁসিলের ডিম থেকে এসেছিল আদি পিতামাতা হিহিড়ি ও পিপিড়ির পথে, ঠিক তখন থুপিশাল চালের ভাত ফোটে আর সেই ওম পেড়িয়ে যায় বনান্তর। সেই ঘ্রাণে বনের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে মুখে গামছা বাঁধা ছায়ামানুষেরা আর সেই খবরে উড়ে আসে তক্কে তক্কে থাকা রাজপুরুষ ও পেয়াদারা। কাকে ছেড়ে কাকে রাখে বলো! একেকদিন মাদল বোল ছাপিয়ে বেজে ওঠে রাক্ষসবাদ্য। আরক্ষাবাহিনী ন্যাড়া পাহাড়ের নীচে থাকলে, সবাই দেখে নেয় তাদের পাতার পোশাক। কী মুশকিল বলো!

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রদেশ বৃত্তান্ত: মান্ডু

এখন তোমরা জানো, সব রাজ্যেই থাকে কিছু বুড়ো দরজি, যারা, দাদু, বাবা, মেয়ে, ছেলে পরম্পরা জুড়ে দরজি। তারা যেকোনও আবহাওয়ায় টিমটিমে লণ্ঠন জ্বেলে দোকান খোলে। নতুন জামা বানানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা নিপুণ হাতে রিফু করে যেকোনও পুরনো ক্ষত। সোজা-উল্টো, রান চেন যেকোনও সেলাইয়ে তারা পটু। তো সবাই মিলে দরজির সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করল কী, তাদের পাহাড়তলিতে ঘরবসত গড়ে দেবে। কত সরকারি প্রকল্প আছে। বিজলিবাতি দেবে। বনসৃজন করে দেবে, পশুখামার করে দেবে। চাষের জমি দেবে, ১০০ দিনের কাজ দেবে। আর নীচে নামিয়ে আনবে অবৈতনিক প্রাইমারি স্কুল, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। তাদের উঠোন জুড়ে পুঁতে দেবে আম, জাম, পেয়ারা, কুল গাছ। পুষ্টিবর্ধক লেখাপড়া। সেইমতো তোড়জোড়; বার্তা গেল রটে। একথা শুনে তাদের তো কি আপত্তি! পাহাড় ছেড়ে, জাহের থান ছেড়ে, পূর্বপ্রয়াতদের অবস্থিতি ছেড়ে তারা কীভাবে নীচে থাকবে! সরকারি পাকা ঘর কি আর মাটির মতো শীতল! সেখানে কোথায় তাদের মতো পাইন্যা লতার আঠা দিয়ে আলপনা দেবে! বনে না গিয়ে তারা বাঁচবে কীভাবে?

আরও পড়ুন: হাথক দরপণ

এসব গেরস্থালি মায়ার পরাণকথা রাজপুরুষের, রাজনারীদের শুনলে কি চলে? বেশি লোকের বারংবার অনুরোধের কাছে তাদের অদম্য জেদ হার মেনে নেয়। পিঠে সন্তান বেঁধে বেড়িয়ে পড়ার আগে তারা যে পরমান্ন রাঁধে, মাধুর্যরহিত হাতে তাতে দিয়ে ফেলে তিন ফোঁটা নুন! যেমন বেড়িয়েছিল তারা সিন্ধুর তীর ছেড়ে। এভাবেই হাঁস ও হাঁসিলের ডিম ভেসে যায় প্রলয়পয়োধিজলে; বেড়ে যায় খুঁটকাট্টি মানবীর ঋণ। পাহাড়তলি তাদের বড় আলসে করে দেয়। নাহলে যে তারা বৃক্ষের উপাসক, বেশ কবারের চেষ্টায় তারা সফল হয় কৃত্রিম বনসৃজনে। তাতে কি আর আছে পাহাড়ি গাছের মায়া, সেই নিবিড় ছায়াপরাণ!

আর পাহাড়চূড়ায় নির্ঘুম জেগে থাকে প্রত্ন জাহের থান…

ছবি লেখক

ক্রমশ…

পৌষালী চক্রবর্তী পেশায় রাজ্য সরকারি আধিকারিক। রসায়ন, তুলনামূলক সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের গবেষক। আগ্রহের বিষয় ইতিহাস, দর্শন, উনিশ শতক। নেশা বই পড়া, ফোটোগ্রাফি, পাহাড়ে বেড়ানো আর ভারতীয় মার্গ সংগীত শোনা। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘লিলিথ জন্মেরও আগে’ (২০২০)। তাঁর চাকরি-জীবনের প্রথম পোস্টিং পুরুলিয়া জেলায়। তিনি তাঁর পুরুলিয়া যাপনের কথা লিখবেন ধারাবাহিকভাবে ‘তুৎ পাখি উড়া দিলে’ কলামে। কখনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার জারণে, কখনও রূপক গল্পের কল্প আখ্যানে তাঁর এই নিবেদন অতীতচারী, বর্তমান-আবদ্ধ, অনাগত কালের পুরুল্যার করকমলে…

Facebook Twitter Email Whatsapp

3 comments

  • রনেন্দ্র

    অসাধারণ লেখা। যতক্ষণ পড়ছিলাম মনে হচ্ছিল এই ইট পাথরের শহরে আমি নেই। আমি ও প্রকৃতির কোলে ওদের ই একজন । খুব ভালো লাগলো। পরের অধ্যায় এর জন্য অপেক্ষায় রইলাম

  • অমল আচার্য

    কাব্যের কথা গল্পের ছন্দে উঠে এলে সে হয় এক অনন্য সাধারণ সৃষ্টি । বোঝা যাচ্ছে অযোধ্যা কোল ঘেঁষা এক জনপদের কাহিনি পরতে পরতে খুলবে । অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছি । শুধু একটি অনুরোধ স্হানীয় শব্দগুলোর অর্থ আলাদা ভাবে জানানো হোক ।

  • Suktisita Bhattacharya

    এতদিনে তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্রীকে খুঁজে পেলাম।
    যার চোখ আছে, মন আছে, মনন আছে। আছে আদিগন্তপাচালির গল্প বলার ভাষা। বুনে বুনে বুনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *