Latest News

Popular Posts

পূর্বমেঘের শস্যবাসনা

পূর্বমেঘের শস্যবাসনা

পৌষালী চক্রবর্তী

আমাদের অফিসের অনেক সহকর্মীই লোকাল ছিলেন। মাঝেমাঝেই তাঁরা হাফ ছুটি নিতেন; সকালটা আসতেন না, বিকেলে পিঠে নিয়ে এসে হাজির। মূলত মে-জুন মাস থেকে ডিসেম্বর-জানুয়ারি। জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে সূচনা। তাঁদের নানারকম পরব চলে; শস্যকেন্দ্রিক বিভিন্ন উৎসব; বৃক্ষ, অরণ্য, প্রকৃতির উপাসনা। কেতাবি ভাষায় পড়েছিলাম, প্রকৃতি তথা অরণ্যকেন্দ্রিক যাপনের প্রাচীন ঐতিহ্য বহনকারী অংশ এই থানের জঙ্গলই হল পবিত্র বন বা স্যাক্রেড গ্রোভ। নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা সামাজিকভাবে সংরক্ষিত এই সব বনাংশের ভৌগলিক সীমানার মধ্যে থাকা গাছপালা, পশুপাখি-সহ পুরো জৈববৈচিত্র্যই পবিত্র। স্থানীয় বা আঞ্চলিক দেবদেবীকে উৎসর্গ করা। সাঁওতাল, মুন্ডা, লোধা, মাহালি, ওঁরাও প্রভৃতি বিভিন্ন জনজাতির নিজস্ব পবিত্র বন থাকে। উপাস্য কখনও হন নিরাকার, কখনও সাকার। কোনও আদি পাথর, বা বিশেষ বৃক্ষ। এতদঞ্চলে আমার পরিচয় ঘটে জাহের থান, গরাম থান, সিনির থান ইত্যাদির সঙ্গে। মানুষ তাদের উপ্যাসের আবাসভূমিকে প্রাণের মতো আগলান। এইসব বনে অবাধ বিচরণ, বা বনজ সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ। প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত জৈববৈচিত্র্যের এমন দৃষ্টান্ত বিরল। এই বৃক্ষলগ্নতা, বৃক্ষপ্রেম আদিবাসী মানুষজনের প্রজন্ম পরম্পরায় বাহিত উত্তরাধিকার। তা একদিনের বিষয় নয়। প্রকৃতি সংরক্ষণের আদি পাঠ তাদের করায়ত্ত। উষ্ণায়নের এই পৃথিবী ব্যাপী সমস্যায় আধুনিক নাগরিক সভ্যতার নতজানু হয়ে পাঠ নেওয়া উচিত বৃক্ষ-উপাসক ‘জগদ্ধাত্রী’দের কাছে।

আরও পড়ুন: জগদর্শন কা মেলা (পর্ব ১)

উৎসর্গীকৃত পোড়ামাটির হাতি ঘোড়া ‘ছলন’। ছবি বঙ্গদর্শন

—’হড়মিত্যান’ বুঝেন দিদি? আমাদের মানভূম্যা শব্দ।

ব্লকে আসতেন এক অধ্যাপক মানুষ।

—আমরা মানভূম্যা মানুষেরা সব এক বৃহত্তর সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ।

অপূর্ব এক মিথোজীবিতা, সমাজচেতনার আভাস পাই। সাঁওতালি ও মুন্ডারিতে ‘হড়’ শব্দের অর্থ মানুষ। সমাজ সাহায্যকারী বিভিন্ন বৃত্তিভোগী মানুষের একত্র সহাবস্থান, পারস্পরিক সহযোগিতায় জীবনযাপনের বিনি সুতোর মালা এই মানভূম্যা হড়মিত্যান— মানুষে মানুষে মিতালি। রুখাশুখা টাঁড়ভূমে তাই জাতি, বৃত্তি নির্বিশেষে মানুষ মেতে ওঠে শস্য-উপাসনায়। মানভূমের কৃষি বৃষ্টিনির্ভর। কর্কটক্রান্তীয় অবস্থানের দরুন এখানের অত্যধিক উত্তাপ আর মাটির জলধারণ ক্ষমতা অত্যন্ত কম হওয়ায় বর্ষার জল ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে চাষবাস বেশ দুরূহ।

সময়ে-অসময়ে, পরবে-সাধারণ দিনে মাঝেমাঝেই পিঠে বানিয়ে আনতেন ঊর্মিলাদি। আমাদের স্বনির্ভর দলের সংঘনেত্রী। গল্প করেন ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি তাদের ভালোবাসার কথা

—আমরা তো খরা মাস জুড়ে জৈড় গাছ গোড়ায় জল ঢালি।

প্রাচীন কালের বৃক্ষ উপাসনা। ছবিটিতে বোধিবৃক্ষকে পুজো করছে মানুষ। গাছে ফুলের মালা দেওয়া হচ্ছে। গাছ আশ্রয়, ছায়া এবং ফল দেয়। তা এটি বুদ্ধের প্রতীক। ছবি nroer.gov.in

কুড়মালি সমবত অনুযায়ী বইসাখ আর জেঠ এই দু’মাস হল খরার মাস। বইসাখ-এর পয়লা থেকে মানুষ জল ঢালেন জৈড় বা অশ্বত্থ গাছের গোড়ায়। সাঁওতালরা বইসাখ, জেঠ মাসের পূর্ণিমায় এরঃ শিম নামে জাহের থানে ঈশ্বরের উপাসনা করেন। এরঃ শিমের সঙ্গে সঙ্গে মারাং বুরু, জাহের এরা ও ধরমের কাছে তারা সুবৃষ্টি ও উত্তম ধানফলনের জন্য প্রার্থনা করেন। এই পূর্ণচাঁদের সময়েই গ্রামের বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোকেরা আবগে নামক বংশের দেবতার উপাসনা করেন নিজ নিজ জমির উঁইঢিপিতে। আবগে রোগ বালাই দূর করে শস্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটান। এই পুজোয় মেয়েরা অংশগ্রহণ বা প্রসাদগ্রহণ করেন না। ধীরে ধীরে খরার দুর্গ ফেটে লাগে সবুজ মাতম। আর আমার মনলোক ছেয়ে যায় বুদ্ধ-রং আলোয়। বইসাখ পূর্ণিমায় শালের জঙ্গল পথে তিনি আসবেন, বোধি লাভ করবেন জৈড় গাছ তলে। তার আগমন প্রতীক্ষায় উদ্বেল প্রকৃতি। আর খরা মাস থেকে খড়কুটো মুখে নিয়ে শস্যবাসনা উড়ে যাবে রোহিনের দিকে।

ছড়া বলেন ঊর্মিলাদি। জেঠ মাসে ‘বারো দিনে বারোনি আর তেরো দিনে রোহিণী’। ‘লিরন’ অর্থাৎ ১৩ জ্যৈষ্ঠ রোহিন দিনে বীজ বপনের সূচনা। লোকবিশ্বাস, এই দিন বীজ ধান বপন করলে তাতে পোকামাকড়ের উপদ্রব কম হবে। বীজপূণ্যাহ বা বীজপুজো করে গৃহস্থ কৃষকেরা জমিতে বীজ ফেলেন। ভোর-ভোর উঠে গৃহস্থ মেয়েরা ঘরদোর গোবর জলে নিকিয়ে আলপনা আঁকে। বাড়ি বা সীমানা প্রাচীর ঘিরে গোবর জল দিয়ে বেড়ি কাটলে নাকি অশুভ শক্তি গৃহে প্রবেশ করতে পারে না। স্নান করে, ভিজে কাপড়ে, মৌনী হয়ে মেয়েরা ক্ষেত থেকে নতুন ঝুড়ি করে রোহিন মাটি নিয়ে এসে তুলসীতলায় বা গোয়ালঘরে রাখা হয়। জমিতে ধান ফেলার আগে বীজের সঙ্গে সামান্য পরিমাণে এই মাটি মেশানো হয়। এই ‘ধুলো বতরে’ মাটি ফেললে পুরুষ্টু, রোগবালাইহীন চারাগাছ ফরফরিয়ে বাড়ে, এমনই বিশ্বাস।

আরও পড়ুন: অমরত্বের অন্বেষণ

ধানজন্মের কথা, ছবি সংগৃহীত

ঊর্মিলাদি কচড়া পিঠে দিয়ে যান। মহুল ফল আর চালগুড়ি দিয়ে বানানো। আগে কখনও খাইনি এই পিঠে।

একটা রোহিন গান শোনান দিদি—

‘বড়বাঁধের আইড়ে যাতে মাইরি, লাগল প্রেমের হাওয়া/ প্রেম পীরিতের বড় জ্বালা মাইরি, ছাইড়ে দে মায়া ছেলা’।

আগে নাকি কচিকাঁচারা ধুলো, বালি, রং, কাদা মেখে রোহিন গান গাইতে গাইতে কুলিহ কুলিহ ঘুরে মাঙন করত। কেউ কেউ আবার কালি ঝুলি মেখে, ছেঁড়া কাপড় পরে কাপ বা সঙ সেজে পেঁপটি বা তালপাতার বাঁশি বাজিয়ে ঘুরত; আবার নানা জীবজন্তুর বেশে রঙ্গতামাশাও করত। রোহিনের কাপ গান গাইত—

‘কাপ নাচ নাচব না/ না দিলে তো ছাড়ব না/ একপুয়া চাল লিব/ প্যাট না ভ্যরলে গাল দিব।’

বা,

‘বেহাইকে মাইরেছে কাড়াতে/ বেহাই পইড়ে আছে নালাতে…’

এমন সব গান হত। ছেলেপিলেদের আনন্দে শামিল হয়ে গাঁ ঘরের লোক তাদের চাল-পয়সা-খেজুরপাকা দিত। এই মাঙনের পয়সায় কোনও মাঠের ধারে খিচুড়ি, মাংসের আনন্দ আয়োজনের সঙ্গে রোহিন নৃত্য হত। শুনেছিলাম এই রোহিন নৃত্যই নাকি ছৌ এর আদিরূপ। সত্যতা জানি না।

প্রবাদ আছে, রোহিনে বৃষ্টি হবেই আর সেই রোহিন জল খেতে জাতসাপেরা গর্ত থেকে বের হয়। এইদিন থেকে মানভূমে মনসা পুজোর সূচনা হয়। সবাই বিষক্ষয়ী আষাঢ়ী বা রোহিন ফল খায়। রোহিন দিনে শিবপুজো হয়। পুঞ্চার পাকবিড়রায় তিনদিনের বিখ্যাত রোহিন মেলা বসে। আদতে জৈন বিগ্রহ কালভৈরবের থানে পরম ভক্তি ভরে মানুষ পুজো দেয়। রোহিন মেলায় না যেতে পারলেও অন্য কোনও সময়ে পাকবিড়রা ভ্রমণ আমার আশ্চর্য সব বিস্ময় জন্মানোর সাক্ষী। বলরামপুরের উরমা, দড়দা, দলদিরিতেও রোহিন মেলা হয়।

আরও পড়ুন: তিনদিন ঝুলনা সাজাতাম, পূর্ণিমায় রাখী পরাত বোন্টু

শস্যচরাচর, ছবি লেখক

আসাড়, সরাবন নিয়ে চলে আসে বেরসার মাস। বীজতলায় অঙ্কুরোদ্গম হয়ে তখন তা মাঠে রোপণ করতে হবে। আষাঢ়ের মাঝামাঝি অম্বাবতীর ঠিক পরেই হয় ‘জাঁতাল’ পুজো। গরাম থানে গ্রাম দেবতার পুজো হয়। সুবৃষ্টি, উত্তম ফসল আর গৃহশান্তির কামনায় পোড়ামাটির হাতি, ঘোড়ার ছলন উৎসর্গ করা হয়। পুরোহিত বা ‘লায়া’ গরাম দেবতার পুজো করেন। তারপর চারা তুলে খেতে রোপণ করা হয়। সাঁওতাল জাতিগোষ্ঠীর মানুষজন এসময়ে পালন করেন ‘যান্থাল’। ধানরোপণ উপলক্ষে আবার জাহের থানে পুজো হয়। সুবৃষ্টি কামনায় গ্রামবাসীদের সমবেত প্রার্থনা শোনা যায়—

‘স্বরগেতে মেঘ হুড় হুড় করে গো/ পৃথিবীতে জল নাই পড়ে/ পৃথিবীতে জল নাই পড়ে/ শ্রীনাথ রাজা পরমেশ্বর/ নালা জল ছাড়িছে/ কাশি ঘুটু রুঁয়া চলে নাই।’

একটা লোকবিশ্বাস শুনি যে আগেকার দিনে অনাবৃষ্টি হলে, সাঁওতাল পল্লীর কোনও কিশোরীকে দিয়ে গোবর ছড়া দেওয়া হত। তারপর টানা ৩ বা ৫ বা ৭ দিন ধরে টানা নাচ হত। তাতে নাকি মেঘডম্বরুর সঙ্গে সঙ্গে নামত বৃষ্টি। এ গল্পের একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও শুনিয়েছিলেন এক মাস্টারমশাই। একাধিক সাঁওতাল পল্লীতে একযোগে নাগাড়ে বাদ্যযন্ত্র বেজে গেলে এবং নাচ হলে ওই এলাকার বায়ুমণ্ডলে কাঁপন লাগে আর সেই কম্পন সঞ্চালিত হয় মেঘস্তরে।

এই আসাড়ে প্রতি সন্ধ্যায় গ্রামের ধরম আখড়াতে লাঁগড়ে নাচ হয়। এই নাচে ঈশ্বরের লীলাগান হয়। এই গানে প্রথমে আখড়া ছঁচ বা গোবর লেপন করা হয়। তারপর আখড়া বন্দনা করে ছিতা, কাপুড়া, দানগী, পুঁড়গী, হিঁশি ও ডুমনি এই ছয় দেবীকে আহ্বান করা হয়।

আরও পড়ুন: রাখীর সঙ্গে গুলজারের যে সম্পর্ক কিংবা জ্যোৎস্নার সঙ্গে রেশমের…

ধান রোপণ। ছবি সংগৃহীত

মানভূমে বর্ষা আসছে। যারা এ অঞ্চলের বর্ষা প্রত্যক্ষ করেননি তাদের বোঝানো সম্ভব নয় মানভূমে বর্ষা কী অপরূপ। টাঁঢ়মাটির জল-বিলাপ শেষ হয়। ধান্যচরাচরে জাগে প্রজনন মায়া। দাবানল ক্ষত ধরা পাহাড়ের বুকে আসে সবুজ আয়ুধ। সময়ে সময়ে সেই সবুজ পাহাড়ের গায়ে নেমে আসে বৃষ্টিগর্ভা মেঘ। জনপদ-বধূরা শস্যপ্রসবিনী ধরিত্রীর বুকে উড়িয়ে দেয় বিরহের মেঘদূত। এক অলৌকিক ঝরনা ধারায় স্তনে দুধ আসে খরামাস পেরিয়ে আসা শীর্ণকায়া নদীর। ‘চিরদিন ছাড়াছাড়ি’ যাদের, সেই ‘দূরদেশী এক রাখাল ছেলে সমুদ্র’ ও তার প্রণয়মুগ্ধা কংসাবতী নদীর আজীবন বিচ্ছেদের কান্নায় উপচে ওঠে নদীর কূল। লোককাহিনি দেবতাকে নদী করে, নদীকে দেবতা। জেলা সদর থেকে ফেরার পথে ভরভরন্ত নদীর ওপর কাঁসাই ব্রিজ পেরোনোর সময় সে গল্প শোনান চালক ওসমানদা। পৃথিবী পর্যটনকালে একবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঘুরতে ঘুরতে আসেন রাঢ়দেশে। প্রকৃতির অপার প্রাচুর্যে মুগ্ধ দেবতা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে পাহাড়ি নদীর জলখেলা করা কিশোরী কংসাবতীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। সে আবার সমুদ্রের প্রণয়প্রার্থী। রঙ্গপটু কৌতুকপ্রিয় ঈশ্বরের ইচ্ছা জাগে মেয়ের সঙ্গে লীলাখেলা করার। ভগবানকে এড়াতে সে মেয়ে নদীরূপ ধরে পলায়ন করল। কিন্তু দেবতাকে এড়িয়ে যাওয়া কী অতই সোজা! শ্রীকৃষ্ণ রূপ নিলেন এক দামাল জলস্রোতের। ধাওয়া করলেন কংসাবতীর পিছনে। দামোদরের কুলপ্লাবী স্রোতে ভেসে গেল দু-ধারের জনপদ, ক্ষেত, মাঠ সব। অনেক দূর আসার পর ভগবান যখন পিছনে তাকিয়ে নিজের তাণ্ডবলীলা প্রত্যক্ষ করেন, তার মনে হয় এই সংহার মূর্তিতে মেয়ের মন পাওয়া যাবে না। মনোকষ্টে তিনি শান্ত, সমাহিত জলধারার রূপনারায়ণ হয়ে ওঠেন। সেই শান্ত, বহতা রূপে প্রায় মজে যায় কংসাবতী। কিন্তু নদীর বুকে চেনা স্বর শুনে মোহভঙ্গ হয় মেয়ের। সে মুখ ফিরিয়ে ভয়ে ভয়ে চলে সাগর সকাশে। কিন্তু স্বয়ং ‘দীনবন্ধু জগৎপতে’ যার প্রণয়প্রার্থী, তাকে গ্রহণ করে, এমন সাধ্য কী হয় সামান্য সমুদ্রের! সে ফিরিয়ে দেয় কংসাবতীকে। আর কোথায় যাবে কৃষ্ণ-বিমুখ কংসাবতী? ঈশ্বরের কাছে সে কিছুতেই নিজেকে সঁপে দিতে পারবে না। অগত্যা ঝাঁপিয়ে পড়ে গঙ্গার কোলে আশ্রয় নেয় সে।

আরও পড়ুন: নদিয়ার পুতুলনাচ

জাহের থান। ছবি পশ্চিমবাংলা আদিবাসী নিউজ বুলেটিন: আদিবাসী উন্নয়ন ও আত্মপরিচয়

আশ্চর্য মনে ভাবতে থাকি এই ভারতভূখণ্ডেই নদীতমা সরস্বতী, দিকে দিকে দেবী জন্ম নিয়েছিলেন। কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের লেখনীতে দেখি

‘…ওরা কখনও দেখেনি/ কীভাবে পাকিয়ে উঠে ভূর্জপত্রগুলি/ দেবীর শরীর পায় সরস্বতী-তীরে’।

আর দেবতা এখানে প্রণয়মুগ্ধ হয়ে নদীজন্ম নিলেন। দেবতাকে নদী বানাল যে মেয়েটি, তার নদী জন্মের উৎসমুখ তো একদিন দেখতেই হবে, মনে মনে ভাবি। শুনেছিলাম তার উৎস ঝালদায়। একদিন যাওয়াও গেছিল সেখানে…

শ্রাবণ সংক্রান্তির মনসাপুজোর পরেই চলে আসে করমের মাস— ভাদর-আসিন। মনে মনে গুনগুন করতে থাকি

‘ভাদরো আশ্বিন মাসে ভ্রমর বসে কাঁচা বাঁশে…’

‘এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর’ জুড়ে ধানমাঠে কচি চারা, শুখাভূমি সবুজে সবুজ। চাষি আর চাষি-বউ মাঠে কাজ করে; খাটতে খাটতে গায় ফসলের গান, কবি গীত-শ্রমের যৌথ সংগীত। এ গান নাকি ঘরে গাওয়ার নয়—

‘অ তুঁই আসবি বলে নাই আলি হে/ টিনের আগুড় জানালায় ভালি হে…’

আর একক কবিগীতকে বলে টাঁঢ়ঝুমৈর। তবে রাখাল বালকেরা মাঠে মাঠে পশুচারণের কালে এইসব গান গাইত বলে একে বাগালি গীতও বলা হয়ে থাকে। আদিম কৃষিজীবী সমাজে যৌনতা আর উর্বরতার ধারণা ছিল একে অন্যের পরিপূরক। তা যেন ছুঁয়ে গেছিল কৃষি-আচারকে। এ সব কৃষিকেন্দ্রিক শ্রমসংগীতগুলিতে আমরা খুঁজে পাই সেই অনুষঙ্গ। গানের কথায় সবসময় শস্য, কৃষির প্রসঙ্গ থাকে না। নিরাভরণ, অকপট এইসব গান যেন ইঙ্গিত পাঠায়। একটা টাঁঢ়ঝুমৈরের কথা বলেছিলেন ঊর্মিলাদি—

‘পীরিত করে লে রে খালভরা/ পীরিত করে লে…’

কৃষিজীবী সমাজে বিভিন্ন আঙ্গিকের সারিবদ্ধভাবে অনুষ্ঠেয় যূথ নৃত্য ও গীত প্রচলিত আছে , যার একটি হল দাঁড়ঝুমৈর। পুরুষেরা নারী সেজে সখীর ভূমিকায় অভিনয় করে থাকে এতে। এ নিছক আনন্দগান, কোনও ধর্মীয় আচারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়—

‘তুমার পীরিতি জানা গেল এতদিনে/ মিছাই দেখা মন রাখা নয়নে নয়নে’

আরও পড়ুন: গীতিকার টানে…

জাহের থান। ছবি সাঁওতাল-santhal, ফেসবুক

মানুষের আদিতম আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি হল বাক্। তার ইতিহাসচেতনা, ছড়া, গান, লোককথা সব এই প্রথমে এই কথ্যসংস্কৃতির অঙ্গ। সাবেক মানভূমে ঋতুভিত্তিক লোকগান ও লোকনৃত্যের প্রচলন ছিল। ঋতুতে ঋতুতে আবার বিভিন্ন ফসল; ফসলের বিভিন্ন দশা যেমন বীজবপণ, অঙ্কুরোদ্গম, চারারোপণ, চারা গাছের বাড়বৃদ্ধি এইসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পরব। ঋতুভিত্তিক ও পরবকেন্দ্রিক বিভিন্ন লোকনৃত্যগীতিতে মাতোয়ারা থাকেন এখানকার মানুষজন। নাগরিক ক্লান্তি ও কোলাহল থেকে দূরে আড়ম্বরের বাহুল্যহীন, আন্তরিক এইসব পরবে তারা আরাধনা করেন ‘নিভৃত প্রাণের দেবতা’কে। দেবতা সাড়া দেন জনপদের উপর দিয়ে, বৃক্ষজীবনের মধ্যে দিয়ে, শস্যচরাচরে বয়ে যাওয়া বায়ুর হিল্লোলে, ফসলের শীষে, বাকল ফেটে বেরিয়ে আসা অযোনিসম্ভূতা পাতার আলিম্পনে। আমার মনে অনুরণিত হতে থাকে প্রিয় কবি অভিমন্যু মাহাত-র ক’টি পঙ্‌ক্তি—

‘…আমাদের আছে মারাংবুরু/ গরামথান পুজো/ করম, মকর, বাঁদনা, রহিন/ মেঘ, রৌদ্র, শস্য, পাহাড়, প্রকৃতি দেবদেবী…/ অভিধানে খুঁজে পাচ্ছি না এই ধর্মের নাম…’

ক্রমশ…

নামাঙ্কন: আল নোমান (বাংলাদেশ)

এই ধারাবাহিকের বাকি পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তুৎ পাখি উড়া দিলে…
পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম
বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে
সূর্যাস্তের দেশে
মাটি-জল-মুক্তামাছ
এই ঘর, এই উপশম
সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর
স্বাধীনতার সূর্যদের লড়াইধন্য সেইসব পবিত্র ভূমি
মানভূমের মনসা পরব

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *