দিনরাত্রির কাব্য

পৌষালী চক্রবর্তী

একেকদিন ভোরের আলোয় লেগে থাকে পৃথিবীর গাঢ়তম বিষাদের সুর। মনের মধ্যে এমন বিপরীত ভাবের টানাপোড়েন চলে… চরাচর ছেয়ে যাচ্ছে একটি নতুন ভোরের প্রথম সূর্যের আলোয় অথচ তার লেশমাত্র ছটা পৌঁছচ্ছে না মনের গহীন তলদেশে। সেখানে কার যেন অনুচ্চ অথচ গাঢ় স্বর ক্রমাগত বলে যায়, কেউ কোথাও নেই, পৃথিবীতে কারও জন্য কেউ অপেক্ষা করে না। আহ্নিক গতির সঙ্গে পৃথিবীর জড় দেহের যে অস্তিত্ব, সেখানে মানুষ, মানুষের সভ্যতার তিলমাত্র আঁচড়ও পরেনি— এমনটা সময়-সময়ে মনে হয়। সভ্যতা নিয়ে, মানুষের কীর্তিকলাপ মানুষেরই পালাকীর্তন, কোনও এক মানুষের মন ছাড়া অথবা আবহমান মানুষের স্মৃতি ছাড়া তার অন্য কোথাও কোনও অস্তিত্ব নেই। কালচক্রের ওপর, জীবনের অন্তিম পরিণতির ওপর মানুষের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। একেকটা দিন এরকম প্রদীপ নিভিয়ে শুরু হয়।

আরও পড়ুন: সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৮)

অথচ প্রকৃতিতে আয়োজনের কোনও খামতি নেই। মানভূমে শরৎ এসেছে, করমের মাস জুড়ে। নীলাভ আকাশ জুড়ে আশ্বিনের আলো রঙের রোদ। কাশবালিকারা দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে আম্রুহাঁসা নদীর চরে। অযোধ্যা হিলটপে ওঠার রাস্তার দু-ধারে ঘন কাশ-আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে দুধসাদা মেঘ নেমে এসেছে অথবা বরফের হিমবাহ। এখনই তার ওপর দিয়ে ছুটে চলে যাবে বল্গাহরিণে টানা স্লেজ। পাহাড় আর এমন কাশ সমাবেশকে প্রেক্ষাপটে রেখে ঘুর চপকা মেরে শূন্য থেকে নেমে আসছে মুখোশধারী ছৌ শিল্পী। ক্যালেন্ডারের ফোটোশ্যুট হচ্ছে। এই প্রকৃতি, এই প্রতিবেশ, এই শিল্প ফ্রেমবন্দি হয়ে পৌঁছে যাবে ড্রয়িংরুমের দিনযাপনে। প্রকৃতি ও মানুষের এমনধারা মহাকাব্যিক অনন্ত লীলাখেলার মধ্যে কার যে মরবার সাধ হল…

দিনটা ছিল দুর্গাষষ্ঠী। সহকর্মীদের মধ্যে রোস্টার করে অফিস খুলে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কয়েকজন উপস্থিত আছেন, যদি কেউ রিলিফ নিতে আসেন সেই প্রয়োজন মেটানোর জন্য। কেউ কেউ ঘুরছেন অফিস সংলগ্ন রোদের বাগানে। অফিসঘরে বসে বসে ভাবছিলাম সিরগি নদীর পাশে যাব। ওখানে একরত্তি একটা প্রত্নস্থল আছে। পলাশগাছের নীচে এক পাথর খোদাই জৈন উৎসর্গ দেউল বহুদিন যাবৎ মুখ ঢেকে আছে। কোনও লুপ্ত সভ্যতা, কবেকার কোন অনামা শিল্পীর সৃষ্টি ভাবিকালের জন্য রয়ে গেছে এক গ্রাম্য নদীর পারে। এইসব মনে মনে ভাবছি আর বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় এসডিও ম্যাডামের ফোন এলো। ব্লকের গ্রামীণ হাসপাতালে একটি মৃতদেহ এসেছে। তার সুরতহাল করতে যেতে হবে। এই একটি কাজ আমাদের চাকরি জীবনে। কিছুতেই যেন অস্বস্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায় না। ছোট ছোট প্রাণগুলো শেষ হয়ে যেতে দেখলে ভারি এক অসহায় কষ্টের বোধ ঘিরে ধরে।

আরও পড়ুন: পঞ্চাশটি ঝুরোগল্পের ডালি ‘তরুণিমার কোনও অসুখ নেই’

সেবার পুজোয় ছুটি মেলেনি। আমাদের ক্ষেত্রেও একই মহকুমার পাশাপাশি ব্লকের বিডিওরা একে অন্যের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে নিয়ে পুজোর দিনগুলোতে পালা করে বাড়ি যাওয়ার একটা চেষ্টা করা হয়। অধিকাংশই বাড়ি থেকে বহুদূরের কর্মক্ষেত্রে একা একা থাকে। এসময়টা তাই ভারি মন টানে বাড়ির দিকে। এবার স্টেশন লিভ করা যাবে না, এমনই নির্দেশ। পুজোয় যে খুব প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরি বা জমিয়ে ঠাকুর দেখি, তেমনটা আমার কোনও দিনই নয়। কিন্তু ওই মফস্সলের ছায়া ঘেরা বাড়ি, জানালার ফাঁক দিয়ে পুজোসংখ্যার বুকে এসে এসে পড়া পাটভাঙা শারদীয়া রোদ কিংবা বহুদূরাগত ঢাকের শব্দ, মাঝেমাঝে মাইকে ভেসে আসা পুরনো বাংলা গানের মায়ায় জড়িয়ে থাকা বকুলশাখা, পারুলশাখা কিশোরীবেলার জন্য মন কেমন করতে থাকে। এখানে শারদোৎসবে প্রকৃতির সাজ কানায় কানায় ভরে উঠলেও মানুষের আয়োজনের অংশটি অনেকটা নিস্তরঙ্গ। এমন শান্ত শারদীয়া ঘিরে থাকে বামনী ঝরনার জলপতনের শব্দ অথবা শালজঙ্গলের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ডহরিয়া বাতাসের পত্রমর্মর ধ্বনি। পাতাবন্ধ পরে থাকে থরে থরে শারদসংখ্যা। প্রত্নস্থল যাওয়া মুলতবি রেখে গুটিগুটি এগিয়ে চলি গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে। জীবনে প্রথমবার সুরতহাল করতে চলেছি। ব্লক অফিস সংলগ্ন একটি বারোয়ারি দুর্গামণ্ডপে তখন চলছে বোধনের আয়োজন।

আরও পড়ুন: জনপ্রিয়তা কি সীমাবদ্ধতাও

আর বোধনের সমান্তরাল পথে হেঁটে আমরা এসে পৌঁছই ভাসানের উপকূলে। থানার ইনভেস্টিগেটিং অফিসার এসে ব্রিফ করছেন। আগুনে পুড়ে আত্মহত্যার একটি কেস। সুরতহালের সময় মৃতদেহটি আদ্যোপান্ত খুঁটিয়ে দেখে কোনও অস্বাভাবিকতা বা আঘাতের চিহ্ন আছে কিনা, তা দেখা এবং মৃত্যুর আপাত কারণ যদি কিছু বোঝা যায়, সেই সংক্রান্ত রিপোর্ট দেওয়া কাজ। যদিও অনেক মৃতদেহ দেখে কিছু বোঝার উপায় থাকে না। এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সুরতহাল রিপোর্ট পেলে সেটি মর্গে যায় এবং হাসপাতালের অটোপ্সি সার্জন ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করেন। সাধারণত বিয়ের সাতবছরের মধ্যে কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে পুলিশ ইউডি বা আনন্যাচারাল ডেথ কেস শুরু করে। এটিই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষ মনে করলে সুরতহালের নির্দেশ দিতে পারেন।

জনৈক একুশ বছরের একটি বিবাহিত মেয়ের নব্বই শতাংশ ঝলসে যাওয়া দেহের সামনে দাঁড়াই। এটি এক মায়েরও মৃতদেহ। দাদু, দিদা আর মামা’র সঙ্গে হাসপাতালে এসেছে একটি তিন বছরের শিশুকন্যা। বাড়িতে তাকে দেখার কেউ আর নেই। বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে ভাবি কোন মানুষের প্রত্যাখ্যান তাকে এমন শিশু ফেলে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিয়েছে! পর্যায়ক্রমে প্রথমেই একটি অত্যন্ত অপ্রিয় কাজ করতে হয়। মৃতার রক্তসম্পর্কের কাউকে দিয়ে তার শনাক্তকরণ। মেয়েটির মা আসেন দমকে দমকে ওঠা কান্না সামাল দিতে দিতে। যে শিশু শরীর কে স্নেহ দিয়ে, যত্ন দিয়ে তিনি এত বড় করেছিলেন, যে প্রাণ আরেকটি প্রাণকে পৃথিবীতে এনে বজায় রেখেছিল মাতৃধারা, সেই প্রাণ ছেড়ে যাওয়া ঝলসানো শরীরকে, তার একান্ত নিজস্ব চন্দ্রবদনীর অঙ্গার আবরণ উঠে যাওয়া মুখটিকে সনাক্ত করেন তিনি। আগলে ধরতে যান, আঁকড়ে ধরতে চান পোড়াকাঠ মেয়ের শরীর। থানার ডোম তাকে বিরত করেন। শিশুকন্যাটি তখন হাসপাতালের মেঝেতে বসে, মেঝেতে থাবড়া মেরে মেরে খেলছে। কিচ্ছু না বুঝতে পারা শিশুর মুখে অনাবিল হাসি। এমন দৃশ্যের সামনে পড়ে ইচ্ছে করে পুড়িয়ে দিই কবিতার খাতা। বেঁচে আছি বলে নিজেকে মনে হতে থাকে এক নির্লজ্জ অপরাধী। মনে হয় মৃত্যুচেতনার যত কাব্যকথা আছে সেসব এই পৃথিবীর নয়। ওসব কারও কারও অনুভূতি দেশের ভাববিলাস। জীবনান্দের কবিতার লাইন ছিল—

“যেইখানে কল্কা পেড়ে শাড়ি প’রে কোনো এক সুন্দরীর শব
চন্দন চিতায় চড়ে— আমের শাখায় শুক ভুলে যায় কথা;
যেইখানে সবচেয়ে বেশি রূপ- সবচেয়ে গাঢ় বিষণ্ণতা;
যেখানে শুকায় পদ্ম— বহুদিন বিশালাক্ষী যেখানে নীরব;
যেইখানে একদিন শঙ্খমালা চন্দ্রমালা মানিকমালার কাঁকন বাজিত,
আহা, কোনোদিন বাজিবে কি আর!”

রূপসী বাংলার সেই রোমান্টিক মৃত্যুজগতের থেকে কত দূর বীভৎসতা লেগে আছে এই মৃত্যুদৃশ্যের গায়ে।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদের বন্যা ও নদী ভাঙন: ফরাক্কা ব্যারেজের প্রভাব

শনাক্তকরণের সইসাবুদ করিয়ে মেয়েটির ভাইকে জিজ্ঞেস করি, তারা কেস করবেন কিনা। ততক্ষণে স্বামী-সহ শ্বশুরবাড়ির লোক পলাতক। জানতে পারি স্বামীটির বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে নিত্যদিনের অশান্তি আর মেয়েটির প্রতি অত্যাচার সে সন্ধ্যায় চরমে ওঠে। মেয়েটি নাকি রান্নাঘরে গিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। পড়শিদের কাছ থেকে তারা এমনই জেনেছেন। গুষ্টিসমেত পালানোর সময় তারা শিশুটিকে ফেলে রেখে গেছে। শিশু বলে নাকি মেয়ে শিশু বলে, জানি না। পড়শিরা বাচ্চাটিকে রেখেছিল। তাঁকে আলাদা কোনও অভিযোগ করবেন না। মেয়েটির মা বলেন, অভিযোগ করলেও মেয়ে তো আর ফিরবে না। বাচ্চাটাকে তবু যদি শ্বশুরবাড়িতে নেয়।

মৃতদেহটি খুঁটিয়ে দেখে পরিধান বা দৃশ্যমান যা কিছু সে-সবের নোট নিয়ে নিই। যদিও এই ঝলসানো দেহ দেখে আর আপাতভাবে কিছু বোঝার নেই। থানায় যাই প্রোফর্মা রিপোর্ট লিখতে। মাথায় পাক খেতে থাকে গুটিকয়েক ছবি। স্ট্রেচার থেকে বাইরে ঝুলে আছে একটি পুড়ে কালো হয়ে চামড়া উঠে যাওয়া হাত। সেই হাত জড়িয়ে আছে পুড়ে যাওয়া একটি চুড়ি। সাদা আভাস দেখে মনে হয় ওটি ছিল শাঁখা। ডোম যখন হাতের মুঠি খুলে দেখাচ্ছিলেন আমার নজর এড়ায়নি আঙুলের আধখাওয়া সবুজ নেলপালিশ। সেই হাত গতদিনও আঁকড়ে ছিল শিশু। আর না পোড়া পায়ের পাতার ফাটা গোড়ালিতে আবছা হয়ে ফুটে থাকা বিচ্ছিন্ন আলতা দাগ। পুড়ে যাওয়া নাকে চিপে বসে যাওয়া নাকফুল। তার শখের চিহ্ন, বিবাহযাপন, সংসারবাসনা। মাথায় ঘা মারেন গৌতম বসু—

“ধোঁয়া মাটির দিকে তাকায় আর বসবাসের কথা ভাবে
এবার সংসারী হতে হবে, সংসার নারীর পা
প্রাণের অভাবে ধোঁয়া আর শিরা দিয়ে কাহিনী
সম্পূর্ণ হল, আলতা অনেক পরের কথা,
আলতা অনেক আগের কথা, তার কুৎসিত ঐশ্বর্য
কেউ-কেউ ঘৃণা করেছে; কিন্তু অদৃষ্টে শ্রী ছিলেন।”

আমার গলায় ভলকে ভলকে উঠে আসছে মাংসপোড়া ঘ্রাণ। ওই স্থান থেকে সরে আসার বহুক্ষণ পরেও। সুরতহালের পর দেহ চাদরমোড়া হয়ে ভ্যানে করে চলে আসে থানায়। পিছন পিছন আসে শবযাত্রীরা- বাবা, মা ,ভাই, কন্যা। ময়নাতদন্তের পর তারা মৃতদেহ হাতে পাবে। থানায় গিয়ে রিপোর্ট লিখতে লিখতে খালি আমার মন কল্পনা করে নিতে চায় মেয়েটির সংসারদৃশ্য। জেনে নিই পাহাড় কোলে মেয়েটির শ্বশুরবাড়ি। তার টালিখাপড়ার ঘরে কি আছে একটা বিষণ্ণ হুক? যার গায়ে একটি আয়না টাঙানো? পারা বেরিয়ে পরা সেই আয়ানায় কোনওমতে সে মুখ দেখত? প্রসাধন করত? গায়ে আগুন দিয়ে সে যখন বাঁচার জন্য ছুটছিল, সে দৃশ্য কী দেখেছিল তার শিশু? আজ শূন্য সংসারে উল্টে পড়ে আছে ভাতহীন হাঁড়ি…

জীবনে মৃত্যুঅভিজ্ঞতা বলতে শৈশবে ঠাকুমার চলে যাওয়া । মনে আছে রাতের উঠোনে তার মালায় সাজানো মরদেহের বুকে রাখা গীতা। আমার চোখ সব কিছু ছাড়িয়ে বারবার আটকে যাচ্ছিল রথাসীন কৃষ্ণার্জুনে। পিসিদের, মায়ের কান্না; কান্না চেপে চোখ লাল হয়ে যাওয়া বাবা আর শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে আসা শ্মশানবন্ধুরা- আবছা আবছা মনে পড়ে। মৃত্যুর আগে ঠাকুমা বেশ কিছুদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। আমার অতি শিশু বোন তখন টলোমলো পায়ে ঠাকুমার ঘরে গিয়ে মাথায় হাত দিত, কখনও দুষ্টুমি করে চুলও টেনে দিয়ে আসত। তাঁর মৃত্যুর পরের দিন ওই ঘরের সব দরজা, জানালা খুলে দেওয়া হয়েছে। ঘর ভেসে যাচ্ছে শীতদিনের রোদে। আমার বোন একটা রানি কালারের উলের ফ্রক পরে টলতে টলতে গিয়ে খাটের কাছে যায়। বিছানায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে হঠাৎই খাটের নীচে খোঁজে ঠাকুমাকে…

আরও পড়ুন: জগদর্শন কা মেলা (পর্ব ২)

একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় আচমকা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে এক বন্ধু, সহপাঠী মারা যায়। সেই প্রথম বোধহয় জীবনের অনিশ্চয়তার সাথে মুখোমুখি পরিচয়। মাঝরাত্তিরে টেলিফোন বাহিত মৃত্যুসংবাদের সেই আচম্বিত আঘাত পেরোতে অনেকগুলো মাস লেগেছিল। তারপর আরও অনেক নিকটজনের মৃত্যু হয়েছে কিন্তু অস্তিত্বকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া, মনোভূমি তোলপাড় করা অনুভবের সামনে এমন করে আর দাঁড়াতে হয়নি। ধীরে ধীরে বোধহয় মনোলোকের গহীন জগতে চারিয়ে গেছে এই বোধ— ‘…যে কোনও গৃহের থেকে শ্মশান খুব দূরের পথ নয়।’ (অনন্যা, গৌতম বসু)।

প্রথম সুরতহাল আবার যেন সেই অস্থিরতার বোধকে খুঁচিয়ে তুলল। সেদিন বুঝিনি যে মৃত্যুর মধ্যে বসে জীবনের বাঁচানোর জন্য লড়াই করা ডাক্তার বা দাহকার্যে সহায়তা করে জীবনযুদ্ধ জারি রাখা শ্মশান ডোমের মতো এক নিরাসক্তি, ধীরে ধীরে আমি আয়ত্ত করে নেব। তখন অস্বস্তিটুকু পড়ে থাকবে, কিছুটা বিষণ্ণতাও থাকবে কিন্তু তোলপাড় বিদায় নেবে। তখন থানার রিক্যুইজিশনে কজ অব ডেথ পয়জন দেখলে একটু কম অস্বস্তি হবে। কারন তা হ্যাঙ্গিং বা বার্নের থেকে বীভৎসতায় কিছুটা কম।

আরেকটি মৃত্যু’র ঘটনায় একবার থানার ওসি এসেছিলেন। সেখানে অবশ্য প্রেক্ষিতটা একটু ভিন্ন ছিল। দরিদ্র, প্রান্তিক এক পরিবারের একমাত্র রোজগেরে মানুষ বেশ কিছুদিন নিরুদ্দেশ ছিলেন। তারপর তার মৃতদেহ পুলিশ উদ্ধার করে এক অনামা, অচিন পাহাড়ের গায়ে অযত্নে বেড়ে ওঠা এক গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায়। শরীরে তখন ম্যাগট ধরে গেছে। আমাদের কাজ ছিল পরিবারের পুনর্বাসনের কিছু বন্দোবস্ত করা। সে-সবের প্রয়োজনে তাদের বাড়ি যাই। নির্লিপ্ত, কঠিন কিছু মুখের নীরব জিজ্ঞাসার সামনে আমরা কথা খুঁজে পাইনি সেদিন। শোনা গেল মানুষটির মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক ছিল না। মাঝেমাঝেই এমন উধাও হয়ে যেতেন, আবার ফিরে আসতেন। এবার পাহাড়ে জঙ্গলের পথে একেবারে হারিয়ে গেলেন… আমার মাথায় সেই না- দেখা দৃশ্য স্থায়ীভাবে জাঁকিয়ে বসে। পাহাড় ঠেলে অনেকটা উঠে দেখি এক সিল্যুয়েট-ফিলামেন্টের মধ্য দিয়ে দেখা রোদে, হালকা-হালকা বাতাসে দুলছে এক প্রাচীন মানুষের দেহ। পৃথিবীর কোনও কাব্যই বোধহয় মৃত্যুর জন্য লেখা হয়নি…

ট্রেনিংয়ের সময়ে এইসব কঠিন পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছিল অনেক কেস স্টাডি দিয়ে। তারা বিলি কাটে মগজের ধূসর কোষে। মৃতদেহের সম্মান, সম্ভ্রম রক্ষার কথা যেন আমাদের মাথায় থাকে। সহমর্মিতার সঙ্গে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে যেন পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে কোনও একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: পুরুলিয়ার তেলকুপিতে জলের নীচে ইতিহাস

ভাবতে ভাবতে ফিরি। ওই পরিবারটি নিশ্চয়ই দুঃখ, মৃত্যু, বিরহ, দহন পেরিয়ে জীবন প্রবাহের মধ্যে সন্ধান করবে তার অনন্ত সম্ভাবনা, আনন্দের উৎসমুখ। মা হারা শিশুটিও শ্বাস নেবে, হাসবে, খেলবে, বড় হয়ে উঠবে এই পৃথিবীতে। বাবা তাকে ফিরিয়ে নিক অথবা না নিক। সে প্রাণ যেমন ভাবেই বেড়ে উঠুক না কেন এই জগতের অপার সম্ভার, আলো, হাওয়া, রোদ, বৃষ্টি, তারারাজি, পাখি ডাকের ওপর তার যে নিরঙ্কুশ, নিঃশর্ত অধিকার তা কেউ খর্ব করতে পারবে না।

আমার বাঙালি জীবনের বয়স আরেক বছর বাড়িয়ে দিয়ে সেবার মানভূমে শারদোৎসব আসে। আশ্বিনের রোদের মধ্যে চিরকাল আমি এক বিষাদ খুঁজে পাই। কোন নাকছাবি যে কোন হলুদ বনে হারিয়েছে, সে হদিশ না দিয়েই রোদের শরৎ পাহারা কানে কানে বলে যায়— “এক লক্ষ বছর সঙ্গে থাকার পর সাব্যস্ত হবে, তুমি আমার কিনা।”

ক্রমশ…

এই ধারাবাহিকের বাকি পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তুৎ পাখি উড়া দিলে…
পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম
বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে
সূর্যাস্তের দেশে
মাটি-জল-মুক্তামাছ
এই ঘর, এই উপশম
সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর
স্বাধীনতার সূর্যদের লড়াইধন্য সেইসব পবিত্র ভূমি
মানভূমের মনসা পরব
পূর্বমেঘের শস্যবাসনা
প্রজনন মায়া লাগে শস্যচরাচরে

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *