Latest News

Popular Posts

ছোট ছোট দুঃখকথা

ছোট ছোট দুঃখকথা

পৌষালী চক্রবর্তী

এই যে বেশ কয়েক বছর পরে বসেছি মানভূম যাপনের গল্প নিয়ে, স্মৃতির অলিগলি সময়ের চলনকে তো পুরো তালগোল করে দিচ্ছে। যেমন যেমন যা মনে আসছে তা লিখতে গিয়ে মাঝেমাঝেই কালানুক্রমণ দোষ ঘটে যায়। লেখকের বাস্তব স্থানকাল আর মনোভূমির সময়কাল তো আলাদা বটেই, লেখার মধ্যেকার সময়ও মাঝে মাঝে এ দুয়ের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। চলছি এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, ভাবছি হয়তো তখন অন্য এক সময়ের কথা যে ক্রোনোটোপের এক বিন্দু ছুঁয়ে আছে মানভূম। লিখছি মানভূমেরই অন্য এক সময়ের কথা। যেমন আজ এই শনিবার, ২ অক্টোবর  ২০২১ সনে, আগামীকাল রবিবারের জন্য যখন নিয়মিত কলাম লিখছি অফিস যাওয়ার পথে কোনা হাইওয়ের পাশে নেমে আসা গাঢ় নীল শরৎ আকাশের বুকে ঘনিয়ে ওঠা পেঁজাতুলোর মতো মেঘ দেখে আমার চোখে ভেসে উঠল অযোধ্যা পাহাড়। মনে হল যেন আরেকটু এগোলেই ময়ূর পাহাড় পৌঁছে যাব। এমন আমার মাঝেমাঝেই হয়। লিখতে শুরু করতেই দেখি লিখতে ইচ্ছে করছে চাতোরমা পাহাড়ের কোলঘেঁষে ঝাড়খণ্ড সীমান্তের সেই ছোট্ট গল্পের মতো ইস্কুলবাড়ির কথা…

আরও পড়ুন: ‘গুলিনদা’র জন্ম শতবর্ষ

মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন স্কুল পরিদর্শন করতে হত-পরিকাঠামো, মিড-ডে মিল বা অন্যান্য আরও অনেক কিছু বিষয়েই। অনেক সময়েই সঙ্গী হতেন পুলিশ আধিকারিকরা। জঙ্গলমহলের কমিউনিটি পুলিশের অঙ্গ হিসাবে ওদের এমন নানারকম কিছু থাকত। তখন বর্ষার ধূসরসিক্ত আলাপন মেখে পাহাড়ে, বনের সবুজ আরও গাঢ় সবুজ হয়েছে। মাঠে মাঠে সবুজ ধানের হিল্লোল। আজকের মতোই মেঘমুক্ত সুনীল আকাশ। টাটা-পুরুলিয়া রোডের দু-পাশে নিবিড় সবুজের মধ্য দিয়ে গিয়ে পৌঁছেছি সেই প্রাইমারি স্কুলে। টিফিনের ঘণ্টা পড়ার একটু আগে আগে। ক্লাসঘরে ক্লাসঘরে তখন নিবিড় পাঠে মগ্ন ছেলেমেয়েরা। ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষিকা আমাদের দেখে এগিয়ে আসেন। তাঁর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে কিচেনে যাই। স্বনির্ভর দলের দিদিরা সেখানে রান্নার কাজে নিযুক্ত। বেশ পরিষ্কার, গোছানো পরিপাটি রান্নাঘর। দিদিরা বলেন অনেক ছেলেমেয়েদেরই ছোট ছোট ভাইবোন মিড-ডে মিলের সময়ে চলে আসে।

‘তাদের কী করে না দিই বলেন?’

আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার একটি এলাকার বাংলামাধ্যমের স্কুল। মূলত কাছেপিঠের বাচ্চারাই পড়তে আসে। অনেকেই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। প্রধানশিক্ষিকা সহ বাকিরা শহর থেকে আসেন। তাঁরা নিজস্ব উচ্চারণ নিয়েই মোটামুটি কলকাতা-কেন্দ্রিক যে বাংলা, বা তাঁদের পাঠদানের বিষয়বস্তু যে ধরনের বাংলায় লেখা, তেমনভাবে আমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। কিন্তু তাদের শিক্ষার্থীদের মুখের ভাষার সাথে পাঠ্যবইয়ের ভাষার বিস্তর ফারাক। ম্যাডাম বলছিলেন বইয়ের ভাষার জগতের সঙ্গে তাদের সংযোগ তৈরিতে কতখানি অসুবিধা হয়। অধিকাংশই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া হওয়ায় বাড়িতেও কোন বাড়তি সুযোগ-সুবিধা তারা পায় না। স্কুলের শেখানো পড়াশোনা বাড়িতে গিয়ে ঝালিয়ে নেওয়ার ব্যাপার নেই। যা শিখবে স্কুলেই। তারপর মুখের ভাষার সঙ্গে পাঠ্যের দূরত্ব। যে লোককথার গল্প বা নিজেদের ইতিহাসের কথা তারা বাড়িতে দাদু-ঠাকুমার কাছে শোনে, পাঠ্যের জগতে সেসব আর খুঁজে পায় না।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২১)

ক্রমে দেখি গুটিগুটি বেশ কিছু বাচ্চা আসছে মায়েদের বা দাদু-ঠাকুমার হাত ধরে। টিফিনের ঘণ্টা পড়বে। এই স্কুলটির সীমানা পাঁচিল ছিল। তা সত্ত্বেও দেখি যে গলায় ঘণ্টা বাঁধা দু’টি আদুরে ছাগল চড়ছে। জিজ্ঞেস করে জানি এক পড়ুয়ার পোষা ছাগল। সেও রোজ সঙ্গে সঙ্গে স্কুলে বেড়াতে আসে।

একেকদিন সকাল সকাল চলে যাই দূরতম প্রান্তের অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্রে। সেসব জায়গা বড় মনোরম। গুটগুটে বাচ্চারা আসে, খেলা আর খেলতে খেলতে পড়া শেখে। তার সঙ্গে কিছু খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত। গর্ভবতী মা এবং বয়ঃসন্ধির কিশোরীরাও আসে। সিংহভাগ ক্ষেত্রেই অঙ্গনওয়াড়ি দিদিমণিদের আন্তরিকতা থাকে কাজের প্রতি। কোথাও কোথাও গোলযোগ ঘটে। অপুষ্ট বাচ্চার সংখ্যা কোনও কারণে বেড়ে গেলে তা খুবই চিন্তার কারণ হয়ে যায়। নানাভাবে সেই গ্রাফ কমানোর চেষ্টা করা হয়। সেইসব বাচ্চাদের আলাদাভাবে পুষ্টিকর খাবারদাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অনেক সময়েই, একাধিক বাচ্চা থাকলে মা সেইসব খাবারদাবার তাদের মধ্যে ভাগ করে দেন। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, বলে-কয়ে কোনও কাজ হয় না। একবার তাই থানা থেকে এলাকাভিত্তিক ভলান্টিয়ার দিয়ে তাদের সঙ্গে গ্রামপঞ্চায়েতের স্টাফদের ট্যাগ করে দেওয়া হয়েছিল বাড়ি বাড়ি ঘুরে মনিটরিং করার জন্য। যাতে অপুষ্ট বাচ্চাটাকেই শুধু খাওয়ানো হয়। এ ব্যবস্থা নিতে খারাপ লাগত, কিন্তু আর কি বা করা যেত? অপুষ্টির মাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পুষ্টি পুনর্বাসন কেন্দ্রে বাচ্চা-সহ মা ভর্তি থাকার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মায়েরা সংসার ছেড়ে সেখানে ভর্তি হতে রাজি হন না। বেড ফাঁকাই যায়।

আরও পড়ুন: বাঁকুড়ার লোকদেবতা লোকেশ্বর

পাহাড়ের উপরের দিকে একটা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে একবার গিয়ে দেখি বাচ্চাদের দোলনা খুলে ঘরের মধ্যে রাখা। পরিদর্শনের সময়ে এলাকার লোকেরা সবসময়েই চলে আসেন। অভাব-অভিযোগ বলতে থাকেন। সেটা সেন্টার কেন্দ্রিকভাবে শুরু হয়ে নানাদিকে যায়। তারা এসে বলেন চুরি হওয়ার ভয়ে দোলনা খুলে রাখা। এখানে এসেই দেখা হয় যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে। দশম শ্রেণির এই প্রাণবন্ত ছেলেটি আমাদের ঘোরায় পাহাড়ের আনাচে-কানাচে, একদা নিষিদ্ধ সব জায়গায়। টায়ার সোলের চপ্পল পায়ে নিঃশব্দ পদক্ষেপে পাহাড় ডিঙিয়ে চলা যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে আমরা কি আর তাল রাখতে পারি!

আমরা তো সামলাতে পারি না অনেক আবেগের বহিঃপ্রকাশও। একদিন একটি ছেলে হন্তদন্ত হয়ে অফিসে ঢুকতে চায়। সেদিন আসন্ন পুলিশ কনস্টেবল পরীক্ষার ‘মাঠ’ অর্থাৎ ফিটনেস টেস্টের আগে রেসিডেন্ট সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য খুব ভিড় ছিল অফিসে। ক্রমাগত সার্টিফিকেট দিয়ে যেতে হচ্ছে। ছেলেটিকে বোধহয় কেউ বলেছিল একটু অপেক্ষা করতে। সে চেঁচামেচি জুড়ে দেওয়ায় ভিতরে ডেকে পাঠাই। ভিতরে আসে। চোখেমুখে ফেটে পড়ছে সীমাহীন উদ্বেগ আর আকুতি। গড়গড়িয়ে একটি মেয়ের ঠিকানা সাকিন চোদ্দপুরুষের ঠিকুজি-সহ যা বলল, বুঝলাম একটি নাবালিকার বিয়ে হতে চলেছে সেইদিনই। পরিবারটি খুবই ধনী আর রক্ষণশীল। আমি তখনও ভাবছি এ বাছার এত উদ্বেগ কেন! জিজ্ঞেস করি, তোমার কে হয়?

আরও পড়ুন: দু’টি কবিতা

এবার সে হুঁশে ফিরল। লালচে হয়ে বলল— ‘আমার লাভ?’

আর আমার তখনই মনে পড়তে হল মারাঠা মন্দিরে বছরের পর বছর ডিডিএলজি চলছে!

যা মনে হল, এলাকায় যদি মেয়েটা থাকে বিয়ে তো আটকাব কিন্তু এ বেচারার কোনও সুবিধাই করতে পারব না।

আরেকটি মেয়ে ভোরের আলোর মতো এসে পড়েছিল ব্লক অফিসে। নিজের বিয়ের দিন বাড়ি থেকে পালিয়ে আমাদের কাছে এসেছিল বিয়ে আটকাতে। তার তেজ, জোরই আলাদা। তার বিয়ে আটকানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিবারটিরও বেশ কিছুদিন কাউন্সেলিং করা হয়েছিল। মেয়ে আর তার বাবা পড়াশোনা-সহ নানা প্রয়োজনে মাঝেমাঝে ব্লক অফিসে আসত। আমার আলাদা করে কড়া নজর থাকত তার দিকে। কিন্তু আমাকে হতাশ করে দিনে দিনে সে সাজুনি হয়ে উঠছিল। পড়াশোনা করত, তবে ততটা মনোযোগ দিয়ে নয়। প্রশাসন বাহ্যিক সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু নিজের লেখাপড়া, নিজের কাজ তো নিজেকেই গুছিয়ে করতে হয়…

আরও পড়ুন: হতভাগ্য স্বামীর বিলাপ

আজ লিখতে গিয়ে কত মুখ এসে ভিড় করছে মনে। একেকটা মুখের পিছনে একেক রকম গল্প। এখনও অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে সেই তরুণী বিধবাটির মুখ মনে পড়লে যার একটি শিশুপুত্র শারীরিক প্রতিবন্ধী আর কোলের ছেলেটি জন্মান্ধ। নিজের বিধবাভাতা আর বড় ছেলেটির প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য। সে ব্যবস্থা হয়েছিল কিন্তু তার এই অতলান্ত দুঃখের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা মুখটিকে আমি ভয় করতাম। মানুষের অসীম অনিশ্চিত জীবনের কথা ভেবে শিরদাঁড়া বেয়ে ভয় নামত; আজও সেই অনুভূতি ফিরে আসছে। এই কোনও বিপর্যয়ের জন্য সে দায়ী নয় অথচ তার জীবনে এ সবই অনতিক্রম্য। অথচ সে কথা বলত মুখে হাসি রেখে। সেই হাসির পিছনে এক অপরিসীম লড়াকু ধৈর্যপ্রতিমা। বিরহ, দহন, মৃত্যু, দুঃখ পেরিয়ে যিনি নিয়ত জীবনের উদ্‌যাপন করেন সেই একক মায়ের জীবনযুদ্ধের প্রতি আমি একটি আভূমি প্রণাম রেখে যাই…

ক্রমশ…

এই ধারাবাহিকের বাকি পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তুৎ পাখি উড়া দিলে…
পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম
বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে
সূর্যাস্তের দেশে
মাটি-জল-মুক্তামাছ
এই ঘর, এই উপশম
সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর
স্বাধীনতার সূর্যদের লড়াইধন্য সেইসব পবিত্র ভূমি
মানভূমের মনসা পরব
পূর্বমেঘের শস্যবাসনা
প্রজনন মায়া লাগে শস্যচরাচরে
দিনরাত্রির কাব্য
যা দেখি, যা শুনি, যা লিখি
বিবিধ পরব, বহু-মানভূম

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *