দেবতার জন্ম

পৌষালী চক্রবর্তী

তখন একটি গ্রাম পঞ্চায়েতের পরিকল্পনা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে উঠছিলাম। অর্থ কমিশনের বাজেটের নিরিখে সব গ্রাম পঞ্চায়েতের থেকে প্ল্যান তৈরি করে ব্লকে পাঠিয়েছে; সেগুলি চেক করে নিয়ে আমাদের অনুমোদনের জন্য জেলায় পাঠাতে হবে। সিংহভাগই গতানুগতিক কাজের ক্ষেত্র ধরেছে। হয়তো মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে এগুলোই বেশি কাজে লাগে। চোখ বোলাতে বোলাতে হঠাৎই নজরে পড়ল একটি পঞ্চায়েতের স্কিমের নাম ‘আর্কিওলজি মাথার শেড’। তো সেই নামের পিছনের ধাওয়া করে পৌঁছানো গেল অতীতের জানালার ধারে। জানালা কী সব সময় পিছনের দিকে টানে? স্মৃতির পরিধিতে যার তিলমাত্র গতায়াত ছিল না, সেই অজায়ত অন্ধকারের দিকে আলো ফেলে একটি খোলা জানালা? ইনি এখন বুরু ঠাকুর। পূজিত হন স্থানীয় ভূমিজ সম্প্রদায়ের পুরোহিত ‘লায়া’ দ্বারা। প্রতি বছর ২রা মাঘ তাঁকে ঘিরে আয়োজন হয় টুসু মেলার। মেলায় মোরগ লড়াই আর ছৌ নাচের আসর বসে। খাবার দাবার মণিহারীর দোকান বসে। হয় চৌডলের প্রতিযোগিতা। বুরু ঠাকুর নৈবেদ্য পান বাতাসা, মিষ্টি, চিঁড়েগুড়। মোরগ, পায়রা বলি হয়। পুজোর দিন তাঁকে গোবর মাখিয়ে স্নান করিয়ে ঘি মাখিয়ে ঔজ্জ্বল্য ফেরানোর চেষ্টা করা হয়।

আরও পড়ুন: উৎসবের মরশুমে শুশুনিয়া পাহাড়

কালভৈরব, পাকবিড়রা, ছবি অন্তর্জাল

বলি এবং শীতল নৈবেদ্য দিয়ে পুজো পাওয়া এই বুরু ঠাকুর কে? কৃষ্ণ গ্রানাইট শিলায় নির্মিত এই মূর্তি কার? তাঁর খোঁজে শাসনডি গ্রামে গিয়ে দেখি ধানক্ষেতের ধারে গাছের নীচে এক উঁইঢিপির উপর হেলানো অবস্থায় তিনি দণ্ডায়মান। মূর্তির পাদভাগে ‘বৃষ’ লাঞ্ছনচিহ্ন খোদিত। তাই দেখে বিশেষজ্ঞদের অনুমান এটি কায়োৎসর্গ মুদ্রায় দণ্ডায়মান জৈন তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের মূর্তি। কিন্তু বর্তমানে তাঁর জৈনত্ব লুপ্ত হওয়ায় তিনি নতুন দেবজন্ম পেয়েছেন লৌকিক বুরু ঠাকুর রূপে। তীব্রভাবে অহিংসা পালনকারী ধর্মমতের প্রবক্তা তীর্থঙ্করের পরিবর্তিত রূপ পুজো পান বলি চড়িয়ে। কী আশ্চর্য এই দৈবজন্ম! বুরু ঠাকুর কি ‘বলদে চড়িয়া শিবে’র মতো গ্রাম্য প্রত্নরূপের ধারণা? কে জানে? আরও শুনি বুরু ঠাকুর একবার রাতের অন্ধকারে নিজের চুরি হয়ে যাওয়া ঠেকিয়েছিলেন। পড়শি রাজ্য থেকে চোরাচালানকারীরা একবার এই মূর্তি উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। দেবতা লায়াকে স্বপ্নাদেশ দিলে তিনি গ্রামবাসীদের নিয়ে এই চুরি ঠেকান। কিন্তু চোরেরা মূর্তি ফেলে পালানোর সময় সেটি ভালোরকম ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুখ, নাক, ডানহাতে চিড় ধরে।

এইসব অঞ্চলে কোথাও গেলে, দু-দণ্ড দাঁড়ালে, আস্তে আস্তে আশপাশের লোকেরা ভিড় করে আসেন। নানারকম কথাবার্তা হয়, কোনও প্রকল্প নিয়ে অভাব-অভিযোগ থাকলে জানান। বুরু ঠাকুরের থানে আসা এরকম মানুষজনকে জিজ্ঞেস করি, তাঁরা এই মূর্তি মিউজিয়ামে দিতে চান কিনা! সমবেত সকলেই বলেন মূর্তি এখান থেকে কোনওরকম নড়াচড়া হলেই তাদের অমঙ্গল হবে। বরং এখানেই কিছু একটা করে দেওয়া হোক। তাদের পঞ্চায়েতের পরিকল্পনার কথা বলি। খবর পাই মুখ ঢেকে থাকা আরও এক প্রত্নস্থলের।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (অংশ ২২)

তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের মূর্তি, শাসনডি, বলরামপুর, পুরুলিয়া

কানা ও রামকোচা পাহাড়ের ঢালে একটি ছোট্ট গ্রাম সিরগী। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সরু জলদাগের শিরিঙ্গী নদী। সেই গ্রামে এক পলাশ গাছের নীচে অনাদরে পড়ে রয়েছে কয়েকটি প্রত্নবস্তু। তারা বর্ষার জলে ভেজে, রোদে পোড়ে, হেমন্তের প্রথম শিশির তাদের আলতো ছুঁয়ে যায়, মাঘের কুয়াশা তাদের ঢেকে নেয়। কত জন্ম মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে তারা পড়ে থাকে পলাশ গাছের তলায়। কেউ বলতে পারে না কবে থেকে তারা এখানে পড়ে আছে। বসন্ত প্রকৃতি টুপটাপ পলাশ ঝরিয়ে তাদের সাময়িক অর্ঘ্য দেয়। একটি চৌমুখা, একটি জৈন বৃষ, একটি জৈন পট্ট। চৌমুখাটি নাকি কোনও রেখ দেউলের ভগ্ন চূড়ার অংশ। কে ছিল এখানে? কবে ছিল? কে আসত সেই মন্দিরে? কেমন ছিল সেই অতীতের জনপদ এখন যে এলাকাকে মনে হয় প্রান্তস্য প্রান্ত এক গ্রাম। সেই উত্তর ইতিহাস, লোককথা লিখে রাখেনি। জৈনপট্টটিতে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তীর্থঙ্করের মূর্তি খোদিত। এমন পট্ট পরে দেখেছিলাম পুঞ্চার পাকবিড়ড়ায়। আর যে বৃষমূর্তি, রাখাল বালকেরা নিত্যদিন তাকে যাওয়া আসার পথে আঘাত করে করে মুখ ভোঁতা করে দিয়েছে। জানান গ্রামবাসীরা। এই সব প্রত্নবস্তুগুলোকে লোপাট করার চেষ্টা হয়েছিল। গ্রামবাসীদের তৎপরতায় তা রোধ করা যায়। তাদের কাছে জানতে পারি অনেককাল আগে শিরিঙ্গী নদীর শ্মশানের ধারে এক জৈনমূর্তি ছিল, বর্তমানে যার কথা কেউই জানে না।

আরও পড়ুন: বাঁকুড়ার লোকদেবতা লোকেশ্বর

জৈনমূর্তি, বাঁশগড়

আরেক নিদর্শন ছিল বাঁশগড়ে। বরাভূম রাজবংশের প্রাচীন রাজধানী বাঁশ দিয়ে নির্মিত গড়ের বাঁশগড়। সেখানে জনৈক বাসিন্দার বাড়ির পিছনে নিমগাছের পিছনে রয়েছে প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের এক মূর্তি। কায়োৎসর্গে দণ্ডায়মান। বেশ অনেক বছর আগে যুগ্ম মূর্তি ছিল। একটির আজ আর হদিশ নেই। তবে এই মূর্তি তখনও পূজিত হতেন না।

লেখায় নিহিত শস্যবীজ প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে পারে মূক অতীতে? চেষ্টা করে দেখি। যোগাযোগ করা গেছিল রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে। তারা জানান এই মুহূর্তে এই অঞ্চলে প্রত্নখননের পরিকল্পনা তাদের নেই আর এই কটি প্রত্নবস্তুর জন্য মিউজিয়াম গড়ে তোলা সম্ভব নয়। পুরুলিয়ার পশ্চিম ভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বেশ কিছুদিন আগে তারা সমীক্ষা করেছেন। মূর্তি পুজো পাক বা না পাক, যেখানে রয়েছে সেখান থেকে তাদের সরিয়ে অন্য কোনও মিউজিয়ামে সংরক্ষণের জন্য পাঠাতে এলাকাবাসীর ঘোর আপত্তি। এই সব প্রাচীন মূর্তির সঙ্গে তাদের শুভাশুভ বোধ এবং গরিমা জড়িয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন: রাঢ়ের আর্যায়ণ প্রক্রিয়া

জৈনপট্ট, বৃষমূর্তি, চৌমুখা- শিরিঙ্গী, বলরামপুর, পুরুলিয়া

ছোলামাত্র ফেলে রেখে উড়ে যায় সবুজ টিয়া রামকোচা পাহাড়ের দিকে। আর এক অপারগতার পাপ আমার গায়েও এসে লাগে। দৈনন্দিন বর্তমানের চাপে হারিয়ে যায় অতীত। কোনও এক অবসন্ন বিকেলে ভাবি বরাভূমের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাশে পাশে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ব্যবহৃত হাতিয়ার প্রাপ্তির কথা। শুনেছিলাম চাউনিয়া জঙ্গলে নাকি পাওয়া গেছিল নিওলিথিক যুগে তৈরি মাংস কাটার অস্ত্র। কোনও এক জামরঙা বিকেলের মুখে নিশ্চয়ই তার সঙ্গে আমার দেখা হবে। ব্লক অফিস ঢোকার আগে এক বটগাছের তলায় আছে তো মেগালিথিক সভ্যতার নিদর্শন। কত কিছুর সাক্ষী এই আম্রুহাঁসা নদী, তা আজ আর কেই বা জানে!

আরও পড়ুন: জেলার নাম বাঁকুড়া

দেউলঘাটা, আড়ষা- চিত্রঋণ ট্যুরিজম বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার

এখানে পথে প্রান্তরে ইতিহাস, পুরাকথা। জৈনযুগের কত নিদর্শন যে অবলুপ্ত হয়ে গেছে। কী বিস্ময় জেগেছিল পাকবিড়রায় গিয়ে। বেগলার যেখানে নাকি একুশটি দেউল দেখেছিলেন তার একটিও আজ আর অবশিষ্ট নেই। যে তিনটি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে তা হাল আমলের অদক্ষ পুনর্নির্মাণ। এখানে পুরাকীর্তি সংরক্ষণশালায় অনেক নিদর্শন রয়েছে। চিত্তাকর্ষক হল কালভৈরবের উপাসনা। এখানকার সর্ববৃহৎ, সাতফুট উচ্চতা বিশিষ্ট জৈন তীর্থঙ্কর (সম্ভবত) শীতলনাথের মূর্তিটি এখন কালভৈরব শিবরূপে পূজিত হন। রোহিন দিনে এখানে মেলা বসে। তেমনই তেলকূপি, দেউলঘাটা কত নিদর্শন নিয়ে আছে। পুরাকালের তামাখুন তাম্রখনি, তৈলকম্প বন্দর কেন্দ্রিক জৈন শ্রাবক বা সরাক গোষ্ঠীর বাণিজ্য বসতে এতদাঞ্চলে জৈন ধর্ম, জৈন স্থাপত্যের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তারও বহুপূর্বে মহাবীর পরিব্রজনকালে রাঢ়দেশ, বজ্জভূমি গিয়েছিলেন, যেসব স্থানকে অনেকেই রাঢ়ের সঙ্গে একদেহে লীন বলে মনে করেন। খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ ছয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় ৭ম শতক পর্যন্ত মানভূমে সরাকদের প্রাধান্য ছিল। ই টি ডাল্টন সরাকদের আদি আর্য বলে শনাক্ত করেছেন। অনেকের মতে, জৈনসূত্রে রাঢ়দেশে আর্যায়নের সূত্রপাত। বর্তমান সরাকদের ব্যবহারিক আচার বিশ্বাস অনেকাংশেই মানভূমের লোকজীবনের সঙ্গে সংশ্লেষ বিশ্লেষে আত্তীকৃত হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: পুরুলিয়ার তেলকুপিতে জলের নীচে ইতিহাস

পাকবিড়রার দেউল – চিত্রঋণ অন্তর্জাল

শরতের রোদপাহারায় বসে বসে ভাবি মানভূমের পার্বত্যদেশেও উমা আসেন। তবে তা সমতলের মতো আড়ম্বর-আয়োজনের মধ্য দিয়ে নয়। প্রকৃতির অপার প্রাচুর্যের মধ্যে তিনি আসেন আন্তরিক আটপৌরে ভাবে। বহুদূরে-দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একেকটি আয়োজন। মানভূমের তথাকথিত বড় পুজো কোনওবারই দেখতে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। দেখেছি আয়তনে ছোট পুজো, পাহাড়কোলে মহাদেববেড়ার পুজো, কাশীপুর রাজবাড়ির পুজো। তবে এই শারদোৎসবও অনেকের কাছে শোক পালনের কাল। আর আছেন হুদুড় দুর্গা। সেইসব অপ্রচলিত আখ্যানের দিকে চোখ, কান সজাগ রেখে আপাতত উড়া দিক তুৎপাখি…

ক্রমশ…

এই ধারাবাহিকের বাকি পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তুৎ পাখি উড়া দিলে…
পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম
বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে
সূর্যাস্তের দেশে
মাটি-জল-মুক্তামাছ
এই ঘর, এই উপশম
সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর
স্বাধীনতার সূর্যদের লড়াইধন্য সেইসব পবিত্র ভূমি
মানভূমের মনসা পরব
পূর্বমেঘের শস্যবাসনা
প্রজনন মায়া লাগে শস্যচরাচরে
দিনরাত্রির কাব্য
যা দেখি, যা শুনি, যা লিখি
বিবিধ পরব, বহু-মানভূম
ছোট ছোট দুঃখকথা

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *