বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

পৌষালী চক্রবর্তী

“আলে দ-লে বিরহড় হে-কে

সাকাম কুঁবা অড়াঃ তালে

বির হাঁসের জম্ তে-লে, তাঁহে কি-না লে।

বুরু নাড়ি রাপাঃ এনা

বিরহড় হঁ বন চাবাঃ কানা,

বিরবুরু তাঁহেরেদ হড় মেনাঃ বনা।”

বাংলায় যার অর্থ  হল: আমরা সবাই বিরহড় জাতি/ পাতার কুঁবা ঘরে থাকি/ বনের আলু খাই মোরা এভাবে দিন কাটাই/ বন-পাহাড় শেষের মুখে/ আমরা সব ধ্বংসের পথে/ বন পাহাড় আছে / তাই মানুষ বেঁচে আছে।

এ যেন আবহমান কালের মানুষের অনিকেত বেদনার গান। হ্যাঁ। এই গান বিরহড় মানুষদের পরাণকথা। ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী বিভিন্ন জনজাতির মধ্যে, প্রায় পঁচাত্তরটি জনগোষ্ঠী আদিম অধিবাসী (Primitive Tribe Group, PTG) তালিকাভুক্ত। পশ্চিমবঙ্গে তাঁরা হলেন বিরহড়, টোটো, লোধা শবর জনগোষ্ঠী। বিরহড়রা থাকেন মূলত পুরুলিয়া জেলার বলরামপুর ব্লকের বেড়শাতে ১০টি পরিবার, বাঘমুন্ডি ব্লকের ভূপতিপল্লীতে ৬২টি, বাড়েরিয়া গ্রামে ১৯টি, ঝালদা ১নং ব্লকের  মাতকমডি টোলায় ৫টি, বান্দোয়ানের কচাহাতুতে ৮টি বিরহড় পরিবারের বাস (২০১৮ সালের পরিসংখ্যান)। জনসংখ্যাই বলে দিচ্ছে, তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সংখ্যালঘু জনজাতি। এই জনজাতির দু’টি উপবিভাগ রয়েছে উথশ্ব (যারা পুরোপুরি যাযাবর) এবং ড্যামি (স্থায়ী ভাবে বসবাসকারী)। পুরুলিয়ার বিরহড়রা দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত।

আরও পড়ুন: তুৎ পাখি উড়া দিলে…

সাঁওতালি ও মুন্ডারিতে ‘বির’ শব্দের অর্থ বন, ‘হড়’ শব্দের অর্থ ‘মানুষ’। তাঁরা অরণ্য সভ্যতার প্রতিনিধি। উপরের গানটিতে অরণ্য পাহাড়ের জন্য তাঁদের মর্মবেদনা যেন ডহরিয়া বাতাসে কেঁদে ফেরে। আর কী বলে? মূলত লিপিবদ্ধ পরিবেশবিদ্যার মুখে সপাটে জবাব দিয়ে বলে সচেতনতা, জৈববৈচিত্র্য রক্ষার গোড়ার কথা— বন পাহাড় আছে বলে মানুষ টিকে আছে।

তাঁরা লিপি বর্জিত কথ্য দুনিয়ার বাসিন্দা। অতি কষ্টে বাঁচিয়ে রাখছেন এই মৌখিক সংস্কৃতি। মূলত মুন্ডারি( নৃতত্ত্ববিদ নির্মল কুমার বসুর মতে, সাঁওতালির সঙ্গে মিল অনেক বেশি) পরিবারভুক্ত এই  ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত অরণ্য-নির্ভর এই  মানুষরা আজকের দিনে বিজ্ঞান প্রযুক্তিকেন্দ্রিক সভ্যতার সংমিশ্রণে হারাচ্ছেন নিজস্ব বাক্।

বিরহড়দের মধ্যে রয়েছে সৃষ্টি, বংশবিস্তার এবং প্রব্রজনের বিভিন্ন পুরাকথা যা তাঁরা মূলত ছড়ায়, গানে বেঁধে রেখেছেন। মিথ-অতিরিক্ত নির্মম বাস্তবতার কিছু স্থানান্তর কাহিনি আছে, যা প্রাণে বাজতে বাধ্য।

যেমন,

“বিরহড় হি হি ড়ি,পি পি ড়ি, রিবুন জানাম কিনা

হারাগ বুরু রিবু হারা কিনা

সাসাং বেডারে আবু দ বুন জাতি পারিস কিনা

লাহারেমা নাম কি না অগম দ রয়া জালাপুরী

পয়রানি সাকাম চেতান তিবু পায়রা ও পারম কিনা”

—“হিহিড়ি পিপিড়ি-তে জন্ম আমাদের আর হারাতা পাহাড়ে বংশবিস্তার। সাসাং বেড়া নামক জায়গায় আমাদের জাতি পারিস বিভাজন। আসার সময় আমাদের সামনে ছিল এক বিরাট গভীর সমুদ্র। পদ্মপাতার উপর সাঁতার কেটে আমরা ওই সমুদ্র পেরিয়েছিলাম।”

আরও পড়ুন: পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম

এই পুরাকথার বিপ্রতীপে আছে অভাব কিভাবে তাঁদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে সেই কথা। বনের ফলমূল শিকার না পেয়ে তাঁরা অনাহারে থেকেছেন, কখনও খাবারের সন্ধানে চলে গেছেন অন্যত্র…

“সেদায়দ রেঁগেচ্ তে-বুরুলাঙ সেনঃআ

কান্টে আড়াঃক আগুয়ালাঙ।

রেঁগেচ্ তে হপনদ, চেঁহের চেঁহের দুক, ইয়াম্ কানা।

দাঃ তেতাংতে মাড়ি জ্বালাতে

এটাঃ ডেরাতে হপন ইয়ামায়।”

—”আগে আমরা খিদের জ্বালায় শাকপাতা তুলতে বনে যেতাম। খিদের জ্বালায় ছেলেরা কাঁদত।জলের কষ্টে, মাড়ের সন্ধানে আমরা অন্যত্র চলে গেলাম।”

 কখনও অভাবের তাড়নায় ভুল করে বিষাক্ত শাক পাতা খেয়ে কেউ কেউ মারাও যেতেন…

“কানিয়ার আড়াঃ মেনতে -গলগলি আড়াঃগিঞ তিকি লাঃ আ।

আলে বাবু আপুতে চাখা লাঃ আ।

পাহিল সিঙ্গাড় রেগেয় টিটিড় বা এন।”

“কুঁড়াল শাক ভেবে গলগলি রাঁধলাম

বাবুর বাবা চেখে দেখল

প্রথম সন্ধ্যায় মারা গেল।”

সাধারণত তাঁদের স্থায়ী জীবিকা আগে কিছু ছিল না। বনজ সম্পদ যেমন কাঠ, পাতা, লতা গুল্ম সংগ্রহ ও বিক্রি করা, বিভিন্ন ওষধি বিক্রি করে তাঁদের দিন চলে। চিহড়লতার দড়ি নির্মাণে তাঁরা বিশেষ পারদর্শী, যার বেশ চাহিদা আছে। ঠিক আগের গানটিকে আমরা এই প্রেক্ষিতে দেখতে পারি। তাঁরা ওষধি-লতা-গুল্ম সম্যক চেনেন। তবুও খিদের এমন তাড়না, বিভ্রমে বিষাক্ত শাক তুলে আনেন। সে ঘটনা ধরা থাকে তাদের গানে, বয়ে চলে।

আরও পড়ুন: সেইসব স্মৃতিধর

তাদের গানে ফিরে ফিরে আসে বনের পশু, গাছ, লতা গুল্ম, সুগন্ধী ফুল যাদের সহোদরা সম, সেই প্রকৃতিতে লগ্ন তাদের হৃদয়। শিশির বিন্দু, ঝরনার প্রতি তাঁদের অপার মায়া। আছে বৈশাখী পূর্ণিমায় অযোধ্যা পাহাড়ে শিকারে যাওয়ার কথা— “দু সি দাদা সেঁদরা বইসাখ কুনৌমিরে”

তারা বন্য বরাহ, হরিণ, শূকর, খরগোশ, মুরগি প্রভৃতি শিকার করে ফেরার পথে বোনদের খোঁপায় লাগানোর জন্য  যেন ধোপা ধোপা চন্দন -চম্পা ফুল নিয়ে আসেন…

“আগু তরায় মি সি ভাই চান্দান বাহা দ

আগু তরায় মি সি দাদা চাম্পা বাহাদ।

বাহায়িঞ বাহা য়া লদব চান্দান চাম্পাদ।”

তাঁদের বিশ্বাসে, বছর শেষ হয় মাঘ মাসে। এ সময়ে তাঁদের দেবতা কুকুবুরু,  মাঠাবুরু, লুগুবুরু, পরেশনাথ, চেতান লাহার প্রমুখের উদ্দেশ্যে পূজা নিবেদন করে তাঁদের নায়া হাড়াম (পুরোহিত) সকলের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা  মন্ত্রোচ্চারণ করেন…

“…রগ দুখ আল হুয়ুঃ কা

 আতু টলা বুগিনগে তাঁহেঃ কা”

বিরহড়দের মধ্যে স্ত্রী দেবতার প্রাধান্য দেখা যায়— ধর্মস্থানের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থানে দেবী থাকেন, যাঁর পাশে তেল সিঁদুর মাখানো এক সাদা পাথর থাকে বুড়িয়া মাঈ, তিনি মহামায়ার কন্যা এবং দেবীর নাতনি। তিরের আকৃতির মস্তিষ্ক বিশিষ্ট দুধামাঈ হলেন বুড়িয়া মাঈয়ের কন্যা। তাঁরা পাহাড়-নদী-সূর্য পূজক। তাঁদের জঙ্গলের দেবতা বানহি; পৃথিবী রক্ষাকারী দেবতা লুগুবুরু এবং লুগুবুড়ি। কার্তিকে তাঁদের সহরায়, মাঘের প্রথমে মাঘি উৎসব, বসন্তে বাহা বঙ্গা পালিত হয়।

এই গোষ্ঠীতে শিশুর জন্মের পর ৭ দিন ধরে অশৌচ চলে, তারপর পরিশুদ্ধ হওয়ার অনুষ্ঠান ‘থাতি’, যার ১৪ দিন পরে আসল পরিশুদ্ধ হওয়ার উৎসব ‘ছোটথাতি’; নবজাতকের নামকরণ উৎসব ‘সাকি’।

আরও পড়ুন: আদিবাসীরা নাচবে না

বিরহড় সমাজে মূলত ১০ প্রকার বিবাহ রীতি প্রচলিত থাকলেও পছন্দ করে বিবাহ বা ‘সদর বাপলা’ বেশি প্রচলিত। বরকর্তাকেই কন্যাপণ দিতে হয়। বিয়ের সময় বর এলে বাইরে আমডাল পুঁতে বানানো হয় বরডেরা, সেখানে বরকর্তাদের রাখা হয়। বরপক্ষের আনা শাড়ি গয়নায় কনেকে সাজিয়ে বিবাহ রীতি, সিঁদুরদান হয়। কথিত আছে, আগে বর ও কনের কড়ে আঙুল কেটে সেই রক্ত পরস্পরের সিঁথি ও কপালে মাখিয়ে বিবাহ সম্পন্ন হত। তাঁদের মধ্যে বিয়ের গান প্রচলিত, যেগুলি মূলত দঙ সেরেঞ। চিহড়লতা তাঁদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ, তা যেমন দড়ি বোনার কাজে লাগে , তেমনই এই লতার ফুলের মালা বদল করে পরস্পর বিবাহের গান আছে।

কন্যার পিতৃগৃহ ছেড়ে পতিগৃহে যাওয়ার কথা, ধরা আছে অতি প্রাচীন এই বিবাহ গীতিগুলিতে…

“ঢাক সাডি ঢোল সাডি আমকু ইদিম্ কানা পালকি

রম ঝম।নুওয়া দিশম এতে লাতার দিশম।

রিডিং কাম বুড়ি অড়াঃ দুয়ের হাতু  দিসুম

এন্ডোমি বুড়ি আমাঃ অড়াঃ দুয়ার।

—“ঢাক বাজে ঢোল বাজে তোমায় নিয়ে পালকি চলে/ রম ঝম্ বাদ্য বাজে এদেশ থেকে ওদেশ ছোটে/ ভুলে যাও মা, এবার বাবা-মা এবং  সঙ্গী সাথী/ ভুলে যাও এই ঘর বাড়ি গ্রাম, হোথায় এখন তোমার বাড়ি…”

তাঁদের পুরাকথায় মিশে আছে রামায়ণের অনুষঙ্গ। কথিত আছে, রাবণ বানরসেনা ধরার জন্য বিরহড়দের কাজে লাগিয়েছিলেন, তাই হনুমানরা তাঁদের দেখলে জোর হাত করে। রাম লক্ষণ এর শিকারে যাওয়ার কথা আছে… “রাম লক্ষ্মণ সেঁদরা কিন অড়ং এন”। তাঁদের এক অংশের সিংহল থেকে অভিবাসন ঘটে ভারতের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায়, এই তাঁরা বিশ্বাস করেন।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৯ম অংশ)

বর্তমান সময়ে সরকারি উদ্যোগে বিরহড়দের পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসার চেষ্টা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁদের পাকা বাড়ি বানিয়ে দেওয়া, বিজলি বাতির সংযোগ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা সহ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। জীবনধারণের জন্য তাঁদের কিছু চাষের জমি দেওয়া, পশুপালনের জন্য শূকর, মুরগি, ছাগল প্রদান, ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে ফলের বাগান নির্মাণ, স্বনির্ভর দলের আওতাভুক্ত করে দড়ি নির্মাণের উন্নততর ট্রেনিং প্রদান ও অন্যান্য স্বনিযুক্তি প্রকল্পে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মোবাইল মোবাইল মেডিক্যাল ভ্যান এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ান্তরে তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে নিকটবর্তী প্রাইমারি স্কুলে শিশুদের ভর্তি করা সহ বেড়শা গ্রামের ৫ শিশুকে একলব্য মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পাঠানো হয়েছে। অন্যত্র কেউ কেউ মাধ্যমিক পাশ করেছেন।

সমসময়ের ছাপ পড়ে তাঁদের গানে, এখন যে বিপিএল কার্ডের সুবিধা পান সে কথা বলেন…

“পাহিল দ-লে নামঃ একিনা চাউলি দাইল/ হড় অড়াঃ নালহা তুমালে কামিতে/ নিমি দলে নাম কানা বিপিএল কাড়তে”।

এভাবেই সময় এগোতে থাকে, অরণ্য সভ্যতায় পড়ে গ্রামীণ সংস্কৃতি তথা নগরায়ণের ছাপ। হিহিড়ি পিপিড়ি থেকে অভিবাসনের পথে রওনা দিয়েছিল কোন এক নোয়ার নৌকা। আর অরণ্যের পশু পাখি শিশির লগ্ন থাকার গর্ব বুকে লালন করেন কোন এক দোবরু পান্না বিরবর্দী, তাঁর সঙ্গে বিস্ময়াবিষ্ট মন ভাসিয়ে বসে থাকে শহরাগত এক কৌতূহলী রুহ্…..

ক্রমশ…

তথ্যঋণ:
অথ বলরামপুর কড়চা, সম্পাদনা পৌষালী চক্রবর্তী;
বিরহড়দের গান সংগ্রহ ও অনুবাদ
ড. জলধর কর্মকার, শিবশঙ্কর সিং, কিছু অনুবাদে পরিবর্তন করেছেন বর্তমান লেখক।


প্রচ্ছদ: আল নোমান (বাংলাদেশ)

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • পার্থজিৎ চন্দ

    চমৎকার লেখা।।। পুরুলিয়া আমার প্রিয় ভূমি। খুব ভাল লাগছে এ লেখা পড়তে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *