সূর্যাস্তের দেশে

পৌষালী চক্রবর্তী

অফিসের ব্যস্ততার মধ্যে অধিকাংশ দিনই কখন সূর্যাস্ত হচ্ছে, কখনই বা জামের কষের মতো বিষণ্ণ রঙে আকাশ ছেয়ে সন্ধ্যা নামছে টাঁড়ভূমে, বহাল, কানালিতে তার হদিশ থাকে না। বেশ রাত করে অফিসঘর ছাড়ার সময় দেখি ক্যাম্পাসের পুলিশ ক্যাম্পের সামনের মাঠে ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে জোরদার ব্যাডমিন্টন খেলা চলছে। আলোক সন্ধানী পোকারা ঘিরে আছে উজ্জ্বল বৃত্ত। এই আলোর পোকাদের তাড়াতে কখনও কখনও তার পাশে গুঁজে রাখা হয় সবুজ গাছের ডাল। পতঙ্গ বৃত্ত তখন ক্ষণিকের আলপনা আঁকে সবুজে সবুজে; আমাদের মিথ্যে বেসাতির মতো। একেকদিন আবার কপাল ভালো। ফিল্ড ভিজিট ফেরত সন্ধ্যা নামি নামি করতে থাকলে দেখি কীভাবে ঘাটবেড়া কেরোয়ার পাহাড়ের ঢালে অস্ত যাচ্ছেন সিংবোঙ্গা। তার শেষ কিরণ লেগে উপত্যকার সবুজে তখন সোনা রঙের ছোঁয়া। আর অস্তগামী আলোকছটার বিপরীত ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা মহাবৃক্ষেরা তখন মসীকৃষ্ণ। ধানবনে আরেকরকম তারুণ্যের রং। এক সবুজের কত না বিস্তার! দূরে গজাবুরুর একলা চূড়াকে রেখে, আমরা তখন নেমে আসছি পাকদণ্ডী বেয়ে। শেষ আলোকবিন্দুর কাষায় বস্ত্রে সজ্জিত সে তখন এক সর্বত্যাগী উপাসক… আর সেই বস্ত্রজল নিঙড়ে নিঙড়ে কে যেন ফেলছে আম্রুহাঁসার বুকে…

আরও পড়ুন: বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

উপত্যকার পিচ কালো পথ বেয়ে তখন ঘরে ফিরছে একটি গোরুর গাড়ি, তাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল দুই সাইকেলবাহিনী। বোধহয় টিউশন ফেরত। পিচের গা বেয়ে ডাইনে বাঁয়ে নেমে গেছে ল্যাটেরাইটের পায়ে চলা পথ। পিচ আর রাঙা মাটির এই সংযোগস্থল বড় অদ্ভুত। কার অনন্ত প্রসারিত মিশকালো শাড়ির পাড়ে যেন ইতস্তত বসানো আছে বিবর্ণ গেরুয়া রঙের ফুলকারি কাজ। সাইকেল বালিকারা পাকারাস্তা ছেড়ে নেমে গেল রাঙামাটি পথে। ধীরে ধীরে তারা মিলিয়ে যাবে এই আসন্ন সন্ধ্যার ব্যাপ্ত প্রশান্তির মধ্যে, তাদের যাওয়ার দিকে অপলক স্নেহ ঝরিয়ে চলে অস্তগামী মেঘবাহিনীর হিরণ্যজল। আমরা পেরিয়ে আসি জন্মান্ধ বোষ্টমীর সমাধি। কতযুগ আগে সে যেন ছিল এই টাঁড়ভূমে। তার মাটির বাড়ির সামনে একচিলতে উঠোন ঘিরে ছিল ভ্যারেন্ডা গাছের বেড়া, সামনে ছোট্ট বাঁশকঞ্চির গেট, তাঁতের পাড় দিয়ে আটকানো। সে যেন দাওয়ায় পা ছড়িয়ে বসে আছে আর তার দৃষ্টি ছুঁয়ে ফেলছে ভূমিস্পর্শে থাকা বনময়ূর। দিনের গর্ভে কেকাধ্বনি খুলে রেখে এসে সে ঢুকছে সন্ধ্যার কুটিরে। বোষ্টমী হাতড়ে হাতড়ে জ্বালাবে তার টেমিলম্ফ। ঠিক সেই সময় চরাচরে বয়ে যাবে ডহরিয়া কান্নার বায়ু। কবে, এই সাধিকা জন্ম শুরু হওয়ার আগে বাচ্চা বিয়োনোর সময় পলাশ বনে তাকে ফেলে পালিয়েছিল তার পুরুষ। আর সেই মরা বাচ্চার একরত্তি হাঁয়ে অনর্গল ভরিয়ে দিচ্ছিল স্তন উপচে আসা দুধেরক্তে। কতদিন, কতদিন সেই শিশু আগলে পড়েছিল সে। তারপর একসময় তার হিমসাদা হাড়গোড় নিয়ে হাতড়ে হাতড়ে পুঁতে এসেছিল কাঁসাই এর সোনালি বালুর চরে। নিমাই সন্ন্যাস পালা লাগলে সেই হাড় তুলে এনে সে বানায় রঙিন ঘুরচরকি। রাতের আকাশে উড়িয়ে দেবে বলে। …এক ক্ষয়িষ্ণু, নির্জন সমাধি এই আমাকে কোথায় নিয়ে এলো? এই সমাধি মাটি, তার পাশে এই জৈড় (অশ্বত্থ) গাছের ডাল, চিলিচিলি পাতা ছুঁয়ে আসা প্রাচীন বাতাসে ভেসে আসা মা ডাক না শুনতে পারা অন্ধ বোষ্টুমীর কত যুগ আগেকার ব্যর্থ শ্রবণ আমাকে যন্ত্রণায় যন্ত্রণায় বধির করে দিল। বহুযুগের ওপারে দাঁড়ান আমার কানে যেন ঢুকছে না সঙ্গী কৃষি বিশারদের কথা। আমরা তো সমাধি মাটি লাগোয়া খাস জমি দেখে দাঁড়িয়েছিলাম, সেখানে মনরেগা থেকে মিশ্র প্রজাতির ফলের বাগান করব বলে। সে ভূমিতে আম, পেয়ারা, জামের বাগান করেছিলেন স্বনির্ভর দলের মেয়েরা। বৃক্ষপাট্টা নিয়ে ফলের অংশীদারিত্ব পেয়েছিলেন। আর এক মৃতবৎসা জননীর প্রাচীন হৃদয়ের আশীর্বাণী নিয়ে বৈরাগী বাতাস ধানমাঠ পেরিয়ে চলে গেছিল টুটিচাপা পাহাড়ের দিকে।

আরও পড়ুন: পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম

ঘোর ভাঙে মোবাইলের বিসদৃশ বেজে ওঠায়। পাহাড়পথে তখন একে একে জ্বলে উঠছে সৌর পথবাতি। তার আলোকবৃত্তের পাশে তাল তাল অন্ধকার বুকে বিঁধে দাঁড়িয়ে থাকে সময় দেবতা, তার মাথা বেষ্টন করে দিব্য বীভার মতো ফুটে উঠছে কৃষ্ণমহাকাশের শস্যসম্ভার আলোতারারাজি। জেলাশাসক বলেছিলেন প্রথম দিকে এলাকায় ঘোরার কথা… যাদের নিয়ে, যাদের জন্য কাজ করা, তাদের সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধির কথা। আর বলেছিলেন মূলত খাটুরে নারী পুরুষের প্রয়োজনের কথা বুঝতে হলে বিকেল সন্ধের মুখে তাদের কাছে গিয়ে কথা বলতে। সারাদিন বাইরে কাজের শেষে এসময় তারা বাড়িতে থাকেন একত্রে। সেসময় অনেককে একসঙ্গে পাওয়া যাবে। আমাদের সচেতনতার প্রচারমূলক বার্তা অনেক একান্ত পরিসরে দেওয়া যাবে, যা হয়তো দিনের অজস্র কলধ্বনির ভিড়ে মিশে গেছে। বসন্ত গ্রীষ্মের রাতে কুলিহ্ কুলিহতে লাগে ছো নাচ পালা। তখন প্রায় গ্রামজাগনের রাত। আমরা বিভিন্ন ঋতুতে সন্ধে রাতের দিকে পাহাড়-পাহাড়তলি-বাইদ-চ্যাটানে জনপদে ঘুরেছি। লোকশিল্পের বিভিন্ন আঙ্গিকে বিভিন্ন সচেতনতা মূলক প্রচারকাজ, পাড়াবৈঠক করা হয়েছে। কখনও তার অবলম্বন ছো, কখনও বা নাটুয়া, কখনও ঝুমৈর গান। যে জানালা খুলে যায় দলমা পাহাড়ের দিকে, সে বয়ে আনে রূপকথার সন্ধে। কোন প্রাণে ঝুমৈর বাঁধতেন শলাবৎ মাহাত, পুরুল্যা ছো এর চালে আসর মাতাতেন গম্ভীর সিং মুড়া— সেই উত্তরাধিকার নিয়ে যখন ঝুমৈর সুর নিয়ে ঊর্ধ্ব গগনে উঠে যায় গরাম থানের ধূপ, ঘুর দিয়ে শূন্য থেকে চপকা মেরে পড়ে ছো-এর উত্তরসাধক— সেই প্রত্যয়ী বিভঙ্গ সংগ্রামের সচেতন আখর এঁকে দেয় মানুষের চৈতন্যে। এই বিশ্বাস নিয়ে আমরা যত্নে মুছে দিয়ে আসি শিশুদের শ্লেট। নতুন পরাণকথা লেখার জন্য।

গ্রীষ্মরাতে অনেকেই দেখতাম মাটির বাড়ির বাইরে রাস্তায় শুয়ে আছেন। এক বৃদ্ধ মানুষকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সাপখোপের ভয় করে না! তার অনর্গল উত্তর— যে প্রাণ দিয়েছে সেই রাখবে, কী বলো! যেন জ্বর গায়ে কুশীনগরের পথে চলেছেন শাক্যমুনি। অনাদিকালের শিকার উৎসব ক্লান্ত অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায় তখন উঠেছে বুদ্ধপূর্ণিমার চাঁদ।

আরও পড়ুন: তুৎ পাখি উড়া দিলে…

ছবি: সংগৃহীত

একেকটা রোদ ঝলমল ব্যস্ততার দিন পার করে, আমরা ক্ষেতের আল ধরে রাতবিরেতে চলে যাই ডুংরির উপরে। শস্য চরাচরে লাগে প্রজনন মায়া। মারাংবুরু অন্তরলোক থেকে আশীর্বাদ পাঠান। আর নির্জন ডুংরির উপর শুয়ে শুয়ে আমরা দেখি রাতের আকাশজুড়ে বিস্তৃত ছায়াপথ ও নক্ষত্রবীথি আঁকছেন ভ্যান গঘ। সেইসব গ্রহতারারাজি থেকে অন্য অন্য প্রাণ যেন কৌতুহলী চেয়ে আছে এই স্তব্ধ জনপদের নৈশমগ্নতার দিকে। সিরগির শ্রাবকপট্টে মুখ ঢেকে আছেন পরিচয়লুপ্ত দেবী অম্বিকা। দামুদার বুক থেকে মাথা তোলা তেলকুপী মন্দিরের মাথায় বাসা করা ঢেঁকচিল তখন ঘুমিয়ে পড়েছে।

আমরা এগিয়ে চলি ঋতু বদলের পায়ে পায়ে। মেঘভাঙা বৃষ্টি শেষে বেরসা ঋতুর আকাশ জুড়ে ওঠে সরাবন পূর্ণিমার চাঁদ। যে জলভরা ধানমাঠ সকালে কোল দিয়েছিল পাহাড়ছায়াকে এখন সেখানে ভেসে চলেছে অজস্র চাঁদমালা। এমন রাতে মনসার চোখও সজল হয়ে ওঠে বেহুলার শোকে। কুড়মী বউ চাঁদের আলোয় চোখ জ্বালিয়ে খুঁজতে নামে খেতের পাশে হারিয়ে ফেলা তার বহু সাধের রুপোরং নাকফুল।

দিনের আকাশ আবার কানীর চোখের মতো নিরাময়বিহীন। ভাদুকে কাঁদিয়ে দিয়ে ভাদ্রজা রোদ ঘুরে যায় আশ্বিনের বিকেলে। কোজাগরী রাত্রির পরের দিন আমরা চলে যাই কেরোয়া পাহাড়ে। এখানে মনুষ্যবসতি নেই। পাহাড়কে তেরছা রেখে উঠেছে ঈষৎ তোবড়া চাঁদ। বনজ্যোৎস্নায় ছায়া পড়ে বিভ্রম হয়, কোন মনুষ্যদেহ অবয়ব নিয়েছে বৃক্ষরাজি ছেড়ে। সেই স্পর্শডালে ভয় জেগে ওঠে। তবু চন্দ্রাহত বসে থাকতে থাকতে মনে হয় এখানেই আমি কাটিয়েছিলাম গুহামানবীর জীবন আর আছাড়িপিছাড়ি ভালোবেসেছিলাম বাইসন শিকারির নাচ। সেই প্রত্নখত এখনও বুকে ধরে আছে ঘাটবেড়া পাহাড়ের ঢাল। সহস্রাব্দ নীচে থেকে সেই নিশানায় ডেকে এনেছেন জাহের আয়ো।

আরও পড়ুন: আদিবাসীরা নাচবে না

ছবি: সংগৃহীত

গৃহবাসী রাতগুলো চুপিচুপি নামে মাগুসরাইয়ের বুকে। নির্জন চ্যাটানে যেন রাতপতনের শব্দ পাওয়া যায়। গরাম দেবী তখন বেরোন এলাকা পর্যটনে। মানুষের সুখ দুঃখের উপর নিভৃতে বুলিয়ে যান অভয়মুদ্রা। হনুমাতা ড্যামের পাড়ে এক ক্ষয়া নৌকা বাঁধা থাকে। তার মাল্লা বহুকাল নিরুদ্দেশ। নৌকা সাক্ষী, নাবাল ভূমি ছেড়ে খাটিয়ার মানুষের টাঁড়ে বসত গড়ার। তার ফুটিফাটা খোলে কোন বেভুল বালিহাঁস উড়ে এলে বার্তা আসে, সহরায় আ গৈল। শরীরে শিরশিরানি ধরানো গোধূলি বাতাস বলে এবার সেজে উঠবে মাটির দেওয়াল-ল্যাপা গিরিমাটি দিয়ে। তার উপর লতাগাছ, মাছ, পাখি, সাপের টোটেম। দিনে দিনে আসা বাঁধনা পরবের গরৈয়া পিঠে গড়া জাগর রাত্রি জুড়ে ভেসে আসে অহিরার স্বর— দ্রিমিকি দ্রিমিকি বাজে ভূমিসূতা শস্যবাসনা। কিশোরীর চুলে গোঁজা বাঁশফুলে নেশা ধরে সদ্য যুবকের, তাকে ভুলিয়ে দেয় চুট্টার ঠেক। আমরা উঁদি পিঠে কিনে খাই। বাড়িতে নিয়ে আসি খাপরার পিঠে ছাঁচ, আলোর পুতুল। কোন হত-লক্ষ্মীশ্রী হাতের ঘাম, শ্রম লেগে আছে এই আলোর আধার মাটিপুতুলের গায়ে। সেই তনুমধ্যা আলোর নিশানা দেখে দেখে চন্দ্রহীন রাতে ঘরে আসবেন পদ্মালয়া। হিমের রাতে কুয়াশা পরত ঢেকে রাখবে মাথুর অভিলাষী ওই চাঁদের বুক। কুলিহ্, ডহরে অখণ্ড নৈঃশব্দ্য। শুধু শালবনে পাতা খসার শব্দসন্ত্রাস। তারপর জলে ভেসে যায় টুসুর চৌডোল। মেলা লাগে বাঁধপাড়ে, মকরবাহিনীর মন্দির সেজে ওঠে বচ্ছরকারের সাজে। বাতাসে ভেসে চলে টুসুগান। সেই সুর শুনে সেগুন কাঠের চেয়ার ছেড়ে সময়শকটে উঠে পড়ে এক পর্যটক রুহ্। সে দয়িতের হাত ধরে মেলায় মেলায় ঘুরে কাঁসাইয়ের মতো প্রবাহ দেবে এক লোককথার অলৌকিক জগৎকে…

পৌষালী চক্রবর্তী পেশায় রাজ্য সরকারি আধিকারিক। রসায়ন, তুলনামূলক সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের গবেষক। আগ্রহের বিষয় ইতিহাস, দর্শন, উনিশ শতক। নেশা বই পড়া, ফোটোগ্রাফি, পাহাড়ে বেড়ানো আর ভারতীয় মার্গ সংগীত শোনা। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘লিলিথ জন্মেরও আগে’ (২০২০)। তাঁর চাকরি-জীবনের প্রথম পোস্টিং পুরুলিয়া জেলায়। তিনি তাঁর পুরুলিয়া যাপনের কথা লিখবেন ধারাবাহিকভাবে ‘তুৎ পাখি উড়া দিলে’ কলামে। কখনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার জারণে, কখনও রূপক গল্পের কল্প আখ্যানে তাঁর এই নিবেদন অতীতচারী, বর্তমান-আবদ্ধ, অনাগত কালের পুরুল্যার করকমলে…

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

  • কৌশিক বাজারী

    খুব সুন্দর লাগলো পৌষালী। আপনার গদ্যের বাঁধনিটি বড় চমৎকার! শুভেচ্ছা জানবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *