Latest News

Popular Posts

মাটি-জল-মুক্তামাছ

মাটি-জল-মুক্তামাছ

পৌষালী চক্রবর্তী

ঘুমের দরজা ঠেলে একেকদিন আমাদের বেরিয়ে পড়তে হয় ভোর ভোর। দিক্‌চক্রবালে দূর পাহাড়ের ঢাল ছাড়িয়ে লোহিত বর্ণ আকাশে তখন উঠছেন সিংবোঙা। প্রাচীন শালবনে তার আলো-আঁধারি খেলা পাতাঝরা বনতলে ছায়ালহরী তুলছে। সেই আলোকণা গিয়ে পড়েছে মাগুসরাই বাঁধের গহীন জলে খেলে বেড়ানো এক রোহিত মাছের দেহে। সে এক আশ্চর্য আনন্দ-কলকলানি মাছ। রাতবিরেতে কোলজলের মধ্যেও তাকে ঠিক খুঁজে নিয়ে ছুঁয়ে দেয় স্বাতী তারার চোখের জল। ঝিনুকের গায়ে পড়লে তার বুকে যেমন মুক্তো আসে, তেমনই এই মাছ হয়ে ওঠে মুক্তামাছ। সবাই তার হদিশ পায় না। শুধু কিছু ভালো মানুষের ছাঁ শুভকালে দেখতে পায় এই মুক্তামাছ। তাদের কপাল জুড়ে তখন ফুটে মায়াবী শতভিষা।

আস্তে আস্তে জমতে থাকে হাট-বাজার, পথঘাট। ফি মঙ্গলবার রাস্তার উপরেই বসে পশুর হাট। জমায়েত হয় গরু, কাঁড়া, মুরগি সহ মালিকের। ঝাড়াই বাছাই করার পর সেই সব পশু পায়ে হেঁটে বা ছোটাহাতি গাড়ি করে পাড়ি দেয় নতুন মালিকের কাছে। কখনও রাজ্য পেরিয়ে চলে যায়। ফিরতি পথে মাঝেমাঝে নজরে পড়ত তাদের নিঃসার চলে যাওয়া। অন্ধকার রাস্তায় হেডলাইট পড়ে আচমকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের অবয়ব। চোখে যদি আলো পড়ে, তা যেন জ্বলে ওঠে। আমার ধন্দ লেগে যেত, ওদের চোখে জল নাকি! হামেশাই অভিযোগ ওঠে এই হাট নিয়ে। দোরগোড়ায় হসপিটাল। সেদিন কোনও সংকটজনক রোগী থাকলে তার পক্ষে ঠিক সময়ে পৌঁছনো দুঃসাধ্য। হাটকে তো আর নির্বাসন দেওয়া যায় না। আমরা ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করি। মনসা পুজোর আগের হাটবার আবার হাঁসে হাঁসে ছয়লাপ। পাহাড়তলির ছোট্ট গ্রামীণ হাট কিন্তু বর্ণময়। রঙিন জামাকাপড়, সবজি, ফল, খেলনা, এমনকী খাটিয়ার দোকান। মকরের আগের হাট সবচেয়ে জমজমাট। আমরা পিঠে গড়ার খাপরা ছাঁচ কিনে আনি। সন্ধের মুখে নারী-পুরুষের ফিরে চলা হাট করা জিনিস বেঁধে ছেঁদে নিয়ে। কারও কারও পা টলমল করে। চোরাগোপ্তা বিক্রি হওয়া নেশাবস্তু তাদের দখল করেছে তখন। পুলিশ প্রশাসনের তরফে রেড হয়। আবার লুকোচুরি শুরু।

আর পড়ুন: সূর্যাস্তের দেশে

এক দুপুরে ঝাড়খণ্ডের সীমান্তবর্তী এক গ্রামে যাওয়ার পথে সামনে পড়ে টলমল করা এক ঝাঁক। আমরা তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিই, এর উৎসে বিনাশ করতে হবে। সেই ঠেক ভাঙতে যখন যাওয়া হয়, প্রথমে খুব বাধা পেয়েছিলাম। মহিলাদের থেকেও। এ নেশার একটা কারণ দারিদ্র্য তো বটেই। তার দ্বিমুখী ক্রিয়া— একটা অর্থকরী। নেশার জিনিস বেচে হাতে পয়সা আসে। আর অন্যটা সন্তাপনাশক, নিজেরাই খায়— মেতে থাকে, ভুলে থাকে, সাময়িক মুখ ফিরিয়ে রাখে ক্লেশ গ্লানি ক্লেদ আর সবচেয়ে মারাত্মক-অন্নচিন্তা থেকেও। আমরা ঠিক করি এই এলাকায় ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করব। মনরেগার।

কাজে যোগদান করা ইস্তক হইহই করে প্রতিনিয়ত ব্যতিব্যস্ত করে রাখছে যে প্রকল্প, অহরহ আতশ কাচের নীচে পারফরম্যান্স কাটাছেঁড়া করছে যে সে এই মনরেগা। গ্রাম দেশের একশো দিনের কাজ। অনেক বিতর্ক, মতামত, বিরুদ্ধ মতের মধ্য থেকেও বলা যায় আসমুদ্রহিমাচল বিস্তৃত অজস্র ভারতবাসীর জীবিকার সাময়িক সংস্থানের জন্য এই প্রকল্প প্রায় নির্বিকল্প। বলা হয়, সহস্রাব্দের প্রথমে বিশ্বব্যাপী মন্দার সময়েও ভারতবর্ষ কিছুটা সামলাতে পেরেছিল, কারণ— মনরেগা। কাজ চেয়ে মানুষের কাজ পাওয়ার অধিকার, এই প্রকল্পে আইন স্বীকৃত অধিকার— এটি তাই, মহাত্মা গান্ধি রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট। শুরুর দিকের ‘জল মাটি গাছ এই তিন নিয়ে একশো দিনের কাজ’— এই মন্ত্র থেকে সরে এসে তার ভূমিকা সবেতেই দেখা যাচ্ছে মাটি-জল-গাছ-পরিকাঠামো-জীবিকা। শুধুমাত্র মানুষকে কাজের সুযোগ করে দিতে মাটি কাটা (পোশাকি নাম ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট)-র কাজের বদলে উৎপাদনশীল সম্পদ তৈরির দিকে গুরুত্ব ঘুরে যায়। এই সম্পদ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীরও হতে পারে বা অপেক্ষাকৃত ছোট গণ্ডিতে থাকা পরিবারের জন্যও হতে পারে। সৃষ্ট সম্পদ রক্ষা করতে মানুষের মমত্ববোধ জন্মাবে। একশো দিনের কাজ করে একটা পরিবারের বিরাট কিছু রোজগার হয় না, যা সে পরিবারের সম্বৎসরের সব প্রয়োজন মেটাতে পারে। তবে উৎপাদনশীল স্থায়ী সম্পদ তৈরি করতে পারলে, তা দিয়ে বিকল্প জীবিকার দিশা দেখাবে— তার নিকোনো উঠোন আরেকটু তকতকে হবে, ঘরের দেওয়ালে পড়বে মাটির উজ্জ্বল প্রলেপ, দুপুরে রাতে ভাতের থালায় আসবে বৈচিত্র্য।

আর পড়ুন: বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

ব্যক্তিগত মালিকানার জমি সমতলীকরণের মাধ্যমে অনাবাদী জমিকে আবাদী করা, অপুষ্ট (যাদের লাল বাচ্চা বলে, সিভিয়ারলি অ্যাকিউট ম্যালনারিশড চিল্ড্রেন) শিশুর বাড়িতে কিচেন গার্ডেন বা গুটিকতক ফলের গাছে পুষ্টিবাগান করার অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। ব্যক্তিগত জমিতে ছোট পুকুর বা হাপা খনন করে বর্ষার জল ধরে রেখে চাষে ব্যবহার করা, মাছচাষ বা হাঁসপালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মুরগি পালনের পোল্ট্রি শেড, ছাগল পালনের জন্য গোটারি শেড এইসব। মৎস্য দপ্তর, প্রাণীসম্পদ উন্নয়ন দপ্তর, উদ্যানপালন, কৃষিদপ্তর, পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদ, বনদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সহভাগী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিছু কিছু গ্রামীণ হাটের শেড বানানো, সমাজ কল্যাণ ও অনগ্রসর শ্রেণি উন্নয়ন দপ্তরের অর্থানুকূল্যে শিশু আলয় (ICDS) নির্মাণের সময়, তার মজুরি অংশ মনরেগা থেকে দেওয়া হত। বিদ্যালয় চত্বর, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র চত্বরে জমি সমতলীকরণের পর পুষ্টিবাগান প্রকল্প করা হত। সঙ্গে জৈব সার গাদা, অন্য কোথাও অ্যাজোলা পিট। সিএডিসি-র বিরাট এলাকা জুড়ে কর্মকাণ্ড ছিল কুমারী কাননে। সেখানে আদিবাসী মহিলাদের স্বনির্ভর দল রুখা মাটির নিস্ফলা বেদনাকে শ্রম, ঘাম, অধ্যবসায়, ধৈর্যে পাল্টে দিয়েছিল প্রায় দু’হাজার গাছের বেদানা বাগানে। তাদেরকে বৃক্ষপাট্টা দিয়ে ফলনের কিয়দংশের মালিকানা, আর গাছ পরিচর্যার আনুপূর্বিক মজুরির সংস্থান করে দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু খাস জমি, জমি বা গাছের মালিকানা তাদের থাকত না, তাই বৃক্ষপাট্টা। মায়েরা শিশুদের মুখে পুষ্টিকর ফল তুলে দিতে পারে, মায়েরা পরম মমতায় পরিচর্যা করে ফলের বাগানের। এমনকী মজুরির টাকা আটকে থাকলেও। মাঝেমাঝেই মনরেগাতে এই সমস্যা জট পাকিয়ে উঠত। কেন্দ্র থেকে রাজ্যে ফান্ড ফ্লো থমকে থাকত। কোনও পরবের আগে আরও সমস্যা। মনসা পুজো, সহরায়, মকরের আগে যদি টাকা না ঢোকে অফিসে ভিড় ভেঙে পড়ত। একবার একটা সেচনালা পরিদর্শনে গেছি। মাঠের কর্মীরা ঘিরে ধরে অভিযোগ জানাচ্ছেন, টাকা কবে পাবেন। হঠাৎই এক বয়স্ক মহিলা তেড়েফুঁড়ে এসে বললেন, ‘হামরা তুমার মত কিরিম নাই মাখি বটেক’। আমি তো হতভম্ব। আগামাথা বুঝতে পারছি না। আমাকে আরও হতভম্ব ও নির্বাক করে দিয়ে তিনি জানালেন— নালা কাটার কাজ গরমকালে হয়েছে, শীত আসতে চলল এখনও টাকা ঢুকল না। তাদের বাসন মাজা— কাপড় কাচা— কোদাল চালানো প্রাচীন হাত আরও রুক্ষ, ফুটিফাটা হয়ে যাবে। সেই কোমলবিহীন, খড়ি ওঠা হাতের ছাপ কিছুতেই মিলবে না তাদের আধার-সংযুক্ত এটিএম-বিহীন সিএসপি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে। বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি না মিললে আধার গোলযোগে টাকা তোলা আঁধারে। আমার কাছে উত্তর নেই।

সেই যে ঠেক ভাঙা গ্রাম, সেখানে বিরাট খাসজমি ছিল। আমরা আম, পেয়ারা, কুল, লেবু গাছের মিশ্র ফলের বাগানের প্রস্তাব নিয়ে তাদের আঙিনে গেলাম, প্রথমটা তাদের খুব জড়তা ছিল। নেশা ছোটানোর পদক্ষেপ তারা ভালোভাবে নেয়নি। বারবার যাওয়া, আলোচনা; শেষে এক দুপুরে যখন চৈত্রের রোদ রোষের মধ্যে চক্কর কাটছে এক করুণ শঙ্খচিল, সে প্রান্তিক গ্রামের মধ্যে, মাথার চাল দিয়ে রোদ নেমে আসা মাটির দাওয়ায় বসে থাকা এক গাঁওবুড়া সানকিতে করে ভাত আর শাকসিদ্ধ খেতে খেতে বলল, ‘তুমরাও দুটা খাও কেনে, দমে ভুখ লাগিছে ত’— রৌদ্র উপদ্রুত অঞ্চলে পোস্ত বাটার মতো মেঘ ঘনীভূত হল। আর তার চারদিন পর চাতোরমা পাহাড়ে বৃষ্টি নামল। শুরু হল জমিকে আবাদি করার লড়াই। সেই মধ্যাহ্নভোজনের আমন্ত্রণ আমি আমৃত্যু মনে রাখব। মনের দিক থেকে এমন ধনী মানুষের সঙ্গ পাওয়া এক বিরল অর্জন।

আর পড়ুন: পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম

এতদঞ্চলে জমি খোঁজার এক বিরাট সমস্যা ছিল। চোখে দেখে জমি উপযুক্ত মনে হওয়ায় এগোতে যাচ্ছি, বেরোল সে জমি বনদপ্তরের। মন খারাপ। পিছিয়ে যাওয়া। তবে বনদপ্তরও চিত্তাকর্ষক বনসৃজন করত মনরেগায়। টাকা যতই মাঝেমাঝে আটকে যাক, কর্মপ্রবাহ জারি থাকত। একবার কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দলের পরিদর্শন চলছে কুমারী কাননের বিভিন্ন প্রকল্পের (বিস্তারে পরে আসছি)। এই পরিদর্শনের দিন, তারা প্রিয় বাগানকে স্যাক্রেড গ্রোভের মতো সাজিয়েছিল। বেদানা বাগানের মেয়েদের জিজ্ঞেস করা হল, টাকা ঢোকার সময়ের ঠিক থাকে না, তাও তারা কাজ করেন কেন? প্রত্যয়ী উত্তর সরকারি টাকা কিছুতেই মার যাবে না। বনায়নের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিতে ভৌমজলক্ষয়ী সোনাঝুরি বনসৃজনের পথ অনেকাংশে সরিয়ে দিয়ে শাল, গামহার, কেঁদ, পলাশ, নিম প্রভৃতি জৈববৈচিত্র্য রক্ষক আঞ্চলিক বৃক্ষের বন প্রস্তুতির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একটা আশ্চর্য তথ্য দেখেছিলাম যে, পুরুলিয়ায় পরিবারপিছু গড় জমি বর্ধমান-হুগলির পরিবার পিছু গড় জমির থেকে অনেকটা বেশি। তবে স্থিতি কিন্তু পলি বিধৌত স্বল্প জোত মালিকের বেশি। তার কারণ বোধহয় জমির অনুর্বর, অনুৎপাদক চরিত্র এবং তরঙ্গায়িত ভূমিরূপের ভূ-জলতাতত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। তাই প্রতি জোতে জলবিভাজিকা উন্নয়নের ধারণায় জল-মাটি-বন সংরক্ষণের প্রয়াস নিয়ে এল ‘ঊষর মুক্তি’— অহল্যা ভূমিতে মাটিকে অনুর্বরতার অভিশাপ থেকে মুক্তি ও বারিধারা আটকে রেখে মরা গাঙে জল আনার এক কৃৎকৌশল। যেসব শীর্ণকায়া নদী সম্বৎসর জলের আকালে রুক্ষ আর বর্ষায় অতিরিক্ত জলভারে বিপর্যস্ত, তাদের পুনরায় জাগিয়ে তোলার পরিকল্পনায় আমাদের দায়িত্বে পড়ল কুমারী নদী। বৃষ্টিজল ধরে রাখা যায় না বলে এসব অঞ্চল শস্যনিবিড় নয়, মানুষ এলাকা ছেড়ে পুব খাটতে যায়। এ প্রবণতা আটকানোর জন্য জল-মাটি-বন সংরক্ষণের সামগ্রিক নিবিড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জমির ঢাল ও উচ্চাবচতা ও জলধারণ ক্ষমতা ভেদে টাঁড়, বাইদ, কানালী, বহাল এই চারভাগে ভাগ করা হয়। রুক্ষ, উঁচু জমি হল টাঁড়, একেবারেই বৃষ্টিজল ধরে রাখতে পারে না, আর বারিধারা ধুয়ে নিয়ে যায় জমির উপরিভাগের সমৃদ্ধ উপাদান। টাঁড়ভূমি তাই অংশত নিস্ফলা, কৃষিকাজ হয় না। এখানে কম জলের চাহিদা সম্পন্ন ফল বন তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মধ্যম উচ্চভূমি বাইদ, তারপর কানালি, আর নিম্নভূমি, জলধারণে অনেকাংশে সক্ষম জমি হল বহাল জমি। বহালে দু’বার করেও ফসল ফলানো সম্ভব। ফল বন রূপায়ণের কিছু কথা তো আগেই বললাম।

আরও পড়ুন: তুৎ পাখি উড়া দিলে…

বনায়নের পরিকল্পনা নেওয়ার সময়, আমাদের জোর দিতে বলা হয় হারিয়ে যাওয়া আঞ্চলিক বৃক্ষরাজির পুনরুজ্জীবনের দিকে। শোনা যায় একসময়, মানভূম ওষধি গাছে সমৃদ্ধ ছিল, যার ঝাড়খণ্ড সহ দূরদেশে ভালো চাহিদা ছিল। আমরা আলাপচারিতায় জেনেছি, বিরহড় সহ অনেক স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ওষধি গাছের কার্যকারিতা নিয়ে পরম্পরালব্ধ জ্ঞানভাণ্ডার প্রচ্ছন্ন আছে। স্বাভাবিকভাবে তৈরি হওয়া ওষধি বন যে একসময় শেষ হতে পারে, এ ধারণা থাকায় ওষধি বন ও বাণিজ্যের সেই সমৃদ্ধি আজ অতীত। তার রেশ রয়ে গেছে বহেড়া-তোড়া, আমলা পাহাড়, নিম-তোড়া এইসব স্থাননামের মধ্যে। বনদপ্তরের সহায়তায় হাইকোপট নার্সারিতে ওষধি বৃক্ষের চারা তৈরির মাধ্যমে ওষধি বনায়নের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল কিছু এলাকায়।

আরেকটি কাজ ছিল বেশ মনের কাছাকাছি। একসময়ে রাঢ়ভূমি তাল ও খেজুর গাছে বেশ সমৃদ্ধ ছিল। এলাকায় এলাকায় তালপুকুরের সমারোহ সেই রেশ বাহী। তাল খেজুর শিশুপুষ্টিরও বড় সহায়ক। কুমারী কানন অঞ্চলে স্বনির্ভর দলের দিদিদের উদ্যোগে আরবিয়ান খেজুরের চাষ ও ব্লক চত্বরে তাল নার্সারি তৈরির মাধ্যমে সেই পুরনো সময়কে অনুসরণ করার একটা চেষ্টা করা হয়েছিল।

পঞ্চায়েত সমিতি ও ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে ট্রাইবাল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের সক্রিয় সহায়তা ও উদ্যোগে স্থানীয় পলাশ, নিম, বীটরুট, গোলাপ, গাঁদা, অপরাজিতা থেকে ভেষজ আবির ‘বনপলাশী’ তৈরি করা হয়েছিল। তারই প্রলম্বিত প্রসার হল, থিম্যাটিক প্ল্যান্টেশনের আওতায় রঞ্জক বনায়ন। পথিপার্শ্বে বিভিন্ন গাছের সঙ্গে আরও পলাশ রোপণ, কুমারী কাননে গোলাপ বাগান ও তার সীমানা বেড়ায় অপরাজিতা লতিয়ে দেওয়া ও গাঁদা গাছ করা, বনদপ্তরের সহায়তায় অ্যাকিওটে বা লিপস্টিক গাছের চারা হয়। সেবার একশো দিনের কাজে সম্পদ সৃষ্টি বেশ রঙিন। উরমার দিকে এক খেলার মাঠে হল আর্দেন স্টেডিয়াম— মাটির কাঠামোতেই উঁচু ঢাল করে পাঁচিল ঘিরে স্টেডিয়ামের রূপ দেওয়া। তার ইটের দেওয়াল-ঘেঁষে বার্তা লেখা হল বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতার। কুমারী কাননে বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে মনরেগার সমন্বয়ে গড়ে উঠল প্রকৃতি পর্যটনকেন্দ্র, সে বিষয়ে পরে কখনও আসা যাবে।

এভাবেই গ্রামজীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রকল্প ও জীবিকার দিশা রূপে জড়িয়ে আছে মনরেগা। ভোর ভোর উঠে যেমন টাঁড় পাহাড়ে গিয়ে মনরেগা বা মিশন নির্মল বাংলার কাজ দেখতে যেতাম, হেঁটে যেতাম শীর্ণ নদীর ধার বরাবর, কখনও সেই ভোরের আলো গড়িয়ে পড়ত গিয়ে দুপুর ফুলের গায়ে। চড়া রোদ ঠেলে মাটি কাটার পর মানুষ দেখাতেন ‘সাক্ষী’ অর্থাৎ একটা মাটির ঢিপি যার গভীরতা ও বেধ ধরে কাজের পরিমাপ হত। সেই সাক্ষীতে বসে বসে তাদের সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা হত। কীভাবে তারা পার করেছেন ও করছেন কঠিন দিন, সন্তানকে দুধেভাতে, পড়ালেখায় রাখার আবহমান কালের আর্তি ভেসে আসে দুপুরের রুখা বাতাসে। আমাদেরও সীমিত সামর্থ্যে আর কী চাওয়ার থাকতে পারে…

একেকদিন উদ্‌যাপনের আবহে কাজের কথা চলে। হয়তো ছো নাচ পালা, বা নাটুয়া কী ঝুমৈর সুরের আঙ্গিকে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা থাকে। তাদের চিরাচরিত আধারে লাগে পরিবর্তনের ছাপ। পৌরাণিক ছো মুখোশের পাশাপাশি তখন আসে বর্তমানের প্রয়োজনানুগ কোনো মুখোশ। ঝুমৈর-এর প্রাচীন সুর বহন করে বর্তমানের সমাজ বার্তা।

এভাবে জীবন প্রায় প্রতিদিনই তৈরি করে অণুগল্প। গল্পের যেমন শুরু থাকে, তেমনই একদিন তার সমাপ্তি এগিয়ে আসে। পথ চলতে চলতে তার সাথে উপনদীর মতো এসে মেশে বিবিধ অভিজ্ঞতার স্রোত। নদী পুনরুজ্জীবনের চেষ্টায় তখন চোখে বেশ স্বপ্নঘোর, আসে বদলির নির্দেশনামা— এবার জায়গাটি নদীমাতৃক। দলমা রেঞ্জের দিকে ডুবতে থাকা সিংবোঙাকে দেখতে দেখতে ভাবি এমনই অনন্ত গোধূলি কী ছুঁয়েছিল বহুযুগ আগে লাতেহার পাহাড়ের কোলে বসে থাকে সঞ্জীবচন্দ্র কে! জানালা বেয়ে ঢুকে আসে রূপকথার নীচু স্বর। বনে, পাহাড়ে, ডুংরিতে কারা যেন মুক্তামাছের সন্ধানে বেড়িয়েছিল। কারা যেন আর ঘরে ফেরে নি। ফুটিফাটা আকাশপথে তখন পরিক্রমা সারছে প্রাচীন পুনর্বসু…

ক্রমশ…

কভার ছবি ইনস্ট্রাগ্রাম
বাকি ছবি লেখক

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *