এই ঘর, এই উপশম

পৌষালী চক্রবর্তী

মোহনার দেশ ছেড়ে প্রবাসের দিন, পরবাসের দিন কাটতে থাকে। মাঝেমাঝে আবার ফিরে আসি নদীর দিকে। পিছনে ছেড়ে আসি লালমাটি, ছোট ছোট টিলার আড়ালে সূর্যাস্ত, গজাবুরু আলো করে ওঠা প্রথম সূর্যের দিন। অধিকাংশ সময় ফিরতাম সন্ধের চক্রধরপুর এক্সপ্রেসে। সে আবার শেষ রাতের চাঁদডোবা অন্ধকারের আকাশ আর তার বিপরীতে আলোকবৃত্তের শহর-উভয়কেই সাক্ষী মেনে নিজস্ব লোহার গর্ভ থেকে উগরে দেয় নগরগামী মানুষদের। রাত বা ভোর সাড়ে তিনটে। বৌদ্ধমঠের মতো নির্জন টাঁড়ভূম থেকে কোলাহলমুখর হাওড়া স্টেশনের মধ্যে পড়ে শুধু স্থানমাহাত্ম্যের পার্থক্য নয়, মনে হতে থাকে যেন অন্য সময়বৃত্তে এসে পড়লাম। পরদিন কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। স্টেশনে বাবা এসেছেন নিয়ে যেতে। পুজোর ছুটিতে ফেরা হয়নি। এই কোজাগরীর মুখে যাত্রা তাই পিতৃগৃহে। স্টেশনে এসেছেন ভোলা শিবটিও। কাঁচাঘুম ভেঙে কৈলাস থেকে নেমে। একদম ‘দেশে দেশে মোর ঘর’ দশা।

আরও পড়ুন: মাটি-জল-মুক্তামাছ

ছবি সংগৃহীত

বাড়ির পথে যেতে যেতে এখন আমার ঘর কোনটা? কতবার বদলে বদলে গেল ঘরের ধারণা! দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক আধা মফস্‌সল ঘেঁষা গ্রামের নারকেল, সুপারি, আম, টগর, বেগুনি কাঞ্চন গাছে ঘেঁষা বাড়ির একতলার ঘর, যেখানে পড়া ফেলে অনেক গ্রীষ্মদুপুর আমি অপলক পাড় করেছি নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা নীলে তাকিয়ে। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা আমার ঠাকুমা পতি বিয়োগের পর অতিকষ্টে দুই বয়স্থা মেয়ে আর অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে নিয়ে দাঁড় করিয়েছিলেন এই ভিটে। বাংলাদেশ থেকে তিনি এনেছিলেন কিছু পাটভাঙা রোদ- বৃষ্টির কথকতা আর দেবী বিষহরির আসন। তার একান্ত ঈশ্বর। শ্রাবণ সংক্রান্তির চরাচর ভাসানো বৃষ্টিতে বচ্ছরকারের পুজো হয়। এই বৃষ্টি আর বৃষ্টির মধ্যে পুজো দুইই আমার বড় প্রাণের কাছাকাছি। এখন এসেছিও এক মনসা পুজোর দেশে। বাড়ি ফিরতে না পারলেও মনসা পুজোর প্রসাদ ঠিক চলে আসে— তালফুলুরি, মালপোয়া। যাক গে, তো সেই টেঁটিয়া বুড়ি গয়না বন্ধক রেখে মেয়েদের এমএ ক্লাস অবধি পড়িয়ে তাদের মেয়ে স্কুলের দিদিমণি বানিয়েছিলেন সেই তিনি ছেলের ঘরে পরপর দু’টো নাতনি আসায় বংশলোপের দুঃখে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিলেন। আমার সেই প্রাণের ঘর এখন মালিকানা বদলেছে। এখন ও বাড়িতে আমার জন্য বরাদ্দ ঘর আলাদা। কিছুকালের ‘রুম অফ ওয়ান’স ওন’-এ নিয়মিত ফেরাও হয় না বহুকাল হল। সেখানে আমার ‘প্রাণের ক্ষরণ’ রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: সূর্যাস্তের দেশে

ছবি সংগৃহীত

পরের ঘর বিবাহসূত্রে পাওয়া এক দু’শো বছরের পুরনো শরিকি বাড়ির দোতলার ঘর। তবে এ ঘর তো অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। এক বিশাল দেবোত্তর পুকুরের গায়ে। দেবী ভদ্রকালীর পুকুর। তাতে অজস্র আনন্দী মাছ কলকল করে। কেউ ধরে না। শিশুরা পুকুরধারে এসে মাছেদের খাওয়ায়। শুধু উথালপাথাল বৃষ্টি হলে পুকুর ভেসে রাস্তায় উঠে এলে মাছেরা ঠিকানা হারিয়ে ফেলে। এর মাঝেই আরেকটি ঘর হয়েছিল। এ চাকরিতে আসার আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যে বিভাগের গবেষক ছিলাম। তখন বিজয়গড়ের এক ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকতাম। সেখানে সারারাত স্ট্রিটলাইটের আলো ঘরে এসে পড়ত। অন্ধকার অধরা ছিল। পাখিরাও গুলিয়ে ফেলে মাঝরাতে ডেকে উঠত। সে ঘর ছেড়ে এসেছি। পুরুলিয়া থেকে হাওড়ার পুকুর পাড়ের বাড়িতে ফেরাও অনিয়মিত। বরং যাকে মনে মনে জানি ক্ষণস্থায়ী আস্তানা, সেই মাগুসরাই বাঁধ পাড়ের সরকারি কোয়ার্টারটি এখন আমার একান্ত ঘর। দু’দিন পর ছেড়ে যাব জেনেও, যে সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি অফিস শেষ, যে সন্ধ্যায় ব্যাডমিন্টন খেলতে মন চাইছে না, গুটিগুটি ঘরে ফিরে এসে নির্জনে কবিতার কাছে বসি। আমার সঙ্গে এককাপ কফি নিয়ে কোনওদিন বসেন শক্তি, কখনও জীবনানন্দ, বিনয়, রিলকে, ভাস্কর বা জসীমুদ্দিন। আরও অনেকে, অনেকে। নির্ঘুম রাতগুলোতে মনে হয় আমার গতজন্মের সহচর, সোনালি বালুর কাঁসাই চরে নিশাচর হয়ে কেঁদে কেঁদে ফিরছে। আর জঙ্গল কুড়ুনিরা শালবৃক্ষের কানে কানে বলে আসছে রাতচরার সেই দুঃখের কথা।

আরও পড়ুন: বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

ছবি সংগৃহীত

কত রকম ঘরবসতের পালা চলল, অথচ ঠিকানা হল না। ঘরবিলাসের এই কাহনের মাঝখানে যখন মানুষকে সরকারি প্রকল্পে ঘর দেওয়ার কাজ হাতে নিলাম, পরতে পরতে কত না আশ্চর্য অভিজ্ঞতা ভিন্ন ভিন্ন ফুলের মালা যত্ন করে গেঁথে পথের পাশে আমার জন্য দাঁড়িয়ে রইল। কারও আকন্দ মালা, কেউ হলদে পলাশ গাছি বেঁধে এনেছে, কারও হাতে আলো আলো রাঙনী ফুলের মালা। কারও কারও মালা আমার দুর্বল স্মৃতিকে অষ্টেপৃষ্ঠে  বেঁধে রাখল।

সরকারি প্রকল্পে কোনও উপভোক্তার নামে ঘরের অনুমোদন আসে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন মেনে। বিভিন্ন যোগ্যতামানের নিরিখে সেই তালিকা প্রস্তুত হয়। তাতে মাঝেমাঝে ভুল যে দেখা যায় না, তা নয়। আগেকার ইন্দিরা আবাস যোজনা থেকে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানের বাংলা আবাস যোজনা, গীতাঞ্জলি, অধিকার এই সব প্রকল্পে ঘরের অনুমোদন আসে। বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থমূল্য, কিস্তির পরিমাণ বিভিন্ন। অনুমোদিত তালিকা ব্যতিরেকে অনেক মানুষই আসতেন ঘর পাওয়ার দরখাস্ত নিয়ে। অধিকাংশ আবেদন পত্রে দেখতাম ‘ইন্দ্রাবাস’ চাই। বা যাঁরা পরের কিস্তির জন্য আবেদন করছেন, তারাও ‘ইন্দ্রাবাস’। তো সেই ইন্দ্রের আবাসভূমি সকল নিয়ে মাঝেমাঝেই ঘোর জট পাকিয়ে উঠত। কেউ কেউ টাকা পাওয়ার পরে তো কিছুতেই ঘর তোলেন না। কেউ কেউ মেয়ের বিয়ে বা অন্যান্য কিছুতে টাকা খরচ করে ফেলেছেন। এদিকে উপর থেকে ক্রমাগত চাপ আসতে থাকে, কেন বাড়ির সংখ্যা বাড়ছে না। রাজ্যের তহবিলে টাকা রয়েছে, কেন সেখান থেকে ফান্ড ট্রান্সফার অর্ডার জেনারেট করা হচ্ছেনা। সাতদিনের নোটিশে অবিলম্বে ঘর তুলতে বলা। অন্যথায় এফআইআর করতে হবে। তাতে যেন মন সরে না আমার। চেষ্টা চালাই ক্রমাগত কথা বলে কিছুটা ধমকে চমকে যদি কাজ হাসিল হয়। অনেকে আবার খুব আনন্দ করে, যত্ন নিয়ে নিজের থেকেও টাকা ঢেলে ভালো করে ঘর বানান। আমরা হামেশাই পরিদর্শনে যাই। আর অফিসের কিছু নির্ধারিত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকর্মীরা তো অনবরতই ঘর বানানোর অগ্রগতি পরিদর্শন করে আমাদের রিপোর্ট পাঠান। যার ভিত্তিতে পরের কিস্তির টাকা ছাড়া হয়। তো এমন পরিদর্শনের সময় একদিন একটা অদ্ভুত বাড়ি দেখলাম। মাঝারি উচ্চতার একটা টিলার উপর দাঁড়িয়ে আছে সেই ঘর, টিলার নীচের দিকে বাঁশবন ঘিরে পাহারা দিচ্ছে তাকে, আশপাশে কেউ নেই। লখাই আর সীতামণি টুডু’র বাড়ি। বারোশো বছর আগে এদেরই কোনও পূর্বজকে দেখেছিলেন ঢেণ্ঢণপাদ ‘টালত মোর ঘর নাহি পরবেষী’? যদিও সাহিত্যতত্ত্বের সাক্ষ্যে রাঢ় অঞ্চল হয়তো চর্যাভূমি নয়, মন খালি বিশ্বাস করতে চায় সীতামণির কোন পূর্বনারীর সংসারই প্রাণ পেয়েছিল ঢেণ্ঢণের পদে।

আরও পড়ুন: পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম

ছবি সংগৃহীত

ঘাটবেড়া পাহাড়ের ঢালে চ্যাটান পাথরের ওপর এক গ্রাম লুকুইচাটানী। সেখানে কয়েকজন নতুন ঘরের টাকা পেয়েছেন। পাথরের তলার ঢালে মাটিতে ভিত খুঁড়ে ঘর তোলবার জন্য তারা পাষাণী অহল্যার সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছেন। পুরনো কিছু বাড়ি দেখি। এখনও দেওয়ালে আঁকা মাছ, লতা, সাপ। সরকারি প্রকল্পে পাকাবাড়িই করতে হবে। সারিবদ্ধভাবে একরকম দেখতে ঘর ওঠে। কখনও কখনও তালিকায় দেখা যায়, বাবা পরিবারের মাথা হিসাবে নথিভুক্ত। কিন্তু ছেলেরা বহুদিন পৃথগন্ন। সেইসব ছেলের দল বারবার আসে ভিন্ন ঘরের সন্ধানে। কিন্তু তালিকায় সবার যৌথ নাম থাকায়, আমরা কিছু করতে পারি না তাদের জন্য।

একদিন থানার ওসির সঙ্গে যৌথ পরিদর্শনে যাই। যারা অনেকদিন টাকা পেয়ে কিছু না করে চুপচাপ বসে আছে, তারা ওই যদি অন্তত ভয় পেয়ে কাজ এগোয়। অনেকেই বলে সাতদিনের মধ্যে বাড়ির অগ্রগতি দেখিয়েই ছাড়বে। আমরা আশ্বাসটুকু গ্রহণ করে সেইমতো উপরতলায় কথা দিই। এমতাবস্থায় মোলাকাত হল ভারি টেঁটিয়া এক লোকের সঙ্গে। ঘোর দুপুরে আমরা যখন যাই, তিনি তখন তকতকে ল্যাপাপোঁছা মাটির দাওয়ায় বসে অ্যালুমিনিয়াম সানকিতে করে দুপুরের ভাত নিয়ে বসেছে। আমরা গিয়ে দাঁড়াতে বললেন আগে খেয়েনি,  তারপর। আমরা বাড়ির বার দুয়ারে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তিনি আয়েশ করে খেয়ে দেয়ে সানকি ধুয়ে রেখে হাত মুছতে মুছতে এসে বললেন, ‘হ বলেন’। আমরা তো বললাম ব্যাঙ্কের বই নিয়ে আসতে। হেলেদুলে বই আনতে দেখলাম বই আপডেট করানো, বেশ অনেকদিন আগে টাকা ঢুকেছে। তবু ঘর বানানোর কোনও নামগন্ধ নেই। তাকে তো বেশ বকা হল। তখন গলা উঁচিয়ে বলতে লাগলেন সরকার তাকে টাকা দিয়েছে, যবে ইচ্ছে বাড়ি বানাবেন। আমারও মাথা গরম হতে লাগল। ওসির মুখ দেখি রাগে থমথম করছে। পারলে তখনই তুলে নিয়ে যান। আমি বললাম বাড়ি না বানালে বইও ফেরত দেব না। তার ব্যাঙ্কের বই নিয়ে অফিসে চলে এলাম। সাতদিনের মাথায় দেখি গুটিগুটি অফিসে এসেছেন দেখা করতে। এসে বললেন ইট নামিয়েছেন, এবার বাড়ি করবেন। বই ফেরত চাই। লোক পাঠালাম খবর নিতে, দেখি সত্যিই ইট কিনেছেন। ফেরত দিয়ে দিলাম তার ব্যাঙ্কের বই। তারপর ভালোই ঘর তুলেছিলেন। বাড়ি বানাতে পুলিশের সঙ্গে এমন অভিযান মাঝেমাঝেই করতে হত।

আরও পড়ুন: তুৎ পাখি উড়া দিলে…

ছবি সংগৃহীত

পাহাড়কোলে অনেকেই দেখতাম মাটির ঘরে থাকতে বেশি পছন্দ করেন। তাঁরা পাকা বাড়ি বানানোর পরেও সে ঘরে না থেকে পুরনো মাটির ঘরে থাকেন, নতুন ঘরে জিনিসপত্র রাখেন। প্রথমে সেই যে গল্প শুনিয়েছিলাম পাহাড়ের উপর থেকে পাহাড়তলিতে গ্রাম নেমে আসার, তাদের প্রথমে অধিকার প্রকল্পে বাড়ি দেওয়া হয়েছিল। সে বাড়ি সরকারের উদ্যোগে ব্লক দায়িত্ব নিয়ে বানিয়ে দিয়েছিল। যেহেতু গ্রামপত্তন হচ্ছিল, প্রতি পরিবারে অন্তত দু’টো ঘর দরকার। তাই দ্বিতীয়বার তাদের গীতাঞ্জলি প্রকল্পের বাড়ি দেওয়া হয়। এবার উপভোক্তাদের টাকা দেওয়া হয়। এজন্য গ্রামে ক্যাম্প করে তাদের সিএসপি অ্যাকাউন্ট ঠিকঠাক করে নেওয়া হয়। সেই বাড়ি তারা নিজেদের খুশিমতো বানিয়েছিলেন। বাংলা আবাস যোজনার বাড়ির সঙ্গে মনরেগা যুক্ত। বাড়ি বানানোর মজুরি বাবদ টাকা মনরেগা থেকে দেওয়া হয়। অনগ্রসর কল্যাণ দপ্তর থেকে একবার বিরহড়দের ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে অবশ্য বেশ আগেকার কথা।

এক দিব্যাঙ্গ দিদি আসতেন হাতে ভর দিয়ে মাটিতে ঘষটে ঘষটে। অফিসে এসে মেঝেতে বসতেন। আমরা তাঁকে চা খাওয়াতাম। তার জন্য একটা ঘরের অনুমোদন করে দেওয়া গেছিল। কিন্তু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ডরম্যান্ট থাকায় প্রথম এফটিও করার পর অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি। এদিকে কিছু টেকনিক্যাল জটিলতায় এই সমস্যার কিছুতেই সমাধান হচ্ছিল না। আমরা অনেক চিঠি-চাপাটি করি। তিনি মাঝেমাঝেই আসতেন আর বলতেন, ‘এ মা, তোর জন্য একটা আসন বুনছি। আমার ঘরটা করে দে মা’, কখনও বা দিদি বলতেন, কখনও মাসি। আর একজন আসতেন একটা মিষ্টি বাচ্চা মেয়ের হাত ধরে। স্বামী মারা যাওয়ার পর ভাসুর তাকে বাচ্চাসহ বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাইছিল। তিনি একটা ঘরের দরখাস্ত নিয়ে আসতেন। কিন্তু তার নিজের নামে কোনও জমি থাকায় বা পার্মানেন্ট ওয়েট লিস্টে নাম না থাকায় তার অনুরোধ রাখা যায়নি। তেমনই ঘরহারা হওয়ার ঘটনাও দেখেছি। স্থানীয় এক সাংবাদিক এক বৃদ্ধাকে একবার নিয়ে এলেন। তাঁর ছেলেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত ও শহরবাসী। কিন্তু মাকে কেউ সঙ্গে রাখেননি। উল্টে পৈতৃক বাড়িতে তালা লাগিয়ে চাবি নিয়ে চলে গেছে। বৃদ্ধা যাদের জেঠিমা হন, তাঁরা এখন তাঁকে খাবার দেন আর বারান্দা খুলে দেন, থাকার জন্য। জীবনের শেষ ক’টা দিন স্বামীর ভিটেতে কাটানোর জন্য তার সে কী আকুতি! আমার হাত ধরে কেঁদেই ফেললেন। সবার হস্তক্ষেপে শেষমেশ তিনি স্বামীর ভিটেতে ঢুকতে পেরেছিলেন।

ছবি সংগৃহীত

ঘর পাওয়ার, ঘর হারানোর, ভাঙা ঘর জোড়া লাগার কত না গল্প। কোনওদিন রাতের পাহাড় থেকে নীচের উপত্যকার দিকে তাকালে দেখতে পেতাম রাতের আলো জ্বলে উঠেছে। কম আলোক ঘনত্বের জায়গাগুলো গ্রাম মনে হত। যেখানে পুঞ্জীভূত আলো, সেখানে বাসা বাঁধে নগর অসুখ। আর সেখান থেকে জন্ম নেয় এক ভ্রান্তিলতা, সৃষ্টিকর্তা তার উপর বসে অলক্ষ্যে হাসেন। মাঝে মাঝে দেখি ফাঁকা মাঠের মধ্যে পড়ে রয়েছে এক ছাদহীন মাটির ঘর। ছাদের জায়গায় বাঁশের কাঠামো কোনও মতে এখনও টিকে। যেখানে জানালা আঁটত, সেখানে এখন বিপুল শূন্যতা। মাটির দেওয়াল বেয়ে উঠেছে ম্যালেরিয়া লতার সাজ। মেঝেতে বাসা করেছে কোনও বেজি। হঠাৎই কোনও মানুষ চলে এলে তারা চমকে যায়। মেঝেতে কিছু তৈজস ইতস্তত পড়ে। এক হাজার বছর পরে এদের পরিচিতি ধূসর হয়ে আসবে। সিন্ধুসভ্যতার মতো মাটি খুঁড়ে তাকে তুলে আনবে কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক। তখন আর কে পাঠোদ্ধার করবে এককালে বাড়িতে আনখশির জড়িয়ে থাকা গৃহস্থালী মায়া…

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *