Latest News

Popular Posts

সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর

সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর

পৌষালী চক্রবর্তী

এক ভাদ্রের সকালে বৃষ্টিস্নাত এই জনপদে প্রথমবার আসি। তারপর মেঘ, রোদ, কুয়াশা, বৃষ্টি, দিনরাতের অনেক রং, অনেক রূপ, অনেক আবহের মধ্য দিয়ে জারিত হয়েছে আমার প্রাত্যহিক যাপন। প্রতিদিনের কাজ, সরকারি দায়িত্বভারের সঙ্গে নিত্যই যুক্ত হয় মানুষকে দেখার ভিন্নতর অভিজ্ঞতা। একেকটি প্রকল্প নিয়ে মানুষের কাছে যাওয়া, আর সেই মানুষদের নিজের জীবনকে দেখার বিশিষ্ট ভঙ্গি, যাপনের বিশিষ্ট বোধ প্রকল্পটির সাফল্য ব্যর্থতার তত্ত্বগত খতিয়ানকে অনেকাংশে প্রভাবিত করে। এমনই এক প্রকল্প ছিল ‘মিশন নির্মল বাংলা’।

আগেই বলেছি দায়িত্বভার নেওয়া মাত্র যেসব প্রকল্প ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল তার একটি তো মনরেগা, অপরটি ‘মিশন নির্মল বাংলা’। মানুষের বিভিন্ন ধরনের পেনশন, আবাসন প্রকল্প এগুলিও প্রায় সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। এদের মধ্যে ‘মিশন নির্মল বাংলা’ বা ‘এমএনবি’ একদম অন্যরকম, অন্তত রাঢ়ভূমে তো বটেই। এ প্রকল্পে মানুষের জন্য ব্যক্তিগত শৌচাগার বানিয়ে দেওয়া হয়, অথবা কেউ চাইলে নিজেরাও বানিয়ে নিয়ে সরকারের কাছে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা দাবি করতে পারেন। কিন্তু কনস্ট্রাকশন তো হল, তারপর তাকে ব্যবহারে পরিণত করানোর চেষ্টার সঙ্গে আসল লড়াইয়ের শুরু। সে-লড়াই মানুষের আজন্মলালিত অভ্যাস, কিছুক্ষেত্রে সংস্কারের সঙ্গে। সে লড়াই মানুষের চৈতন্যের সঙ্গে।

আরও পড়ুন: এই ঘর, এই উপশম

এ লড়াই তাই এক অতীব কঠিন লড়াই সমাজের গোড়া ধরে নাড়া দেওয়া, সে যেন অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ! রাঢ় অঞ্চলে উদার, অবাধ, উন্মুক্ত ভূমির প্রাচুর্য দেখা যায়। মাইলের পর মাইল জুড়ে এমন খোলামেলা ভূখণ্ডের কথা দক্ষিণবঙ্গের শহরতলিতে আমরা ভাবতেও পারি না। মানুষ প্রকৃতির প্রাচুর্যের মধ্যে, তার ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে থাকে। সেই প্রভাব তাদের জীবনযাপনের মধ্যেও প্রত্যক্ষ ছাপ ফেলে। আমরা যখন এমএনবি-র কাজ করতে নামি, শৌচাগার কনস্ট্রাকশনের পাশাপাশি বেশ ভালো সংখ্যক মানুষের মধ্যে তার ব্যবহার প্রচলনের জন্য সচেতনতা মূলক প্রচারকাজ, আইইসি মেটিরিয়াল নিয়ে আমাদের কোমর বেঁধে মাঠে নামতে হয়। কারণ এই বিস্তীর্ণ ফাঁকা জমির মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জনবসতির মধ্যে অনেকেরই অভ্যাস শৌচকাজ করতে খোলা জায়গা ব্যবহার করা, যেটা অনেকেরই, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের মধ্যে এ এক দীর্ঘলালিত  অভ্যাস। চট করে তারা সে অভ্যাসে বদল আনতে পারছেন না। এ নিয়ে বেশি কথা বলতে গেলে তাদের অনেকের সঙ্গেই রাগারাগি, অশান্তি হয়ে যাচ্ছে। এমএনবির শৌচাগার এর যে সোকপিট সেটির একটি নির্দিষ্ট গঠন এবং কারিগরি ছিল। সেই মোতাবেক প্রতিটা শৌচাগার বানানোর কথা। গোলাকার এই সোকপিট ইট গেঁথে হানিকম্ব আকারে গড়ে তুলতে হত। অর্থাৎ একাধিক মৌচাকের মতো ষড়ভুজ জুড়ে জুড়ে গভীর চোঙয়ের মতো আকার বানানো। ঠিক যেভাবে ষড়ভুজাকার খণ্ড জুড়ে জুড়ে রূপ পায় গোলাকার ফুটবল। পাশাপাশি দু’টি পিট। প্রথমে একটি ব্যবহৃত হবে, সেটি ভর্তি হয়ে গেলে আরেকটি ব্যবহৃত হবে। পর্যায়ক্রমে এই ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হয় ওয়াই জংশন নামক উল্টানো ওয়াই আকৃতির নলের সংযোগস্থলে বসানো ভাল্ব দিয়ে। বেশি কিছু কারুকাজ নেই অথচ এই মডেলে মানববর্জ্য কিছু বছর পর জৈবসারে পরিণত হবে। পিট পরিষ্কার করতে হলে এই সারের ভাগটি তুলে নিলেই হবে। এই মডেলে কংক্রিটের সোকপিট পরিষ্কার করার মত কোনও মানুষকে হাতে করে অন্য মানুষের বর্জ্য পরিষ্কার করতে হবে না। সেদিক থেকে এই মডেল অনেক স্বাস্থ্যকর, পরিবেশবান্ধব। পরিষ্কার করার পদ্ধতি অনেক বেশি মর্যাদাকর।

আরও পড়ুন: মাটি-জল-মুক্তামাছ

শৌচাগার বানানোর ক্ষেত্রেও সেই একই সমস্যা-জমি সমস্যা। নিজের জমি না থাকলে শৌচাগার হবে না। আর বেসলাইন সার্ভের মাধ্যমে উঠে আসা তালিকায় নাম থাকতে হবে। সেই তালিকা বেশ পুরনো হওয়ায় তাতে নানারকম ভুলভ্রান্তি দেখা দিত। তালিকায় অবিভক্ত অথচ পরে ভেঙে যাওয়া অনেক পরিবারের একাধিক শৌচাগারের চাহিদা থাকত, অথচ তালিকা ধরে একটাই দেওয়া যেত। অনেকে আবার বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে শৌচাগারের জন্য জমি কিছুতেই দিতে চাইতেন না। যে ষোলোআনা বাঁধপাড়ে তারা যেতেন, সেই জায়গা দেখিয়ে দিতেন। আমরা ফাঁপরে পড়ি। কথাবার্তা থেকে বাক্‌বিতন্ডা শুরু হয়ে যায়। এগিয়ে আসেন মহিলারা। বলতে থাকেন ‘দোরগোড়ায় পায়খানা বানালে আমরা শ্বশুর ভাসুরের সামনে দিয়ে কীভাবে যাব বলো! আর ওই নোংরা ঘর আমাদের ঘরের সাথে কেন রাখব?’ এবার একটা অন্য পরত খুলে যায় আমার সামনে। বাড়ির পুরুষেরা এতক্ষণ বলছিলেন— মাঠ ছাড়া, বাঁধ পাড় ছাড়া তাঁদের হবে না, তাই বানালে ওখানেই বানাতে হবে। আমরা সাধ্যমতো তাঁদের বোঝাতে চাইছিলাম ষোলোআনার জমিতে বা খাস জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানায় ব্যবহার্য কিছু বানিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের বিরক্তও লাগছিল, কিন্তু মহিলারা বলতে শুরু করলে আমাদের বিহ্বল লাগতে থাকে। আমরা বলতে চেষ্টা করি বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে আবর্জনা একটা নির্দিষ্ট, বদ্ধ জায়গায় আটকে থাকবে আর খোলা মাঠে গেলে তা পরিবেশ দূষণ করবে, মাছিবাহিত রোগ ছড়াতে পারে— এ জাতীয় অভ্যাস থেকে আমরা অন্যের ক্ষতি করছি। আর বাড়িতে বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ আত্মীয়দের সামনে দিয়ে যেতে তাদের লজ্জা, কিন্তু উন্মুক্ত জায়গায় যে কেউ আড়াল থেকে তাদের দেখতে পারে। তাছাড়া স্মার্টফোনের এত রমরমা, যে কেউ অসতর্ক মুহূর্তের ছবি তুলতে পারে। তারা খুব একটা মন দেন না আমাদের কথায়। তাদের নিকানো, তকতকে দাওয়ার লাল, নীল, হলদে সবুজ রঙের লতাপাতার আলপনার দিকে  চোখ আটকে কথা বলতে বলতে নিজের কণ্ঠস্বর, নিজের কানেই অস্পষ্ট, দুর্বল শোনায়। মনে হতে থাকে তাদের সমবেত প্রতিরোধের মুখে আমাদের যুক্তির খুব একটা জোর নেই।

আরও পড়ুন: সূর্যাস্তের দেশে

ভাবি এভাবে হওয়ার নয়। এদিকে উপর থেকে ক্রমাগত চাপ আর বকুনি বর্ষিত হতে থাকে। কেন সন্তোষজনক সংখ্যার শৌচাগার বানানো যাচ্ছে না, কেন যেটুকু বানানো হয়েছে সেটা ব্যবহার করানো যাচ্ছে না ইত্যাদি ইত্যাদি। পাংশু মুখে হজম করে রাগ উগড়ে দিই সহকর্মীদের ওপর। দু’টো আলাদা রকমের ভাবনার কাঠামোকে এক জায়গায় এনে কিছু বাস্তবায়িত করা আর সমাজ বদল করতে নামার লড়াই প্রায় সমার্থক মনে হতে থাকে। আমরা শরণাপন্ন হই শিশুদের।

শিশুদের নিয়ে জমে ওঠে আমাদের দল। ভোর ভোর আমরা বেড়িয়ে পড়ি হুইসেল ঝুলিয়ে। একটি পুঁচকে ছেলে, বিধান সবথেকে উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে আসে হুইসেল বাজিয়ে ঘুরতে। বিভিন্ন বাঁধের পাড়ে যেখানে মানুষের যাওয়া আসা বেশি, সেখানেই সদলবলে আমাদের গন্তব্য। যদি অকুস্থলে না জানিয়ে গিয়ে পড়ে তাদের অস্বস্তিতে ফেলা যেতে পারে। হুইসেল বাজিয়ে সতর্ক করা, যাতে তাঁরা অভ্যাস বদলান। আমাদের জেলা থেকে ক্রমাগত বলা হতে থাকে যাঁরা খোলা জায়গায় শৌচ করেন, তাঁদের সামাজিকভাবে লজ্জিত করতে হবে, জেলার ভাষায় ‘সোশ্যাল লজ্জা’। অনেক জায়গাতেই বাচ্চাদের বকাঝকা করা হতে থাকে। বিশেষত, যেদিন বাচ্চারা অন্য কোনও সহকর্মীর তত্ত্বাবধানে বেরোত। বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা ভয় পেয়ে গিয়ে তাদের আর ছাড়তে চাইতেন না। বাচ্চারা সহজে বুঝত। তারা তো স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে স্বচ্ছতার পাঠ নিত। তাদেরকে বলা হত, বাড়িতে যেন তারা ক্রমাগত বলে চলে শৌচাগার ব্যবহার করার কথা। যাদের বাড়িতে শৌচাগার তখনও বানানো হয়নি, তারা যেন বাড়িতে জোর করে স্থানীয় সরকারি অফিসে যোগাযোগ করার জন্য। বাচ্চারা অনেক সাবলীলভাবে আমাদের বুঝিয়ে দেয় স্বাস্থ্যবিধি; উন্মুক্ত স্থানে শৌচ মানুষের সাধারণ স্বাস্থ্যের জন্য কতটা হানিকারক হতে পারে, তা বলে দেয়। কিছুটা তারা স্কুলে শুনে শুনেছে, কিছুটা অভ্যাস করেছে আর অনেকটাই তাদের বোধের ভিতর ঢুকে গেছে।

আরও পড়ুন: বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে

পাড়া বৈঠক হয়, বিকেল সন্ধের মুখে লোকশিল্পের বিভিন্ন আঙ্গিক ব্যবহার করে চলতে থাকে সচেতনতামূলক প্রচারকাজ। মনে থেকে যায়, তিন বছর সেই ব্লকে থাকাকালীন,  একজন— মাত্র একজন ভদ্রলোক নিজে থেকে এসে দেখা করে বলেছিলেন, ‘আমার শৌচাগার বানিয়ে দিন’। আর বাকি দিন! … সিসিফাসের পাথর ঠেলে পাহাড়ে তুলতে তুলতে একদিন অন্য আকাশে উড়াল দেওয়া…

ক্রমশ…

নামাঙ্কন: আল নোমান (বাংলাদেশ)

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *