স্বাধীনতার সূর্যদের লড়াইধন্য সেইসব পবিত্র ভূমি

পৌষালী চক্রবর্তী

যেদিন থেকে জ্ঞান হয়েছে, স্বাধীনতা দিবসের দিন স্কুলের অনুষ্ঠানে হাজির থাকতাম। আগস্টের এই সময়টা সাধারণত ঘোর বর্ষাকাল থাকে। প্রায় প্রতিবারই সকাল থেকে বৃষ্টি নামত। ঝড়-জল সব উপেক্ষা করে মায়ের হাত ধরে স্কুলে হাজির হতাম। একদম ছোট ক্লাসে পড়ার সময় যেতাম হাতে কাগজের ছোট পতাকা নিয়ে। স্কুলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন হত, জাতীয় সংগীত গাওয়া হত। তারপর জিলিপি খাওয়া। বড় স্কুলে আসার পর দায়িত্ব বাড়ে। দেশাত্মবোধক কবিতা আবৃত্তি, বৃন্দগান, প্রবন্ধ রচনা এসবে অংশগ্রহণ করতাম। পড়ে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতাম। বড়দিদিমণি যখন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতেন, কি রোমাঞ্চ লাগত। নিজেরও ইচ্ছা করত, অমন জনসমাগমে পতাকা তুলি। সে সুযোগ অনেক পরে দিয়েছিল পুরুলিয়া। সেদিন দূরদর্শনে সারাদিন দেশপ্রেমের অনুষ্ঠান, সিনেমা হত। বিভিন্ন ক্লাব থেকে ব্যান্ড সহযোগে কুচকাওয়াজ করা হত। একটি বিষয় আজীবন মনে থেকে গেল। আমাদের বড় স্কুলের বড়দিদিমণি স্বাধীনতা দিবস বা যেকোনও মনীষীর জন্মদিন পালনের বক্তৃতায় বলতেন কোনও দিন বা কোনও ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের সেরা উপায় হল বাড়ি ফিরে সেই সম্পর্কে কিছু পড়া। তা সবসময়ই মেনে চলতে চেয়েছি। রাঢ়ভূমির পুরুলিয়া হয়ে ওঠার যে অদম্য যাত্রাপথ, তার পরতে পরতে সংগ্রাম। আজ সেই তর্পণই থাক…

“অরণ্যপর্বতাবৃতং দেশ ঝারিখণ্ড খ্যাতং/ রাঢ় গঙ্গা রাঢ়শ্চ অটবী রাজ্যং প্রণামিতম।।/ নির্বাণে পার্শ্বনাথশ্চ বর্ধমান সতীর্থঙ্করৌ/ বুদ্ধস্য শ্রীচৈতনস্য পদরেণুভি পবিত্রম।।”

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা আন্দোলনে মুর্শিদাবাদ

ব্রিটিশ সেনাদের হাতে ছিল গোলাবারুদ এবং ভারী অস্ত্র। তা সত্ত্বেও সাঁওতালরা দমে যাননি। তির ধনুক কুঠার ঠাঙ্গী নিয়ে তাঁরা বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিল ইংরেজদের সামনে। চিত্রসূত্র: Illustrated London News

‘মার্কণ্ডেয় পুরাণে’র এই বিস্তীর্ণ জঙ্গলভাগের বর্ণনা এক বিস্তৃত ভূখণ্ডের সুপ্রাচীন সভ্যতা, চিরায়ত ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রাচীন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে আলোচ্য ভূখণ্ডের প্রসঙ্গ মেলে। জৈনসাহিত্যের প্রাচীন গ্রন্থ ‘আচারাঙ্গসূত্র’ থেকে জানা যায় মহাবীর কেবলজ্ঞান লাভ করার পূর্বে প্রাচ্যদেশের সুব্বভূমি, লাঢ় ও বজ্জভূমি প্রভৃতি অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। লাঢ়কে প্রাচীন রাঢ়ভূমি বলে চিহ্নিত করা হয়। ব্রিটিশপূর্ব ভারতের রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদের প্রধান ধারাগুলির আগ্রাসন থেকে এই ভূমি নিজেকে অনেকটাই বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল। এই অঞ্চল প্রথম বিদেশি শাসনের সংস্পর্শে আসে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্রুত সাম্রাজ্য বিস্তারকালে।

১৭৬০ সালে সুবে বাংলার তৎকালীন নবাব মীর কাশিমের কাছ থেকে কোম্পানি এতদাঞ্চলে বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে, পরবর্তীতে যে অঞ্চলের নাম হবে জঙ্গলমহল।

১৭৬৫ সালে কোম্পানি বাংলা-বিহার-ওড়িশায় দেওয়ানি লাভের পর যে ব্রিটিশ অনুপ্রবেশ শুরু হয়, তার আগ্রাসী চরিত্র পাকাপোক্ত হয় ১৭৯৩ সালে কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তনে। পার্বত্য এলাকার গোষ্ঠীমুখ্যরা ব্রিটিশদের রাজস্ব দিতে বিমুখ হয়। একদা যে অঞ্চলে এক আদিমাতা জঙ্গল পরিষ্কার করে সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছিলেন, সেই গাছের গোড়া বা খুঁট কাটা ‘খুঁটকাট্টি’ নারীর উত্তরাধিকার হিসাবে এই অরণ্য ঝরনা পাহাড় জৈববৈচিত্র্যের মধ্যে ছিল যাদের অবাধ বিচরণ, জীবনযাপনের অন্যতম উপায় যাদের ছিল উদার প্রকৃতির সাহচর্য, আদিবাসীদের সেই আজন্ম অধিকারের জমি চড়া দামে মধ্যসত্বভোগী দেশজ জমিদারদের কাছে বিক্রি করে দেয় ব্রিটিশরা।

সহজাত সাহসিকতার কারণে জমিদাররা এলাকার আদিবাসীদের পাইক, বরকন্দাজ হিসাবে নিয়োজিত করতেন। ব্রিটিশ ও তৎসহযোগী দেশজ সুবিধাভোগীদের ভাষায় তারা ছিলেন চুয়াড়। এরা জমিদারের দেওয়া নিষ্কর ‘পাইকান’ জমি ভোগ করত। ব্রিটিশরা প্রথমে তাদের কর্মচ্যুত ও পরে পেশিশক্তির সাহায্যে ভূমিহীন করে। নিঃস্ব, সর্বহারা মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। কখনও তারা সঙ্গে পায় সাধারণ মানুষকে, কখনও সহানুভূতিশীল জমিদারদের। তিনজন জমিদার তাদের তির ও বল্লমবাহিনী-সহ বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়ান ঘাটশিলার রাজা জগন্নাথ ধল, মেদিনীপুরের কর্ণগড়ের রানি শিরোমণি, বাঁকুড়ার রায়পুরের জমিদার দুর্জন সিং। ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত চলেছিল এই প্রতিরোধ, বিদ্রোহ যাকে জে সি প্রাইস বলেছিলেন ‘দ্য গ্রেট চূয়াড় রেবেলিয়ন’। এই বিদ্রোহে ইন্ধন জুগিয়েছিল ৭৬-এর মন্বন্তর চলাকালেও ব্রিটিশের অনেক অমানবিক সাম্রাজ্যবাদী নীতি।

প্রায় তিরিশ বছর ধরে চুয়াড় বিদ্রোহের মুহুর্মুহু আঘাতের অভিঘাতে ব্যতিব্যস্ত ব্রিটিশদের প্রতিনিধি মেদিনীপুরের রেসিডেন্ট ফার্গুসন আদিবাসীদের দমনকল্পে এখানে স্থায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েন করার কথা ভাবেন। সুদৃঢ় প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের জন্য পুনর্বিন্যস্ত হয় প্রশাসনিক এলাকার পরিসীমা। ১৮০৫ সালে বীরভূম, বর্ধমান এবং মেদিনীপুরের বিভিন্ন স্থান নিয়ে গঠিত হয় জঙ্গলমহল জেলা— পূর্বে মেদিনীপুর, পশ্চিমে সিংভূম, উত্তরে পাঁচেৎ ও দক্ষিণে ময়ূরভঞ্জ। এলাকায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কম; রুক্ষ, পাথুরে অরণ্যসংকুল এলাকা।

এই জঙ্গলমহল জেলার সর্ববৃহৎ এলাকা বরাভূম ১৮৩২-৩৩ সালে প্রত্যক্ষ করে ‘গঙ্গানারায়ণ হাঙ্গামা’। বরাভূম রাজবংশের শেষ স্বাধীন রাজা, পরিবারের চল্লিশতম উত্তরপুরুষ তৃতীয় বিবেকনারায়ণ ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধচারী ছিলেন। তার দুই বিবাহজাত পারিবারিক উত্তরাধিকারের সংকট, জনতা ও ভূমিজ আইনের যুগ্ম সমর্থন বনাম ব্রিটিশের পৃষ্ঠপোষকতার কুটিল আবর্তে পড়ে এক অদ্ভূত সমীকরণ তৈরি হয়। এই বংশের দুই উত্তরপুরুষ গঙ্গানারায়ণ ও মাধব সিং বিবাদে জড়ান। প্রজাশোষক, প্রবঞ্চক, ব্রিটিশদের সমর্থনপুষ্ট মাধব সিংকে, অন্যান্য সর্দারের সহযোগিতায় গঙ্গানারায়ণ বামনীর ডুংরি নামক জায়গায় টাঙির কোপে হত্যা করেন। জ্বলে ওঠে বিদ্রোহের আগুন। নিজের অনুগামীদের নিয়ে গঙ্গানারায়ণ বরাবাজার কোর্ট, মুন্সীফ কাছারি, বাজারে লুঠতরাজ করেন। ব্রিটিশ সেনা দমন করতে এলে তা তীব্র বিরোধীরূপ নেয়। স্থানে স্থানে ঘাঁটি গেঁড়ে থাকা বৃটিশ ফৌজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীরা গেরিলা কায়দায় আক্রমণ চালাতে থাকে। গোপন স্থান থেকে ঝাঁক বেঁধে ছুটে আসা বিষমাখা তির তাদের বিপর্যস্ত করে দেয়। বেশ কয়েকবার ব্রিটিশদের আঁটঘাট বাঁধা অভিযান ব্যর্থ হয়। অবশেষে ব্রিটিশ মদতপুষ্ট খারওয়ানোরের ঠাকুর চৈতন সিংয়ের অতর্কিত আক্রমণে গঙ্গানারায়ণ নিহত হলে ব্রিটিশরা বাকি নেতাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। অসীম সাহসী গঙ্গানারায়ণ সম্পর্কে অনেক মিথের জন্ম হয়েছে।

আরও পড়ুন: জয় হো…

গঠিত হয়েছিল সাঁওতাল পরগণা নামক জেলা (ম্যাপে লাল অংশে চিহ্নিত)। চিত্রসূত্র: commons.wikimedia.org

ব্রিটিশরা হাঙ্গামা অভিধায়ের গুরুত্ব লাঘব করতে চাইলেও এর অব্যবহিত পরে, কোল বিদ্রোহের যৌথ অভিঘাতে ১৮৩৩ সালে জঙ্গলমহলকে ভেঙে মানভূম জেলা গঠন করে। ধানবাদ ও পুরুলিয়া সহ ধলভূম মহকুমা এবং বর্তমান বাঁকুড়ার কিয়দংশ এর অন্তর্ভুক্ত হয়।

মানভূমে নীল বিদ্রোহের অভিঘাত ভালোরকম ছিল। বিভিন্ন স্থানের কুঠি নামকরণের মধ্যে সেযুগের রেশ রয়ে গেছে। এ বিষয়ে জিলপা লায়ার নাম স্মরণীয়। পাহাড়ঘেরা দুর্ভেদ্য বাড়েদা অঞ্চলে জিলপা নীল চাষে অনিচ্ছুকদের নিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করেন। তখন নীলচাষের প্রধান ঘাঁটি এবং অফিস ছিল বেড়াদা কুঠি। জোর করে নীলচাষ করানো হত আর অনিচ্ছুক লোককে প্রকাশ্যে ভয়াবহ শাস্তি দেওয়া হত। দলমার কোলে বাটালুকা ছিল জিলপা লায়ার নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকারীদের প্রধান স্থান। কথিত আছে, জিলপা লায়া ধরা পড়ার পর তাঁকে বেড়াদা কুঠির মাঠে ফাঁসিতে ঝোলানোর পর মৃতদেহটি মশাল জ্বেলে পুড়িয়ে একটি মহুল গাছে পেরেক গেঁথে আটকে দেওয়া হয়। জনসাধারণের মধ্যে ভীতি উৎপন্ন করাই ছিল উদ্দেশ্য।

দিনটা ছিল ১৮৫৭ সালের ২২ শ্রাবণ। কাশীপুর রাজবংশের মহারাজা নীলমণি সিংদেওয়ের নেতৃত্বে এলাকার বিপুল সংখ্যক সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষ রাকাব অরণ্যে সমবেত হন। সিপাহি ব্যারাকের বিদ্রোহের তরঙ্গ বয়ে যায় রাঢ়ভূমিতে। তারা ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করার শপথ নেন— ‘ইংরেজ দ-অন রাকাব কোআ’। তারা পুরুলিয়া জেল, ট্রেজারি আক্রমণ করে ব্রিটিশ শাসকদের পলায়নে বাধ্য করে এলাকাটি বেশ কিছুদিনের জন্য মুক্তাঞ্চল করে রাখে। বিদ্রোহের আগুনকে রাঁচি সংলগ্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে তৎপর হলে, বিদ্রোহীদের অনুপস্থিতির সুযোগে ক্যাপ্টেন ওকস-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী এলাকা পুনর্দখলে নামে। নীলমণি রাজা অন্তরিন হন।

স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়া বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গেই সর্বভারতীয় স্তরের বিভিন্ন প্রতিবাদ আন্দোলনে মানভূম সমানভাবে এগিয়ে এসেছিল। ১৯২০ সাল নাগাদ গান্ধিজির নির্দেশিত পথে অহিংসা অসহযোগ আন্দোলনের অগ্রপথিক ছিলেন ঋষি নিবারণ দাশগুপ্ত। তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন অতুল্য ঘোষ। তেইশ বছরের সরকারি চাকরি অনায়াসে ছেড়ে দিয়ে তিনি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রত্যাখ্যান করেন আংশিক পেনশনের প্রস্তাবও। ১৯২১ সালে প্রথমে নীলকুঠি ডাঙা পরে নডিহাতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি কেন্দ্র তৈরি করেন, যার নাম শিল্পাশ্রম। এই আশ্রমের নিত্যদিনের কর্মভারে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিলেন অতুল্য ঘোষের স্ত্রী লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, যিনি সকলের ‘মা’ হয়ে উঠেছিলেন। ১৯২৫ সালে বিহার প্রাদেশিক সম্মেলন চলাকালে গান্ধিজি পুরুলিয়া এসে সাতদিন অবস্থান করেন।

১৯২৩ সালে সাইমন কমিশন বর্জনের সর্বভারতীয় আহ্বানে মানভূমও সাড়া দেয়। এই সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানভূম কংগ্রেসের প্রথম জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯২৮ সালে। এর সভাপতিত্ব করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। বিপ্লবী অন্নদা চক্রবর্তী ছিলেন অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি।

আরও পড়ুন: সমুদ্ধজাতিকা (অংশ ১৪)

১৯২৮ সালেই গঠিত হয় মহিলা সভা। তার সভানেত্রী ছিলেন ক্ষীরোদাসুন্দরী দেবী। ১৯২৯ সালে লাহোর কংগ্রেসের নির্বাচিত মানভূম প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন শেফালিকা বসু। এ-বছরের প্রথমদিকে অন্তরিন হন নিবারণচন্দ্র।

অহিংস অসহযোগ থেকে সাইমন বর্জনের দশককাল যেন ছিল মানভূমের সলতে পাকানোর সময়। যা সম্যকরূপে জ্বলে ওঠে ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের সময়। রাজশক্তির প্ররোচনায় ঝালদায় মানভূম যুব কংগ্রেসের নেতা সত্যকিংকর দত্তের হত্যা দিবস জমিদার-বিরোধী ‘সত্যমেলা’য় পরিণত হয়। লবণ সত্যাগ্রহের সময় মানভূম থেকে ১৩ জনের প্রতিনিধি দল কাঁথি যান। পুলিশি নির্যাতন সহ্য করেও তারা সমুদ্রপাড়ে লবণ প্রস্তুত করেন এবং দেশপ্রেমের নিদর্শন স্বরূপ তা পুরুলিয়াবাসীর মধ্যে বিক্রি করেন। বিলাতি দ্রব্য ও মাদক বর্জন, খদ্দরের প্রসার মানভূমে সাফল্য লাভ করে। কংগ্রেস বেআইনি ঘোষিত হলে এখানেও নিপীড়ন চলে। শিল্পাশ্রম থেকে প্রায় সবাই গ্রেফতার হলে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৩২ সালের ৪ জানুয়ারি অতুলচন্দ্র, নিবারণচন্দ্র, শশধর গাঙ্গুলি প্রমুখ আইন অমান্য করে গ্রেফতার হন। ওই বছর ২৬ জানুয়ারি মহিলা কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবীরা লাবণ্যপ্রভা ঘোষের নেতৃত্বে আইন অমান্য করে গ্রেফতার হন, লাবণ্যপ্রভার ঘোষের আড়াই বছরের কারাদণ্ড হয়।

১৯৪২ সালের ভারতছাড়ো আন্দোলনের প্রাক্কালে লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অতুলচন্দ্র ঘোষ, রামকিংকর মাহাত প্রমুখ নেতৃত্বকে গ্রেফতার করেন, অনেককে নজরবন্দি করা হয়। আদ্রার বিভিন্ন স্থানে বৈঠকের মাধ্যমে বিভিন্ন থানা দখলের পরিকল্পনা করা হয় এবং দায়িত্বভার বণ্টন করা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রত্যন্ত বান্দোয়ান থানার জেতার গ্রামে এক গোপন বৈঠকে থানা আক্রমণের দিনক্ষণ স্থির হয়। উত্তর মানভূমে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও থানা দখলে সাফল্য আসে বান্দোয়ান, বাঘমুণ্ডি, বরাবাজার ও মানবাজারে। ২৯ সেপ্টেম্বর ভীম মাহাত, মদন মাহাত এবং ধনঞ্জয় মাহাতর নেতৃত্বে বরাবাজার থানা অভিযানে অগণিত সাধারণ মানুষ যোগদান করেছিলেন। ছামু শবর, রাম শবর ও লক্ষণ শবরের নেতৃত্বে শবর গোষ্ঠীর মানুষ যোগদান করেছিলেন। বরাবাজার ও বান্দোয়ান থানা পুনর্দখল করতে ব্রিটিশ পুলিশের বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল। বাঘমুণ্ডি থানার ডাকঘর ভস্মীভূত হয়। মানবাজার থানা অভিযানে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। পুলিশ বিনা প্ররোচনায় চেলুয়া গ্রামের মাঠের জমায়েতে গুলি চালায়। চুনারাম মাহাত গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহিদ হন। আরও অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। আন্দোলনের রেশ আস্তে আস্তে থিতিয়ে যায়। নেতৃত্বস্থানীয় অনেকে গ্রেফতার হন। নেতৃত্বের নির্দেশে অনেকে পরে আত্মসমর্পণ করেন।

মানভূমের ভাষা আন্দোলনের কথা না বললে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ১৯১২ সালে মানভূমের বিহার সংযুক্তির পর থেকেই তৎকালীন মানভূমের ৭২% বাংলাভাষী মানুষ নিজেদের ভাষা সংস্কৃতি রক্ষার পক্ষে জোরদার সওয়াল করেন। স্বাধীন ভারতের স্বরাষ্ট্র দফতর ১৯৫৩ সালে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের কথা বলেন। এ বছরেই বিহার সরকার জেলার বাইরে থেকে খাদ্যশস্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় খাদ্য শস্যের সংকট দেখা দেয়। ভাষা আন্দোলনকারী টুসু সত্যাগ্রহীরা অনেকাংশে কৃষক সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছিলেন যাঁরা এই সংকটের সময় ক্ষুধার্তদের মধ্যে ট্রাকে করে খাদ্য এনে বিলি করেন, তাঁদের জব্দ করতে সরকার জেলার মধ্যে কাঠের হাল জোয়াল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। আন্দোলনকারীরা তা অমান্য করে অফিস আদালতের সামনে হাল জোয়াল বিক্রি করে তীব্র প্রতিবাদ জানান; সরকার পিছু হঠেন। এই প্রতিরোধ হাল জোয়াল আন্দোলন নামে প্রসিদ্ধ। এই বছরেই মানভূমের বঙ্গভূক্তির দাবি জোরালো হয়। টুসু, ঝুমৈর গানের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের বার্তা। ‘আমার বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা রে’ নামক একটি টুসুগান এসময়ে খুব জনপ্রিয় হয়। পঠনপাঠনে হিন্দি প্রাধান্য সে সময় বেশ জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। এর প্রতিবাদ এবং বিহার পুলিশের জুলুমের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা সোচ্চার হন টুসু গানে—

‘শুন বিহারী ভাই
তোরা রাখতে লারবি ডাঙ দেখাঁঞ…’

পত্রপত্রিকাও আন্দোলনের স্বপক্ষে সোচ্চার হয়। আন্দোলনের পালে জোরালো বাতাস দেখে তৎকালীন বাংলা ও বিহারের মুখ্যমন্ত্রীদ্বয় এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে জানান যে বাংলা ও বিহারকে একত্রিত করে পূর্বপ্রদেশ নামক এক নতুন প্রদেশ গঠন করা হবে। বাংলা ও হিন্দি হবে যার সরকারি ভাষা। এই বিবৃতি আগুনে ঘি ঢালে। শুধু মানভূম নয়, সারাবাংলা উত্তাল হয়ে ওঠে প্রতিবাদ আন্দোলনে। অতুলচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে পুরুলিয়া থেকে কলকাতা দীর্ঘ পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। শিশু নারী বয়স্ক মানুষ সহ বিশাল দল কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করে টুসু, ঝুমৈর গানকে আন্দোলনের হাতিয়ার করে। ১৯৫৬ সালের ৬ মে এই বাহিনী কলকাতা পৌঁছয়। আন্দোলনের ব্যাপ্তি দেখে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এই সংযুক্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার করেন।

১৯৫৬ সালে পাস হয় Bihar & West Bengal Transfer of Territories Act, 1956, যাতে বিহারের মধ্যে থেকে যাওয়া মানভূমকে তিনটুকরো করা হয়। শিল্পপ্রধান এলাকাগুলো থেকে যায় বিহারে। মানচিত্রে অনেক পুনর্বিন্যাস হয়। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে পথ চলা শুরু হল আজকের পুরুলিয়ার।

আরও পড়ুন: অশান্ত সময়ে ফিরছে আফগানিস্তান!

সাবেক জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে মানভূম হয়ে পুরুলিয়ার এই যাত্রাপথ যেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আদি ভারতের রুখে দাঁড়ানোর আখরে ভরা। এই ভূমিতে স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনের পতাকা উত্তোলনের দায়িত্বভার একাধারে যেমন গর্বে বুক ভরিয়ে তোলে, তেমনই মাথানত করে দেয় আদি ‘লাঢ়’ তথা রাঢ়ভূমির বহতা ঐতিহ্যের প্রতি। এই উদার মুক্ত প্রকৃতি আমাকে স্বাধীনতার অন্য পাঠ দেয়— জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, সীমিত সাধ্যের মধ্যেও। আমাদের নিত্যদিনের কাজের মধ্যেও মাঝেমাঝে এসে ধরা দেয় সেই সুদূরকালের হাওয়া। একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা আসতেন। তার আঁচলে সবসময় মোড়া থাকত এক তাম্রফলক। অফিসে এসে উল্টোদিকের চেয়ারে বসে কথা শুরুর আগে পরম যত্নে তাম্রফলকটা বের করে সাবধানে টেবিলে রাখতেন। ওটি তাঁর প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামী শ্বশুরমশাইয়ের সম্মাননা। বর্তমানে স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে। সেই সুযোগে ভাড়া বাড়ির মালিক তাঁকে উচ্ছেদ করতে চাইছে। তাঁর কোথাও যাওয়ার নেই, সেই তাম্রফলকের দোহাই দিয়ে আমাদের অনুরোধ করতেন, তাঁর যেন উচ্ছেদ না হয়।

আরেকজন বৃদ্ধা আসতেন। তাঁর স্বামীও স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ভাগের মা। কোনও ছেলেই তাঁকে ঠিকভাবে দেখত না। তিনি আসতেন একটা পেনশনের আবেদন নিয়ে, যাতে ছেলেদের কাছে তার একটু কদর বাড়ে— সেই আশায়।

আমি ঠিক করেছিলাম ‘সাত খইট্যা’ দেখতে যাব। খরসোয়ানের দিকে পালানোর সময় গঙ্গানারায়ণ নাকি পাহাড়ের উপর থেকে ঝাঁপ দেন। ফলে সেখানে গভীর গর্ত সৃষ্টি হয় ‘সাত খইট্যা’। ইচ্ছে ছিল ভাগনাদিহির মাঠ দেখার, আদি ভূমির আদি বাসিন্দাদের অদম্য লড়াইয়ের ভূমি। কোনওদিন হয়তো দেখা হবে স্বাধীনতার সূর্যদের লড়াইধন্য সেইসব পবিত্র ভূমি…

তথ্যঋণ
১৷ পলাশি থেকে পার্টিশন— শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়
২৷ গেজেটিয়ার অফ দ্য মানভূম ডিস্ট্রিক্ট- এইচ কুপল্যান্ড।
৩৷ স্বাধীনতা আন্দোলনে রক্তে রাঙা মানভূম— ভজহরি মাহাত ও পদকচন্দ্র মাহাত।
৪৷ অ্যান্টি ব্রিটিশ প্লটস অ্যান্ড মুভমেন্ট বিফোর মিউটিনি— শশীভূষণ চৌধুরী।
৫৷ বাংলাভাষায় জৈনধর্ম চর্চা— তপনকুমার ঘোষ (সম্পা)।
৬৷ মেমোরি আইডেন্টিটি পাওয়ার পলিটিক্স ইন দ্য জাঙ্গলমহল ১৮৯০-১৯৫০— রণবীর সমাদ্দার।
৭৷ অথ বলরামপুর কড়চা— পৌষালী চক্রবর্তী (সম্পা)

এই ধারাবাহিকের বাকি পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তুৎ পাখি উড়া দিলে…
পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম
বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে
সূর্যাস্তের দেশে
মাটি-জল-মুক্তামাছ
এই ঘর, এই উপশম
সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *