মানভূমের মনসা পরব

পৌষালী চক্রবর্তী

মাগুসরাই বাঁধপাড়ের ঘরে বসে মাঝেমাঝে ভাবি দেশ কী? কোথায়? যেসব ভূপ্রাকৃতিক নিরবচ্ছিন্নতার উপর মানুষ কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে, ম্যাপ এঁকেছে আর ভূপ্রাকৃতিক অংশকে করে তুলেছে ভূরাজনৈতিক— সেই সীমাবদ্ধ, নির্ধারিত ভূরাজনৈতিক অংশটুকুই কি একটা মানুষের নিজস্ব দেশ? আর সেই রাষ্ট্রকাঠামোর প্রদান করা বিভিন্ন কাগজের পরিচয়পত্রই কি দেশের মানুষ হয়ে ওঠার অনন্য অভিজ্ঞান? বোধহয় তা নয়। বিশেষ করে যাদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে অন্য এক ভূরাজনৈতিক খণ্ডে তাদের কাছে দেশ অন্য ধারণা, অন্যভাবে অর্থবহ হয়। যেমন দেশভাগের বিভিন্ন স্মৃতিকথায় আমরা দেখেছি মানুষের স্মৃতির মধ্যে থেকে যাওয়া দেশ ধারণায় ছেড়ে আসা ঘর বাড়ি, পড়শির সঙ্গে মিশে আছে উঠোন রোদ মেঘ বৃষ্টি হাওয়া তুলসীতলা, আঁচলে করে বেঁধে রাখা পঞ্চপ্রদীপের তাপ, চৈচৈ হাঁসের দল। সেই ছেড়ে আসা জায়গার ঊষা, গোধূলির বিষণ্ণতা তাকে আতুর করে তোলে, একমাত্র সে-ই বোঝে এর মর্ম। পরবাসে এগোতে এগোতে তার পাঁজরা থেকে খসে পড়ে একেকটি হাড়। যে ভূমি শরণার্থী অথবা উদ্বাস্তু তকমার বিনিময়ে সে মানুষকে দিয়েছে প্রাণধারণের আপাত নিরাপত্তা, সেই ভূমিতে মন বসাতে তার বাকি জীবনটাই বোধহয় লেগে যায়। ’৭১ পরবর্তী অভিঘাতে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া, কুড়ি বছরের ওপর ইন্ডিয়াতে বসবাসকারী এক প্রৌঢ়াকে একবার গল্পচ্ছলে জিজ্ঞেস করেছিলাম তাঁর জাতীয় সংগীত কী? তৎক্ষণাৎ স্বতঃস্ফূর্ত উত্তর ‘আমার সোনার বাংলা’। তিনি আসলে দেশকে বাঁচিয়ে রাখেন, লালনের লালনপালন করেন মনের অতল গহীনে। সেখানের আলো-হাওয়ায় তার মাতৃভূমি চির সজীব। মনোভূমির এই দেশেই তাদের যাপনের উদ্‌যাপন। তেমনই এক উদ্বাস্তু ‘বাঙাল’ আমার ঠাকুমা পূর্ববঙ্গের থেকে সামান্য কিছু জিনিসপত্রের সঙ্গে আঁচলে বেঁধে এনেছিলেন ধান-মাঠ-রোদ-হাওয়া-আলো-তারারাজি। আর মনসা পুজোর উত্তরাধিকার নিয়ে এসেছিলেন। যদিও কোনও অভিভাবকের রক্তচোখ তাকে চাপিয়ে দেয়নি এই উত্তরাধিকারের দায়িত্ব অথবা চিরায়ত সংস্কারের আরও কোনও ভারী বোধ তাঁকে প্রাণিত করেছিল। তাই দেশছাড়া হয়েও ছাড়তে পারেননি ইষ্টকে।

আরও পড়ুন: তিনদিন ঝুলনা সাজাতাম, পূর্ণিমায় রাখী পরাত বোন্টু

আলোকচিত্র লেখক

ইন্ডিয়াতে আসার পর অতিকষ্টে একটু টালিচালের ঘর তোলার সংস্থান হলে, আগে তৈরি হয় মনসার ঘর— ঈশ্বরের আবাস। এই আবেশে তিনি মেয়ের ঘরে নাতনির নাম দেন পদ্মাবতী। তিনি আমাকে শিশুকালে যেসব গল্প শোনাতেন, তার সিংহভাগ তাঁর ‘দেশের গল্প’। লোডশেডিংয়ের বারান্দায় চাঁদের আলো পড়লে তার দিঘির গহীন তলের মতো কোলের কাছে শুয়ে শোনা গল্প শিশুমনে যে মায়াকাজল পড়িয়েছিল, তা আর কখনও ভুলিনি। এমনই এক গল্পে ঠাকুমার সম্পর্কীয় এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি একবার রাতের গাঢ় প্রহরে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে আসেন। ঘর থেকে কিছু দূরে এক শালুকজলার পাশে শ্রাবণের রাত। দিকে দিকে জলের পাহারা, কাদাপথ পিছল হয়ে আছে। আকাশে মেঘ ছেঁড়া অস্বচ্ছ চাঁদ। চরাচর যেন শিবের মতো নেশামগ্ন। এমন সময় তিনি দেখেন জলার মাঝবরাবর কেমন এক অত্যুজ্জ্বল আলো। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তিনি যেন সম্মোহিত হয়ে যান। জলার মাঝে একটি শালুক হয়ে গেছে সহস্রদল এক পদ্ম। তার উপরে বসে আছেন এক সর্পসজ্জিতা দেবী। তার মাথার মুকুটের উপর এক মহানাগ। মাথায় মণি। সেই মণি থেকে ঠিকরানো অপার্থিব আলোয় জায়গাটি আলোকিত। দেবীর হাতে সাপ জড়ানো। দেবীর মুখ নাকি আশ্চর্য কোমল, মায়াবী। আস্তে আস্তে তার বরাভয় ওঠে। অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান সেই ব্যক্তি। এরপর তার আর কিছু মনে নেই।

এই গল্পের সেই পদ্মালয়া, সর্পভূষিতা কোমল মুখের দেবীর প্রতি আমার যে কি মায়া তৈরি হয়! এ যেন আমার কাছে পাড়াগাঁ-র কমলে কামিনীর অরা বহন করে। যার সিংহল সমুদ্রের মতো প্রেক্ষাপটের দুরপনেয় গরিমা নেই, কিন্তু পাড়াগাঁ-র শ্রাবণ রাত্রির বারিধারাকে করে দিতে পারে অমৃতবাহিনী। আমার সঙ্গে লগ্ন হয়ে থাকেন এই দেবী, আর প্রতি শ্রাবণ সংক্রান্তিতে সেই মনসা ঘরে দেবীর আবাহনের অনুষঙ্গ। ঈশ্বর বিশ্বাসী কিনা আমি জানি না কিন্তু পুজোর উপাচার সাজিয়ে ঈশ্বরকে আবাহনের মধ্যে যে সুন্দর আছেন আমি তার উপাসক। বুকের গভীরে আমি লালন করি মনসা পুজোর ধূপধুনোর গন্ধ, প্রতি পুজোয় আকাশ ভেঙে পড়া শ্রাবণজল— যেন দেবী কাঁদছেন। তাঁকে আর ক্রূর মনে হয় না, মনে হয় না তার চোখে আছে বৈশাখের দুপুর রোদের মতো তীব্র অভিশাপ। আমার সঙ্গে ঘুরে ফেরে কোজাগরী রাতে পূর্ণচাঁদের সামনে রাখা মূর্তিবিহীন লক্ষ্মীপুজোর বউছত্র।

আরও পড়ুন: রাখীর সঙ্গে গুলজারের যে সম্পর্ক কিংবা জ্যোৎস্নার সঙ্গে রেশমের…

সাধারণ কাজের দিনে এরা মনের কোন গহীন তলে ঘুমিয়ে থাকে। হঠাৎই কোনও আনমনা মুহূর্ত যেন বয়ে আনে প্রাচীন ধুনোগন্ধ, সেপিয়া টোনের শ্রাবণরাত। পুরুলিয়া এসে অবধি কোনও মনসা পুজোর দিনই আর বাড়ি ফেরা হয়নি। যেদিন প্রথম ব্লকে আসি, ব্লক ঢোকার পাকা রাস্তার বাঁ-হাতে পড়ে এক মনসামন্দির। দেখেই একঝলক মনে পড়ে যায় বাড়ির প্রতিমা। সেবার মনসা পুজোর আগে বাড়ি থেকে আসে এক ভারি মনখারাপের খবর। আমাদের মাটির মূর্তি সচরাচর বদলানো হয় না। সম্বৎসরের পুজো আর শ্রাবণ সংক্রান্তির পুজোয় সেই মূর্তিই সেজে ওঠে। বাবা ফোনে খবর দেন মূর্তির হাতের আঙুলগুলি নিজে থেকে খসে পড়েছে। পড়ে গেছে শিরোভূষণ পঞ্চনাগ। তাই অনেক আলোচনাতে স্থির হয়েছে নতুন দেবীমূর্তি গড়া হবে। যেহেতু জলে বিসর্জন আমাদের হয় না তাই ‘ইহা গচ্ছ ইহা গচ্ছ ইহ তিষ্ঠ ইহ তিষ্ঠ’ বলে আবাহন করা প্রতিমাকে রেখে আসা হয় কচুবনের পাশে এক সিজগাছের নীচে। আর মানভূম থেকে আমার জন্য আসে মনসা পুজোয় যাওয়ার আমন্ত্রণ। এক পরিচিত মাস্টারমশাই ডেকেছেন তাঁর বাড়ির পুজোয়।

মানভূমে মনসা পুজো চলে প্রায় সাড়ে চারমাস ধরে। ১৩ জ্যৈষ্ঠর ‘রোহিন দিনে’ তার সূচনা চলে আশ্বিনের ডাক সংক্রান্তি বা জিহুড় ডাক পর্যন্ত। এই গোটা সময়পর্বই শস্যকেন্দ্রিক বিভিন্ন উৎসবে ভরে রাখে মানভূমকে। রোহিন দিনে চাষিরা জমিতে বীজ বপন করেন। গৃহস্থের ঘরে নানা লোকাচারে আনন্দের সঙ্গে পালিত হয় রোহিন। এদিন গোবরজলগুলে বাড়ি-ঘরের চারদিকে বেষ্টনী দেওয়া হয়, যাতে  কোনও বিষাক্ত পোকা মাকড় ঘরে না ঢুকতে পারে। শুনেছিলাম এদিন আষাঢ়ী নামে এক ফল খাওয়া হয়, যার ফলে নাকি বিষাক্ত সাপের কামড়েও শরীরে ততটা বিষ ঢোকেনা। বিষধর জাত সাপ মানভূমের লোকবিশ্বাসে দেবতাজ্ঞানে পূজিত, বিশেষ করে লোকদেবতার থান সংলগ্ন জাত সাপেরা। জাত সাপ, বাস্তু সাপ মারলে সংসারে অকল্যাণ হবে মনে করা হয়। বাস্তুসাপ তো ধনবড়া— সৌভাগ্য, ধনদৌলতের প্রতীক। তাই কোনও কারণে জাতসাপকে মারতে হলে তার দেহ পুড়িয়ে সৎকার করতে হবে। মনে করা হয় প্রকৃত জাতসাপ রোহিন দিনে বেরোবে ‘রোহিন জল’ খেতে আর জিহুড় দিনে জিহুড় জল খেয়ে গর্তে ঢুকবে। এমনটি না হলে জাতসাপের কামড়ে বিষ নামবে না। ‘জিহুড়’ শব্দের অর্থ বোঝাতে আমাদের এক সহকর্মী বলেন, ‘জি’ অর্থ জীবন আর ‘হড়’ হল মানুষ। এই ডাক সংক্রান্তির দিনে পাকা ধানের শীষ ছোঁয়া আসন্ন হেমন্তের হাওয়া বয়ে যায় শস্যচরাচরে। সে যেন আবাহন করে বা ডাকে জিহুড়কে।

আরও পড়ুন: মনে পড়ে সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে চিৎকার করে বলা ‘বন্দে মাতরম’

তবে শ্রাবণ সংক্রান্তির দিনে সবচেয়ে জাঁকজমকের সঙ্গে মনসা পুজো হয় মানভূমে। বলি চড়ে হাঁস, পায়রা, পাঁঠা, ভেড়া। মনসা পুজোর ঠিক আগে ব্লক সংলগ্ন মঙ্গলবারের হাটে সে কি চৈচৈ হাঁসের ঢল! সবচেয়ে বেশি বলি হয় হাঁস। এই বলির প্রাবল্য আমার কৌতূহল জাগায়। কথা প্রসঙ্গে এক ইতিহাস অধ্যাপক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক জানান যে, সেই রোহিন দিন থেকে জমিতে যে খাটাখাটনি শুরু হয়, তা সাময়িক বিরতি পায় শ্রাবণের শেষে। হাঁসমাংস পুষ্টিবর্ধক। আষাঢ় শ্রাবণ মাস ব্যাপী কঠোর খাটুনিতে পরিশ্রান্ত কৃষকেরা হৃৎবল ফিরিয়ে আনে এই মাংস খেয়ে। তিনি এক অদ্ভুত গল্প বলেন। হাঁসের নাকি খুব হজমশক্তি। তার ছোটবেলায় বাড়িতে গোটা হাঁস এলে জোর করে হাঁসের চঞ্চু দিয়ে ষড়ভুজাকার কুড়ি পয়সা ঢুকিয়ে দিতেন। রান্নার আগে সেই হাঁস কাটা হলে তিনি দেখেছিলেন কুড়ি পয়সা অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে— তার কথায় হজম হয়ে গেছে!

ব্লক অফিসে ভিড় জমে যেত শ্রাবণ সংক্রান্তির আগে। মনরেগার টাকা ঢুকছে না কেন? টাকা দিতেই হবে পরবের আগে। আমরা চেষ্টা করি, উপরমহলে কথা বলি। এটুকুই অনেকের স্বস্তি। পুজোর দিনে ‘ভগতা’রা সারারাত ধরে মনসা থানে জাগে। দেবীমাহাত্ম্য সূচক ‘জাঁত’ গান গাওয়া হয় ঢোলবাদ্যের সঙ্গে দোহারিদের হাততালিতে— ‘দেবী এসো গো, এসো মা/ আমার আসরে…’ মনসামঙ্গলের আখ্যান প্রচলিত বা জনপ্রিয় বিভিন্ন গানের সুরে বসিয়ে গাওয়া হয়।

মানভূমের লোকবিশ্বাসে একটি কাহিনি প্রচলিত। ক্ষীরাই নদীতে মাছ ধরার সময় জেলেদের জালে প্রথম উঠে আসে ঘটবারি। এই ঘটবারি তেই দেবীর অধিষ্ঠান বলে লোকবিশ্বাস। জেলেদের জালে ঘটবারি প্রথম ধরা পড়ে। লোকসমাজে মনসার কোনও সুনির্দিষ্ট মূর্তিকল্পনার বদলে ঘটবারিতেই পুজো করে মনসাদেবীকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঘটবারিই দেবী মনসা।এই ঘটনাকে স্মরণ করে পুজোর দিন সন্ধেবেলা কোনও পুকুর, জলাশয় থেকে মনসা ঘটবারি তুলতে যাওয়ার সময় ভগতারা ঢোল, কাঁসর বাজিয়ে গান ধরে— ‘মাকে আইনতে যাব রে—/ ক্ষীরাই নদীর কূল/ হাতে দিব লাল গামছা— /চরণে দিব ফুল’। শোভাযাত্রা সহ ঘটবারি ও মনসা সিজ গাছ নিয়ে এসে তাদের স্থাপন করার রীতি ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে মূর্তি কল্পনা করা হলে কোথাও ডানহাতে শালুক, বাঁ-হাতে চিতি সাপ, মাথায় সাপ; কোথাও বা মূর্তির সঙ্গে দুই সখী; বা ডাইনে বাঁয়ে লক্ষ্মী-সরস্বতী মূর্তি পূজিত হয়। এ প্রসঙ্গে বলা যায় বাঁকুড়ার পাঁচমুড়ার বিখ্যাত মনসার ‘মেড’-এর কথা। মনসামঙ্গলের কাহিনি সংবলিত মাটির মনসা মূর্তি। কোথাও মাটির সরায় ডাক সাইজের মূর্তি, ডাকের মাথায় ফণাবেষ্টিত বিভিন্ন নাগমূর্তি।

আরও পড়ুন: গীতিকার টানে…

শ্রাবণ সংক্রান্তির পুজোয় জাঁত গানের আসর চলতে চলতে হয় ঝুঁপাইর। জাঁত গানের মূল গায়েন বা দোহারি বা শ্রোতাদের কারও ওপর ভর করেন মা মনসা। সে তখন আসরে বসে ঝুঁপতে থাকে আর সমবেত সকলে তাকে প্রশ্ন করে জেনে নেয় বর্ষফল, ক্ষয়ক্ষতির হিসেব, বর্ষাবাদল, চাষবাসের খবর। যেহেতু ঝুঁপাইর ওপর দেবী ভর করেছেন, তাই তার মুখে স্বয়ং দেবী বর্ষফল ঘোষণা করছেন মনে করা হয়। পাড়ায়, পাড়ায় বসে জাঁত গানের, সাখী গানের আসর। কুলহির মাঝখানে কোনও জায়গায় শামিয়ানা খাটিয়ে মনসামঙ্গলের আখ্যান থেকে মনসাপালার অভিনয় হয়। পুরুষেরাই সাধারণত নারী চরিত্রে অভিনয় করে। দর্শকের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে অভিনেতাদের আত্মিক যোগ তৈরি হয়, কোনও দেওয়াল থাকে অভিনেতা ও দর্শকের মাঝে। আসর ছেড়ে বেহুলা চরিত্রটি ভিক্ষা চাইলে মহিলারা কেঁদে আকুল হন।

ধূপধুনো, দীপ, ফুলফল ও ধান, খইয়ের শীতল ভোগে দেবীর আরাধনা হয়। পুজোর পরে মূর্তি বা ঘটবারি কেউ বিসর্জন দেন, কেউ রেখে দেন। জেলেরা পরের বছর বিসর্জন দিয়ে জলাশয় থেকে নতুন ঘটবারি তুলে আনেন। শোভাযাত্রা সহ বিসর্জন কালে ভারাক্রান্ত মনে ভগতারা ভাসান গান করেন।

মানভূমে কৃষক, কেওট, বাইদ্যা বা বেদিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেবীপুজোর অধিক প্রচলন দেখা যায়। রোহিন দিন থেকে মনসা থানে ওঝা বা গুরুরা তাদের উত্তরাধিকার হিসাবে ঝাড়ফুঁক, তুকতাক তেল পড়া, জল পড়া শেখানোর জন্য চ্যালা বা শিষ্য রাখে। কেউ কেউ নিজে থেকেই শিষ্যত্ব নেয়। ডাক সংক্রান্তির দিন পর্যন্ত চলে এই প্রশিক্ষণ পর্ব। আমাদের অফিসের এক বয়স্ক সহকর্মী বলছিলেন যে, আগে বেদিয়াদের মধ্যে অনেকে মনসা পুজোর পরের দিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঝাঁপান করতেন। গরুর গাড়িতে মাচা বেঁধে হুকড়ী করে সাপ নিয়ে গিয়ে সাপখেলা দেখাতেন। হাতে, গলায় সাপ পেঁচিয়ে কখনও বা বিষধর সাপ মুখের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ রেখে অথবা সাপটিকে দিয়ে শরীরের কোনও অংশে কামড়ানো—  চলত এই সঙ দেখানো। তাদের সঙ্গে ঘুরতেন ওঝা, গুণিনরা। ভূতপ্রেত, দানো, ডাইনে বিশ্বাসী মানুষের সামনে তারা তৈরি করতেন ঐন্দ্রজালিক পরিবেশ। মন্ত্রের লড়াই চলত। তারা গালিগালাজ খিস্তি খেউড় করে ডাকাডাকি করতেন ডাইন, অপশক্তিকে— তাদের কত ক্ষমতা আছে এসে দেখিয়ে যাক, কত বিষ তারা ঢালতে পারে ওঝার শরীরে ঢালুক। সবকিছু কাটান করতে পারে তারা। বাস্তবিকই মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখত, শুনত। এখন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও পুলিশি কড়াকড়িতে এইসব লোকবিনোদনের অঙ্গগুলি আর চোখে পড়ে না। কোনও প্রত্যন্ত গ্রামের আবডালে হয়তো বা চলে এই খেলা। বেদিয়ারা জিহুড় ডাকের পর হুকড়ী বা ঝাঁপি থেকে বেশিরভাগ সাপকে বনে ছেড়ে দেয়। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে দু-একটি সাপকে সঙ্গে রেখে দেয় মাঙন করা, বা খেলা দেখানোর জন্য। বাকিরা শীতঘুমের দিকে যেতে থাকে। আবার রোহিন জল খেয়ে বেরোলে শুরু হবে সাপখেলা।

পুরুলিয়া থেকে আসা এক সহকর্মী বলছিলেন, বোরো থানার এক গ্রামে এক গৃহস্থের মনসা পুজোর দিনে ঘটবারির লাল শালু ও শীতল ভোগ আসে গ্রামের মুসলমান ঘর থেকে। কোথাও মনসা পালায় অংশ নেওয়া মুসলিম অভিনেতা দর্শককে আকুল করে তোলেন। লোকজীবনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ হয়ে ওঠে মনসা পূজা।

আরও পড়ুন: মুর্শিদাবাদ জেলার সংবাদ-সাময়িক পত্রের দু’শো বছর

মনে করা হয় সাপের ভীতি থেকেই মনসা পুজোর উদ্ভব বঙ্গে। পদ্মাপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের মতো পুরাণে শিবের মানসকন্যা, পদ্মপত্রে জন্মানো পদ্মা মনসাকে পৌরাণিকতার আদল দেওয়া হলেও অনেক পণ্ডিতই মনসাকে লৌকিক দেবীরূপে মানতে আগ্রহী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সর্পপূজায় সাপ প্রজনন শক্তির প্রতীক। মানভূমে সাড়ে চার মাস সময় ধরে চলা মনসা পুজোর সময়ে পূর্ণগর্ভা ধরিত্রী হয়ে ওঠে শস্যপ্রসবিনী। শ্রাবণ সংক্রান্তির পর থেকে খেতে বীজ বপন, কীটনাশক প্রয়োগের মতো শ্রমসাধ্য কাজ কমে আসে। তখন শুধু শস্য আগলে রেখে তার পূর্ণতা প্রাপ্তির প্রতীক্ষা। এই সময়কালে সাপের উর্বরতা প্রতীক আর ধরিত্রীর শস্যপ্রজননের যেন সমাপতন ঘটে মানভূমে। তবে আমার আর যাওয়া হয়ে ওঠে না পুজো দেখার নিমন্ত্রণ রাখতে। কিন্তু ঘরে চলে আসে প্রসাদ। ঠিক যেমন বাড়িতে পুজোর দিনে মা বানান তালের বড়া, খিচুড়ি। বাড়ি থেকে অনেক দূরে বাড়ির গন্ধ, দেশের হাওয়া ধুনোগন্ধ বয়ে আনে এই প্রসাদ। ব্লক চত্বরে ঘোরে কয়েকটি পোষা রাজহাঁস। তাদের বৃষ্টিতে ভিজতে দেখে আমার আচমকাই পদ্মাপাড়ের কথা মনে পড়ে। সেই পদ্মাসনা, সেই নাগমণি, শৈশবের কল্পনার সেই কমলে কামিনী। আর সংক্রান্তির বৃষ্টিকান্না আশীর্বাদ করে জানিয়ে যায় দেশে দেশে ঘর আছে আমার, পূর্বজদের যূথস্মৃতির দেশ আছে মনের গহীনে। সে দেশের নাগরিকত্ব, বসবাস নির্বাধ…

ক্রমশ…

অঙ্কন: লীনা মণ্ডল, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট অ্যান্ড ডেপুটি কালেক্টর
প্রচ্ছদচিত্র: প্রচলিত
নামাঙ্কন: আল নোমান (বাংলাদেশ)

এই ধারাবাহিকের বাকি পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তুৎ পাখি উড়া দিলে…
পশ্চিমে দেশান্তরের মরশুম
বিরহড়দের কাহিনি: পুরাকথায়, গানে
সূর্যাস্তের দেশে
মাটি-জল-মুক্তামাছ
এই ঘর, এই উপশম
সিসিফাস ও স্বচ্ছতার পাঠান্তর
স্বাধীনতার সূর্যদের লড়াইধন্য সেইসব পবিত্র ভূমি

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *