১৬ আগস্ট: কলকাতা শহরের ইতিহাসে দু’টি মর্মান্তিক দিন

শুভ্রাংশু রায়

একদম শিরোনাম থেকেই আলোচনা শুরু করা যাক। ১৬ আগস্ট তো একটি তারিখ। মর্মান্তিক শব্দটি ব্যবহার করা হলেই সহজেই আমাদের মনে চলে আসে ১৬ আগস্ট, ইডেন গার্ডেন্সে সেই বড় ম্যাচ। গ্যালারিতে ১৬ জন ফুটবলপ্রেমীর মৃত্যু। কিন্তু দু’দিন কেন? কারণ ঠিক তারও চৌত্রিশ বছর আগে শহর আরও বড় মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল। ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘ক্যালকাটা কিলিং’। মারা গিয়েছিলেন দুই বা তিন হাজারের বেশি মানুষ। সেই কারনেই শিরোনামে দু’টি শব্দের ব্যবহার। চৌত্রিশ বছর ব্যবধানে একই তারিখে এই দু’টি ঘটনা ঘটে যাওয়া নেহাতই কাকতলীয় হতে পারে। কিন্তু এই দু’টি দিন শহরের ইতিহাসে কালো দাগ হিসেবে রয়েই যাবে। আর রয়ে যাবে চর্চা। সময়ের আস্তরণ তাতে কিছুটা প্রলেপ দিতে পারে হয়তো। কিন্তু এ ক্ষত পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব নয় কখনোই।

আরও পড়ুন: মাহি মার রাহা হ্যায়!

ফিরে দেখাটা সাম্প্রতিক থেকে শুরু করা যাক। আসলে লিখছি সাম্প্রতিক কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চার দশক আগের ঘটনা। তবু এই কলকাতা শহর বা শহর সংলগ্ন অসংখ্য মানুষ আছেন যারা সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। কেউ মাঠে ছিলেন। কেউ পাড়ায় নিহত বা আহত মানুষদের দেখেছেন। ঘটনার বিবরণ শুনেছেন বা পরের দিন খবরের কাগজের পাতায় পড়েছেন। সেই রাতে আকাশবাণীর রাতের অনুষ্ঠানে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথিকা শুনেছেন। কিছুদিন পরে মান্না দে-র গলায় সুপর্নকান্তি ঘোষের সুরে “খেলা ফুটবল খেলা” গানটি শুনেছেন। পরের বছর থেকেই এই বিশেষ দিনটি ফুটবলপ্রেমী দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়। আয়োজন করা হয় এই উপলক্ষে রক্তদান শিবিরেরও। এই বছর এই করোনা আবহে রক্তদান শিবির আয়োজন বন্ধ হয়নি।

সেদিনের কথা অনেকেরই মনে আছে। বিশেষত যাঁরা ষাট বা সত্তরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। যেমন ব্রহ্মানন্দ কেশব চন্দ্র কলেজের ইতিহাসের প্রাক্তন অধ্যাপক শান্তনু চক্রবর্তী। তখন বয়স ছিল পনেরো। সেদিন ছিলেন ইডেনে ছিলেন ক্লাব হাউজ গ্যালারির মিডল টাওয়ারে। বড় ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে শুরুতে মাঠের মধ্যে গণ্ডগোল ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতে। “কিছু দর্শককে টপটপ পাকা ফলের মতো রঞ্জি স্টেডিয়ামের আপার টাওয়ার থেকে নিচে পড়তে দেখেছিলাম। বাড়ি নিরাপদে ফিরেছিলাম বটে, কিন্তু ফুটবল মাঠের প্রতি কেমন যেন বিতৃষ্ণা এসে গেল।সেদিনের পর আজ অবধি এই চল্লিশ বছরে একদিনের জন্য আর মাঠে যাইনি।”

আরও পড়ুন: ১৬ বছরের পুরনো ৫০০০ মিটারের বিশ্বরেকর্ড ভাঙলেন উগান্ডার চ্যাপ্টেগেই

একই গ্যালারির ওপরে টাওয়ারে বসে পুরো ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন সেদিনের সদ্য স্কুল উত্তীর্ণ অলক চক্রবর্তী। আজ চল্লিশ বছর পর বিদ্যানগর কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক অলক চক্রবর্তীর পরিণত গলায় সেদিনের ঘটনার জন্য দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে।” সেদিন মাঠের উত্তেজনা মুহূর্তের মধ্যে গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। রঞ্জি স্ট্যান্ডে কিছু লোক উন্মক্তের আচরণ পুলিশ সময়মতো ব্যবস্থা নিলে এতগুলো প্রাণ অকাতরে ঝরে যেত না।”

সে বছর আর মাঠে যাননি অলকবাবু। তবে বেশিদিন মাঠের আকর্ষণকে এড়িয়ে থাকতে না পারলেও সেই ১৬ আগস্টের ক্ষত কোথাও আজও নাড়া দেয় তাঁর মনকে। পরের দিন ফুটবলকে ‘ শহরের নতুন ঘাতক ‘ হিসেবে চিহ্নিত করে ছিল একটি নামজাদা দৈনিক পত্রিকা। সেদিন মাঠে ১৬ জন প্রাণ দিয়েছিলেন। আহতের সংখ্যা ছিল কয়েকশো।

কিন্তু আরো চৌত্রিশ বছর আগে কলকাতা শহরে যে কুখ্যাত ঘটনাটি ঘটেছিল, তাতে হতাহতের সংখ্যা বহুগুণ বেশি ছিল। ১৯৪৬ সালে কলকাতা শহরে যে প্রকৃত অর্থে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ দেখা গিয়েছিল তা শহরের ইতিহাসে একটি বেনজির ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। প্রকৃতপক্ষে পরিষ্কার করে বলে নেওয়া ভালো একমাত্র ১৬ আগস্ট তারিখটি ছাড়া এই দু’টি ঘটনার ব্যাপ্তি, ভয়াবহতার কোনও তুলনাই চলে না।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৮০-র ইডেনের ঘটনায় মৃত্যু ছিল ঘটনার আকস্মিকতার শিকার। কিন্তু ১৬ আগস্ট, ১৯৪৬-এ যে বিশাল সংখ্যক মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন বা মাথায় ছাদ বিহীন হয়েছিলেন তা ছিল রীতিমত পরিকল্পিত এবং ক্ষমতার ভাগাভাগির নগ্ন আকাঙ্খার খুবই নির্লজ্জ পরিণতি। ১৯৪৬-এর ১৬ আগস্টের স্মৃতি নিয়ে শহরে বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা আজ নগণ্য। তবু যাঁরা আছেন, যেমন সন্তোষপুরের নব্বুই ছুঁইছুঁই নিভারানী ভট্টাচার্যের গলায় আতঙ্ক উঠে আসে সেই দিনের ঘটনার কথা মনে করতেই। তিনি বেশি কথা মনে করতে চান না বা বলতেও চান না হয়তো। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “এমন দিন কাউকে যেন দেখতে না হয়”।

দু’টি ঘটনার সময়ই দু’টি পক্ষ ছিল। কোনও ক্ষেত্রে ফুটবল দলের সমর্থক অপর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সমর্থক। দ্বিতীয় ঘটনার ক্ষেত্রে অঘটনের বিস্তৃতি নিরীহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রে শেষ বিচারে প্রাণ গিয়েছিল মানুষের। কত মানুষের প্রাণ গিয়েছিল বা সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছিল সময়ের ব্যবধানে সেটাই বিবেচ্য হয়। তাই খুব সচেতনভাবেই এই লেখায় দু’টি ঘটনার কোনও পক্ষের নাম উল্লেখ করা হয়নি। কারণ এটা সবারই জানা। শুধু এটাই কাম্য এই রকম মৃত্যুময় দিন শহরকে আর যেন দেখতে না হয়।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক

আমরা এখন ফেসবুকে। আমাদের খবর আপনাদের পছন্দ হলে আমাদের ফেসবুক পেজে আসুন। ফেসবুক পেজ লাইক করতে হলে সার্চ করুন mysepik আর প্রেস করুন লাইক বাটন।

Facebook Twitter Email Whatsapp

7 comments

  • Mitrangshu Banerjee

    অনবদ্য

  • Debashis Majumder

    Simply outstanding article

  • মোহাম্মদ আবু নাসিম

    সত্যি খুব সুন্দর ভাবে দুটি ঘটনাকে ইতিহাসের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। লেখককে ধন্যবাদ জানাই আজকের দিনটির গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য।

  • ১৬ ই আগস্ট তারিখটি যে শুধু একটি তারিখ নয় দুটি ইতিহাস তা উপলব্ধি করা গেল এই লেখাটি পড়ে। অসংখ্য ধন্যবাদ প্রাবন্ধিক, গবেষক ,অধ্যাপক ,শুভ্রাংশু রায় কে।

  • শ্রাবন্তী মণ্ডল

    অনবদ্য,অনেক কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ স্যার

  • আমার কাছে 16ই আগস্ট ক্যালেন্ডারের শুধু মাত্র এক তারিখ ছিল, কিন্তু তার মধ্যে যে দুই মর্মান্তিক ঐতিহাসিক ঘটনা নীহিত আছে তা আজ জানলাম।
    লেখাটি খুব ভালো লাগছে ।

  • মর্মান্তিক ঘটনার এক মরমী নিবেদন –সদ্য কলেজের শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছি , ঐ ভয়ংকর ঘটনা আজ ও ম’ন কে ভারাক্রান্ত ক’রে ! ধন্যবাদ অধ্যাপক শুভ্রাংশু রায় কে এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি আমাদের ম’নে ক’রিয়ে দিলেন নিহত ঐ ক্রীড়াপ্রেমীদের –তাঁদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা এবং আবারো ধিক্কার জানাই এই ধ’রণের বর্বর আচরণের । খেলা যেন রসাস্বাদনের মাধ্যমই থাকে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *