উদয়ভানু

সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়

“আপনি ভাড়ার টাকা লইতে আইসেন হেই লইয়্যা কথা কইবেন, ইলশা তুইল্যা কথা কইবেন না।” প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প অবলম্বনে সুকুমার দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘ওরা থাকে ওধারে’ (১৯৫৪) ছায়াছবির এক অমোঘ সংলাপ। নেপালের চরিত্রে সাম্যময় ওরফে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কথনে আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার স্মৃতি-সত্তা অনেকটাই ধরা পড়েছিল। তখন র‍্যাডক্লিফ কাটাকুটির বিহ্বলতা পেরিয়ে একটা জাতি আবার জেগে উঠছে বিয়োগচিহ্নের উপান্তে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির দীর্ণ যাপনগুলো ধরা পড়ছে সেলুলয়েডের কাব্যে এবং তাতে নানা চরিত্রে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিগনেচার অভিব্যক্তি সেই বিয়োগচিহ্নের কথকতার আড়ালে প্রতিস্পর্ধায় জেগে উঠে বলছে “আমি ঢাকার ভানু”।

আরও পড়ুন: শতায়ু-তরুণ সাম্যময় ভানু

Ora Thake Odhare: Amazon.in: Uttam Kumar, Suchitra Sen, Molina ...

ঢাকার মৈসুন্ডিতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির শতবর্ষ। ছোটবেলা অনুশীলন সমিতির সঙ্গে সখ্যের কারণে নজরে পড়েন পরবর্তীতে অলিন্দ যুদ্ধখ্যাত বিখ্যাত বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের। বড়দিদির সূত্রে কিছুটা যোগ ছিল প্রবাদপ্রতিম লীলা রায়ের জয়শ্রী দলের সঙ্গেও। এই ছটফটে প্রাণচঞ্চল কিশোর ছেলেটিকে ভার দেওয়া হয়েছিল ঢাকার সদরঘাটে আগত বিশিষ্ট কিছু ব্রিটিশ রাজপুরুষের গতিবিধি নজর রাখার জন্য। সেই কাজের দায়িত্ব কুশলী দক্ষতায় পালন করেন সাম্যময়। এর বদলে মিলত চার্লি চ্যাপলিনের ছবি দেখার পুরস্কার। যদিও দীনেশ গুপ্তের ফাঁসির কিছু পরে নানা ধরপাকড় শুরু হওয়ায় ওঁকে লুকিয়ে চলে আসতে হয় কলকাতা শহরে। প্রাথমিক একটা চাকরিতেও ঢোকেন আয়রন অ্যান্ড স্টিল ওয়ার্কসে। যদিও অভিনয়ের একটা অমোঘ ডাক শুনতে পাচ্ছিলেন নিজের ভেতরে।

আরও পড়ুন: মা টেরেসা ও তাঁর সন্তানেরা (প্রথম পর্ব)

NURSERY ALPANA BANERJEE BENGALI rare EP RECORD 45 vinyl INDIA 1974 ...

গত শতাব্দীর চারের দশকের শেষের দিকে টালিগঞ্জের রুপোলি দুনিয়ায় প্রবেশ করেন ভানু। প্রথম কয়েক বছর পার্শ্বচরিত্রের আচ্ছাদনে ওঁর নিজস্ব নির্ভার অথচ সেই কৌলিক প্রস্তরসাক্ষর অভিনেতা আত্মপ্রকাশ করেনি। সেই সুযোগ এল নির্মল দে পরিচালিত সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩) ছায়াছবিতে। তুলসী চক্রবর্তী, মলিনা দেবী, পদ্মা দেবী, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়ের মতো এতজন শক্তিশালী অভিনেতার পাশাপাশি আলাদা করে নজর কাড়েন ভানু ওঁর যাপনবোধের সরসতায়। এই চলচ্চিত্রের প্রায় প্রথম দিকে সেই মেসবাড়ির প্রাথমিক এক এসটাব্লিশমেন্ট শটে মদনের চরিত্রে নবদ্বীপ হালদারকে উদ্দেশ্য করে ভানু ওরফে কেদার বলে ওঠেন “উফ অহন আবার চা লইয়্যা আইলি।” সকালবেলায় বারোয়ারি বাথরুমের রাউন্ড রবিন ভাগ বাঁটোয়ায়ার আড়ালে জীবনের নিত্যকার মলিনতা কি নির্মম অথচ হাস্যরসের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে প্রতিভাত হল। এই ছবিটা আমাদের অস্তিত্বের মায়াঘোরে এখনও তেমনভাবেই স্বর্ণাভ হয়ে আছে।

আরও পড়ুন: ‘সমগ্র চেতনা শুধু গানে’…

mini-review marathon: the old-ish Bengali films, Uttam edition

এরপর অসংখ্য ছবিতে সেই যাদের পিঠে অদৃশ্য এক কাঁটাতারের দাগ দেখতে পান অনেক মহামান্যেরা, সেই বাঙাল চরিত্রের কৌম শরীরে ওঁর অভিনয় একাঙ্গী হল, আদৃত হল দর্শকচিত্তে। কিন্তু এর আবডালে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অনেকটা কাছের মানুষ হয়ে গেছেন ততদিনে । ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘মৃতের মর্ত্যে আগমন’, ‘পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘আশিতে আসিও না’-র মতো ছবি কমেডিক ট্রিটমেন্ট মানুষ বরণ করেছেন আন্তরিকভাবে। আবার এর মধ্যে জহর রায়ের সঙ্গে ওঁর যৌথ স্ল্যাপস্টিক অনুষঙ্গে ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’-এর মতো ছবি নির্মিত হয়েছে যার মধ্যে লরেল-হার্ডি জুটির প্রচ্ছন্ন আদল থাকলেও বাঙালিয়ানার স্বকীয়তার অনন্য সেই ছবি। ছবির চরিত্রের নামে অভিনেতার নাম অথবা নম দ্য প্লুম-এর এই ব্যবহার এদেশের প্রেক্ষিতে অভিনব। চ্যাপলিন, বাস্টার কীটন বা হ্যারল্ড লয়েডের ছায়াছবিকে অধ্যয়ন করেছিলেন ভানু। এইসব প্রবাদপ্রতিম অভিনেতারা তাঁদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শারীরিক অভিব্যক্তিকে কীভাবে চরিত্রের বাহ্য আদলের মধ্যেও সপ্রাণ ভাষায় বয়ে বেড়িয়েছেন তার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তিনি, যে ভাষার সিলেবল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অব্যক্ত।

আরও পড়ুন: বিসমিল্লাহ খান ভারতীয় সংগীত জগতের সন্ত কবীর

5 comedy films of Bhanu which we will see again and again| Half Samosa

জীবনশিল্পী ছিলেন তিনি, তাই দেখি নির্মল দে পরিচালিত ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে’ (১৯৫৯) ছবিতে কমেডি অভিনেতার জীবনের নিকষ কালো কিছু বিষাদের ছবি কি গহীন অনুভূতির দীপ্তিতে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ভানু! প্রশ্ন জাগে, এর মধ্যে লুকিয়ে কি ছিল নিজের জীবনের কিছু কথামালা, বাঁচার কিছু অমোঘ পঙ্‌ক্তি? একজন চরিত্রাভিনেতাকে যে ধরনের মালিন্যের মাঝে নিয়ত সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয় চলচ্চিত্রের বাজারি শুভঙ্করী আর্যার ধারাপাতে। তারই ছায়া কি সত্যিই ভেসে এসেছিল এই চরিত্রের শরীরে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। কিন্তু যেটা জানি, তা হল টালিগঞ্জের অনুদার ঔদাসীন্যে তাঁকে এক সময় প্রাণপাত করে অভিনয় চালিয়ে যেতে হয়েছিল। পেশাদারি থিয়েটার, রেডিও নাটক, অডিও কৌতুক ছাড়াও এমনকি গ্রামে গঞ্জে ছুটে বেরিয়েছিলেন বায়না করা যাত্রার মঞ্চে। একসময় অসংখ্য মঞ্চসফল নাটকে অভিনয়ের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র এবং মহাজাতি সদনের ৮২-তে পা

ওঁর অভিনয় জীবনের প্রথমার্ধেই সলিল সেনের প্রখ্যাত ‘নতুন ইহুদী’ নাটকে সেই ঠাঁই হারানো মানুষের চরিত্রে ওঁর অভিব্যক্তির গভীরতা দর্শকের হৃদয়ের গভীরে স্পর্শ করেছিল। শেষ জীবনে ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’-এর মত ছবিতে অকালে ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যের যে মানুষটাকে আমরা দেখতে পাই তিনিও কি গভীর ওই চরিত্রের নিমগ্ন চরণে। এই পোড়া দেশের নির্মম অনবধানে ১৯৮৩ সালের ৪ মার্চ মাত্র বাষট্টি বছর বয়সে চলে গেছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পার্থিব অস্তিত্বের বন্ধন কাটিয়ে। ‘‘…যখন বিদূষক কাঁদে, তখন তার সাথে কাঁদে ভগবান’’ দাদাঠাকুরের সেই অমোঘ উক্তির আড়ালেও তাঁর যাপনে দুঃখের বাদী স্বরগুলোকেও সমবাদী হাস্যরসের জারণে উদ্ভাসিত করে তোলার জন্য আজও আমাদের চেতনার সীমান্তে উদয়ভানু হয়ে আছেন তিনি।


লেখক বিশ্বসাহিত্য, মার্গ সংগীত আর সারা পৃথিবীর সিনেমার একনিষ্ঠ ভক্ত। প্রথাগত শিক্ষা প্রযুক্তিবিদ্যায় (স্নাতকোত্তর) আর বর্তমানে সেই বিষয়েরই শিক্ষকতায় যুক্ত।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *