অনন্য অলিম্পিক দর্শন

সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

ছেলেটার তখন ক্লাস ওয়ান। তার দু’বছর আগে বাড়িতে টেলিভিশন সেট এসেছে। তখন অবশ্য টিভি মানেই সাদা-কালো। আর কোনও টিভি, বিজ্ঞাপনী ভাষ্যর মতো ‘প্রতিবেশীর ঈর্ষা’র কারণ হত না, বরং পাড়ায় কোনও একটা বাড়িতে টিভি থাকলে সেটা সারা পাড়ারই টিভি, এমনটা মনে করারই রেওয়াজ ছিল। টিভি-তে কোনও খেলা দেখানো হলে টিভি-র ঘরটা হয়ে যেত গ্যালারি। সেখানে বাড়ির মালিকও যে ভালো জায়গা পাবেন, এমন কোনও গ্যারান্টি ছিল না। এমনই ছিল সময়। সালটা ১৯৮০। সেই সময়েই ছেলেটা প্রথম অলিম্পিকের নাম শুনেছিল। মস্কো অলিম্পিক। সে অলিম্পিকে ভারত সোনা পেয়েছিল হকিতে; সেই সোনাই ছিল দেশের একমাত্র পদক। সে-অলিম্পিকে সব দেশ যোগ দেয়নি; আমেরিকা আর তার বন্ধু রাষ্ট্ররা বয়কট করেছিল সোভিয়েত দেশের সে-অলিম্পিক; কোনও দিন ‘ঠান্ডা লড়াই’-এর নাম না-শোনা ক্লাস ওয়ানের ছেলেটা কী করে যে এত ‘খবর’ পেয়েছিল, তা আজ চার দশক পরে ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়! আশির অলিম্পিকের আর একটা স্মৃতি ছেলেটার আছে। তা হল ছবির স্মৃতি। মস্কো অলিম্পিকের ম্যাসকটের ছবি; নাম তার মিশা বা মিশ্‌কা। ভারি মিষ্টি দেখতে ছিল সে! টেডি বিয়ার-বিহীন শৈশব কাটানো ছেলেটার আদরের ভাল্লুক সে। আজ গুগল করে সে দেখছে মিশার ছবি এঁকেছিলেন ছোটদের বইয়ের অলংকরণ-শিল্পী ভিক্টর চিজিকভ। তাহলে ছেলেটার কোনও রুশ বইয়ের ছবিও কি চিজিকভেরই আঁকা ছিল? তাই চেনা লেগেছিল? কে-জানে! গুগল জানাচ্ছে, মিশাই ছিল কোনও খেলার প্রথম ম্যাসকট। তাই কি মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে মিশা? ভাবতে ভাবতেই ছেলেটার মনে পড়ে বিরাশির দিল্লি এশিয়াডের ম্যাসকট মিষ্টি হাতি আপ্পুর কথা। কথা তো হচ্ছিল অলিম্পিকের; কাজেই এশিয়াডের কথা এখন থাক।

আরও পড়ুন­: পূর্ণচন্দ্র ব্যানার্জি, মোহনবাগান এবং বাঙালির প্রথম অলিম্পিকে অংশগ্রহণ: ১৫ আগস্ট, ১৯২০

ম্যাসকট মিসা

চুরাশির অলিম্পিক মানেই পি টি ঊষা। লস অ্যাঞ্জেলেসে হওয়া সেই অলিম্পিক ছেলেটার মনে আছে ঊষার জন্যই। হিটে প্রথম হয়ে ঊষা উঠেছিলেন চারশো মিটার হার্ডলসের ফাইনালে। ছেলেটার মনে আছে, তখন তাদের বাড়িতে ‘যুগান্তর’ কাগজ আসত; সে-কাগজে হেডিং হয়েছিল— ‘অলিম্পিকের আকাশে ঊষার আলো’। তবে ভোরের সে আলোতে আঁধার ঘনিয়ে এসেছিল তার পরেই। ফাইনালে ঊষা একটুর জন্য ব্রোঞ্জ পদক হারান। একটুর জন্য ব্যাপারটা যে কী, তা ছেলেটা সেদিন বুঝেছিল! এমনিতে অঙ্ক ক্লাসে ক্লাস শেষের ঘণ্টা পড়ার পরে স্যার যখন ক্লাসরুম ছেড়ে চলে যেতেন, তখন সে আর তার দু’জন দুষ্টু বন্ধু প্রায়ই বলত যে স্যারের করতে দেওয়া শেষ অঙ্কটা একটুর জন্য শেষ হয়নি! কিন্তু একটুর জন্য মানে যে এক সেকেন্ডের একশো ভাগের এক ভাগও হতে পারে তা সেদিন-ই ছেলেটা জেনেছিল!  অত ছোট সময় বের করা যায়? ছেলেটার বিস্ময়ের সীমা ছিল না!

আরও পড়ুন: একশো বছর পূর্ণ প্রথম কলকাতা ডার্বির গোলের

সেই স্বপ্নভঙ্গের দৌড়

ছেলেটার স্কুলবেলা দেশের অলিম্পিক-পদক বুভুক্ষু হয়েই কেটে গিয়েছিল। ১৯৮৪, ১৯৮৮, ১৯৯২—কোনওবারেই ভারতের কোনও পদক জোটেনি। পদক এলো ১৯৯৬-তে, কলকাতার ছেলে লিয়েন্ডার পেজের হাত ধরে। মেন্স সিঙ্গলসে লিয়েন্ডার সেমিফাইনালে হেরে গেলেন মার্কিন টেনিসতারকা আন্দ্রে আগাসির কাছে। পরে অবশ্য ব্রোঞ্জ জিতলেন ফার্নান্দো মেলিগেনিকে হারিয়ে। হৃদয়ভঙ্গ আর আনন্দে মোড়া এই দু’টো ম্যাচই ছেলেটা টিভি-তে সরাসরি দেখেছিল।

আরও পড়ুন: ৪১ বছর পরে হকিতে মেডেল এলো ভারতের: এখন প্রশ্ন একটা না দু’টি?

অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী লিয়েন্ডার

তারপর থেকে ভারত প্রতি অলিম্পিকেই একটা-দু’টো পদক পায়। কর্মজীবনে ব্যস্ত ছেলেটা খবর রাখে, খবরের কাগজে পড়ে সেসব খবর। তার মধ্যেই ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে ২০০৮-এ। ছেলেটা তার কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পথে খবর পায় অভিনব বিন্দ্রার লক্ষ্যভেদের। ব্যক্তিগত ইভেন্টে ভারতের প্রথম সোনা জয়। শ্যুটিংয়ে ভারতের সোনা জয়ের খবর যিনি জানিয়েছিলেন  সেই সহকর্মী ক্রীড়াপ্রেমী। তারপর  দু’জনে মিলে চলল কর্মক্ষেত্রে ভারতের সোনা জয়ের প্রচার। বেশ মনে পড়ে, কর্মক্ষেত্রে চালু থাকা কম্পিউটারে বারবার সেই লক্ষ্যভেদের ছবি দেখার গল্প!

আরও পড়ুন: মেডেল জয়ের নেপথ্য নায়ক ‘ওয়ারেবল টেকনলজি’

সোনাজয়ী অভিনব

২০১২-তে হাফ ডজন পদক পাওয়ার অভূতপূর্ব ঘটনা সেদিনের সেই ছেলেটাকে নাড়া দিয়ে যায়। আর একেবারে টাটকা স্মৃতি হয়ে রয়ে যায় ২০১৬-তে সিন্ধুর ব্যাডমিন্টনে সোনা হারানো আর দীপা কর্মকারের একটুর জন্য ব্রোঞ্জ হারানোর পারফরম্যান্স সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা।

তবে সেই সব কিছুকেই ছাড়িয়ে গেল এবারের টোকিও অলিম্পিক। ছাড়িয়ে যাওয়া মানে এতদিনকার সবচেয়ে বেশি পদক সংখ্যার রেকর্ড ভেঙে সাতটা পদক জয়ের কথা বলা হচ্ছে তা নয়। এবারের অলিম্পিক সেদিনের সেই ছেলে, আজকের মাঝবয়সি লোকের ‘দেখা’র অভিজ্ঞতায় অনন্য হয়ে রইল। এবারের অলিম্পিকের আসর যখন বসল তার প্রায় দেড় বছর আগে থেকে নানান নামে গৃহবন্দিত্ব চলছে। সব যে একইভাবে চলছে তা নয়। লকডাউন, আনলক এক-দুই-তিন পার হয়ে এখন চলছে আত্মশাসন পর্ব। আর এভাবে অনেকের মতোই ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এ অভ্যস্ত হয়ে গেছে অলিম্পিকের পুরনো সেই অনুরাগী। আর এই ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ তাকে এনে দিল হাত পেতে নিয়ে চেটেপুটে অলিম্পিক দেখার সুযোগ। সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের সঙ্গে ভারতের সময়ের পার্থক্য ছিল খেলা দেখার পক্ষে ভারি অনুকূল। ফলে ভোর পাঁচটায় উঠে টি ভি খুলে অলিম্পিক দেখা শুরু হত যা চলত বিকেল অবধি। সঙ্গে থাকত ভারতের সেদিনের খেলার তালিকা; কখন কার কোন ইভেন্ট। গৃহবন্দিত্ব মানুষকে নিঃসন্দেহে একা নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে। কিন্তু কী আশ্চর্যভাবে যে দল বেঁধে এবারের অলিম্পিকের বিভিন্ন খেলা দেখা হল সে-কথা ভাবতেই রোমাঞ্চ হয়। এই অলিম্পিক-দর্শকরা একসঙ্গে খেলা দেখত বটে, তবে কেউ কারোর পাশে বসে দেখত না। সকলেই দেখত যে যার বাড়ি বা কাজের জায়গায় টিভি-তে বা স্মার্টফোনে।

আরও পড়ুন: শৈশবের হিরো, কৈশোরের গুরু

আর তাদের দেখার সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করত খেলাপ্রেমীদের এক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। সে কী উত্তেজনা! খুব মনে পড়ে ভারতের হকি ম্যাচগুলোর কথা। কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের পুরুষদলের গ্রেট ব্রিটেনকে হারানোর উত্তেজনা বা তারপরে জার্মানিকে হারিয়ে ভারতের ব্রোঞ্জ জেতার আনন্দ সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার স্মৃতি ভোলা যায় না। একইরকমভাবে মনে পড়ে মহিলা হকি দলের আগেরবারের সোনাজয়ী অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর আনন্দ আর শেষে গ্রেট ব্রিটেনের কাছে অল্পের জন্য হেরে ব্রোঞ্জ হাতছাড়া হওয়ার বেদনা। আর হরষে-বিষাদে সব সময়ই পাশে ছিল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের বন্ধুরা। মুষ্টিযুদ্ধ, কুস্তি— সব খেলাতেই জয়-পরাজয়ের আনন্দ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া বন্ধুদের সঙ্গে। কেউ কি ভেবেছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা গলফ খেলা দেখবে? সেটাও হল অদিতি অশোকের সাফল্যকামনায়। একটুর জন্য বেশ কিছু পদক এলো না। কেউ কেউ গ্রুপে লিখল, “আমরা কি চতুর্থ হওয়াতে প্রথম হচ্ছি?”

আরও পড়ুন: তিনকাঠির ত্রাতা

তবে যার শেষ ভালো তার সব ভালো। সমাপ্তির আগের দিন ভারত প্রথমে পেল কুস্তিতে ব্রোঞ্জ। তারপরে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জ্যাভলিন থ্রোয়ের ফাইনাল। নীরজ চোপড়ার জন্য দুরুদুরু বুকে টিভি-র সামনে বসা। একা। কিন্তু আসলে একা নয়, সবাই মিলে। নীরজের প্রথম থ্রোই আশা জাগাল, দ্বিতীয় থ্রোতে দূরত্ব আরও বাড়ল। কেউই আর সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে পারল না। অবশেষে এলো ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড থেকে অধরা সোনা। ফাইনালে সবমিলিয়ে ষাটটা জ্যাভলিন ছোড়ার প্রতিটা মুহূর্তে একে অন্যকে সাহস দিয়ে গেল, ভরসা জুগিয়ে গেল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের বন্ধুরা। আর সেই প্রাক্তন (প্রাক্তন লিখতে হচ্ছে কারণ দু’জনেরই কর্মক্ষেত্র বদল হয়ে গেছে) সহকর্মী যিনি অভিনবের সোনা জয়ের খবর দিয়েছিলেন চলভাষে, গ্রুপে নীরজের ইভেন্ট চলাকালীন অসম্ভবরকম শান্ত। শুধু মাঝেমাঝে স্ক্রিনে ফুটে ওঠে তাঁর পোস্ট ‘ফাইনালে ওঠা প্রত্যেকের  এখনও তিনটি থ্রো বাকি।’ তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এলো সেই  মুহূর্ত। মোবাইল আর টিভি স্ক্রিনে দেখা গেল সোনা জিতে গেছেন নীরজ। মুহূর্তে গ্রুপ ভরে গেল হরেক কিসিমের আনন্দময়  মেসেজে। মজার কথা হল, এই বন্ধুদের বেশিরভাগেরই একে অন্যের সঙ্গে কোনও দিন দেখা হয়নি, কেউ হয়তো বা অর্ধপরিচিত। কিন্তু এই অলিম্পিক তাদের বেঁধে বেঁধে রেখে দিল। শেষে সেই স্বপ্নের মুহূর্ত। পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে নীরজ। গলায় ঝোলানো সোনা। জাতীয় পতাকা উঠছে স্টেডিয়ামে। বাজতে শুরু করেছে ‘জনগণমন অধিনায়ক’-এর সুর। দেখতে গিয়ে কেমন ঝাপসা লাগছে যেন সব কিছু। কেবলের গণ্ডগোল? নেটওয়ার্কের সমস্যা? মাঝবয়সি লোকটা টিভি-র পর্দার কাছে এসে দেখে জাতীয় সংগীত গাইছেন নীরজ, তাঁর চোখে জল। এতক্ষণে খেয়াল হয় লোকটার। নিজের চোখে হাত দিয়ে দেখে জনগণমন গাইতে গাইতে তার চোখ কখন যেন জলে ভরে গেছে; এইজন্যই ছবিটা ঝাপসা লাগছিল!

লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ান। আগ্রহের বিষয় সমকালীন সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

3 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *