ভেষজ বিজ্ঞানে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের ব্যবহার

সমীরণ মণ্ডল

গরাণ  ভেষজে গরাণের ঔষধি গুণের ব্যবহার আছে। পচনশীল ও ম্যালিগন্যান্ট ঘা নিরাময়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখে গরাণ। প্রাচীনকাল থেকে প্রথাগত চিকিৎসায় ঝামটি গরাণের ব্যবহার হয়ে আসছে। এর ছালের রস রক্ত পড়া বন্ধ করে। ক্বাথ রক্তস্রাব চিকিৎসায় ব্যবহার হয়ে থাকে। চর্মরোগ, কুষ্ঠ ও ম্যালেরিয়ায় পাতার ব্যবহার হয়। শরীরের কোনও অংশ কেটে ছুলে গেলে কচিপাতা বেটে ক্ষতস্থানে প্রলেপ দেওয়া হয়।

গর্জন  এর ছাল বহুমূত্র, কণ্ঠনালির প্রদাহ, রক্তক্ষরণে ভেষজ হিসেবে ব্যবহার হয়। গর্জন গাছের কষ দাদের এবং কোষ্ঠকাঠিন্যে ব্যবহার হয়। আলসারে গর্জনের রস খাওয়া হয়। গর্জনের ছাল সিদ্ধ করে জল ছেঁকে সকাল বিকাল খেলে আমাশয় ভালো হয়।

কেওড়া  কৃমির ওষুধ তৈরি সহ ফোঁড়া ও রক্তক্ষরণ বন্ধে ব্যবহার করা হয়। কেওড়া হজম শক্তি বাড়ায়, আমাশয় দূর করে, মুখের রুচি বাড়ায়, খিদে বাড়ায় এবং বমিভাব দূর করে। অন্যদিকে কাঁচা, চাটনি, টক সহ বিভিন্নভাবে খাওয়ার প্রচলনও আছে।

আরও পড়ুন: গোলপাতা চাষ ও গোল গুড় উৎপাদন হতে পারে সুন্দরবন উপকূলের বিকল্প কর্মসংস্থান

বাইন  ফল ও ফলের রস ফোঁড়া নিরাময়ে এবং পাতার রস গর্ভপাত বিষয়ক ভেষজ, ব্যথা বেদনার ঔষধি।

ঝাউ  ছাল আমাশয় এবং পেটের রোগের, পাতা ও ফল চর্মরোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।

হরগোজা  পাতার রস ও ক্বাথ হাঁপানি ও অজীর্ণ রোগে ব্যবহার হয়। কচিপাতা সামান্য গরম করে বাতের ব্যথা উপশমে ব্যবহার হয়। কাইন ও পায়রা মাছের কাঁটা ফোটার যন্ত্রণায়, হোরগোজা বা কালোলতার শিকড় আড়াইটা গোল মরিচ সহ বেটে লাগিয়ে বেঁধে রাখলে যন্ত্রণা কমে।

নাটা করঞ্জা  ফলের রস বলদায়ক, কৃমিনাশক। বীজের তেল মুখের দাগ তুলতে এবং চামড়ার কোমলতা ফেরাতে সহযোগিতা করে।

গোলপাতা  গোলের পুষ্পদন্ডের থেকে সংগৃহীত রসে গুড় তৈরি হয় এবং গোলপাতা ঘা ও চুলকানি প্রতিরোধে ব্যবহার হয়।

আরও পড়ুন: আলু নিয়ে আলুথালু

বন কার্পাস  এর মূল ও ফল গনোরিয়া চিকিৎসায় ব্যবহার হয়।

করঞ্জা  পতঙ্গনাশক এবং এর বীজের গুঁড়ো সর্দি-কাশিতে ব্যবহার হয়।

বাউলে ফল  এটি আমাশয়ের ঔষধ হিসেবে ব্যবহার হয়। কাঁচা অথবা পুড়িয়ে খাওয়া হয়।

সুন্দরী  কচিপাতা, শেকড় ও ছাল ভেষজ উপাদান, ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তের শর্করা কমায়।

গনিয়ারি/গইনারি  এর শিকড় বেটে খেলে পাকস্থলীর ক্ষমতা বৃদ্ধি ঘটে। সাধারণ জ্বর ও আমবাতে উপকারী। গোল মরিচের সঙ্গে এর পাতা বেটে খেলে সর্দি-জ্বর ভালো হয়। কিডনির সমস্যায় হাত-পা ফুলে গেলে প্রতিদিন তিন-চার চা চামচ পাতার রস খেলে উপকার হয়। পাতা জল দিয়ে ফুটিয়ে মোট জলের চারভাগের একভাগ হয়ে এলে সেই জল খেলে পান্ডুরোগ ও জন্ডিস ভালো হয়। প্রসূতিদের জন্য এটি একটি উপাদেয় টনিক, স্তনস্ফীতি, দুগ্ধ স্বল্পতা, রক্তাল্পতা, প্রদহ দূর করে। এর অরিষ্ট সেবনের সময়ে শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করতে পারে। অতিপিপাসা, মুখে ঘা, পেটে জ্বালা-পোড়া, হৃৎপিণ্ডে ব্যথা থাকলে খাওয়া যাবে না।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জঙ্গল নিয়ে বিভিন্ন রকমের কর্মসূচি চলছে। এখানের জীববৈচিত্র ও মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে মূলত গবেষণা বা চিন্তাভাবনায় সুন্দরবনকে সম্পদশালী একটি বনজ ভাণ্ডার এবং এখানকার জনজীবনকে গরিব-অসহায়-অশিক্ষিত রূপে দেখা হয়েছে। সেই সমস্ত গবেষণা ও চিন্তাভাবনাকে তথাকথিত জনমুখী চিন্তনের স্টিকার লাগিয়ে চলছে সেই সমস্ত কর্মযজ্ঞ। কিন্তু এই সমস্ত গবেষণায় সুন্দরবনের জঙ্গলজীবীদের আহরিত জ্ঞানকে শামিল করা হয়নি বা হলেও সুন্দরবন রক্ষার্থে তা ব্যবহার করা হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আঙ্গিকে বহিরাগত গবেষকদের দেখার ভঙ্গিতে আমরা সুন্দরবন পাঠ করে চলেছি।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *