বাংলার প্রাচীন বৈকুণ্ঠ চতুর্দশী

শুভদীপ সিনহা

আমাদের এই বাংলা ব্রতময়। ঋতুর উপর ভিত্তি করে সারাবছরই বাংলার পল্লিসমাজ নানা ব্রত-পার্বণ নিয়ে মেতে থাকে। বিশেষত কার্তিক-অগ্রহায়ণ তো ব্রত, মেলা, উৎসবের মূল সময়ই। এরকমই একটি ব্রতের কথা সংক্ষেপে লিখলাম। কার্তিক মাসের শুক্লা চতুর্দশীতে পালিত হয় বৈকুণ্ঠ চতুর্দশী ব্রত।

আরও পড়ুন: ‘জানো, একা কোনো কিছু আমার লাগে না ভালো’, বাবার এই কবিতার লাইন নিজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল: তিতি রায়

Vaikuntha - Wikiwand

ব্রহ্মা একদিন তাঁর ছেলে নারদকে বললেন, ‘বৈকুণ্ঠ চতুর্দশীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি শোনো।’ সত্যযুগে কার্তিক মাসের শুক্লা চতুর্দশীতে নারায়ণ বৈকুণ্ঠ থেকে বেরিয়ে কাশীধামে গিয়ে রাতের শেষে চতুর্থ প্রহরে মণিকর্ণিকায় স্নান সেরে এক হাজার সোনার পদ্ম নিয়ে শিব ও শিবানীর পুজো করবার জন্য যান। শিবানীর পুজো সারার পর তিনি শিবের এক হাজার নামে এক-একটি করে পদ্ম নিয়ে শিবের পুজো আরম্ভ করলেন। শিব তখন পরীক্ষার জন্য ছল করে একটি পদ্ম চুরি করে লুকিয়ে রাখলেন। পুজো করতে করতে নারায়ণ দেখলেন যে, একটি পদ্ম কম পড়ছে। তখন তিনি চারদিকে খুঁজে দেখলেন, কিন্তু পদ্ম দেখতে পেলেন না। শেষে মনে মনে ভাবলেন যে, আমি এক হাজার পদ্ম দিয়ে শিবের পুজো করব বলে ঠিক করেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি একটা পদ্ম কম। তাহলে এক হাজার পদ্ম দিয়ে কীভাবে পুজো করব? সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে এলো, তাঁকে তো সবাই পদ্মলোচন বলে থাকে। তাহলে পদ্মের অভাবে চোখ দিয়েই পুজো করবেন তিনি, এমনই মনস্থির করলেন। এই কথা মনে হতেই তিনি নিজের একটা চোখ উপড়ে নিয়ে সেই চোখ দিয়ে শিবের পুজো করলেন। এইভাবে শিবের পুজো করার জন্য শিব খুব সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘হে শ্রীহরি! তোমার মতো ভক্ত এই ত্রিলোকে আমি দেখিনি। সেইজন্য তোমার নাম দিলাম ত্রৈলোক্য। তোমার যদি কোন ভীষ্ট বস্তুর প্রার্থনা থাকে তো বলো। আমি তোমার সেই প্রার্থনা নিশ্চয়ই পূরণ করব। যাঁরা কেবল আমাকে ভক্তি করবে অথচ বিষ্ণুর প্রতি বিদ্বেষ মনোভাব পোষণ করবে, তাঁদের আমি আমার পরম শত্রু বলে জ্ঞান করব।’

আরও পড়ুন: বিমানবন্দর না সবজি-মান্ডি?

উত্তরে নারায়ণ বললেন, ‘হে দেব মহেশ্বর, আপনি আপনি আমাকে ত্রিলোকের অধীশ্বর করলেন কিন্তু আমি দৈত্যদের বধ করব কি করে?’ মহাদেব উত্তরে বললেন, ‘হে ত্রৈলোক্যপতি ভগবান বিষ্ণু! আমার প্রদত্ত সুদর্শন চক্র গ্রহণ কর। এই চক্রের সাহায্যে তুমি সমস্ত দৈত্যদের পরাভূত করতে পারবে।’ মহেশ্বর বিষ্ণুকে চক্র দিয়ে বললেন, ‘তুমি বৈকুণ্ঠ থেকে এসে, কার্তিক মাসের শিব তিথির শুক্লপক্ষের চতুর্দশীর দিন, সূর্যোদয়ের সময় এক হাজার পদ্ম দিয়ে আমার পুজো করেছ, সেইজন্য জগতের লোক, এই তিথি পরম পবিত্র বৈকুণ্ঠ চতুর্দশী বলে জানবে আর এই ব্রত পালন করবে। এই সঙ্গে আমি তোমাকে আর একটি বর দিচ্ছি। যাতে সকলেই এই পুজো করবে আর আগে তোমার পুজো করে তারপর আমার পুজো করবে। ব্রতী সমস্ত দিন উপবাসী থাকবে আর আগের দিন রাতের আগে, সন্ধ্যাবেলা তোমার পুজো করে আমার পুজো করবে।’ এই বলে মহেশ্বর অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

ব্রতফল  যিনি সৌর কার্তিক মাসের শুক্লা চতুর্দশীতে এই ব্রত করেন, তিনি বংশানুক্রমে পুত্র-পৌত্র রেখে আলোর রথে করে বৈকুণ্ঠে চলে যান।       

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *