ওয়াসিম জাফরের ইস্তফা বিতর্ক প্রসঙ্গে

Wasim Jaffer

অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

ক’দিন আগে প্রাক্তন ক্রিকেটার ওয়াসিম জাফর উত্তরাখণ্ড রাজ্য ক্রিকেট দলের কোচের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। গত জুন মাসে ওঁর সঙ্গে উত্তরাখণ্ড রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার এক বছরের চুক্তি হয়েছিল। সুতরাং এই বছর মে মাসের আগে জাফরের চাকরি যাবার অবকাশ ছিল না। একটা অক্রিকেটীয় এবং আপাদমস্তক রাজনৈতিক কারণে বিষয়টা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছিল, জাফর নাকি ক্রিকেটের মাঠে অথবা সাজঘরে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করেছেন। জাফর পত্রপাঠ ইস্তফা দিয়েছেন। সেইসঙ্গে সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আগাগোড়া খণ্ডন করেছেন।

আরও পড়ুন: শেষ হল মোহনবাগানের বহু প্রতীক্ষিত বার্ষিক সাধারণ সভা

ওয়াসিম জাফর যে সে ক্রিকেটার নন। ২০০০ থেকে ২০০৮-এর মধ্যে ভারতীয় দলের হয়ে ৩১টি টেস্ট খেলেছেন। মোট টেস্ট রান দু’হাজারের কাছাকাছি। গড় চৌত্রিশের মতো। মাটি কামড়ে পড়ে থাকা মুম্বই ঘরানার ওপেনার ছিলেন। একটা ডাবল সেঞ্চুরিও আছে। যদি এটা যথেষ্ট মনে না হয়, তাহলে ঘরোয়া ক্রিকেটে আসুন। ১৯৯৬ থেকে ২০২০ পর্যন্ত, মানে পঁচিশ বছর সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলেছেন। ’২০ সালের মার্চ মাসে অবসর। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে শেষ বছরেই ৫৩ রান গড়ে পাঁচটা খেলায় তিনশো কুড়ি রান করেন।  তখন বয়স ৪১। ভারতের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে রঞ্জি ট্রফিতে ১৫০-এর ওপর ম্যাচ খেলেছেন। শুধু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেই সাড়ে উনিশ হাজার রান করেছেন। কেবল সংখ্যাতত্ত্বের বিচারেই নির্দ্বিধায় ওয়াসিম জাফরকে ভারতের সর্বকালের সেরা ঘরোয়া ক্রিকেটার বলা যায়। যাঁদের বলার ইচ্ছে নেই, তাঁরা বলবেন না। কিন্তু তাঁরাও এটুকু মানতে বাধ্য যে ক্রিকেটের প্রতি চূড়ান্ত ভালোবাসা, সততা এবং ভক্তি ছাড়া কেউ পঁচিশ বছর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে প্রায় বিশ হাজার রান করতে পারেন না।

কিছু এসে যায় না। ওয়াসিম জাফর এত বড় ক্রিকেটার না হলেও নীচে যে কথাগুলো বলব, সেগুলো হয়তো বলতাম। কিন্তু ওয়াসিম জাফর এতগুলো রান করে আর এতগুলো বছর মাঠে নেমে একটা অতিরিক্ত সুবিধে করে দিয়েছেন। কেবল রেকর্ড এবং দীর্ঘজীবী কেরিয়ারের মাপকাঠিতে জাফরকে ঘরোয়া ক্রিকেটের শচীন তেন্ডুলকর বললে মোটেই বাড়িয়ে বলা হয় না।

কী অভিযোগ করা হয়েছিল? এক, জাফর নাকি এক মুসলমান খেলোয়াড়কে অধিনায়ক করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। বকলমে বলা হচ্ছে, উনি একজন খেলোয়াড়কে কেবল সে মুসলমান বলে অধিনায়ক করতে চাইছিলেন। দুই, জাফর নাকি মৌলবিদের ডেকে সাজঘরে শুক্রবারের নামাজ পড়িয়েছেন।  তিন, উনি নাকি কিছু যোগ্য খেলোয়াড়কে দলে জায়গা দেননি। চার, উনি নাকি টিমে প্রার্থনার ধরন বদলে দিয়েছেন। প্রার্থনা কথাটা যুতসই হল না। আজকাল দেখা যায় না খেলোয়াড়রা একজোট হয়ে হাতে হাত রেখে সমস্বরে শপথ নেবার মতো চিৎকার করে যেন যুদ্ধে নামার মতো একটা ব্যাপার করেন। সেই শপথগোছের জিনিসটার শব্দগুলো নাকি বদলে দিয়েছেন জাফর।

আরও পড়ুন: মোহনবাগানের বার্ষিক সাধারণ সভায় বিদেশ থেকে ভয়েস কলে সদস্য সমর্থকদের আন্দোলনে আহ্বান: ময়দানে হঠাৎ চাঞ্চল্য

প্রতিটি অভিযোগ খণ্ডন করেছেন জাফর। উনি বলছেন যে, উনি জয় বিস্তাকে অধিনায়ক করার উপদেশ দিয়েছিলেন। নির্বাচকরা সে-কথা মানেননি। দুই, জাফর বলছেন যে অনুশীলনের পরে কয়েকজন খেলোয়াড় মৌলবিকে ডেকে নামাজ পড়তে পারবে কি না, তার অনুমতি চাইলে উনি সেই অনুমতি দিয়েছিলেন। মানে মৌলবিদের জাফর ডাকেননি। তিন, নির্বাচকদের পছন্দের কিছু খেলোয়াড়ের যোগ্যতা বিষয়ে ওঁর সন্দেহ ছিল। ওঁর মনে হয় যে নির্বাচকরা অযোগ্য খেলোয়াড়দের সুযোগ দিচ্ছেন। চার, আগে উত্তরখণ্ড দল ওই যৌথ  শপথের সময় একটা শিখ মন্ত্র ব্যবহার করত। জাফর বলেন ‘গো উত্তরাখণ্ড’ এই কথা বলতে।

এরপর বিষয়টা নিয়ে আর কিছু জানা যাচ্ছে না। প্রসঙ্গত বলা যায়, জাফর মাসখানেক আগেই অস্ট্রেলিয়াতে ভারতীয় খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষের তীব্র নিন্দা করেছিলেন। এছাড়া বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্যের জন্য গত একবছর ধরে টুইটারে জাফর ভীষণ জনপ্রিয়। এই বিতর্ক প্রসঙ্গে এই মুহূর্তে একটা উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দাবি জানানো দরকার। কেন-না ভারতীয় ক্রিকেটে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ এই বোধ হয় প্রথম। যদি জাফর দোষী হন তাহলে ওঁর তীব্র নিন্দা হোক। কিন্তু যদি উনি নির্দোষ হন, তাহলে যাঁরা এই অভিযোগ জানিয়েছেন তাঁদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। 

আরও পড়ুন: করোনা প্যান্ডেমিকের পর প্রথম টুর্নামেন্ট খেলার জন্য প্রস্তুত ভারতীয় মহিলা ফুটবল দল

আরেকটা বৃহত্তর প্রশ্ন তুলতেই হবে হবে। মাত্র কয়েকদিন আগে পপ গায়িকা রিহানা দিল্লিতে প্রতিবাদরত কৃষিজীবীদের সমর্থনে একটি টুইটার মেসেজ করার পরে রাশি রাশি প্রাক্তন এবং বর্তমান ক্রিকেট খেলোয়াড় ভারতের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়েছে বলে পাল্টা টুইট করতে শুরু করলেন।  শচীন তেন্ডুলকরও স্বয়ং ছিলেন এই তালিকায়। অনিল কুম্বলে ছিলেন, রোহিং শর্মা ছিলেন। বিরাট কোহলিও ছিলেন সেই দলে।  ক্রিকেটাররা যে জিনিস বোঝেন না সেই বিষয়ে তড়িঘড়ি মন্তব্য করতে ছুটলেন। অথচ যখন তাঁদের অতিপরিচিত একজন সহযোদ্ধার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ উঠল, তখন অনিল কুম্বলে আর মহম্মদ কাইফ ছাড়া বড় কোনও ক্রিকেটের মুখ খুললেন না।  ক্রিকেটারদের এই দ্বিচারিতাটা আশ্চর্য। রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে এঁরা উৎসুক অথচ আগাগোড়া ক্রিকেটীয় একটি বিতর্কে এঁরা চুপ।

ক্রিকেটপ্রেমীদের ভাবতে হবে। একটি বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ সফল একজন কৃতী অন্য একটা বিষয়ে মতামত দিলে সেটা কতখানি গুরুত্ব পাওয়া উচিত? একজন বিখ্যাত গায়িকা বা অভিনেতা কি মেয়েরা কী পোশাক পরবে বা আমাদের কী খাওয়া উচিত সেই বিষয়ে মতামত দিলে সেটা নিয়ে ভাববার আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে?

আরও পড়ুন: মুসলিমদের পক্ষে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করে উত্তরাখণ্ডের কোচের পদ থেকে ইস্তফা ওয়াসিম জাফরের

এমনিতে নেই। তবে মুশকিল হল টুইটারের পৃথিবীতে একজন ক্রিকেটার বা অভিনেতার কোটি কোটি অনুগামী। এঁরা যাই বলুন মুহূর্তের মধ্যে সেটা কোটি দু-তিন মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।  এদের মধ্যে একটা ছোট অংশও যদি এঁদের কথায় ওঠে বসে, তাহলে সেই সংখ্যাটা অযুতে গুনতে হবে। এঁরা কি সেটা বোঝেন? শচীন তেন্ডুলকর ক্রিকেটের ভগবান হতে পারেন। তবে ইস্কুল পাঠশালে ভদ্রলোক যাবার সময় পাননি। নাই বা পেলেন। কি এসে গেল তাতে? নিজের ক্ষেত্রে উনি তো ভগবানতুল্য। ঠিকই। কিন্তু সব ক্ষেত্রে না। অথচ উনি টুইট করলেই দু-সেকেন্ডে কয়েক কোটি মানুষ সাইটে দেখবে।  বিশ্বাস করুক বা না করুক, মানুক বা না মানুক, দেখবে। স্বাভাবিক বিশ্বাসে অনেকে মানবেও। আজও অনেকে বিশ্বাস করে ক্রিকেটের ভগবান মানে বোধ হয় সবকিছুতেই ভগবান। হয়তো হবে। মুশকিল হল এঁরাও ভগবানের মতো কিছু ক্ষেত্রে সর্বদাই অন্ধ অথবা চুপ। 

ওয়াসিম জাফরের বিচার চাই। নইলে ভারতে মুসলমান ক্রিকেটারদের নিয়মিত এই ধরনের অভিযোগের স্বীকার হতে হবে। ক্রিকেটের মাঠে সাম্প্রদায়িকতা ঢুকতে দেওয়া যাবে না। তবে জাফর-কাণ্ডের সরেজমিনে তদন্ত না হলে ক্রিকেটের মাঠেও অচিরেই সাম্প্রদায়িকতা ঢুকবে।

নিবন্ধক অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, কর্ণাবতী ইউনিভার্সিটি, গান্ধিনগর।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *