‘এ তুফান ভারী দিতে হবে পাড়ি’, জন্মদিনে ঝোড়ো কবি নজরুল

জয়গোপাল মণ্ডল

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। আসছে মহাপ্রলয়। ইয়াস ঝাঁপিয়ে পড়ছে বাংলা ওড়িশা উপকূলে। থরহরি কাঁপছে আধুনিক সভ্যতা। গত বছর এই সময় এসেছিল আমফান। তছনছ করেছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সে দগদগে ঘা এখনো শুকায়নি। করোনার দোসর হয়ে আসছে বিধ্বংসী ঝড়। কী যে আত্মীয়তা দু’জনের! আজ সকালে হঠাৎ মনে পড়ল আর এক ঝড়ের জন্মজয়ন্তী। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নিয়েছিলেন এ বঙ্গের বিদ্রোহী সন্তান। তাঁর প্রকৃত আত্মপ্রকাশ ১৯২১-এ। লিখেছিলেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। সে ঝড়ের দাপটে নড়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ শাসকের ভিত। কবি আত্মদর্শনে লিখেছেন,

“আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,

আমি পথ সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি।”

আরও পড়ুন: আসবে ঝড়, নাচবে তুফান…

অধুনা বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং বাঙালির হৃদয়ের ‘বুলবুল’ কাজী নজরুল ইসলাম। গত শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী কবি— একাধারে ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, অন্যদিকে যেন ধ্রুপদি সংগীতের অনন্য রূপকার। আজ যখন সমগ্র বাঙালি জাতি ঝড়ের ঝাপটার আশঙ্কায় ঘরবন্দি, বিপদের প্রহর গুনছে— তখন মানসে জেগে ওঠে এক বাঙালির গীতিকথা। যিনি নিজেকেই ঝড়ের প্রতীকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেশ ব্রিটিশ শাসনে পীড়িত, অত্যাচারিত, অসহায়, পরাধীন ভারতমাতার দুর্দশায় ছোট্ট কৈশোরের দুখুমিয়া হয়ে উঠলেন দুঃখ নিবারণের দিশা, ঝোড়ো আগমন। কবিতাকে করলেন হাতিয়ার, স্বাধীনতা আন্দোলনের অস্ত্র। শাসকের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন:

              “বল বীর—

বল       উন্নত মম শির

শির      নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির

                   বল বীর—”

দীর্ঘ এই কবিতার পঙ্‌ক্তিতে পঙ্‌ক্তিতে ঝঞ্ঝা আর কবি একাত্ম। প্রথম কবিতা সংকলন ‘অগ্নিবীণা’তে (১৯২২) তাঁর কবিতা ও ব্যক্তি জীবনের সুর ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনিত হল। প্রলয়োল্লাস কবিতায় লিখেছেন:

             “তোরা সব জয়ধ্বনি কর।

             তোরা সব জয়ধ্বনি কর।

ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখীর ঝড়।”

এখানেই শেষ নয়, ঝড়বাদলের যে শাশ্বত সত্য সেই চিরন্তন ভাবনার আলোকে কবি সমগ্র ভারতবাসীকে আশ্বস্ত করে বললেন, “ঐ সে মহাকাল সারথি রক্ত-তড়িত চাবুক হানে/ রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্র-গানে ঝড়-তুফানে।/ ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? —প্রলয় নূতন সৃজন বেদন/ আসছে নবীন জীবনহারা অসুন্দরে করতে ছেদন।”

আরও পড়ুন: বিশ্ব সাহিত্যে চার চিকিৎসক ও বর্তমান অতিমারি

রক্তাম্বর-ধারিণী মা কবিতার মূল ভাবনার ফলশ্রুতিতেও ঝড়ের ব্যঞ্জনা। কবি সুস্পষ্ট প্রত্যয়ে লিখেছেন,

“তোমার খড়্গ-রক্ত হউক

       স্রষ্টার বুকে লাল ফিতা।

এলোকেশে তব দুলুক ঝঞ্ঝা

কাল-বৈশাখী ভীম তুফান।

কবি ও সমালোচক বুদ্ধদেব বসু কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পদাতিক প্রকাশকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, “এটা বোঝা যাচ্ছে যে এখন আমরা ইতিহাসের এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেচি, যখন বাঙালি কবির হাতেও কবিতা আর শুধুই বীণা হয়ে বাজছে না, অস্ত্র হয়ে ঝলসাচ্ছে।” (সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা সংগ্রহ— ১ম খণ্ড) স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, কবি নজরুলের কবিতা কি কেবলই বীণার ধ্বনি? যুদ্ধজয়ের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ ঘোষণা কি কম ছিল? হয়তো কবি সুভাষের মতো বলেননি, “কমরেড আজ নবযুগ আনবে না”। কিন্তু বিদ্রোহী কবি যখন দ্রোহ ঘোষণা করেন এইভাবে:

                 “মহা বিদ্রোহী রণক্লান্ত

                 আমি সেই দিন হব শান্ত

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না

অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না” (বিদ্রোহী)

—তখন কি মনে হয় না কাজীর কবিতার পঙ্‌ক্তিমালায় টর্নেডোর হুংকার শোনা যায়, তিনি ছিলেন পরাধীন বাঙালির হৃদয়ের ধুন— স্বপ্নত্রাতা। গীতিকার সলিল চৌধুরীর কথা আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গীত সুর যেন সত্য হয়ে ওঠে কবি নজরুলের আত্মকথা: “আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা”।

কবিতায়, গানে নজরুল কখনো ঝড় রূপে ধ্বংস করতে চেয়েছেন অত্যাচারী শাসকের ভিত, কখনো বা শাসকরূপী ঝড়বাদলের টুঁটি টিপে গড়ে তুলতে চেয়েছেন পৌরুষের প্রত্যয়।

আরও পড়ুন: হাতুড়ি

কবি নজরুল ইসলাম (২৪ মে ১৮৯৯-২৯ আগস্ট ১৯৭৬) বাঙালির বিবেক, বাঙালির আত্মদর্শন, স্বভাবচেতনার লালন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে আটত্রিশ বছরের ছোট। তাই সময়ের ও সামাজিক অবস্থানের যে সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া সম্ভব, সেটাই ঘটেছে। একদিকে দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় জীবনযন্ত্রণার প্রভাব আর দুখুমিয়ার দুর্দান্ত স্বভাব তাঁকে বিদ্রোহী করেছে। তাই তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে করাচি পল্টনে যোগ দেন আবার শাসকের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন, লেখেন বিদ্রোহী কবিতা। বিংশ শতাব্দীর বাঙালি মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তাঁর কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত। অগ্নিবীণা হাতে তাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ। আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে তাঁর সারস্বত সাধনায় প্রায় ইতি ঘটে। নিভৃত জীবনে প্রবেশ করেন। অসুস্থ হন: বাক্‌শক্তি চলে যায় আর মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। কিন্তু সর্বহারা’র কবি আজও ঝড়ের মাতন লাগায়। তাই তো ইয়াসের আগমনে সাংবাদিকদের স্মরণ করতে হয় কবি নজরুলের কাণ্ডারী হুঁশিয়ার কবিতার লাইন:

“দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,

ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত?

কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।

এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।”

কবি নজরুল জীবনের বিপর্যয়ে সেই মাঝি যিনি পরাধীন ভারতবর্ষে বারবার মাঝির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। কখনো ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে যে শাসন, তার বিরুদ্ধে আহ্বান করেছেন আত্মত্যাগ। রণ-ভেরী কবিতায় বলেছেন,

তোর জান যায় যাক, পৌরুষ তোর মান নাহি যেন যায়।

ধরে ঝঞ্ঝার ঝুঁটি দাপাটিয়া শুধু মুসলিম পাঞ্জায়।

তোর মান যায় প্রাণ যায়—

বাজাও বিষাণ, ওড়াও নিশান! বৃথা ভীরু সমঝায়।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)

নানা তাৎপর্যে ঝড় ও ঝঞ্ঝা কবি নজরুল ইসলামের কবিতা ও ব্যক্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ। কবির ঠিকানা তাঁর কবিতায়, এমন কাব্যভাষা ও বিষয় বাংলা সাহিত্যে একেবারে স্বতন্ত্র ও অনন্য। তাঁর ভাষায় নিহিত তাঁর প্রত্যয় এবং পৌরুষদীপ্তি: “মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম/ মোরা ঝরণার মতো চঞ্চল/ মোরা বিধাতার মতো নির্ভয়/ মোরা প্রকৃতির মতো সচ্ছল ।”

ড. জয়গোপাল মণ্ডল। জন্ম: সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে ১৫ আগস্ট ১৯৬৯। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. ফিল এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ: যদি বাঁচতে চাও একটি আবেদন, লাল টুকটুকে আকাশে বিহঙ্গ একা, একফালি সকাল, নিবিড় অভিসারে এবং একটি কথা অনেক নদী প্রকাশিত হয়েছে।
প্রবন্ধ গ্রন্থ: সু্ভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার ঘর ও বাহির (দে’জ পাবলিশিং), প্রসঙ্গ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (দে’জ পাবলিশিং), বিবেকচিন্তা (কমলিনী), কবিতার অন্তরলোকে প্রাবন্ধিকতা (কমলিনী), পদ্মানদীর মাঝি সম্পাদনা (কল্লোল) এবং শিখা প্রকাশনী ঢাকা থেকে ‘কবিতার আঙিনায় কৃষক আন্দোলন’ প্রবন্ধ গ্রন্থ প্রকাশিত। এছাড়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ মুদ্রিত হয়েছে। তিনি সাহিত্য অঙ্গন পত্রিকার সম্পাদক (ISSN: 2394-4889)।
সুন্দরবন উত্তরণ পত্রিকা সম্মাননা (২০০৭) এবং  বাংলার মুখ অনন্য সম্মান ২০১৯-এ, পশ্চিমবঙ্গ ছোটগল্প প্রসার অকাদেমি পুরস্কার (২০২০), আমি অনন্যা পত্রিকার ছোটগল্প প্রতিযোগিতা সম্মান (২০২০) এবং মোহিতলাল মজুমদার স্মৃতি পুরস্কারে (২০২১) সম্মানিত।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *