নদীর ধারে বাস ভাবনা বারোমাস

সঞ্জিতকুমার সাহা

ইদানীং ‘ম্যানগ্রোভ’ শব্দটা সংবাদে ঘুরেফিরে আসছে। এর কারণ তো অবশ্য করেই আমফান, ইয়াস, আয়লা, সিডার, বুলবুল নামের সামুদ্রিক ঝড়-তুফান। একেকবার করে একেকটা ঝড়-তুফান আসে আর সেই ঝড়-তুফানের ধ্বংসলীলা শেষ হওয়ার পরে পরেই শুরু হয় নানারকম কারণ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ। শুরু হয় ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা। আর এই আলোচনার হাত ধরেই আসে সমুদ্র অঞ্চল সংলগ্ন নদী-বাঁধ মেরামত, কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ এবং ম্যানগ্রোভের কথা। বলা বাহুল্য, এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে গোটা সুন্দরবন। এর সঙ্গে অবশ্য অন্যান্য অঞ্চলের কথাও আসে। যেমন এবারে এসেছে পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরি, নন্দীগ্রাম, দিঘা, শংকরপুর, তাজপুরসহ মন্দারমণি ইত্যাদি জায়গার নামও। এবারে ইয়াসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ও উত্তর চব্বিশ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সাধারণত দেখা যায় বঙ্গোপসাগরে উদ্ভূত যে কোনও গভীর নিন্মচাপ বা সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদির গতিপথের প্রবণতা থাকে ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ ছুঁয়ে বাংলাদেশের দিকে চলে যাওয়ার। আবহাওয়া দপ্তর থেকে পূর্বাভাসে এসব জানানো থাকলেও শেষ মুহূর্তে এর গতিপথ হঠাৎ করে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। যেমন এবারে ইয়াস মেদিনীপুর হয়ে ঝাড়খণ্ডের দিকে চলে গেল। এর আগেও এমনটা বহুবার হয়েছে। ফণী বা সিডারের ক্ষেত্রেও হয়েছে।

আরও পড়ুন: প্রকৃতি ও পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান

Mangrove - Wikipedia

সমুদ্র লাগোয়া অঞ্চলের বসবাসকারীরা সবাই জানেন, নদীর ধারে বাস মানে ভাবনা বারোমাস। অর্থাৎ কবে কখন কী হবে কেউ জানে না। একটা অজানা আশঙ্কার মধ্যেই মানুষজনের বসবাস। তবুও মানুষ নদীর ধারে, সমুদ্র অঞ্চল লাগোয়া জায়গায় মানুষ থাকে। কারণ জীবন ও জীবিকা।

এমনিতেই সমুদ্রের রূপ-রহস্য মানুষের কাছে অধরাই। আগেও ছিল, এখনও আছে। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই ঝলমলে আকাশ, রৌদ্রকিরণ ঠিকরে পড়ছে, হঠাৎ করেই বলা নেই কওয়া নেই, সমুদ্রের বুক থেকে উড়ে আসা গভীর ঘন কালো মেঘে মুহূর্তে শুরু হয়ে যায় তুমুল বৃষ্টি। তেমনি সঙ্গে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া। ঝড়-বৃষ্টির আকস্মিকতায় মাঝিমাল্লারা দিশেহারা। নিমেষে  নৌকাডুবিও হয়। কেউ কেউ নিখোঁজও হয়ে যান। অথচ সকালের আবহাওয়ার বুলেটিনে হয়তো এমনটার কোনও পূর্বাভাসই ছিল না। হঠাৎ হঠাৎ করে এমনটা হয়। আগে তো এমন হামেশাই হত। তখন মানুষের কাছে জলবায়ু বা আবহাওয়ার সাতসতেরো গিয়ে পৌঁছত না, এসব নিয়ে ভাবতও না। প্রযুক্তিগত দিক দিয়েও পিছিয়ে ছিল আবহাওয়া দপ্তর। কিন্তু এখন সময় পালটেছে। প্রযুক্তি এখন যেমন আধুনিক হয়েছে তেমনি উন্নতও। তা সত্ত্বেও সমুদ্রের গতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে সব সময়ে সঠিক আগাম বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্তমানে আসন্ন ঝড়ের আভাস, ঘূর্ণাবর্ত, নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপের খবর কিছু পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত কোথায় আছড়ে পড়বে, তা অনেক সময়েই বলা সম্ভব হচ্ছে না বা আগাম আভাস দেওয়া হলেও বাস্তবের সঙ্গে তা মিলছে না। কারণ যে কোনও সময়ে সামুদ্রিক ঝড়ের গতিপথ পালটে যায়। সমুদ্রের রহস্য আজও তাই অনেকটাই অধরা। তা হলেও এখন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আগাম আভাস থাকায় ঘরবাড়ি তছনছ ও জমির ফসল নষ্ট হলেও প্রাণহানির সংখ্যা অনেকটাই কমেছে। কিছুকাল আগে পর্যন্ত এও একেবারেই সম্ভব ছিল না। মাত্র কুড়ি বছর আগের ওড়িশার ‘সুপার সাইক্লোনে’র কথা তো সকলেরই মনে আছে। এরপর গত কুড়ি বছরে কম তো ঝড়-তুফান হল না। কিন্তু মৃত্যুসংখ্যা অনেক কমেছে। আগাম আভাস থাকায় দুর্গতপ্রবণ অঞ্চল থেকে মানুষ নিজে থেকেই নিরাপদ জায়গায় চলে যাচ্ছে। কখনও কখনও প্রশাসনিক সাহায্যও পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: আসবে ঝড়, নাচবে তুফান…

সিডার বা আয়লা অথবা অতি সাম্প্রতিক আমফানের দগদগে ঘা এখনও গোটা সুন্দরবন অঞ্চল জুড়েই রয়েছে। তার উপরে চলে এলো ইয়াস। ইয়াসে যত না ঝড়-তুফানে ক্ষতি হয়েছে, তার ঢের বেশি ক্ষতি হয়েছে জলোচ্ছ্বাসে। এখনও বহু জায়গায় জল জমে রয়েছে। ফলে প্রচুর সংখ্যায় মাটির বাড়ি ভেঙেছে। অনেকের মাথার উপরে ছাদ নেই। আশ্রয় নিতে হয়েছে কোনও স্কুলবাড়ি বা ত্রাণ শিবিরে। কোনও কোনও দ্বীপ তো ধ্বংসের মুখে। ঘোড়ামারা, মৌসুনি দ্বীপের নাম সংবাদের প্রচারে এখন অনেকের মুখে মুখে।

সামুদ্রিক ঝড়-তুফানে যে শুধু দ্বীপের ভৌগলিক ক্ষতি হয় বা পরিবর্তন হয় তা তো নয়, ক্ষতি হয় চাষবাসের। ক্ষতি হয় জীবন ও জীবিকার। এমন ক্ষতি যে শুধু আজ হচ্ছে তা কিন্তু নয়। মানুষ যবে থেকে সুন্দরবনে বসবাস শুরু করেছে, তবে থেকেই এমন দুর্যোগের মধ্যে তাঁদের পড়তে হয়েছে।

ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকেও সুন্দরবনে বসতি ছিল। তার প্রমাণ মেলে রায়দিঘির জটার দেউল দেখলে অথবা বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্বশালায় কিছু ইট ও অন্যান্য জিনিসের নমুনা দেখলে। কিন্তু সেই বসতিও যে স্থায়ী হয়নি, তার প্রমাণ তো ভূরি-ভূরি। সাগরদ্বীপে যে একসময়ে বড় বন্দর ছিল, তা নিয়ে মতভেদ থাকার কথা নয়। গঙ্গারডি রাজত্বের কথা অনেকেরই জানা।

শুধু তো সাগরদ্বীপ নয়, মেদিনীপুরের তাম্রলিপ্ত বন্দর বা খেজুরির কথাও অনেকেই জানেন। শোনা যায়, তাম্রলিপ্ত বন্দর দিয়েই হিউয়েন সাং-এর মতো পর্যটকও যাতায়াত করেছেন। খেজুরিতে কান পাতলে এখনও শোনা যায়, দেড়-দু’শো বছর আগের প্রাণচঞ্চল জনপদের কথা। শোনা যায়, এই বঙ্গের প্রথম ডাকঘর ও টেলিগ্রামও নাকি খেজুরিতেই চালু হয়েছিল। আজ সেসব ইতিহাস। খেজুরি কিংবা সাগর কোনও জায়গাতেই সেসময়ের বিশেষ কোনও চিহ্ন নেই। সবই কোনও না কোনও সময়ে সামুদ্রিক ঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাসে সেসব নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক।

ক্রমশ…

লেখক পরিবেশ বিষয়ে বিভিন্ন দৈনিক, সাময়িক পত্রপত্রিকা, আকাশবাণীর নিয়মিত লেখক ও শিশু সাহিত্যিক। নির্বাহী সম্পাদক : সবুজ পৃথিবী।

ছবি ইন্টারনেট

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *