মেডেল জয়ের নেপথ্য নায়ক ‘ওয়ারেবল টেকনলজি’

ড. সোমা বসু

জমে উঠেছে অলিম্পিক্স গেমস। অলিম্পিকের প্রথম রুপোর পদক ভারতের ঘরে এলো মীরাবাঈ চানুর হাত ধরে, ভারোত্তোলনে। তারপর পি ভি সিন্ধু। ইতিমধ্যে বক্সিংয়ে পদক নিশ্চিত করেছেন লভলিনা। ভারতীয় মহিলা এবং পুরুষ হকি দলের সামনে পদকের হাতছানি। প্রতিদিনই পদকের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে আশা আর হতাশা। চলছে নানা দেশের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। প্রতিটি খেলোয়াড়ই নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছেন, তবুও একটুর জন্য মিস হচ্ছে পদক। করোনা অতিমারির আবহে এইবারের টোকিও অলিম্পিক্স বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। খেলার মাঠে সবাই মিলে প্র্যাকটিস করা থেকে শুরু করে জিম, সবেতেই ছিল নানাধরনের কড়াকড়ি। তা সত্ত্বেও তাঁরা চালিয়ে গেছেন অনুশীলন। সহায় ছিলেন বিজ্ঞানীরা আর তাঁদের তৈরি করা নানান ‘ওয়ারেবল ডিভাইস’, সোজা বাংলায় ‘পরিধানযোগ্য যন্ত্র’। যন্ত্রবিশেষে শরীরের কোনও একটি জায়গায় পরে নিলেই হল— প্রাকটিস শেষে শারীরবৃত্তীয় নানা তথ্য জানা যায়। আর এই তথ্য বিশ্লেষণ করেই খেলোয়াড় আর তাঁর কোচ ঠিক করে নেন ভবিষ্যতের খেলার মাঠে লড়াইয়ের স্ট্র্যাটেজি।

আরও পড়ুন: ’৮৮-র সিওলের সেই দুপুর নয়, ’৪৮-এর লন্ডন অলিম্পিকের বিকেলকেই যেন ফিরে পেতে চায় ভারতীয় হকি দল

আজকাল তো নানা ধরনের ছোট-বড় ওয়ারেবল ডিভাইস ঢুকে পড়েছে আমাদের মতো সাধারণের জীবনেও। এই ধরনের ডিভাইসের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় হল অ্যাপল-র হাতঘড়ি। অ্যাপল ওয়াচ ছাড়াও আছে ফিটবিট, জার্মিন আর পোলার। শরীর ফিট রাখতে সেসব ব্যবহারও করছি আমরা। সারাদিনে কত কিলোমিটার হাঁটছেন, দৌড়চ্ছেন সবকিছুর হিসাব রাখছে হাতের কবজিতে বাধা ঘড়ি। সেই সময়কার পালস রেট থেকে শুরু করে রেসপিরেটরি রেট, ব্লাড প্রেসার— সবেরই নিখুঁত হিসেব জানিয়ে দিচ্ছে সে আপনাকে।

আরও পড়ুন: এই ঘর, এই উপশম

খেলার মাঠে অনেকদিন ধরেই দাপিয়ে ব্যাট করে চলেছে ‘ওয়ারেবেল টেকনলজি’। আধুনিক অ্যাথলেটিক প্রাকটিসের খোলনলচেই বদলে গেছে এই টেকনলজির হাত ধরে। সাধারণ কথায়, ‘পরিধানযোগ্য যন্ত্র’ বলতে শরীরের সঙ্গে যুক্ত এমন কোনও ছোট যন্ত্রকে বোঝায় যা দৌড়ানো, সাইকেলিং, হাঁটা বা সাঁতার কাটার মতো শারীরিক ক্রিয়াকলাপের সময় দেহের ফিজিক্যাল পারফরম্যান্সের কিছু কিছু প্যারামিটার পরিমাপ করে। এই ধরনের পরিধানযোগ্য ডিভাইসগুলোর সুবিধা হল যে, এগুলো তুলনামূলকভাবে দামে সস্তা আর আকারে ছোট হওয়ার কারণে খুব সহজেই শরীরের যেকোনও অংশের সঙ্গে লাগিয়ে দেওয়া যায়। আজকাল তো এমন যন্ত্রও পাওয়া যাচ্ছে, যা পোশাকে, জুতোতে বা চোখের চশমাতেও লাগিয়ে রাখা যায়। ফলে খুব সহজেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছে ‘ওয়ারেবল ডিভাইস’।

আরও পড়ুন: মেধাকাল

একজন খেলোয়াড় যখন মাঠে (আউটডোর) বা কোনও যন্ত্রে (ইন্ডোর) প্র্যাকটিস করেন, অতি শক্তিশালী থ্রি-ডি ক্যামেরার সাহায্যে ল্যাবে বসে এই টেকনলজির সাহায্যে তার প্রতিটি মুভমেন্টের বিশ্লেষণ করেন গবেষকরা। সেই বিশ্লেষণই বলে দেয়, আর কী কী করলে বাড়বে সেই খেলোয়াড়ের ফিজিক্যাল পারফরম্যান্স। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন একটুকরো সেন্‌সর দৌড়বিদের জুতোতে বা সাঁতারুর সুইমিং গগলসে থাকবে লাগানো আর তারই সাহায্যে মিলবে পারফরম্যান্স উন্নত করার নানান টিপস। এই ধরনের ডিভাইসগুলো একেবারে নিখুঁত অঙ্ক কষে দেখিয়ে দেবে সেই খেলোয়াড়ের ইনজুরি রিস্ক কত? একইভাবে একজন ডাক্তারও এই ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করে বয়স্ক পেশেন্টদের, যাঁদের মুভমেন্ট প্রবলেম রয়েছে, তাঁদের হাঁটাচলা ঠিক করতে পারবেন।

আরও পড়ুন: শৈশবের হিরো, কৈশোরের গুরু

আজকের অ্যাথলেটিক দুনিয়ায় কারা ব্যবহার করেন এই ধরনের ওয়ারেবল ডিভাইস? উত্তরে পাবেন লম্বা এক লিস্ট। দৌড়বিদ আর সাঁতারুরা তো অনেকদিন ধরেই এই ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করছেন।  গ্রাউন্ড কন্ট্যাক্ট টাইম আর ফোর্স এনালাইসিস— এই ডিভাইসগুলোর মাধ্যমে এত নিখুঁতভাবে মাপা যায় যে, আজকাল স্কেটিং বা জাম্পিংয়ের দুনিয়াতেও এর ব্যবহারের ছড়াছড়ি। একইভাবে, ভলিবলের দুনিয়াতে ব্যবহার বেড়েছে এই টেকনলজির।  খেলোয়াড়দের হাঁটুর আঘাত প্রতিরোধের জন্য প্রশিক্ষণের (প্রতিটি অনুশীলনে বা এক সপ্তাহের মধ্যে) সময় কোচেরা লাফের সংখ্যা ট্র্যাক করে সেখান থেকে বুঝতেন কী ধরনের প্র্যাকটিস শিডিউল করা দরকার। আর এই তথ্য পাওয়ার জন্য খেলার শেষে কোচেদের কয়েক ঘণ্টা ধরে ভিডিয়ো দেখতে হত। বর্তমানে, একটি সাধারণ (VERT) নামক পরিধানযোগ্য ডিভাইস ব্যবহার করে খেলা চলাকালীনই যাবতীয় তথ্য পেয়ে যান তাঁরা। অ্যাকসিলরোমিটার ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই তথ্য বের করতে পারেন।

আরও পড়ুন: ক্রুশ্চেভ ভার্সেস টিটো: প্রথম ইউরো কাপ ফাইনাল ছিল ‘কমিউনিস্টদের লড়াই’

সাঁতারুদের (বিশেষ করে এলিট সুইমারদের) কাঁধের পেশিতে চোটের সমস্যা বেশি হয়। এই ধরনের চোট-আঘাত সাধারণত কীভাবে বডি রোল করছে, কতটা স্ট্রোক দিচ্ছে— তার ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে চেষ্টা চলছে এই ধরনের সেন্সর ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্ট্রোক কাউন্ট এবং বডি রোল মুভমেন্ট বিশ্লেষণ করে কাঁধের আঘাত প্রতিরোধ করার। তবে, একটা কথা মনে রাখতে হবে— এই ধরনের ডিভাইসগুলোর মাধ্যমে প্রচুর তথ্য পাওয়া গেলেও, সেই তথ্য অনুযায়ী খেলোয়াড় কী করবেন, তা তার একার পক্ষে বোঝা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। এরজন্য সাহায্য লাগবে এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের।  স্পোর্টস সায়েন্টিস্টদের পক্ষে সম্ভব এই তথ্য বিশ্লেষণ করে খেলোয়াড়দের উপযুক্ত প্র্যাকটিস শিডিউল তৈরি করে দেওয়া বা তাঁকে তাঁর সম্ভাব্য ইনজুরি সম্বন্ধে সচেতন করে তোলা। ঠিক এই ধরনের সাহায্য পেয়ে থাকেন বিদেশের প্রায় সব খেলোয়াড়রাই।

আরও পড়ুন: অমল জলে অমল পুজো

তাই, খেলা এখন আর শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড়ের জন্মগত নিজস্ব স্কিলের ওপর নির্ভরশীল নয়। নিজস্ব সেই ব্যক্তিগত স্কিলকে আরো নিখুঁত করে তুলতে সাহায্য লাগে ঝাঁ-চকচকে উন্নত এক ল্যাবরেটরির আর অসংখ্য ছোট-বড় নানা ধরনের যন্ত্রপাতির। কোচ, স্পোর্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং ওয়ারেবল টেকনলজি— এই তিনের সঠিক সমন্বয়ে খেলোয়াড়দের হাতের মুঠোয় আসছে অলিম্পিক মেডেল।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *