দেশবিভাগ এবং সাহিত্যে তার প্রতিফলন বিষয়ে চিত্তরঞ্জন কলেজের উদ্যোগে ওয়েবিনার

Mysepik Webdesk: চিত্তরঞ্জন কলেজের ইতিহাস বিভাগ ও IQAC কমিটির পরিচালনায় রাজ্যস্তরে এক দিবসের ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হল ২১ অক্টোবর। আলোচনার বিষয় ছিল ‘ভারত ব্যবচ্ছেদ: সাহিত্যে তাঁর প্রতিফলন’। আলোচনা সভার প্রধান পরিচালক ছিলেন IQAC কমিটির কনভেনর এবং ইতিহাস বিভাগের প্রধান ড. পারমিতা দাস। আলোচনাসভার প্রধান বক্তা ছিলেন সংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপিকা ড. সমতা বিশ্বাস। তাঁর আলোচনা শুরুর আগে IQAC কমিটির কনভেনর ড. পারমিতা দাস ও কলেজের শিক্ষক সংসদের সম্পাদক ড. জয়শ্রী দাস আলোচনার সূচনা করেন। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সৈয়দ ওয়ালিওল্লা, তসলিমা নাসরিনের সাহিত্য।

বক্তা ড. সমতা দাস প্রথমে ভারত ব্যবচ্ছদের প্রাসঙ্গিকতা আজ কোথায়, তা আলোচনা করেছেন খুব সুন্দরভাবে। বক্তার নিজের ব্যক্তিগত জীবন বা পারিবারিক জীবনে ভারত দেশভাগের কোনও প্রভাব নেই। কিন্তু ২০১৮ সালে অসমে যখন এনআরসি প্রকাশিত হবার ফলে ১৮ লাখ মানুষ ভারতীয়র প্রথম তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেল, ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হল এবং এর ফলে ভারতীয়ত্ব আর নিশ্চিত রইল না। এখানেই আজ দেশভাগের আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।

আরও পড়ুন: পুজো মণ্ডপে নিষিদ্ধ অঞ্জলি-সিঁদুর খেলা: হাইকোর্ট

দেশভাগের এই ভয়াবহ পরিণতি প্রতিফলিত হয়েছে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও উর্দু সাহিত্যে। এখনও এই চারটি ভাষায় দেশভাগ নিয়ে সাহিত্য লেখা হচ্ছে। ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ পর্যন্ত সময়ের সাহিত্যকে দক্ষতার সঙ্গে বক্তা বিশ্লেষণ করেছেন। ২০০০ সালের পর থেকে মহিলা ও দলিত লেখক দের লেখায় দেশভাগের স্মৃতি উঠে এসেছে।

কেন আমরা এই দেশভাগকেও সাম্প্রদায়িকতা, হিংসার ইতিহাসকে ভুলে যাব না এই প্রসঙ্গে অধ্যাপিকা বিশ্বাস, অনিন্দ্য রায়চৌধুরির ‘Narrating South Asia’ বইয়ের কথা তুলে ধরেছেন, যেখানে অনিন্দ্য রায়চৌধুরি বলছেন, ভারত ব্যবচ্ছেদের ফল মানে লক্ষ লক্ষ মানুষের হত্যা, মহিলাদের ধর্ষণ, উদ্বাস্তু সমস্যা শুধু না, দেশভাগের ফলে সৃষ্টি হয়েছে অনেক সাহিত্য, সিনেমা, স্মৃতিকথা, আত্মজীবনীও। দেশভাগ নতুন পরিচয় তৈরি করেছে। পুরনো পরিচয় হারিয়ে গেছে। দেশভাগ অতীতের সঙ্গে আমাদের বর্তমানের যোগসূত্র তৈরি করেছে। প্রত্যেক হিংস্রতার ইতিহাসের মধ্যে একইসঙ্গে রয়েছে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, আশ্রয়ের ইতিহাস। দেশভাগের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় আমাদের দেশে শুধু হিংস্রতা নয় এক ধরনের সম্প্রীতিও ছিল, যা এখনও আছে।

আরও পড়ুন: ৩২ বছর ঢাক বাজাচ্ছেন, এবারের মতো পুজো কখনও দেখেননি রামদেওয়ানপুর গ্রামের ঢাকি তুফান প্রামাণিক

তিনি পরবর্তী স্তরে আলোচনার জন্য মূলত পাঁচটি বিষয় বেছে নিয়েছেন। তা হল— হিংস্রতা, গৃহহীন মানুষ, অপহৃত মানুষ মূলত মহিলাদের হস্তান্তর, জাতি ও জাতীয়তাবাদ এবং কারা উদ্বাস্তু? হিংস্রতা প্রসঙ্গে বলেছেন পঞ্জাব ও বাংলার হিংস্রতার চরিত্র ছিল বিভিন্ন। পঞ্জাবের থেকে বাংলার হিংস্রতা অনেকদিন ধরে চলেছিল। এই প্রসঙ্গে আজিজ আহিমতের ছোট গল্প ‘কালিরাত’, সাদাত হাসান মান্টোর ‘খোল দো’র বর্ণনা করেছেন। গৃহহীন মানুষদের কথা বলতে গিয়ে পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ ও পাকিস্তান থেকে আসা মানুষের নস্টালজিয়ার কথা তুলে ধরেছেন যেখানে নিজের বাড়ি, পুকুর, গাছের প্রতি ভালোবাসা বাংলা সাহিত্যে ফুটে উঠেছে। তৃতীয় ধরনের সাহিত্য মেয়েদের নিয়ে লেখা হয়েছে, যাদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার হয়েছিল যেমন ঋতু মেনন ও কমলা হুসেনের লেখায় পঞ্জাব প্রেসিডেন্সির মেয়েদের বর্ণনা পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে মেয়েদের ভারত ও পাকিস্তানের সীমানার এপার আর ওপারে হস্তান্তরিত হওয়া ও তারপর তাঁদের জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে রাজেন্দর সিং বেদির ‘লাজবন্তী’ ছোটগল্পে। এই বিষয় নিয়ে ২০২০ সালে প্রকাশিত  হয়েছে কল্লোল লাহিড়ীর ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’। এরপর তিনি মনোরঞ্জন ব্যাপারির দলিত সাহিত্য ‘Interrogating my Chandal Life: An Autobiography of a Dalit’ নিয়ে বর্ণনা করেছেন, যেখানে দেখানো হয়েছে সব উদ্বাস্তুদের একভাবে দেখা হয়নি। দলিত উদ্বাস্তু এবং মহিলা উদ্বাস্তুরা স্মৃতিকথা লিখেছে। কোন উদ্বাস্তু নাগরিক হবে, কোন উদ্বাস্তু নাগরিক হবে না, তা জাতি পরিচয় ঠিক করে দিয়েছিল।

তাঁর মতে ব্যবচ্ছেদ, সাম্প্রদায়িকতা আজও ভারতে বর্তমান। এদিনের ইউটিউবের মাধ্যমে সম্প্রসারিত ওয়েবিনারটিতে একশোর বেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের অধ্যাপক, গবেষক এবং ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করেন। শেষ অংশে প্রশ্নোত্তরের পর্বটি ও বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *