‘দেশভাগ: ঐতিহাসিকতা, চলচ্চিত্র, সংগীত ও নাটক’ বিষয়ে ওয়েবিনার, আয়োজনে চিত্তরঞ্জন কলেজ

Mysepik Webdesk: ‘দেশভাগ: ঐতিহাসিকতা, চলচ্চিত্র, সংগীত ও নাটক’ এই শিরোনামে চিত্তরঞ্জন কলেজের ইতিহাস বিভাগ ও আইকিউএসি-র উদ্যোগে রাজ্যস্তরে এক দিবসীয় ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি। এদিন অনলাইন আলোচনাচক্রে তিনজন বক্তা ছিলেন। প্রথম বক্তা ছিলেন ড. তিস্তা দাস, বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপিকা; দমদম মতিঝিল কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপিকা ড. মিমি ভট্টাচার্য এবং সংগীত শিল্পী, সংগীত গবেষক গান, চলচ্চিত্র, যাত্রা ও নাটকের একজন লেখ্যাগারিক ড. দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায়।

অনুষ্ঠানে এই তিনজন ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পেশ করেন আয়োজক কলেজের মাননীয় অধ্যক্ষ ড. শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি। তিনি তাঁর পরিবারের পূর্বসূররিরা কীভাবে নিরাপত্তাহীনতা থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছিলেন, তার বর্ণনা তুলে ধরেন। তিনি নিজে পূর্ববঙ্গ থেকে চলে এসেছিলেন ১৯৬৩ সালে। তাঁর আত্মীয়রা যাঁরা ওখানে থেকে গিয়েছিলেন, তাঁরা খুন হয়েছিলেন। তাঁর মতে, দণ্ডকারণ্য থেকে উদ্বাস্তুরা চলে এসেছিল মরিচঝাঁপিতে তাদেরকে আবার ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। এটি একটি বড় ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন অধ্যক্ষ মহাশয়। আলোচনার প্রারম্ভিক বক্তা ড. তিস্তা দাস তাঁর বক্তব্যে বাংলার উদ্বাস্তুদের অভিগমনের ভৌগলিক পরিসরের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং একইসঙ্গে তাদের চিহ্নিতকরণের পদ্ধতি সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করেন। উদ্বাস্তু আন্দোলনের দাবি হল, তাদের উদ্বাস্তু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। উদ্বাস্তুরা শুধু দেশভাগের কারণে আসেনি, তারা ‘ভয়’ পেয়ে এসেছিল এবং এই ‘ভয়’ দেশভাগের ফলে হয়নি। উদ্বাস্তুরা তার গৃহ থেকে নেশনের দিকে যাত্রা করেছিল। এই যাত্রাই তাদের পরিচয় ঠিক করে। আবার রাষ্ট্র কেমন ব্যবহার করছে উদ্বাস্তুদের সঙ্গে তাও গুরুত্বপূর্ণ।

বক্তা দক্ষিণারঞ্জন মজুমদার তাঁর লেখায় রাতের অন্ধকারে জোর পূর্বক স্থান ত্যাগে বাধ্য উদ্বাস্তুদের অসহায়তার কথা তুলে ধরেছেন। ইন্দুবরণ গাঙ্গুলি তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন, উদ্বাস্তুরা আশা করেছিল স্টেশনে সরকারি অভ্যর্থনা পাবে, কিন্তু তাদের হতাশ হতে হয়েছিল। এই জন্মভূমি বা ভিটে-মাটি ছেড়ে নতুন মাটির সন্ধানে যে যাত্রা, তা গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের যাত্রা। অন্যদিকে, ড. তিস্তা দাসের কথায়, ফেলে আসা দেশ শুধুমাত্র নেশন নয়, তা স্মৃতির আধারও।

কলোনিতে তখন যে বাজার তৈরি হয়েছিল, সেখানে বিভিন্ন দোকানের নামকরণ হয়েছিল পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের নামে, যেমন― ঢাকা, কুমিল্লা ইত্যাদি নামে। কিন্তু কলোনি-জীবনে সাম্য ছিল না। সেখানে বর্ণভেদ ছিল। মধ্যবিত্তরা মধ্যবিত্ত কলোনিতে স্থান পেয়েছিল। উদ্বাস্তু জীবন একমাত্রিক ছিল না। সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অন্তর্দ্বন্দ্ব ও দলীয় রাজনীতি। উদাস্তুদের জন্য যে সরকারি সাহায্য এসেছিল, তা নয়ছয় করা নিয়ে গড়ে উঠেছিল নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বও। একদিকে ছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্ব। আবার একচিলতে জমি পাওয়ার আশায় রাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে চলবার বাধ্যবাধকতাও ছিল। ওয়েবিনারে এই গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের যাত্রার বর্ণনা করতে গিয়ে উঠে এসেছে কলকাতার বিভিন্ন কলোনি, যেমন― বিজয়গড় কলোনি, চিত্তরঞ্জন কলোনি, নেতাজিনগর কলোনির ইতিহাস। ক্রমশ এই কলোনিগুলি তাদের মত প্রকাশের রাজনৈতিক মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। এইভাবে উদ্বাস্তু আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। এই আন্দোলনে ইউনাইটেড সেন্ট্রাল রিফিউজি কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল উদ্বাস্তুদের ঐক্যবদ্ধ রেখে তাদের অধিকার দেওয়া।

ড. মিমি ভট্টাচার্য বক্তব্য রাখেন ‘দেশভাগ: ঘর থেকে বিশ্বে ফিরে দেখা নারীর ইতিহাস’ এই বিষয়ের উপর। তিনি বলেন, “দেশভাগ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ অনেক পরে শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার ৪১ বছর পর গোবিন্দ নিহালানির পরিচালনায় প্রথম দেশভাগের উপর চলচ্চিত্র প্রকাশিত হয়েছিল ‘তামস’ (১৯৮৮)।” তিনি আরও বলেন, “হয়তো চলচ্চিত্র নির্মাতারা ভেবেছিলেন, যতদিন মানুষের মনে দেশভাগের জ্বলন্ত ছবি থেকে যাবে ততদিন দর্শকরা দেশভাগের উপর কোনও চলচ্চিত্র গ্রহণ করতে পারবেন না।” মিমি ভট্টাচার্যের কথায়, “চলচ্চিত্রের ভুবন হল ‘পলাতকী ভুবন’। চলচ্চিত্রে দেশভাগের ভূমিকা মূলত পরোক্ষ।” এই প্রসঙ্গে দু’টি চলচ্চিত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ও ‘মহানগর’-এর উল্লেখ করে সিনেমার মাধ্যমে দুই নারীর সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন তিনি।

দেশভাগের অভিঘাতে মধ্যবিত্ত জীবনে ক্ষমতার কাঠামোর পরিবর্তন হয় ও নারীর নবজন্ম হয়। এ-প্রসঙ্গে তিনি প্রথমে বলেন, কীভাবে বিংশ শতকের প্রথম দিকে নারীর জীবনে পরিবর্তন এসেছিল। গান্ধিজির ডাকে মহিলারা সত্যাগ্রহ ও আইন আমান্য আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। তাদের সাংগঠনিক শক্তি মানুষকে বিস্মিত করেছিল। মেয়েদের মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছিল। এবং এক নতুন দিশা দিয়েছিল। বাধ্য হয়ে তারা পিতৃতান্ত্রিক বেড়াজাল অতিক্রম করে রোজগারে নেমেছিল। তার ফলে তাদের মধ্যে এক নতুন সত্তার জন্ম হয়েছিল। বক্তার মতে দুই চলচ্চিত্রের “দুটি ভিন্ন চরিত্র নীতা ও আরতি কোথায় যেন ঐতিহাসিক বহমান ধারায় মিলে যায়। … যক্ষ্মা আক্রান্ত নীতার আঁতুড়ঘরে নিজেকে আবদ্ধ করার মাধ্যমে কোথাও ঋত্বিক ঘটক ক্ষমতার কাঠামোর পরিবর্তনের দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ‘মহানগর’ চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায় দেখিয়েছেন কীভাবে একজন সাধারণ গৃহবধূ ক্রমশ সামাজিক দায়বদ্ধ নাগরিকে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মহিলারা তখন বিভিন্ন পেশায় যোগ দিতে শুরু করেছিল। প্রথা ভেঙে ঘরের বাইরে এসে চাকরি করাটাও যে একটা বিপ্লবেরই অঙ্গ, তা ‘মহানগর’ চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে।”

এরপরের বক্তা ড. দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায় শুরুতেই বলেন, “দেশভাগের জন্য আমাদের আজ দু’টি পরিচয়। আমরা পশ্চিমবঙ্গীয় ও ভারতীয়।” উল্লেখ্য, অচিন্ত্য সেনগুপ্তর কবিতা ‘পূব-পশ্চিম’ দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। এরপর তিনি নাটকের প্রসঙ্গে যাবার আগে ১৯৩৫ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪৬ সালের ভারতের রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরেছেন। এখানে তিনি রাজনৈতিক পালাবদল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শিল্পী রামকিঙ্করের বক্তব্য তুলে ধরেন। রামকিঙ্কর বলেছিলেন, একজন সামাজিক জীব হিসেবে দেশভাগ, দাঙ্গা, মন্বন্তর এই রকম যত ঘটনা মানুষকে অপমান করেছে, তা শিল্পীকে আন্দোলিত করবেই। তাই শিল্পীর উচিত আলোর কথা, জীবনের কথা ঘোষণা করা।

নাটকের ইতিহাস বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “প্রথম দিকে ঐতিহাসিক নাটক বলতে বোঝাত চন্দ্রগুপ্ত, শাহজাহান, শিবাজিকে নিয়ে লেখা। তখন জীবনের কথা নিয়ে নাটক লেখা প্রায় হয়নি। ১৯৪৩ সালে প্রথম গণনাট্য সংস্থা গড়ে ওঠে এবং ১৯৪৪ সালে সেই সংস্থা প্রথম পরিচালনা করেছিল ‘নবান্ন’। তখন ঋত্বিক ঘটক নাটক লিখছেন। তখন যদিও দেশভাগ হয়নি, কিন্তু দেশভাগের প্রস্তুতি চলছিল।” ‘নবান্ন’ তৈরি হবার পর সাধারণ মানুষের জীবনের কাহিনি নিয়ে নাটক লেখা হয়েছিল। যেমন তুলসী লাহিড়ীর ‘দুঃখীর ইমান’। তাঁর আলোচনাতেও নারীদের অভাবের তাড়নায় বাড়ির গণ্ডি অতিক্রম করার ঘটনা ধরা পড়ে। কিন্তু সকল নারীর ক্ষেত্রে এর ফল শুভ হয়নি। গানে সুর তুলে বাইরে গিয়ে পুরুষের বিনোদনের মাধ্যম থেকে তারা হয়ে যায় সমাজের পরিত্যক্ত নারী। এইভাবে তৈরি হয় ঘর ভাঙনের ইতিহাস।

তাঁর আলোচনায় উঠে এসেছে পেশা বদলের ইতিহাস। শিক্ষা প্রদান, ওকালতি ছেড়ে এপাড়ে এসে উদ্বাস্তুদের অনেকেই যাত্রাপালা লিখেছিল। যাত্রাপালায় ফুটে উঠেছে হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির কথা। বক্তার মতে তা হয়তো সাহিত্যে, যাত্রা, পালাতেই সম্ভব, তবুও আমরা আশাবাদী। এরপর তিনি সত্যেন্দ্রনাথ সেন এর ‘এই স্বাধীনতা’ নাটক যা সরাসরি আঘাত করেছিল দেশভাগকে, তা উল্লেখ করেন। সলিল চৌধুরীর ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূ’ গানটি বিশ্লেষণ করেন, যার মধ্যে জীবনবোধ তুলে ধরা হয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের মনকে ছুঁয়ে গিয়েছিল।

এরপর আইকিউএসি কো.অর্ডিনেটর ড. পারমিতা দাস বিশ্লেষণ করে বলেন, এখানে বিভিন্ন ধরনের উদ্বাস্তু পরিবারহীন নারীর শিবির, পরিবার নিয়ে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের শিবিরের জীবন সংগ্রামের কাহিনি জানতে পারলাম। বিভিন্ন রকম দ্বন্দ্ব, যেমন― রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, উদ্বাস্তুদের নিজেদের মধ্যে দন্দ্ব এবং বহিরাগতদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ইতিহাসও ছিল। নারীদের চিরাচরিত বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার ফলে তিন ধরনের নারীর কথা জানা যায়। এক ধরনের নারী গান গেয়ে পুরুষদের বিনোদনের মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে। তার সামাজিক সম্মান হারাচ্ছে। আরেক ধরনের নারী যে পরিবারকে আর্থিক নিরাপত্তা দিচ্ছে কিন্তু মুক্তি পাচ্ছে না, তাঁর স্বপ্ন মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। আরেক ধরনের নারী পরিবারকে আর্থিক নিরাপত্তা দিয়ে তাঁর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। তিনি জানান, দেশভাগের ফলে কেবলই হিংস্রতা নয়, পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে সাহিত্য ও সাহিত্যিক, শিল্প ও শিল্পী। এর পর দেবজিতবাবুর দেশভাগের উপর একটি সুন্দর সংগীতের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ওয়েবিনারের সমাপ্তি ঘটে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *