পোকেমনের দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগত

অনিন্দ্য বর্মন

ওয়েলকাম টু দ্য ওয়ার্ল্ড অফ পোকেমন…। এই শব্দমালা ব্যবহার করেই বিগত ২৫ বছর কথক আমাদের পোকেমনদের পৃথিবীতে নিয়ে চলেছেন। পোকেমনের প্রত্যেকটি এপিসোড, মুভির শুরুতেই থাকে এই শব্দগুলি। শুধু ভারতই নয়, সারাবিশ্বের মানুষ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মজে আছেন পোকেমনদের দুনিয়ায়। এখানে মানুষ বাদে অন্যান্য সমস্ত জিবজন্তুই হল একেকটি পোকেমন। তাদের হরেক নাম, আকৃতি এবং স্বভাব। অবশ্য পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল প্রাণীর সঙ্গেই পোকেমনের কিছুটা সাদৃশ্য আছে। কিন্তু তাদের মজার গঠন, স্বভাব, বিশেষ শক্তি এবং কর্মকাণ্ড সকল দর্শকের মন জয় করে নিয়েছে।

আরও পড়ুন: ম্যান অব দ্য সিরিজ

অ্যাশ, পিকাচু, মিস্টি, ব্রক, ম্যাক্স, মে, ক্ল্যেমেন্ট, বনি, সেলেনা, সিলান, ডন, আইরিস, প্রফেসর ওক, ট্রেসি— এই নামগুলোর সঙ্গে পরিচিত প্রায় সমস্ত পৃথিবীর মানুষ। বিশেষ করে শিশুরা। তবে পোকেমন শুধুমাত্র টিনএজারদের গণ্ডিতে আটকে নেই। বড়রাও তাদের নিয়ে যথেষ্ট উৎসাহী। এমনকী খাস কলকাতাতেও পোকেমন সফট টয়স অথবা মার্চেন্ডাইস বেশ জনপ্রিয়। এবং মা-বাবারাও তাঁদের সন্তানকে পোকেমন কিনে দিতে যথেষ্ট আমোদ উপভোগ করেন। পোকেমন আজ সমস্ত গণ্ডি পেরিয়ে সবার মন জয় করে চলেছে বিগত ২৫ বছর।

আরও পড়ুন: মুঘল দরবারে আম

অ্যাশ এবং বিভিন্ন এপিসোডে তার বন্ধুরা

আশা করি পাঠক বুঝতেই পেরেছেন যে, এই লেখাটি পোকেমনদের নিয়ে। অনেকেই তাদের এবং তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত। তবুও মূল লেখায় প্রবেশের আগে, আসুন, পোকেমনদের সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক। বিভিন্ন রেটিং অনুযায়ী পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ২৫টি কার্টুনের একটি হল পোকেমন। এবং গত দুই দশকে এই পরিসংখ্যান বিশেষ বদলায়নি। ১৯৯৫ সালে জাপানের সাতোশি তাজিরি এই কার্টুনটি তৈরি করেন। প্রথম থেকেই পোকেমন জয় করে নিয়েছে আপামর কার্টুনপ্রেমীদের মন। ভারতে পোকেমন প্রথম সম্প্রচার করা হয় আনুমানিক ২০০১ সালে কার্টুন নেটওয়ার্ক চ্যানেলে।

আরও পড়ুন: প্যানকেকগুলি

সাতোশি তাজিরি

গল্প অনুযায়ী, প্যালেট শহরের একটি শিশুর নাম অ্যাশ কেচাম। বয়স দশ। নিয়ম অনুযায়ী, দশ বছর পূর্ণ করার পর একজন শিশু পোকেমন ট্রেনার হতে পারে। অ্যাশের স্বপ্ন, সে বড় হয়ে পোকেমন মাস্টার হবে। প্রফেসর ওকের থেকে অ্যাশ নিজের প্রথম পোকেমন পায়— পিকাচু। পিকাচুকে নিয়ে অ্যাশ বেড়িয়ে পরে বিশ্বভ্রমণে। পথে সে অনেক বন্ধু পায়, জিম ব্যাটেল জেতে, পোকেমন লিগেও সে প্রচুর সাফল্য পায়। এছাড়াও বিভিন্ন প্রদেশ ঘুরে সে প্রচুর পোকেমন দেখে, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে এবং তাদের ধরে। এভাবেই গত ২৫ বছর ধরে পোকেমন কার্টুনটি এগিয়ে চলেছে।

আরও পড়ুন: সম্বুদ্ধজাতিকা (৩য় অংশ)

অ্যাশ ও পিকাচু

কিছু জিনিস এখানে স্পষ্ট করে দেওয়া উচিত। এই পোকেমনদের পৃথিবীটা ঠিক কেমন? আগেই বলেছি যে, দশ বছর পূর্ণ করলে একটি শিশু পোকেমন ট্রেনার হতে পারে। তার জন্য তাকে বিভিন্ন পোকেমন ধরতে হবে, তাদের ট্রেনিং দিতে হবে, জিম ব্যাটেল জিততে হবে এবং তবেই সে বিভিন্ন পোকেমন লিগে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এভাবেই সে একদিন অ্যাশের স্বপ্ন অনুযায়ী পোকেমন মাস্টার হয়ে উঠতে পারবে। তবে পোকেমন ধরা মানে কিন্তু তাদের বন্দি করা অথবা দাসত্ব নয়। এই পোকেমনরা তাদের ট্রেনারদের বন্ধু। ট্রেনারদের জন্য তারা সবরকম ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।

আরও পড়ুন: ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুর্শিদাবাদ

পোকেমন ট্রেনার্স এবং তাদের পোকেমন

ট্রেনার হতে গেলে সবার আগে নিজের প্রদেশের প্রফেসরের (পোকেমন এক্সপার্ট) থেকে নিজের প্রথম পোকেমন নিতে হয়। যেমন অ্যাশের প্যালেট অথবা ক্যান্টো প্রদেশে আছেন প্রফেসর ওক। এনার থেকেই অ্যাশ নিজের প্রথম পোকেমন পায় পিকাচু। পোকেমনদের ধরার এবং রাখার জন্য একধরনের বিশেষ বল ব্যবহৃত হয়— পোকেবল। ট্রেনাররা এই পোকেবলেই তাদের পোকেমনদের রাখে এবং প্রয়োজনে তাদের বল থেকে বের করে আনে। বিভিন্ন পোকেমন সম্বন্ধে জানার জন্য ট্রেনাররা ব্যবহার করে পোকেডেস্ক। এটা একটা যন্ত্র, অনেকটা মোবাইলের মতো যাতে বিভিন্ন পোকেমনের তথ্য ভরা থাকে। পোকেমনদের ট্রেনাররা জিম ব্যাটেল লড়াই জেতার জন্য ব্যবহার করে। এই লড়াইয়ে জিতলে ট্রেনাররা একটি করে জিম ব্যাজ পায়। মোট আটটি জিম ব্যাজ পেলে একজন ট্রেনার সেই প্রদেশের পোকেমন লিগে অংশগ্রহণ করার ছাড়পত্র পায়।

আরও পড়ুন: আঁকা-লেখা

প্রফেসর ওক

মূল লেখায় যাওয়ার আগে আরেকটি জিনিস বলে নেওয়া দরকার। হিসেব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ৫০০-র ও বেশি পোকেমন আছে। শুধুমাত্র অ্যাশের সংগ্রহেই আছে ৫০-এরও বেশি পোকেমন। এবং এই সমস্ত পোকেমনের ধরন এবং প্রকৃতি আলাদা। জিম ব্যাটেল লড়ার জন্য প্রত্যেক পোকেমন নিজের বিশেষ শক্তি ব্যবহার করে। পোকেমনদের ধরন নির্ধারিত হয় তার শক্তির ধরনের ওপর। যেমন গ্রাউন্ড (মাটি), ফায়ার (আগুন), ওয়াটার (জল), গ্রাস (ঘাস), ইলেক্ট্রিক (বিদ্যুৎ), সাইকিক (মানসিক তরঙ্গ), রক (পাথর), ফাইটিং (লড়াকু), ঘোস্ট (ভূত), আইস (বরফ), স্টিল (ইস্পাত), ফ্লাইং (উড়ন্ত), পয়সন (বিষ), বাগ (পোকা) ইত্যাদি। এছাড়াও আছে রেয়ার (যাদের খুব কম পাওয়া যায়) এবং লেজেন্ডারি পোকেমন। এদের ধরা বা ট্রেন করা যায় না। এরা বিশেষ বিশেষ সময়ে মানুষ, পোকেমন এবং সমাজের সাহায্য করে থাকে। গল্পের নায়ক অ্যাশের সংগ্রহে প্রায় সবধরনের পোকেমনই আছে। তার প্রথম পোকেমন পিকাচু ইলেকট্রিক পোকেমন।

আরও পড়ুন: নোটস ফ্রম দ্য ডেড হাউস (৩য় অংশ)

বিভিন্ন ধরনের পোকেমন

পোকেমনরা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসার জন্য আছে পোকেমন সেন্টার। প্রত্যেক শহরেই একটি করে পোকেমন সেন্টার থাকে। এই সেন্টারের দায়িত্বে থাকে নার্স জয় এবং তার পোকেমন চ্যানসি। মজার বিষয় হল, প্রত্যেক শহরেই এইরকম একজন নার্স জয় আছে এবং এদের সবাইকে একইরকম দেখতে। ঠিক সেইভাবেই প্রত্যেক শহরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আছে অফিসার জেনি। নার্স জয়ের মতোই সমস্ত অফিসার জেনিকেই একই রকম দেখতে। তবে অফিসার জেনিদের পোকেমনরা একটু আলাদা হয়। আর আছে দুষ্টু টিম রকেট। এদের প্রধান কাজ হল ভালো পোকেমন চুরি করে তাদের নিজেদের বশে করা। টিম রকেটের সবথেকে জনপ্রিয় তিন চরিত্র হল— জেসি, জেমস এবং তাদের পোকেমন মিয়াওথ। এই মিয়াওথের আরেকটি বিশেষ গুণ হল, সে একমাত্র পোকেমন যে মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে।

আরও পড়ুন: স্মৃতিতে সুন্দরলাল

নার্স জয় এবং অফিসার জেনি

আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমার বয়সি আর পাঁচজন শিশুর মতোই কার্টুনের পোকা। আর আমাদের শৈশবে কার্টুন বলতে ছিল মাত্র দু’টি টিভি চ্যানেল। তৎকালীন ডিডি২-তে বিকেল ৫টা থেকে ১ ঘণ্টা বিভিন্ন কার্টুন সম্প্রচারিত হত। স্পাইডারম্যান, হিম্যান, ব্যাটম্যান, সুপারম্যান, গামি বেয়ার্স, চিপ অ্যান্ড ডেল, মিকি মাউস, ডোনাল্ড ডাক, ডাক টেলস ইত্যাদি দেখেই বড় হওয়া। এছাড়া ডিডি১-এ রবিবার সকাল ১০টায় দিত মোগলি। ১৯৯৬ পরবর্তী কেবল লাইনে সাদা-কালো টিভিতে ধরা পরত আমাদের স্বপ্নের জগৎ— কার্টুন নেটওয়ার্ক চ্যানেল। বারবার চ্যানেল ঘুরিয়ে সেই একটি চ্যানেলের খোঁজ। অবশেষে পাকাপাকিভাবে ১৯৯৯-এ রঙিন টিভির হাত ধরে সে মুঠোয় ধরা দিল।

আরও পড়ুন: ‘এ তুফান ভারী দিতে হবে পাড়ি’, জন্মদিনে ঝোড়ো কবি নজরুল

২০০১-এ একটি বিজ্ঞাপন সম্প্রচারিত হয়। একটা ছোট্ট কিন্তু ভীষণ কিউট একটা প্রাণী টিভি স্ক্রিনে খেলে বেড়াচ্ছে। সেই পিকাচু। সেটা ছিল পোকেমনের বিজ্ঞাপন। সেই থেকেই শুরু। প্রথম দিন থেকেই আমি পোকেমনদের ফ্যান হয়ে গেলাম। প্রথম এপিসোড সম্প্রচারিত হয়েছিল— আই চুস ইউ। এই এপিসোডে দেখানো হয়েছিল যে, অ্যাশ পোকেমন মাস্টার হতে চায়। সেদিন প্রফেসর ওকের থেকে তার প্রথম পোকেমন পাওয়ার কথা। কিন্তু ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ায় সে কোনও পোকেমন পায় না। নাছোড়বান্দা অ্যাশকে প্রফেসর ওক একটি পিকাচু দেন। প্রথমে পিকাচু ছিল অ্যাশের অবাধ্য। মুহুর্মুহু ইলেকট্রিক শক দিয়ে সে অ্যাশকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। সে পোকেবলেও থাকতে চায় না। কিন্তু মাত্র কয়েক এপিসোড পরেই এই পিকাচু হয়ে ওঠে অ্যাশের সর্বক্ষণের সঙ্গী, বেস্ট ফ্রেন্ড। অ্যাশ কখনোই পিকাচুকে পোকেবলে রাখেনি। পিকাচুও অ্যাশের কাঁধে চেপেই দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। দু’জনেই দু’জনকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে এবং একে অন্যের জন্য কোনও রকম ঝুঁকি নিতে ভয় পায় না। এভাবেই পোকেমন তুলে ধরেছে মানুষ এবং পোকেমনের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং বিশ্বাস।

আরও পড়ুন: আসবে ঝড়, নাচবে তুফান…

পিকাচুকে পাওয়ার পর অ্যাশের পোকেমন মাস্টার হওয়ার যাত্রা শুরু হয়। সে ঠিক করে যে, ক্যান্টো প্রদেশের পোকেমন লিগে অংশগ্রহন করবে। তার আগে তাকে আটটা জিম ব্যাটেল জিততে হবে। পেতে হবে আটটা জিম ব্যাজ। পিকাচুকে সঙ্গে নিয়ে অ্যাশ সেরুলিয়ান শহরের দিকে যাত্রা শুরু করে।

ক্রমশ…

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *