জনপ্রিয়তা কি সীমাবদ্ধতাও

নিবেদিতা ঘোষ রায়

বুদ্ধদেব গুহর মৃত্যুর পর কলেজ স্ট্রিটে এক বইয়ের দোকানে এক পলিতকেশ বৃদ্ধ এসে ‘মাধুকরী’ চাইছেন। আমার এক বন্ধু দেখেছে। বেস্টসেলার বুদ্ধদেববাবুর মৃত্যুর পর বই বিক্রি হয়তো বেড়েছে, এর চেয়ে ভালো কি হয়! স্ক্রিন রিডিংয়ের সময়ে কেউ হাতে বই নিয়ে পড়তে চাইছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, অদূরে র‍্যাকে ‘মহিষকুড়ার উপাখ্যান’ পড়ে আছে অনাদরে কেন?

আর্ট যেন এক বিশাল গজরাজ। আমরা, তাকে হাতড়ে চলেছি। কেউ লেজের রোম পাচ্ছি, কেউ শুঁড়ের নরম ভেজা অনুভূতি কারও কর্কশ দাঁত, খসখসে চামড়ায় হাত পড়ছে। কারও হাত পিছলে যাচ্ছে জ্যোতির্ময় কোন অনুভূতিতে। এই অসম্পূর্ণ অর্ধদর্শনকে আর্ট বলে মনে করে প্রবল নির্মিৎসায় ভুসভুসে বালির ইমারত সাজিয়ে ফেলে, তাকে অভ্রান্ত নির্বিকল্প বলে ধরে নিলে আত্মতুষ্টিই হয়।

আরও পড়ুন: প্রজনন মায়া লাগে শস্যচরাচরে

পুরো স্পেকট্রাম জুড়েই রঙের খেলা। কালার হুইল অনুযায়ী বারোটি রং। তার মধ্যেই ঘোরাফেরা, সুরেও বারো, গন্ধেও একই নোট বারো। (ফ্র‍্যাগনেন্স, উড, মেটাল, আর্থ ইত্যাদি) পৃথিবীর রেসিও তাই, সেভেন ইস্টু ফাইভ। রাগ দুঃখ আনন্দ প্রাইমারি কালার সঙ্গে মিশে তৈরি হয় সেকেন্ডারি কালার, তাদের সঙ্গে মিলনে টার্শিয়ারি কালার। রং বদলাচ্ছে মুড বদলাচ্ছে। মুডের, আবেগের তো অনড় অবস্থান নেই। প্রাইমারি কালারের মিলনস্থল থেকেই তৈরি হচ্ছে আরও অচেনা রং। রং একটু ফিকে হচ্ছে, আবেগ বদলে যাচ্ছে, গাঢ় হচ্ছে, একটু আলো বেশি পড়ছে, ব্রাইট ঝকঝকে, আবেগের মধ্যে শুরু হচ্ছে অন্য দাদামা। রং তুলে নেওয়া হচ্ছে, ডার্ক বিষণ্ণ, ঘন বিষাদ। কালার একটা অব্যক্ত সিনেমার ল্যাঙ্গুয়েজ। সাহিত্যেরও ভাষা একই।

এইচ.এস.এল। হিউ, স্যাচুরেশন, লাইট। হিউ হল রং, স্যাচুরেশন হল কতটা গভীর অতল, ফিকে। লাইট হল আলো, কোথায়, কতটা, কার ওপর পড়ছে সেটা। মানবমনের ওপরেই পড়ছে। কখনও তার অভিজ্ঞতায় বাইরে, কখনও বৃত্তের মধ্যে। ঘাস বনে যে লাইট পড়েছে, নদীর ব্রিজে তাকে ভিন্ন দেখায়। লুথুয়ার নদীতে বান পড়িল, শালতলে বেলা ডুবিল। এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই এদিক-ওদিক থেকে লাইট পড়ল আবেগের ওপর। যত রকমের ইমোশন, তত রকমের রং, যত রকমের সাহিত্য, তত রকমের ভ্যারিয়েশন। কেই বা কার থেকে ন্যূন। আমি কিছু নির্দিষ্ট করে দেগে দেওয়ার কেউ নই তো। শুধুই ব্ল্যাক আর হোয়াইট তো হয় না। আর্টফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর মানুষে পার্থক্য গ্রে জোনে। আজকে যে সাহিত্য আমার অন্তসারশূন্য, বা ডার্ক লাগছে, কোন এক চরম, বা উদাস মেন্টাল স্ট্যাটাসে, চকিত ক্ষণে এক অচেনা আলো সেইখানেই এক উদ্বেল হাওয়া নিয়ে আসতে পারে। মানুষের মন তো জিরো আর ওয়ান বাইনারি নম্বর ডাইসেক্ট করে না। মোনোক্রোমাটিক কিছু নেই এখানে। সতত পরিবর্তনশীল।

অনেকের বুদ্ধদেব গুহকে কিঞ্চিৎ মাত্রও দরকার পড়েনি বা তাঁর বর্ণিত তরল প্রণয় থেকে উৎসাহিত হবার মতো বস্তুকণাও নেই। যেমন আমারও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ছবি দেখার দরকার পড়েনি। তা বলে সেখানে কোনও কৃতিত্ব, নিষ্ঠা নেই! সেখানে অন্য রং, অন্য স্বপ্ন আছে। গঞ্জ বা আধা মফস্‌সলের বিবর্ণ দিনগুলোতে হয়তো প্রাণবিন্দুর আশা চুঁইয়ে পড়ে এই অভিনেতার হাত ধরেই। হ্যাঁ, আমার স্বপ্নটা নেই সেখানে।

অনুরাগ কাশ্যপ বলেছিলেন, “আমরা দলিতদের জন্য সিনেমা বানাই, কিন্তু তারা ক্যাটেরিনা কাইফকে দেখতে পছন্দ করে।” ‘তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’য় দেবেশ রায় বলেছিলেন, “ভারতবর্ষে যারা কালি কলম ব্যবহার করতে জানে আমাদের মতো, তারা জানে না ভারতবর্ষের দরিদ্রতম ছয় সাত কোটির কথা কোন অক্ষরে লেখা যায়। তাই অক্ষরজ্ঞানহীন এই বৃত্তান্ত যতই লেখা হবে ততই মিথ্যা হবে।”

মহাভারতের মতো যেখানে সব রং রয়েছে, তারপরেও কাব্য লেখা হয়। নতুন সাহিত্য হয়। আল্টিমেট বলে কি হয় পৃথিবীতে। গল্প থেমে থাকে না। কথাকার নানা আলো ছায়ায় তাকে বুনে চলে। সবই তো জীবন নিয়ে! সিরিয়াস সাহিত্য কি, কাহাকে কয়! মেসেজ দেওয়ার ব্যাপার তো!” ‘বাজা তোরা রাজা যায়’ কথা সাহিত্যে বাঘের রূপকে মালিখা পাহাড়ের উঁচুতে এক একক স্বতন্ত্র আত্মসমর্পণহীন জীবনের ধীরে নিভে যাওয়া দেখি যারা মাছি ভনভন বাঁশের চাটাই মোড়া শব হয়ে পাহাড় চূড়ায়, নদী নালার ধারে ছাই হওয়ার জন্য চলে যায়। শহরের দরদি আর্ম চেয়ার কনসার্ভেটারদের বাণী এখানে পৌঁছয় না। যাদের আছে শুধু দেওয়ার। তিস্তা পারের বাঘারুর সঙ্গে কোজাগরের মানিয়ার আপাত মিল আছে, উভয়েই একই রকম নিঃস্ব, মানবপরিচয়হীন। বাঘ শিকারের পর যারা শালপাতা নিয়ে দাঁড়ায় মাংসের ভাগ পাবে বলে, বন্য পশু মরলে তারা আনন্দ করে, স্যাংচ্যুয়ারির পরিসংখ্যানে তাদের কিছু যায় আসে না। এদের সঙ্গে মহিষকুড়ার আসফাকের, মাদারির মা-র পার্থক্য কোথায়। জল জঙ্গল প্রকৃতি সংবলিত আপাত রোমান্টিক সরলতা প্রকৃতপক্ষেই জলধর্মী, অর্থাৎ সহজ, কিন্তু গভীর অনিশ্চিত কুটিল। বুদ্ধদেবের জনপ্রিয়তা তার সীমাবদ্ধতা। যাকে তিনি বলতেন অক্সিমোরন। তার আঙ্গিকের শিথিলতা আছে, ঘটনাবিন্যাসের স্বেচ্ছাচারিতা আছে, শহুরে আরোপ আছে। তাকে দিনের শেষে ব্যক্তিজীবনে, শহরে, পেশায় ফিরতে হয়েছে। অরণ্য প্রকৃতি নদী, পাহাড়, জঙ্গল এমনকী হিংস্র জন্তু সমেত সমগ্র জীবনযাত্রার সংগতি একাত্মতা ছিঁড়ে লেখক তাঁর প্রবল শহুরে উপস্থিতি নিয়ে ঢুকে পড়েছেন। আর অমিয়ভূষণ নিজে বনচারী। তার প্রকৃতি আদিম গহীন। প্রকৃতি এখানে কোনও কৃত্রিম পটভূমি নয়। প্রকৃতিরই স্বাভাবিকত্বের বৃত্তে জন্মানো মানুষের কথা। বিভূতিভূষণের অরণ্য অনুভূতি আধ্যাত্মিক। “আরণ্যক জীবন এখানে ক্ষীন বিচ্ছিন্ন। প্রকৃতি তাকে যত টুকু ছেড়ে দিয়েছে তার মধ্যেই সে মাথা গুঁজে আছে, ঘুম পাড়ানিয়া আচ্ছন্নতায়।”

ঠুঁটা বাইগা, ল্যাড়া পাহান, বাইধর, টিগা, কাড়ুয়া, মানিয়া, নানকু, হাড়িবন্ধু, টিগর, এরা লেখকেরই শিকার জীবনের অনুভূতির কক্ষপথে আবর্তিত। এদের জীবনপর্যায়য়ের গাঢ় রং আঁকা হলেও খণ্ডিত। বুদ্ধদেবের প্রকৃতি অনেক টুরিস্ট স্পটের জন্ম দিয়েছে, মুদ্রণ ইন্ডাস্ট্রিকে ব্যবসা দিয়েছে। বাঙালিকে জঙ্গলের রোমান্স এনে দিয়েছে।

আরও পড়ুন: আদিবাসীরা নাচবে না

আমি অনেক বছর আগে থিম্পু যাচ্ছিলাম। ভুটানে ঢোকার পারমিশানের জন্য ভুটান গভর্নমেন্টের দপ্তরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। কতগুলো সাদা থান পরা বিধবা বুড়ি বগলে পোটলা পুঁটলি নিয়ে দলবেঁধে বিভ্রান্ত হতচকিতভাবে এদিক-ওদিক ঘুরঘুর করছিল। তাদের কেউ কেউ নেড়া মাথা, কারো বয়েজ কাট সাদা চুল, কারো খোঁচা করে কাটা, চারটে বাটিওয়ালা ঢাউস টিফিনবাক্স নিয়ে তারা এমনভাবে চারপাশে চাইছে যেন, যেন কীর্তনের আসরের বহু আকাঙ্কিত খিচুড়ি মিস করেছে এইমাত্র। চারিদিকে প্রচুর নর্থ-ইস্টের লোক না থাকলে জায়গাটাকে কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাট মনে হত।

জিজ্ঞেস করলাম তারা কোথায় যাবে?

এক বুড়ি গম্ভীর হয়ে বলল ‘থম্পু’।

দলের এক বৃদ্ধা ঘন কৃষ্ণবর্ণ, সে খুব সন্দিগ্ধ হয়ে বলল, “এই তো টেরেনে এলাম, এখেনে ক পয়সা করে চাইছে র‍্যা?”

আমি অবাক। কাশী, বৃন্দাবন, নবদ্বীপ, পুরী ফেলে এরা সদলে থিম্পু যাচ্ছে কেন? সেখানে বড়-বড় পাহাড়, বিজাতীয় ভাষা, লোকে শুয়োরের মাংস দড়িতে শুকোতে দেয়, শুটকি মাছ বাড়ির উঠোনে মেলে রাখে। মনাস্ট্রিতে ভোঁ-ভোঁ করে জলদগম্ভীর স্বরে বিশাল শিঙা ফুঁকে তিব্বতি মন্ত্র পড়ে। তাঁরা এখানে কি মজা কুড়োতে যাচ্ছেন। থাকবেনই বা কোথায়? ড্রাগন আঁকা হোটেল, হোম স্টে ছাড়া ধর্মশালা তো নেই! বরফ ঢাকা পাহাড়ে অনেক উঁচু বৌদ্ধ মনাস্ট্রি ওরা লাঠি হাতে চড়বে নাকি!

এই ঘটনা লেখক তার বাঁ-চোখ দিয়ে যা দেখার দেখলেন। এবার কেউ একে টেনে নেবেন কমেডিতে, কেউ সমাজ বাস্তবতা, সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট খুঁজবেন। কেউ মনস্তত্ত্বের মাটি খুঁড়ে ফেলবেন। সৃষ্টি হবে ভ্যারাইটি। যে যার মতো বাছবে। সাহিত্য তো কংক্রিটে গাঁথা নয়। সাহিত্যিকের ভাব দর্শন কোন শুঁড়িপথে, কীটের মতো গর্ত খুঁড়ে, ভূমিসংস্থানের কী রূপান্তর সাধন করবে, তার কোন ছাঁচ হয় না। লেখার পর লেখক উলঙ্গ, এবার পাঠক কোন জামা গায় দেবে, কোন লেখক, তার অন্তরাত্মার কোন গোপন ছুঁয়ে ফেলবে কে জানে!

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *