নেগেটিভ যখন পজেটিভ

তন্বী হালদার

এই আছে এই নেই। এ যেন পি সি সরকারের ম্যাজিককেও হার মানিয়ে দিচ্ছে। চার দিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষটা পোস্ট দিল পজেটিভ। দু’দিন আগে পরিচিত মানুষের পোস্টে দেখা গেল, নেই। কবে? কীভাবে? এখন আর কেউ জিজ্ঞাসা করে না। রিপের বন্যা বয়ে যায়। কিছু ব্যক্তিগত স্তরের চেনা মানুষ কিছু ব্যক্তিগত কথা লেখেন। সেই লেখার সঙ্গে আবার কেউ কেউ কমেন্ট করেন। এভাবে ক’দিন চলতে থাকে বাক্য, শব্দ, ইমোজির ঘূর্ণায়মান যাপন। তবে সবাই কিন্তু একটা কথা ভাবে, এবার কার পালা!

মৃত্যু বিষয়টা নিয়ে এখন আর কার ও ভেতর কোনো নস্টালজিয়া কাজ করে না। আসে না কোনো কাব্য। তীব্র হনন ইচ্ছুক মানুষ ও বাঁচতে চায়। বলতে চায় না Death can be so peaceful so majestic. ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমার সেই শেষ চিৎকারের মতো সকলেই আমরা ভেতরে ভেতরে চিৎকার করছে, দাদা আমি বাঁচতে চাই।

আরও পড়ুন­: সম্বুদ্ধজাতিকা (২য় অংশ)

সবাই বাঁচতে চায়। বেঁচে থাকাটা খুব জরুরি। এই সময় জানিয়ে দিচ্ছে কত কথা, কাজ বাকি। কত আপনজনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। হয়তো অনেকের মুখটাও ভালো করে মনে নেই। দু-যুগেরও বেশি সময় যে মানুষটা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মরুভূমিতে রয়ে গেছে, তার আসার কথা ছিল গত বর্ষায়। অতিমারির কারণে ভিসা মেলেনি গতবছর। সে নিশ্চিত এ বছর মৃত্যুমিছিল যেভাবে চলছে, এবারও ভিসা পাওয়া যাবে না। তবে কি আর দেখা হবে না! মরুভূমিতে বৃষ্টি না হলেও ফোনের ওপারে সেই মানুষটার চোখে বৃষ্টি নামে। আর বারিধারায় সিক্ত হয় এ দেশের কোনো স্থানের রুক্ষতা। কত কিছু বাকি আছে। নিদেনপক্ষে চিড়িয়াখানা যাওয়া। চকোবার খাওয়া। শত্রু বলে আর কেউ নেই। মন বলছে সকলের forget and forgive, যখন কোনো আপনজন, পরিচিতমুখ হাসপাতালে ভর্তি থাকছে, মনে হচ্ছে নিজেদের অক্সিজেন লেভেলটাই বুঝি কমে যাচ্ছে। চোখ বুজলে সাদা বিশেষ প্যাকেট মোড়ানো মৃতদেহ। সারি দেওয়া শোওয়ানো। মুখ দেখাও যাবে না। তাই নম্বর দেওয়া। ওই নম্বরটা অমুকের মায়ের। আর এই নম্বরটা তমুকের বাবার। স্বামী স্ত্রী একসঙ্গে ভর্তি হয়ে একজন বেমালুম নেই হয়ে গেল। ওই কুৎসিত ভাইরাস তাকে নেই-রাজ্যের বাসিন্দা করে দিল। যে মানুষটা বেঁচে ফিরে এলো, সে কি আদৌ আর বেঁচে থাকবে! চিতার অগ্নি বা কবরের মাটি তাকে না নিলেও বাকি জীবনটায় সে হয়ে থাকল জীবস্মৃত।

আরও পড়ুন: আম চাষ: ইতিহাস-বৃক্ষ ঘেঁটে

ছোটো, অতি সাধারণ একটা কাজ করতে গেলেও মনে হচ্ছে কি হবে করে? গৃহিণী আচার, আমতেল বানিয়ে বয়ামে ডরতে ভরতে ভাবে, সামনে বছর আবার বানাতে পারব তো! বৃদ্ধ, বৃদ্ধা যারা সুগারের পেশেন্ট অথচ মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসে, দেখা যাচ্ছে বাড়ির অন্য সদস্যরা মাঝেমধ্যেই পাতে একটু মিষ্টি দিচ্ছে নিজেরাই। আহা খাক একটু। অথচ ক’দিন আগেই মিষ্টি খাওয়া নিয়ে ধুন্ধুমার অশান্তি, ঝগড়া, সেন্টিমেন্ট কত কিছুই না হয়ে গেছে। কেউ জানে না কে যে কখন ক্যুইট করবে। কার পালা কখন। এই অন্ধকারের বিবমিষা কবে কাটবে। নতুন করে সূর্যোদয় হবে। কারা কারা থাকবে সেদিন নতুন আলোর সন্তান হিসেবে। তবু একমাত্র বোধ হয় এই হোমোস্যাপিয়ান্স প্রজাতি আশা ছাড়ে না। স্বপ্ন দেখে। বিশ্বাস রাখে বিজ্ঞান ঈশ্বরের উপর। আস্থা রাখে একে অন্যের উপর। যে কাজ একজন সাহসী মানুষ করতে ভয় পায়, একজন খুব সাধারণ ভীতুর ডিম ধরনের মানুষ সহজেই করে দেখিয়ে দিচ্ছে। কত কতরকম সদর্থক কাজ করে। এই অতিমারি তাদের ভেতরকার ঘুমিয়ে থাকা আসল সাহসী মানুষটাকে টেনে বের করে আনছে।

কোভিড টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ এলে একটা মানুষের জীবনে এমন পজেটিভ ঘটনা আর ঘটেছে বলে মনে পড়ে না। নেগেটিভ মানে ম্যারাথনের মশাল এখন তার হাতে। সে ছুটতে পারে। আরো কিছু বছর। আরো কিছু মাস আরো কিছু দিন। আরো কিছু ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড।

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *