‘হাড়িকাঠের কান্না’য় যখন চোখ মেলি

ধীমান ব্রহ্মচারী

কবিতার সঙ্গে ঘর করতে করতে এমন হয়, যেন কবিতার জন্যই এখনও পথ হাঁটা, এই ভিড়ের মধ্যে। জনকোলাহল ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে থাকি সময়ের ব্যবধানে। কবিতার একটা বড় পরিচয় পাওয়া যায় কবিতার মধ্যে দিয়ে। কবিতার সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। আশ্চর্য হতে হয় এই ভেবে, কীভাবে কবিরা এভাবে শব্দ দিয়ে ছবি আঁকেন।

‘একটুখানি বিবেকের কাছে ঝুঁকে

চোখ মেলো-যেমন করে

রাতের অন্ধকারে

মেঘেরা সমুদ্রে নেমে আসে

শুদ্ধি-স্নানে,

জ্যোৎস্না নতজানু হয়

গাছেদের কাছে!

একটুখানি বোসো

বিবেকের কাছে।’

সকালের পর পর কাজ শেষ করে, এখন রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। হাতে সদ্য প্রকাশিত কবিতার বই ‘হারিকাঠের কান্না’। কবি সুকান্ত পাল। কবিতার এই এত বড় সাম্রাজ্যে এভাবে তিনি নিজেকে চেনাচ্ছেন। মারাত্মক একটা কবিতা দিয়ে। সারাবইয়ের এই কবিতাটা প্রথমে আছে। অর্থাৎ মনে হচ্ছে, এই কবিতায় যেন বাকি কবিতাদের নেতৃত্ব দেবে। কত বড় মাপের ভাব না থাকলে এভাবে ‘একটুখানি’ শব্দটাকে নিয়ে এভাবে ছবি আঁকা যায় না। কবিতার নামও এই শব্দ দিয়ে, সেটা হল, ‘একটুখানি’। এখানে কবিতার মধ্যে লুকিয়ে আছে একটা বিবেক, যাকে কবি যেন অনেককিছু শিক্ষা দিচ্ছেন। তাই, সে প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন—

‘একটুখানি বিবেকের কাছে ঝুঁকে

চোখ মেলো— যেমন করে

রাতের অন্ধকারে

মেঘেরা সমুদ্রে নেমে আসে

শুদ্ধি-স্নানে, …’

আরও পড়ুন: রানাঘাটের শরীরচর্চার ইতিহাস

এই কবিতার ছন্দ বেশ ধীর। যেন শান্ত চলাচলের এক সরীসৃপ। হ্যাঁ,  একটু অন্যরকমভাবে এখানে আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘সরীসৃপ’ শব্দটা ব্যবহার করলাম, কারণ কোথাও মনে হচ্ছে এই কবিতার স্বর যেন মাটির মতো করে, মাটির খুব কাছ দিয়ে বা বলতে গেলে ভালো করে বলা যায়, মাটি-ঘেঁষে যেন এই ভাবনার প্রবাহ। তার গতি। তার চলমানতা। তাই কবি নিজেই উপলব্ধি করছেন, সেই স্পর্শ। মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেন ভাবনার গতি।

তবে সবচেয়ে লক্ষ করার বিষয়, কবিতার মধ্য রয়েছে এক চিরকালীন আবেদন। প্রেমের আকুতি যা দুই নরনারীর জীবনে নিয়ে এনেছে পূর্ণতা। তাই কবিতার মধ্যে দেখি বেশ কিছু শব্দ, যার মধ্যে কোথাও একটা শান্ত-ধীর ও স্থিরতার লক্ষণ আছে। যেমন— ‘রাতের অন্ধকারে’, ‘শুদ্ধি-স্নান’, ‘জ্যোৎস্না নতজানু’ আবহমান বাংলা কবিতার ধারায় এই শব্দগুলোই যেন, এক একটা নিঃশব্দে চলাচলকারী চিন্তা। কবি সেই উপমা দিয়েই আঁকছেন তাঁর ছবি। ‘গাছেদের কাছে!/ একটুখানি বোসো/ বিবেকের কাছে।’ এখানে এই প্রসঙ্গে অনেকগুলো স্মরণীয় দিনের কথা মনে পড়ছে। যদিও সব ঘটনায় নিজের, কিন্তু তবুও একটু বলি, পাঠকের উদ্দেশ্য। আমার নিজের গলার স্বর সত্যিই একটা অদ্ভুত। আমাদের ছোটবেলায় গ্রাম থেকে সন্ধেবেলায় অন্য এক গ্রামে যেতাম। শীতের জমির আল বেয়ে বেয়ে চলা। আমরা শুনতাম শীতের রাতে ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ। কোথাও আবার কোনও বৃহৎ সরীসৃপের শুকনো পাতার ওপর দিয়ে চলার শব্দ। দীর্ঘদিন গ্রামের জল হওয়ায় থাকতে থাকতে মনে হত, নিজের অনুভূতি ঠিক যেন, ওই গ্রামের মানুষের মতো। তাদের পায়ে মাটি ঢুকে ঢুকে পা যেত ক্ষয়ে। অথচ তাদের কোনও প্রতিক্রিয়ায় হত না। এভাবে আমরাও তেমন হয়ে যেতাম। তখন আমাদের বিবেক, আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের চেতনা নিজের অন্তরের হুঁশ ফিরিয়ে আনত। কবিও এই প্রকৃতির মধ্যে সেই চেতনা যেন ফিরিয়ে নিয়ে আনছেন বিবেকের হাত ধরে।

বইটার ‘হারিকাঠের কান্না’ শিরোনামের এই কবিতা আছে শেষ হবার একটা কবিতার আগে।

‘সিঁড়ি ঘরের তলায় তক্তপোষের আশ্রয়ে

অদৃশ্য নিদ্রাহীন নক্ষত্রের চোখে চোখ রেখে

এই তো বেশ আছি জীবন্ত মমির আস্তারণে।

স্তব্ধতার ছায়াতলে হারিকাঠের কান্নারা

ঘুরে বেড়ায় আমার চারপাশে দিনরাত

হওয়ায় ভাসে স্বপ্ন জাগানো তত্ত্ব মানবতাবাদ।

তাই বসে থাকি আজীবন এভাবেই

আগুনের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে

জীবনের দুর্নিবার-আকর্ষণে। ‘

কী বাস্তব জড়ানো কথা। ‘সিঁড়ি ঘরের তলায় তক্তপোষের আশ্রয়ে’— এই ঘটনায় তো আমাদের মতো মানুষের বাস্তবতার রূপ। মধ্যবিত্ত পরিবারের আগেকার দিনের বনেদি বাড়ির ‘কোনার ঘর’ সেখানে সাধারণত আমাদের প্রতিদিনের বাসি বিছানা পরে থাকত। ঘরের আলো থাকত সামান্যই, যা না থাকার মতোই। সেখানেই আমাদের কালের ইতিহাস লেপে থাকত বালিশ-চাদরেরা। সেখানেই যেন কবি একাত্ম হয়েছেন। তাই কবির স্পষ্ট স্বীকারোক্তি— ‘অদৃশ্য নিদ্রাহীন নক্ষত্রের চোখে চোখ রেখে/ এই তো বেশ আছি জীবন্ত মমির আস্তারণে।’— আসলে কবিও যেন ক্লান্ত। কবিতার গঠন তিনটি স্তবকে, যেখানে কবির কিছু মুহূর্ত প্রকাশের জন্য তিন তিনবার ভিন্নতার স্বর শোনা গেছে। প্রতিটি স্তবক আবার তিনটে লাইনের। খুব শৈল্পিক গুণ না থাকলে, এভাবে শব্দের মাত্রা বুঝে ছবি তৈরি হয় না। তিনি জীবনের প্রকৃত বাঁচার মাহাত্ম্য পদে পদে বুঝতে পারছেন, আর তাই ‘হারিকাঠে’ মাথা দিয়ে চেয়েছেন নিষ্কৃতি।

আরও পড়ুন: জয়া মিত্রের ‘যাত্রাপুস্তক’

তবে এই পর্বে দাঁড়িয়ে কবি কিন্তু সম্পূর্ণই একা। তাই তিনি কবিতার দ্বিতীয় স্তবকের দ্বিতীয় লাইনে বলেছেন, ‘কান্নারা ঘুরে বেড়ায় আমার চারপাশে দিনরাত’। অর্থাৎ কবির চারিদিকে বা কবিকেই ঘিরে। নিজেই কোথায় যেন এক আত্মসমর্পণ করতে ব্যতিব্যস্ত হয়েছেন। তাই পতঙ্গের লেলিহান শিকার ক্রমশ এগিয়ে যাওয়াকে নিজ মৃত্যুর প্রবণতা হিসাবে দেখেছেন। সামাজিক বাস্তবায়নের যুগেও কবির এরকম ভাবনা অনেকটা আমাদের মতো পাঠককে সুরা জোগানোর কাজ দেবে। পুরো বইটাতে প্রায় তিপান্নটা কবিতার ধারা কোথাও যেন এক সাবলীল গতির মতোই প্রবাহিত হয়। বইয়ের আরও কবিতা, যেমন— ‘শীতঘুম’, ‘আত্মরূপ’, ‘মৌন মিছিল’, ‘কবি ও পৃথিবী’, ‘শব্দের সাথে বাস’, ‘সহবাস’, ‘হারিকাঠের কান্না’, ‘চলে যাবার পর’ প্রায় সব কবিতার মূল সুর কোথাও সাত সুরের মতোই। ‘চলে যাবার পর’ কবিতায় কবি তাই লিখছেন, ‘ঈশ্বর এসে চুমু খায়’।

তাই সার্বিকভাবেই একথা বলতেই পারি, কবিতার মধ্যে কোথাও শব্দের ছবি নির্মাণ কবির নিজস্ব ঘরানার পরিচয়। যা তাঁর প্রকাশিত ‘হারিকাঠের কান্না’ নামক বইটিকে পাঠককে খুব সহজেই টেনে নেবে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *