ভ্রমণের জায়গা হিসেবে প্রসিদ্ধ বোলপুর-শান্তিনিকেতনের ইতিহাসের তালাশ ক’জন?

মহিউদ্দীন আহমেদ

শান্তিনিকেতন। বিশ্বকবির বিশ্বভারতী আর শান্তিনিকেতন এখন একটা আন্তর্জাতিক মান মননের জায়গা। শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত নয়, সারাবিশ্বের মানুষই আসছেন, বেড়াচ্ছেন, থাকছেন। শান্তিনিকেতনের সবুজ পরিবেশ, কোপাই, সোনাঝুরি জঙ্গলের খোয়াই বনের অন্য হাট বা শনিবারের হাট, বিশ্বভারতীর দর্শনীয় স্থান চোখে দেখতে মানুষ যতটা উৎসুক, ততটা জানতে আগ্রহী নয় বোলপুর-শান্তিনিকেতনের ইতিহাস। জানানোর উদ্যোগও নেই। লিখেছেন মহিউদ্দীন আহমেদ।

আরও পড়ুন: ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’

Santiniketan: all you need to know to go | Condé Nast Traveller India |  India | Experiences

বিশ্বকবির বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে ভারতবর্ষ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনো করছেন। করছেন গবেষণাও। শান্তিনিকেতন আজ যে শুধু একটা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাকেন্দ্র, তা নয়। এখানে শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত একাধিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। রয়েছে উত্তরায়ন, রবীন্দ্র ভবন, কলা ভবন, শ্যামলী, কাচমন্দির, শান্তিনিকেতন গৃহ সহ অনেককিছুই। তারপরও পর্যটকদের উপরি পাওনা, যা শান্তিনিকেতন ঘিরে অবস্থিত বাংলাদেশ ভবন, কোপাই নদী, শ্যামবাটী পেড়িয়ে সবুজ সোনাঝুরি জঙ্গল, জঙ্গলে হস্তশিল্পীদের নানান হাতের কারুকার্য শিল্পের সম্ভারে সাজানো হাট, সেখান থেকে আর একটু গেলে আমার কুটির সোসাইটি ও ইকো ট্যুরিজম পার্ক, সবুজ জঙ্গল, ক্যানেল, বল্লভপুর অভয়ারণ্য সহ একাধিক দর্শনীয় স্থান ও হাতের তৈরি নানা শিল্পকর্ম থেকে ব্যাগ, পোশাক-আশাক বিকিকিনির জায়গা। বীরভূমের বোলপুর থেকে শান্তিনিকেতন দূরে নয়। লাগালাগি। আজ শান্তিনিকেতনকে দেখার জন্য সারা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক আসছেন। বোলপুর-শান্তিনিকেতনে এই পর্যটকরা আসায় এখান আর্থ-সামাজিক পরিস্থতির উন্নতি হয়েছে। পর্যটন শিল্প গড়ে ওঠায় একাধিক হোটেল, যানবাহন ব্যবস্থাও উন্নত হয়েছে। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বোলপুর থানার এক অংশ ভাগ করে করা হয়েছে পৃথক শান্তিনিকেতন থানা। মহিলাদের সুরক্ষার জন্য শান্তিনিকেতনে হয়েছে বোলপুর মহিলা থানা। বহিরাগত পর্যটকদের আগমন ও সাম্প্রতিক কালে শান্তিনিকেতন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভারতীই যে বোলপুর-শান্তিনিকেতনের দেখার জায়গা এমন নয়।

আরও পড়ুন: কানাডা থেকে এসে কলকাতাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন ফাদার গাস্তোঁ রোবের্জ

Shantiniketan travel | West Bengal, India - Lonely Planet

আজ শান্তিনিকেতনকে যাঁরা শুধু দেখতে আসছেন, বেড়াতে আসছেন বা অনেকেই কবিগুরুর প্রেমে ভক্তি শ্রদ্ধায় শান্তিনিকেতনের সবুজ শান্তিময় পরিবেশকে আপন করে স্থায়ীভাবে বসবাসও করছেন, তাঁর অনেকেই বোলপুর-শান্তিনিকেতনকে জানতে চেষ্টা করছেন না বা জানার পরিবেশ পাচ্ছেন না। আজ শান্তিনিকেতন শুধুই কবিকেন্দ্রিক এমন নয়। বোলপুর ও বল্লভপুর আমার কুঠিরে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর আগমন, ভাষণ দেওয়া ও বিশ্বকবির সঙ্গে সাক্ষাৎ থেকে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধি যেমন এসেছেন শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের কাছে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিয়াল্লিশের আন্দোলনে বোলপুর রেল স্টেশনে অবরোধ, বিক্ষোভ ও প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে সেখানে বোলপুর পার্শ্ববর্তী এলাকা সহ শান্তিনিকেতনের তৎকালীন শিক্ষিত-এলিট সমাজের মানুষের অংশগ্রহণ, বল্লভপুর আমার কুঠি এলাকায় স্বাধীনতা সংগ্রামী পান্নালাল দাসগুপ্ত থেকে সুষেন মুখোপাধ্যায়দের গোপন ঘাঁটি, শ্রীনিকেতনের চিফ কুঠিতে ব্রিটিশ নীলকরদের নীল চাষ, তার অদূরেই লোহাগড় গ্রামে জনৈক ব্রিটিশ চিফ সাহেবের কবর দেওয়া সহ একাধিক ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত জায়গা রয়েছে।

Shantiniketan#"The abode of peace". The most convenient way to reach  Santiniketan is by train. The

দেশ-বিদেশের মানুষ বীরভূমের বোলপুর-শান্তিনিকেতনকে দেখার আগ্রহ নিয়ে যতটা আসছেন, ততটা তার ইতিহাসকে জানার কোনও চেষ্টা বা চর্চা চোখে পড়ছে না। স্থানীয় স্তরেও ইতিহাসকে তুলে ধরার লোকের বড় অভাবও রয়েছে। বিশ্বভারতীতে প্রতিবছর ১০ মার্চ গান্ধী পূর্নাহ্য পালিত হয়। গান্ধাজী এমন দিনে শান্তিনিকেতনে আসেন। এবং বিশ্বভারতী তথা শান্তিনিকেতন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নেন। সেই দিনটি পালিত হলেও গান্ধি পুণ্যাহ পালনের তাৎপর্য অনেকের কাছে অজানা। শান্তিনিকেতনে রাস্তার ধারে হাতের তৈরি ব্যাগ, কাঁথা স্টিচের শাড়ি চুড়িদার পাঞ্জাবি থেকে নানান শিল্পকর্ম যতটা বিক্রি হতে দেখা যায়, ততটা বিক্রি হয় না বোলপুর-শান্তিনিকেতনের ইতিহাস সংবলিত পুস্তক-পুস্তিকা। মুর্শিদাবাদ হাজারদুয়ারিতে যেমন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার জীবনী, হাজারদুয়ারি নিয়ে চটি আকারের অনেক বই বিক্রি হয়। ইতিহাস পিপাষু ছাত্রছাত্রী, গবেষক ছাড়াও সাধারণ মানুষও কেনেন। শান্তিনিকেতনে তেমন কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

আরও পড়ুন: বিদ্রোহী কবির প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

Santiniketan - Weekend Thrill

আমার কুঠির সোসাইটি তাদের ইতিহাস সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু বই বিক্রি করে, পাশাপাশি আমার কুঠিরের পরিচয় সংক্রান্ত বাংলা ও ইংরেজিকে হ্যান্ডবিল আকারে লিফলেট ফ্রিতে বিতরণ করে এটুকুই মাত্র। আবার শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা, মাঘ মেলা, দোল উৎসব, রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী বা প্রয়াণ দিবস যেমন পালিত হয়, তেমনি বিয়াল্লিশের আন্দোলন আগস্ট মাসে সভা-সেমিনার, নেতাজি, মাহাত্মা গান্ধির বোলপুর আগমনের দিনকে স্মরণ করে আলোচনাসভা, সেমিনার করা যেতেই পারে। কিন্তু সেরকম কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ে না। বাইরের পর্যটকরা যেমন বোলপুর-শান্তিনিকেতনে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আগমন, বিয়াল্লিশের আন্দোলনের কথা যেমন সেভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন না, তেমনি বোলপুরের স্থানীয় ছাত্রছাত্রীরাও অনেকে বলতেই পারবে না যে, শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথ সহ বোলপুর- শান্তিনিকেতন ইতিহাসের এক অনন্য পটভূমি। পরাধীন ভারতের সময়কালের ইতিহাসকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা নিলে এখানকার মান-মর্যদা যেমন বাড়বে, তেমনি স্থানীয় ও বহিরাগত জ্ঞানপিপাসু পর্যটকরাও আরও আকর্ষিত হবেন।

আরও পড়ুন: অবিরাম শিবরাম

Shantiniketan Maati Baari | Nomadic Weekends

বোলপুরের প্রবীণ নাগরিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক-লেখক সৌরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “আপনার মতের সঙ্গে আমি একমত। রবীন্দ্রনাথ একজন মহাসাগর, সেই মহাসাগরের পাশেও অনেক সাগর থাকে সেগুলো নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার দরকার। মানুষ শান্তিনিকেতন নিয়ে যতটা আগ্রহ প্রকাশ করেন, তেমনি বোলপুরের ইতিহাস নিয়েও আগ্রহ থাকার দরকার।” সম্প্রতি বোলপুর থেকে ‘ভরসা’ নামের একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বোলপুরের ‘চাপা পড়া ইতিহাস’ নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছেন সৌরেন্দ্রনাথবাবু। তিনি বলেন, “বোলপুর এখন অনেক উন্নত ও রমরমা বাজার। কিন্তু এক সময় বোলপুর একটা গ্রাম ছিল। সেই সময় বোলপুরের পাশে শ্রীনিকেতন লাগোয়া সুরুল গ্রাম ছিলো উন্নত ও আর্থিক দিক থেকে সম্পদশালী। আজ মানুষ সুরুল গ্রামের ইতিহাস জানে না।” তাঁর আক্ষেপ, শান্তিনিকেতন আজ সমাদৃত ভ্রমণের জায়গা হিসেবে। অথচ শান্তিনিকেতনের ইতিহাস, বোলপুরের ইতিহাস নিয়ে চর্চা নেই। শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতী বা রবীন্দ্রনাথ কেন্দ্রিক পর্যটনকেন্দ্র যেমন, তেমনি একইভাবে বোলপুর-শান্তিনিকেতন সমানভাবে ঐতিহাসিক পীঠস্থান। এটা তুলে ধরার প্রয়াস কম। ঐত্যিহাসিক জায়গাগুলিকে সংরক্ষণ, জনসমক্ষে তুলে ধরা দরকার।

বিশ্বভারতীর ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, বীরভূমের বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী গবেষক-লেখক ড. শুচিব্রত সেন বলেন, “সবাই শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু ঐত্যিহাসিক দিকটা হাইলাইট হয় না।” বল্লভপুর আমার কুঠিরের কথা প্রসঙ্গে বলেন, এখানে নেতাজি এসেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা সমাজসেবামূলক কাজ করে ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে থাকতেন। বোলপুর-শান্তিনিকেতনের ইতিহাস আজ চাপা পড়া ইতিহাসই হয়ে রইল।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *