ভাষার মাস কেন নয় ফাল্গুন

সায়মন স্বপন (বাংলাদেশ)

১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৮ ফাল্গুন আমাদের জাতীয় জীবনে এক অনবদ্য অধ্যায়। বাঙালির ভাষা আন্দোলনের এই দরদি দিনের কথা আজীবন বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা। অথচ ৮ ফাল্গুনের কথা আড়ালে রেখে ইংরেজি ফেব্রুয়ারি মাসের একুশ তারিখটি কীভাবে আমাদের ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে সঞ্চারিত হয়েছে, সেটি নতুনভাবে বলার প্রয়োজন আসে না। ফাল্গুনের আট তারিখটি মনের ভেতর আলাদা একটি সাহস জোগানোর মতোই শব্দ। যে সাহস যুগে যুগে শুধুই সঞ্চারিত হয়েছে আমাদের জাতীয় জীবনে। আমরা ভাষার জন্য সংগ্রাম করে স্বীকৃতি পেয়েছি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপনে শামিল হয়েছে সারাবিশ্ব। সারাবিশ্বে ভাষার জন্য এক নিদর্শন হয়ে আছে বাংলাদেশ। ফাল্গুনের সঙ্গে ভাষা আন্দোলন নিবিড়ভাবে মিশে আছে। ভাষার শহিদেরা আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আজীবন বীরের মর্যাদায় ভূষিত থাকবে। পলাশির প্রান্তর থেকে শুরু করে দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে স্পষ্ট হওয়া জরুরি। বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য বিকৃত হয়ে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে ভিন্ন আঙ্গিকে। নতুন প্রজন্ম প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে। ইতিহাস বিকৃত হলে আমাদের প্রজন্ম ধাবিত হবে ভিন্ন পথে, এটাই স্বাভাবিক। এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার নামে প্রজন্ম যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তবে তার দায়ভার আমাদেরকেই নিতে হবে। কেন-না, প্রজন্ম ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি বলে তারা তথ্যের জন্য নির্ভর করে বিভিন্ন গণমাধ্যম, বই কিংবা ব্যক্তি-সাক্ষাৎ। সেক্ষেত্রে তথ্যবিভ্রাট হলে প্রজন্ম সেই বিভ্রান্তিকর তথ্যই সত্য বলে মনে করবে। এজন্য এই সকল ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলকেই আরও বেশি যত্নবান হওয়া জরুরি। তবেই প্রজন্ম পাবে সঠিক ইতিহাস, দেশ এগিয়ে যাবে সুস্থভাবে।

আরও পড়ুন: বাংলাভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস

Image result for 21 february 1952

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে ভাষা আন্দোলনের বড় একটি প্রভাব রয়েছে, যা ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে লালন করেই সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের অসম্প্রদায়িক চেতনার মূলে রয়েছে মূলত এই চেতনা। কেন-না, ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা চর্চার মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে মিশে গেছে সেদিনের ফাল্গুন। আর এই চেতনাকে সামনে রেখেই নতুন প্রজন্ম এগিয়ে যাচ্ছে অধুনা-পৃথিবীর হাত ধরে। বিশ্ব প্রতিদিন বাংলাদেশকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে। মর্যাদা পাচ্ছে ভিন্ন মাত্রায়। বিশ্বের সরলরেখার মূল স্রোতে মিশতে সক্ষম হচ্ছে বাংলাদেশ। যেমনি দেশের সুনাম অক্ষুণ্ণ থাকছে, তেমনি বৈদেশিক চাহিদা পূরণে দেশ ধারবাহিকতা রক্ষা করছে নিটোলভাবে। একটি স্বকীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতি আজ এই ধারাবাহিকতায় পৌঁছেছে। বাংলাভাষা আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনও। যার বীজবপন হয়েছিল বাহান্নর আগে, বহির্প্রকাশ ঘটে বাহান্নতে। শহিদদের রক্তের বিনিময়ে শোকাবহ দিনগুলোর কথা বাঙালি ভোলেনি, ভুলবেও না কোনোদিন। কারণ সেই দিনগুলোর কথা কতটা নির্মম ছিল, তা অকল্পনীয়। তবে এই নির্মমতার বিপরীতে বাঙালির ছিল কঠোর অবস্থান। বিনিময়ে মুক্তির স্বাদ পাওয়া। এজন্য কবি হাসান আজিজুল হক নতুন করে একুশের চেতনা প্রবন্ধে বলেছেন― ‘‘তখনই বুঝেছি, পাকিস্তানিদের দ্বারা পরিচালিত এই রাষ্ট্রে সমতা ও ন্যায় নেই; পরিবর্তে আমাদের বাঙালিদের জন্য আছে সীমাহীন শোষণ, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও অপমান। সর্বোপরি সব ক্ষেত্রে এক উৎকট বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠল। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন এই বৈষম্য আর অপমানের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম সরব জবাব।”

আরও পড়ুন: ‘দেশভাগ: ঐতিহাসিকতা, চলচ্চিত্র, সংগীত ও নাটক’ বিষয়ে ওয়েবিনার, আয়োজনে চিত্তরঞ্জন কলেজ

এক এক দেশের ভাষা একেক রকম। বিভিন্ন সময়ে ভাষার ভিন্নতা বা পরিবর্তন, পরিমার্জন কিংবা পরিবর্ধন হয়েছে এবং হচ্ছে। মানুষের হাসি কান্নার সঙ্গে মায়ের ভাষা পরিপূরকভাবে জড়িত। মানুষ হাসলে তার ভাব প্রকাশের ভাষা এক রকম আবার কাঁদলে তার ভাব প্রকাশের ভাষা অন্য রকম হবে, এটাই স্বাভাবিক। কেন-না, ভাষার স্বকীয়তার কারণেই এটি হয়ে থাকে। যে মাতৃভাষার জন্য এতটা পথচলা, এতবেশি ত্যাগ স্বীকার আর রক্তঋণে আমরা আবদ্ধ; আমরা কি সেই বাংলাভাষার সঠিক মূল্যায়ন করছি? কখনও কখনও দেখা যায়, বিদেশি ভাষার প্রতি আমরা যতটা যত্নবান, ঠিক ততটাই অবহেলা করছি বাংলাভাষাকে। অন্য ভাষার প্রতি বাঙালির এই ঝুঁকে যাওয়াকে বোদ্ধারা ইতিবাচক হিসেবে দেখেননি, সেক্ষেত্রে এই ঝুঁকে যাওয়ার প্রবণতাকে বাংলাভাষার যথাযথ মূল্যায়নের বিষয়টি ভেবে দেখা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট আহমদ রফিক বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। একটি সাক্ষাৎকারে, বাংলাভাষা অবহেলার স্বীকার হওয়ার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন― ‘‘আমাদের ১৯০ বছর বিদেশি শাসন, রাজ ভাষা এবং তার সংস্কৃতি। ইংরেজি সংস্কৃতির প্রভাবে যে শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি হয়েছিল তাদের ধারবাহিকতায় উনিশ শতক থেকে একের পর এক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেটা লালিত হয়েছে, পালিত হয়েছে। সেটা যেমন ’৪৭-এর আগে হয়েছে ’৪৭-এর পরে হয়েছে এবং ’৭১-এর পরেও সেই ধারবাহিকতাটাকে আমরা বহন করছি। আমরা এখনও ঔপনিবেশিক রাজ ভাষার প্রভাবমুক্ত নই। সেই ধারাবহিকতা বহন করার ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে যারা অতিমাত্রায় রাজনীতি সচেতন আদর্শিক দিক থেকে শুদ্ধ এবং সৎ তারা খুব সামান্য সংখ্যক ব্যতিক্রম। আর বাদ-বাকিদের এই ভাষার ব্যাপারে মমত্ববোধ নেই। তেমনিভাবে সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ বলেছেন― উর্দুকে যদি রাষ্ট্রভাষা করা হয়, তবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ নিরক্ষর এবং সকল সরকারি পদের ক্ষেত্রেই অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে।’’

আহমদ রফিক, বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক

বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারি মাতৃভাষার গুরুত্ব কতখানি। এমতাবস্থায় সমকালীন লেখকগণই তাঁদের লেখার মাধ্যমে ভাষার বিশ্লেষণধর্মী গুরুত্বের বিষয়টি সাধারণ মানুষের দরজায় পৌঁছে দিতে পারেন। শুধু লেখকগণ নন, সংশ্লিষ্ট সকলকেই এর জন্য কাঁধে কাঁধ মেলাতে হবে। এই চেতনা সাধারণের মাঝে সঞ্চারণে সাহিত্যিক একটি বড় ভূমিকা পালন করে থাকে, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সুতরাং, গণ-মানুষের মাঝে গণ-চেতনার বীজ বুনে অঙ্কুরে সহায়ক ভূমিকা পালন করা সম্ভব। নইলে ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করা হলে তার দায়ভার প্রথমে সাহিত্যিককেই নিতে হতে পারে। কেন-না, জাতি আজও বিশ্বাস করে ‘বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র।’ সুতরাং সাহিত্যিককে আরও কতবেশি দায়িত্বশীল হতে হবে তা স্পষ্ট। শুধু শখের বশে লিখতে আসা কতিপয় লেখকশ্রেণির লেখা থেকে পাঠক তথা গণ-মানুষ খুব বেশি উপকৃত না-ও হতে পারে। যারা ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা থেকে লিখে চলেছে, তাদের লেখা থেকে গণ-মানুষ শুধু উপকৃতই হয় না, একটি নব জাগরণের সূচনা হয়― একটি নতুন স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়। তার প্রমাণ আমরা বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি। একজন সাহিত্যিকের একটি মাত্র শব্দই পাল্টে দিতে পারে সমাজ ও রাষ্ট্রের ধোঁয়াটে কুসংস্কার।

জীবিকা ও জীবনাচরণের জন্য প্রয়োজন ভাষা। জীবনবোধের ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে আঞ্চলিক ভাষার উৎপত্তি। মানুষ জন্মের পর থেকেই তার মাটি ও মাকে চিনে থাকে। সে সুবাদে, মাটির সোঁদা গন্ধের পাশাপাশি বোল শিখে যায় মায়ের মুখ থেকে। এজন্য জীবনবোধের দর্শনে মা ও মাটি একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে ধরতে পারি। যে-ভাষার সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের দরদগুলো মিশে আছে, সে-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মাটির কাছাকাছি থেকে জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করা জরুরি। আহমদ রফিক একুশের চেতনা ও সর্বজনীন জাতিরাষ্ট্র কি স্বপ্নই থেকে গেল প্রবন্ধে বলেছেন― ‘‘স্বভাবতই মাতৃভাষা জাতীয় পর্যায়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামী প্রেরণা, তেমনি কখনও হয়ে ওঠে মুক্তি সংগ্রামেরও প্রেরণা।’’ এখানে লেখক স্পষ্ট করেছেন যে, মাতৃভাষার অধিকারের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক। কেন-না, কোনো কোনো সংগ্রাম অন্য একটি অধিকার আদায়ের সঙ্গে সরলরেখায় মিলে যায়। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বহু সাহিত্যিক বিভিন্ন মতাদর্শ উপস্থাপন করেছেন তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে। ভবিষ্যতেও এর ধারবাহিকতা রক্ষা হবে। তবে এসব লেখা থেকে পাঠক কি পাঠোদ্ধার করছে, তার বিশ্লেষণধর্মী গবেষণাও জরুরি। আগেই বলা হয়েছে, ইতিহাস বিকৃত করে নতুন প্রজন্মের হাতে কিছু তুলে দিলে সেটি হাতের ভাঙা-মোয়া ছাড়া কিছুই হবে না। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাহিত্যিককে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। হয়তো-বা এই মতাদর্শের সঙ্গে কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করতেই পারে। কিন্তু দেশ ও গণ-মানুষের কথা ভেবে সাহিত্যিকদের আরও বেশি সজাগ হতে হবে, আরও বেশি তথ্যনির্ভর হতে হবে। ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলাভাষার শিকড়কে আরও মজবুত করতে হবে, বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্য সকলকে যত্নবান হতে হবে। সাহিত্যিক কোথা থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে; সে উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য তা ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে বলে বোধ করি। কারণ একটি ভুল তথ্য যতটা অপকার করে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে ইতিহাসকে। ইতিহাসের উপর নির্ভর করেই জাতি এগিয়ে যায় সামনের দিকে। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, সাহিত্যিকদের এক্ষেত্রে কী করণীয়। সত্যিকার অর্থে, সাহিত্যিকগণই এক্ষেত্রে তাঁদের লেখাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। অস্তিত্বকে ধরে রাখতে গেলে প্রয়োজন দ্যোতনাধর্মী বাস্তব জীবনবোধ ও দর্শন। এতগুলো বছর পরে ভাষার চেতনা নিয়ে নতুন করে বিশ্লেষণের কতটুকু প্রয়োজন আছে বা নেই সেটি আমাদের সবারই জানা। একটি পক্ষ অবশ্য দাবি করতেই পারে, এটির গঠনশৈলী বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কারণ, নতুন প্রজন্মের দরজায় গঠনশৈলী তথ্য উপস্থাপনের প্রয়োজন আছে। সেক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের হাত থেকে নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে বা হতে পারে। তারুণ্য কখনও হারতে শেখেনি। এজন্য হয়তো-বা কবি আসাদ চৌধুরী শহিদ মিনার কবিতায় বলেছেন এভাবে―

‘‘শহিদ মিনার মানি অসমাপ্ত

বারবার ভাঙচুরের শিকার

আমাদের কীর্তি ও সাফল্যের

প্রথম সোপান তবু

তারুণ্যের স্বপ্নমাখা শহিদ মিনার’’

কবির কবিতায় আমরা দেখতে পাই, ভাষা আন্দোলনের স্মারকস্তম্ভ শহিদ মিনার বারবার ভেঙে ফেলা হলেও তারুণ্যের কাছে পাক-হনাদার বাহিনী পরাজিত হয়েছে। অবশেষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ভাষা আন্দোলনের সাক্ষী― শহিদ মিনার। শহিদ মিনারের মতো তরুণদেরও বারবার ভেঙে গেলেও আবার উঠে দাঁড়াতে হবে। সাহস সঞ্চার করতে হবে অস্তিত্বের নিশান মাথায় বেঁধে। তবেই মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সম্ভব। একটু ভেবে দেখলে আরও স্পষ্ট হওয়া যায় যে, ১৯৪৮, ১৯৫২ কিংবা ১৯৭১ সালের চাওয়াগুলো একই সরলরেখায় মিশেছিল― রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পরিবর্তে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া। খেটে খাওয়া মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব থাকলেও তারা এতটুকু অনুধাবন করতে পেরেছিল যে, ছাত্রসমাজ-বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রামের সঙ্গে একীভূত হওয়া। খেটে খাওয়া মানুষ ভাষার গুরুত্ব বুঝে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল বলেই দীর্ঘ সংগ্রাম আর অপেক্ষার পর অবশেষে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া হল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। আমরা ফিরে পেলাম মায়ের শেখানো বোল। তাদের এই অসীম সাহসের মূল্য কোনোদিন কোনো কিছু দিয়ে শোধ দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলা বোলের জন্য কত মা তার সন্তানকে, স্ত্রী তার স্বামীকে, বোন তার ভাইকে হারিয়েছে। যখনই কোনো সংকটের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ, তখনই পেছন থেকে আমাদেরকে মুঠোভরা সাহস জুগিয়েছে চেতনার বাতিঘর― মহান ভাষা আন্দোলন। জাতীয় পর্যায়ে এই আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দ্যোতনায়, যার একটিই চাওয়া ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে জাতি ও দেশের কল্যাণে ভাষা আন্দোলনের অগ্রনায়কেরা অমর হয়ে ঋণী করেছে আমাদেরকে। তারুণ্যের গতিশীলতার ফলাফল মহান ভাষা আন্দোলন কিংবা স্বাধীনতা যুদ্ধ। শিহাব সরকার তাঁর রক্তে ভিজুক পা কবিতায় বলেছেন―

‘‘দাঁড়িয়ে আছো কেন, দাঁড়াবে না

ভুলেও থামতে নেই কোথাও

ছুটতে থাকো, সাঁতরাও উল্টো স্রোতে ধরো মুঠো মুঠো ফুলরেণু, ঘ্রাণ নাও’’

কবির এই কবিতায় তারুণ্যকে থেমে যাওয়ার কোনো অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়নি বরং স্রোতের উজানে হাল ধরে রাখার জন্য বলা হয়েছে। গতিশীল জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে সঠিক পথে ছুটতে হবে, তবেই জয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব।

ভাষা আন্দোলনের বয়স ধীরে ধীরে বাড়ছে। তার অর্থ এটা হতে পারে না যে, তথ্যগুলো কুয়াশাচ্ছন্ন হবে কিংবা কল্পনাপ্রসূত হবে। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত ছিল না,শুধু শুনে শুনে তথ্য সংগ্রহ করে লেখালেখি করেছেন, তাঁদের লেখাতেও কিছুটা কল্পনার আশ্রয় আসতেই পারে। কারণ আশির দশকের আগ পর্যন্ত দু’একটি তথ্যনির্ভর বইপত্র ছাড়া তেমন কেউ ভাষা আন্দোলন নিয়ে লিখতে আগ্রহ দেখাননি। এর কারণ খুঁজে দেখার প্রয়োজনও হয়তো-বা কেউ বোধ করেনি। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষাক্রমে এ-সকল বিষয় নির্ভুল হতে হবে। নইলে ভাষার চেতনা মুখ থুবড়ে পড়বে আগামীতে। শিক্ষার্থীদেরকে স্বপ্রণোদিত হয়ে তথ্যনির্ভর চলচ্চিত্র, বই ও দলিল-পত্রাদি থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এর জন্য পারিবারিক পাঠাগার থেকে শুরু করে  রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি পর্যায়ের পাঠাগার প্রয়োজন,সঙ্গে পাঠাভ্যাসও জরুরি। প্রয়োজন আরও তথ্যনির্ভর সুস্থ ডকুমেন্টরি কিংবা চলচ্চিত্র। ফলে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পাশাপাশি চেতনাবোধ জাগ্রত হবে। সুস্থ পাঠাভ্যাসই সঠিক তথ্যকে পাঠকের সামনে হাজির করে থাকে।

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করলেও এই চেতনাকে আমরা কতটুকু মূল্যায়ন করছি,সেটি বিশ্লেষণের প্রয়োজন। অথচ,বাংলাভাষা আন্দোলনের ওই দিনের ৮ ফাল্গুন ইতিহাসের দরজায় এখনও কড়া নেড়ে গেলেও আমাদের কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই। ইংরেজি মাসের ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখটি আমাদের চিরচেনা-জানা হয়ে উঠেছে। আর দিনে দিনে চাপা পড়তে চলেছে ৮ ফাল্গুন। নতুন প্রজন্ম তো ভুলতে বসেছে ৮ ফাল্গুনকে। এখনও বাংলা বানানের প্রতিনিয়ত ভুল ব্যবহার হচ্ছে। সেটি আমাদের অজ্ঞতার কারণেই হচ্ছে। বাংলাভাষা ব্যবহারে আমরা কেন সচেতন নই, তা নিয়ে বিতর্কের জন্ম আছে বেশ। শুধু বলা যেতে পারে,বাংলা শুদ্ধ বানান আমাদের চর্চা করা সময়ের চাহিদা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। তার জন্য ছাত্র-শিক্ষক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে সকলকেই বাংলা বানানের ক্ষেত্রে আরও বেশি যত্নবান হওয়া জরুরি।

ভাষার চেতনাকে লালন করার জন্য প্রয়োজন― সর্বস্তরে বাংলাভাষার প্রচলন। যদিও প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় জীবনে সর্বক্ষেত্রে বাংলাভাষার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। সেক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষাসহ দেশের সকল শিক্ষাব্যবস্থা, অফিস-আদালত, সচিবালয় ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এবং বেসরকারি ক্ষেত্রেও বাংলাকে প্রাধান্য দিতে হবে। অতি আধুনিকতার নামে আমাদের শিক্ষাক্রম থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে অবহেলা করা হচ্ছে। বাংলাভাষা দিনে দিনে উপহাসের বিষয় হতে চলেছে। বহির্বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের জীবিকায়ন থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে নিজেদের মাতৃভাষাকে মুখ্যভাষা হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে অন্য কোনো ভাষা গৌণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আমরা পাশ্চাত্য কিংবা প্রাচ্যকে অনুসরণ-অনুকরণ করা শুরু করেছি বহু আগে থেকে। অথচ, তাদের ভাষার প্রতি তাদের প্রীতির মমতাটুকু, আমরা আজও শিখে নিতে পারিনি। ভাষার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাকে সকল ক্ষেত্রে প্রচলনের জন্য প্রয়োজন বাংলাভাষার জন্য একটু সদিচ্ছা। প্রয়োজন, জীবন ও জীবিকার সঙ্গে বাংলাকে যৌক্তিকভাবে সংযুক্ত করা। বাংলাভাষা আন্দোলনের মাস হিসেবে বাংলা ঋতুর মাসকে কেন আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি, এটি সময়ের দাবি হিসেবে পরিগণিত হতে চলেছে। সকলের সদিচ্ছা থাকলেই কেবল এই বাংলা তারিখটিকে আমরা টিকিয়ে রাখতে পারব। অন্যথায়, ইংরেজি ভাষার আগ্রাসনে আমাদের প্রজন্ম দৌঁড়াতে থাকবে অন্য হ্যামিলনের বাঁশির সুরে।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *