মারাদোনা কি পৌঁছবেন এবারের ইউরো ফাইনালে?

শুভ্রাংশু রায়

এই শিরোনাম দেখে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। দিয়েগো মারাদোনা কি করে ইউরোতে খেলবেন! তার চেয়েও বড় কথা তিনি তো গত নভেম্বরে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। একবারে সঠিক কথা। কিন্তু মারাদোনাকে ইউরোর সেমিফাইনালে মাঠে দেখা যাবে। কীভাবে? খোলসা করা যাক ব্যাপারটা। এক দশ নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড়ের সঙ্গে মিশে। লরেনৎসো ইনসিনিয়ে। ইতালির এই ফরোয়ার্ড গায়ে মারাদোনার ট্যাটু নিয়ে ইউরো সেমিফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে খেলতে নামবেন। আর সেই জন্যই বলা ইউরোর সেমিতে মারাদোনা মাঠে থাকবেন।

আরও পড়ুন: দেশ, সীমান্ত এবং মিলখা সিংয়ের রূপকথা

নাপোলির নেপোলির লরেঞ্জো ইনসিগন রোমার বিপক্ষে দুর্দান্ত ফ্রি-কিক করার পরে মারাদোনার সম্মানে একটি ব্যানারের সামনে উদ্‌যাপন করছেন। ফোটোগ্রাফ: সিরো ফুস্কো / ইপিএ

শুক্রবার রাতে ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলে ইতালির জয়ের নায়ক ছিলেন এই লরেনৎসো ইনসিনিয়ে। ঘটনাচক্রে ইনিও খেলেন ইতালির  নাপোলি ক্লাবে। ইতালির ক্লাবের থেকে মনে হয় নাপোলির  বিশ্বজনীন পরিচয় মারাদোনার ক্লাব হিসেবেই। ইতালির দশ নম্বর জার্সিধারী এই ফরোয়ার্ড একটা গোল করিয়েছেন এবং নিজেও ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি করে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেছেন ইনসিনিয়ে। যদিও নাপোলির অধিনায়ক ইনসিনিয়ে নিজের ক্লাবে কখনোই দশ নম্বর জার্সিটা পরার সুযোগ পান না। কারণটি সকলের জানা। নাপোলি ক্লাব কর্তৃপক্ষ দশ নম্বর জার্সিটি চিরতরে মারাদোনার জন্য সংরক্ষিত রেখে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: মাদেইরার আগুন, রোজারিওর বৃষ্টি

‘ফেরেশতাদের অধিনায়ক’ মারাদোনাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে নেপোলি। ফোটোগ্রাফ: ফিলিপো মন্টেফোর্ট / এএফপি

দিয়েগো মারাদোনার অনুরাগী ইনসিনিয়ে তাঁর প্রিয় ফুটবলারের ট্যাটু শরীরে এঁকে মাঠে নামছেন ইউরোর প্রত্যেকটি ম্যাচেই। অবশ্য ইউরো কাপের ঠিক আগে নয়  আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে শ্রদ্ধা জানিয়ে ইনসিনিয়ে নিজের উরুতে এই ট্যাটুটি আঁকিয়েছিলেন গতবছরের ডিসেম্বরে। মারাদোনার ট্যাটু এঁকে প্রথমবার ইনসিনিয়ে মাঠে নামেন ইউরোপা লিগের ম্যাচে, গতবছরের ১১ ডিসেম্বর। গত নভেম্বরে মারাদোনার মৃত্যুর পর সিরি আ-র একটি ম্যাচে ফ্রি–কিক থেকে গোল করে মাঠেই মারাদোনাকে গোল উৎসর্গ করেছিলেন ইনসিনিয়ে। গোল করেই তিনি ছুটে যান  সাইডলাইন পেরিয়ে গ্যালারির দিকে। তারপর কিংবদন্তি ফুটবলারের ১০ নম্বর জার্সিটা তুলে ধরে চুমুতে ভরিয়ে দেন। এক অন্য আবেগে ভেসে যায় পুরো স্টেডিয়াম।

আরও পড়ুন: লেন্সের ভিতর থেকে বিশ্বজয় দর্শন: স্মৃতির সফরে শ্রেণিক শেঠ

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ১৯৮৪–৯০ পর্যন্ত নাপোলিতে খেলেছিলেন দিয়েগো মারাদোনা। একদা দক্ষিণ ইতালির এই অখ্যাত ক্লাবকে সাত মরশুমে দিয়েগো উপহার দিয়েছিলেন দু’টি সিরি আ লিগ শিরোপা, একটা সুপার কাপ ও একটি উয়েফা কাপ। মারোদোনা নাপোলির এই উন্মাদনা সংকটে পড়ে ১৯৯০ সালে ফিফা বিশ্বকাপ নেপলস খোদ নাপোলির স্টেডিয়ামে ইতালির মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। মারাদোনা নেপলসবাসীকে নিজের দেশের বদলে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করার আর্জি জানান যা নিয়ে গোটা ইতালি জুড়ে শোরগোল পড়ে যায়।

আরও পড়ুন: ফুটবল পরিসরে উপেক্ষিত দুই ইতালীয় ‘রুণে’র গল্প

মর্যাদার সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা জয়ী হলেও নিন্দুকেরা বলেন এরপরেই রাষ্ট্রের রোষানলে পড়ে যান দিয়েগো এবং ইতালি ছাড়তে বাধ্য হন পরের বছরই। অদৃষ্টের কি পরিহাস, সেই নাপোলির স্টেডিয়ামের নাম বদলে বর্তমানে রাখা হয়েছে মারাদোনার নামে। আর নাপোলির স্ট্রাইকার ইনসিনিয়ে স্বগৌরবের সঙ্গে নিজের শরীরের সঙ্গে মারাদোনাকে সেঁটে নিয়ে ইতালিকে টানা ৩৩তম ম্যাচ জেতানোর লক্ষ্যে মাঠে নামবেন এবারের ইউরোর প্রথম সেমিফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে। মারাদোনা বিশ্বজনীন লোকগাঁথার এক অন্য উপাখ্যান।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

6 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *