সেই টোকিওই কি ফিরিয়ে দেবে ভারতীয় পুরুষ হকি দলের মহিমা

শুভ্রাংশু রায়

স্বাধীনতা আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ভারতীয় দল অলিম্পিকের আসরে হকিতে সোনা জয়ের হ্যাটট্রিক করেছিল (১৯২৮, ’৩২ এবং ১৯৩৬)। বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৮ অলিম্পিক থেকে আবার টানা তিনবার হকিতে সোনা এনেছিল ভারতীয় হকি দল। আবার হ্যাটট্রিক। অন্যভাবে ডাবল হ্যাটট্রিকও বলা যায়। কিন্তু এরপরই এই সোনা জয়ে ছেদ পড়ে। রোম অলিম্পিকে (১৯৬০) ভারত সোনা হারায় পাকিস্তানের কাছে। স্বাধীনতার পরে সেই প্রথম শূন্যহাতে অলিম্পিকের আসর থেকে ফেরা। এরপরের আসর ছিল টোকিওতে। প্রথমবারের জন্য অলিম্পিকের আসর এশিয়া মহাদেশে। তাও একদা যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানে।

আরও পড়ুন: শৈশবের হিরো, কৈশোরের গুরু

১৯৮০-র অলিম্পিকে ভারতীয় দলের উচ্ছ্বাস

একথা অনেকেই মনে করেন, ১৯৬৪ টোকিও অলিম্পিক আয়োজন করে জাপান তার ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বিশ্ববাসীকে জনিয়ে দিয়েছিল। ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ভারতও। একবারের জন্য হলেও অলিম্পিক পডিয়ামে বেজে উঠেছিল জাতীয় সংগীত। সেই পাকিস্তানকেই কোমাজায়া হকি ফিল্ড স্টেডিয়ামে ১-০ গোলে হারিয়ে অলিম্পিকে হকির সপ্তম সোনা জিতেছিল ভারতীয় হকি দল, চরণজিৎ সিংয়ের নেতৃত্বে। এরপর আর একবারই ভারত হকিতে সোনা জিতেছিল। সেটি ছিল ১৯৮০ মস্কো অলিম্পিক।

আরও পড়ুন: তিনকাঠির ত্রাতা

১৯৮০-র অলিম্পিকে সোনাজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য

মাঝে অবশ্য দু’টি অলিম্পিকে সোনা জিততে না পারলেও ১৯৬৮ এবং ১৯৭২ সালে ভারতীয় হকি দল ব্রোঞ্জ মেডেল জিতেছিল। এরপর সেই ১৯৮০ মস্কো অলিম্পিক। রাজনৈতিক কারণে অনেক পশ্চিমি সমাজতন্ত্রী বিরোধী দেশ সেবার অলিম্পিকের আসরে হাজির হয়নি। তাই অনেকেই ১৯৮০ পুরুষ হকি দলের সোনা জয়কে ভাঙা হাটে সাফল্য বলে কটাক্ষ করলেও অলিম্পিক রেকর্ডে সেটাই ছিল হকিতে শেষ ভারতের শেষ সাফল্য। তারপর কেটে গেছে চার দশক।

আরও পড়ুন: ক্রুশ্চেভ ভার্সেস টিটো: প্রথম ইউরো কাপ ফাইনাল ছিল ‘কমিউনিস্টদের লড়াই’

ভারতীয় পুরুষ হকি দল (আলাদা করে এখন ‘পুরুষ’ লিখতে হচ্ছে কারণ ইভেন্ট হিসেবে ১৯৮০ মস্কো থেকেই মহিলা হকি ইভেন্ট হিসেবে অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং প্রথমবারেই ভারতীয় মহিলা হকি দল আয়োজক দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ব্রোঞ্জ মেডেল ম্যাচ হেরে অল্পের জন্য পদক হাতছাড়া করে।) এরপর মেডেল তো দূরের কথা, পরের ন’টি অলিম্পিকে পুরুষ হকি ইভেন্টের সেমিফাইনালেই পৌঁছতে পারেনি। মহিলা টিমও ২০১৬ সামার অলিম্পিকে গ্রুপ স্টেজ থেকেই বিদায় নিয়েছিল।

আরও পড়ুন: অমল জলে অমল পুজো

হকি টিমের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা পদক তালিকায় দীর্ঘদিন ভারতকে ব্রাত্য করে রেখেছিল। ১৯৮০ মস্কোর পরে ভারত পদক শূন্যতার ক্ষেত্রে হ্যাটট্রিক করে কারণ ১৯৮৪, ’৮৮ এবং ’৯২ অলিম্পিকের আসরে হকির ব্যর্থতার পাশাপশি কোনও ভারতীয় প্রতিযোগী ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক জিততে পারেননি। অবশেষে ’৯৬-এ আটলান্টায় এই ডেডলক ভাঙেন লিয়েন্ডার পেজ। টেনিসে সিঙ্গলসে ব্রোঞ্জ পদক জিতে অলিম্পিকের আসরে দীর্ঘ ১৬ বছর পরে পদক তালিকায় নাম তোলে ভারত। তারপর ২০০৮ অভিনব বিন্দ্রার সোনা। ২০১২-তে লন্ডন অলিম্পিকে ভারতীয়দের এ যাবৎ সেরা ব্যক্তিগত ইভেন্টে ছ’টি পদক লাভ ইত্যাদি বিভিন্ন খুচরো সাফল্য এসেছে। তবে হকির সাফল্য আজও অধরা। সেই ১৯৬৪ পরে আবার বসছে অলিম্পিকের আসর। এবার কি টোকিও আবার ভারতকে চার দশক পরে হকিতে সাফল্য অন্তত একটি পদক এনে দেবে? ভারতীয় পুরুষ এবং মহিলা দল অবশ্য ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছে অলিম্পিক ভিলেজে।

আরও পড়ুন: লেন্সের ভিতর থেকে বিশ্বজয় দর্শন: স্মৃতির সফরে শ্রেণিক শেঠ

বর্তমানে এফআইএইচ আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে চার নম্বরে থাকা ভারতীয় পুরুষ হকি দল ২৪ জুলাই পুল ‘এ’-তে তাঁদের প্রথম ম্যাচ ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ছ’টায় খেলতে নামবে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ভারতীয় দলের গ্রুপে অনান্য দেশগুলি হল আয়োজক দেশ জাপান, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা এবং স্পেন। প্রত্যেক গ্রুপ থেকে চারটি করে টিম নকআউট পর্বে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিংয়ে দশম স্থানাধিকারী ভারতীয় মহিলা দল পুল ‘এ’-তে প্রথম ম্যাচেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নেদারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে। পরের ম্যাচগুলিতে জার্মানি, গ্রেট ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে ভারতীয় প্রমীলা ব্রিগেডকে।

লেখক সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

2 comments

  • শুভ কামণা রইলো ভারতীয় মহিলা এবং পুরুষ হকি প্লেয়ারদের জন্য ।

  • Debashis Majumder

    Best of luck to men’s and women’s hockey teams of India.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *