Latest News

Popular Posts

বিবেকের নারী-নক্ষত্র

বিবেকের নারী-নক্ষত্র

রাহুল দাশগুপ্ত

স্বামী বিবেকানন্দের মতো একজন রূপবান, তেজস্বী ও বলিষ্ঠ পুরুষের প্রতি দেশি-বিদেশি বহু নারীই আকৃষ্ট হয়েছিলেন। হিন্দু সাধক একসময় লিখেছিলেন, “ভারতের দুই মহাপাপ। মেয়েদের পায়ে দলানো আর জাতি জাতি করে গরিবগুলোকে পিষে ফেলা।” পশ্চিমের আদর্শে নারী ও পুরুষের সমানাধিকার চেয়েছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্রের মতো বিবেকানন্দেরও ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ ছিল চুম্বকের মতো। শুধু ভগিনী নিবেদিতা নন, ইউরোপ-আমেরিকায় তাঁর অসংখ্য মহিলা ভক্ত ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে তিনি নানারকমভাবে যোগাযোগ রাখতেন। এইসব বিদেশি নারীদের তিনি কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের বাড়িতে, তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন।

আরও পড়ুন: প্রতিমার শেষ মাস

২৮ ডিসেম্বর, ১৮৯৩ সালে বিবেকানন্দ শিকাগো থেকে শিষ্য হরিপদ মিত্রকে লিখেছেন, “এদেশের স্ত্রীদের মতো স্ত্রী কোথাও দেখি নাই। সৎ পুরুষ আমাদের দেশেও অনেক, কিন্তু এদেশের মেয়েদের মতো মেয়ে বড়ই কম। এদেশের তুষার যেমন ধবল, তেমনই হাজার হাজার মেয়ে দেখেছি। আর এরা কেমন স্বাধীন। সকল কাজ এরাই করে। এদের মেয়েরা বাড়িতে স্থান দিচ্ছে, খেতে দিচ্ছে, লেকচার দেবার সব বন্দোবস্ত করে, সঙ্গে করে বাজারে নিয়ে যায়। এরপরই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন পশ্চিমি দেশের মেয়েদের রোল মডেল করে ভারতে নারীদের গড়ে তুলবেন। ভারতীয় পুরুষদের উদ্দেশ্য করে তীব্র শ্লেষে তিনি বলেছেন, তোরা মেয়েদের নিন্দা করিস, কিন্তু তাদের উন্নতির জন্য কি করেছিস বল দেখি?”

বিবেকানন্দের জীবনে ভগিনী নিবেদিতার একটা বিশেষ জায়গা ছিল। সম্প্রতি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে একটা জীবনীগ্রন্থ লেখার ইচ্ছে আছে যাতে আমি তাঁর সত্য জীবনটাকে তুলে ধরতে চাই। ভগিনী নিবেদিতার সঙ্গে তাঁর একটা সম্পর্ক ছিল, এটা আমি সেখানে বলতে চাই। ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসের এক শীতল অপরাহ্নে এই দু’জনের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। পরে নিবেদিতা লিখেছেন, ঠিক সেই সময় তিনি লন্ডনে না আসতেন, আমার জীবনটা হয়তো একটা অসাড় স্বপ্ন হয়েই থেকে যেতো! আমি যেন ঠিক এরই অপেক্ষায় ছিলাম। যেন জানতাম, কেউ আমাকে ডাকবে!’’ বিবেকানন্দ লন্ডনের এক অভিজাত পরিবারের ড্রয়িং রুমে বেদান্ত দর্শন নিয়ে কথা বলছিলেন। নিবেদিতা, যার তখনকার নাম ছিল মার্গারিট নোবল, বান্ধবী ইসাবেল মারগেশনের আমন্ত্রণে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। গুরুগম্ভীর স্বরে বিবেকানন্দ যখন সংস্কৃত পদ্য আওড়াচ্ছিলেন, মার্গারিট তখন মুগ্ধ হয়ে যান।

বিবেকানন্দের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ মার্গারিট এরপর তাঁর অনেকগুলি বক্তৃতা একের পর এক শুনতে যান। প্রাচ্য সম্পর্কে আগে থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে, গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে জানতে তিনি খুবই উৎসাহী ছিলেন। বিবেকানন্দ ভারতের নারীদের দুর্দশার কথা তাঁকে বলেন। একটি চিঠিতে তিনি লেখেন, “ভারতে তোমার একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। ভারতীয় নারীদের অবস্থার উন্নতির জন্য কোনও পুরুষ নয়, এমন এক নারীকে প্রয়োজন যে সিংহীর মতো তাঁদের জন্য লড়াই করবে। ভারত এখনও কোনও মহৎ নারীর জন্ম দেয়নি, অন্য দেশ থেকেই সেই নারীকে ধার করতে হবে তাকে। তোমার শিক্ষা, নিষ্ঠা, বিশুদ্ধতা ও মনের দৃঢ়তা তোমাকে সেই নারী হিসাবে আমাকে চিনিয়ে দিয়েছে, যাকে আমি খুঁজছিলাম।”

আরও পড়ুন: শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের কবিতাভুবন: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

বিবেকানন্দের সঙ্গে নিবেদিতা

মার্গারিট এরপরই ভারতীয় নারীদের শিক্ষিত করার ব্রত নিয়ে এদেশে চলে আসেন। নিজের পরিবার ও বন্ধুদের, সর্বোপরি মা’কে ত্যাগ করে তিনি প্রথম এদেশে আসেন ১৮৯৮ সালের ২৮ জানুয়ারি। বিবেকানন্দই তাঁর কাছে ভারতের ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, জনজীবন, সামাজিক ঐতিহ্য সম্পর্কে বিশদে জানান, এদেশের মানুষকে ভালোবাসতে শেখান। ১৮৯৮ সালের ২৫ মার্চ বিবেকানন্দ তার এই প্রিয় শিষ্যাকে দীক্ষা দেন এবং তাঁর নতুন নাম হয়, ‘নিবেদিতা। ওই বছরই ১৮ মার্চ তখনকার স্টার থিয়েটারে এক জনসভার আয়োজন করে, বিবেকানন্দ নিবেদিতার সঙ্গে কলকাতার মানুষের পরিচয় করিয়ে দেন। এই প্রথম কোনও বিদেশি নারী ভারতীয় সন্ন্যাসিনী হিসাবে আত্মপরিচয় অর্জন করেন।

মৃত্যুর দু’দিন আগে বিবেকানন্দ সারাদিন উপবাসী থাকলেও নিজের হাতে নিবেদিতাকে খেতে দিয়েছিলেন। তারপর তাঁর হাতে জল ঢেলে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিয়েছিলেন। নিবেদিতা বিস্মিত হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘‘একাজ তো আমার! আপনি করছেন কেন?” বিবেকানন্দ জবাব দিয়েছিলেন, ‘‘যিশু তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন!” এরকম একটা জবাব শুনে নিবেদিতা স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, ‘‘একাজ যিশু করেছিলেন মৃত্যুর ঠিক আগে!” কিন্তু বলতে গিয়েও তিনি থেমে যান। বিবেকানন্দও আর বাঁচেননি। দু’দিন পরেই, শুক্রবার, ১৯০২ সালের ৪ জুলাই তিনি মারা যান।

আরও পড়ুন: আদিবাসী জনজীবন ও পশুপাখি

সারা সি বুল

নিবেদিতার আজীবনের দুই বান্ধবী ছিলেন, সারা সি বুল এবং জোসেফিন ম্যাকলিওড। এঁদের দু’জনের সঙ্গেই বিবেকানন্দের পরিচয় হয় আমেরিকায়। নিবেদিতা এদেশে আসার কয়েক সপ্তাহ পরেই এই দু’জনও ভারতে আসেন। সারা ছিলেন নরওয়ের প্রসিদ্ধ বেহালাবাদক ওলে বুলের স্ত্রী। ১৮৯৪ সালের অক্টোবরে বিবেকানন্দ প্রথম কেমব্রিজে সারার বাড়িতে যান। এই বিদেশি মহিলা সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘ইনি একজন সন্ত, এক মহৎ নারী, যার কাছে যাওয়া তীর্থস্থান দর্শনের মতোই ব্যাপার।” সারা স্বামীজির কাছে মায়ের মতোই হয়ে উঠেছিলেন। অনেক চিঠিতেই তাকে সম্বোধন করা হয়েছে, ‘মা’ বলে। পশ্চিমে বিবেকানন্দের ভাবনা-চিন্তা প্রসারে সারার ভূমিকা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সারাই তাঁকে হার্ভার্ডে বক্তৃতা করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে বহু অধ্যাপকের আলাপ-পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তিনিই স্বামীজির আর্থিক দিকটা দেখভাল করতেন। বেলুড় মঠ স্থাপনের সময়ও তিনি অর্থসাহায্য করেছিলেন। কলকাতার গরম অসহ্য হয়ে উঠলে তাঁকে নিয়ে একবার স্বামীজি বন্ধু ও অভিভাবক হিসাবে কাশ্মীরও ঘুরে আসেন।

জোসেফিন ম্যাকলিওড়ও ছিলেন বিবেকানন্দের খুব ভক্ত। ১৮৯৫ সালের ২৯ জানুয়ারি এই দু’জনের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। নিউ ইয়র্কে বোন বেটির বাড়িতে গিয়েছিলেন জোসেফিন। স্বামীজিকে ঘিরে একটা ছোটখাটো জমায়েত হয়েছিল। জোসেফিন মাটিতেই বসে শুনছিলেন। তিনি এই দিনটিকে তাঁর ‘আধ্যাত্মিক জন্মদিন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মনে হয়েছিল, এই হিন্দু সাধু যা কিছু বলছেন, তার মধ্যে সত্য ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি লিখেছেন, “বিবেকানন্দ এমন একজন মানুষ, যার কোনও সীমা নেই। আমি তাঁর তল যেমন খুঁজে পাইনি, তেমনই তাঁর উচ্চতাকেও ছুঁতে পারি না! সাত বছর ধরে বিভিন্ন সময় আমি তাঁর কথা শুনেছি আর সত্য ছাড়া আর কিছুই সেখানে খুঁজে পাইনি! তাঁর উপস্থিতি আমাকে অমরত্বের স্বাদ দিয়েছে। সূর্যকে একবার দেখলে যেমন আর কখনও ভোলা যায় না, তিনিও সেরকমই ছিলেন।”

স্বামীজি তাঁকে ‘জো’ বলে সম্বোধন করতেন। আমেরিকার নাগরিক হলেও তাঁর শরীরে ছিল স্কটিশ রক্ত। ১৮৯৫ সালে জোসেফিনের বোন বেটির সঙ্গে নিউ ইয়র্কের ধনকুবের ব্যবসায়ী ফ্রান্সিস লেগেটের বিয়ে হয়।

আরও পড়ুন: সাক্ষাৎকার: চিত্রপরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য

জোসেফিন ম্যাকলিওড

স্বামীজি সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্যারিসে যান। জোসেফিন লিখেছেন, তাঁর মধ্যে একটা প্রচণ্ড প্রাণশক্তি ছিল। তিনি যেভাবে অন্যদের সাহস জোগাতেন, সেখানেই ছিল তাঁর আসল শক্তি। তিনি যেন নিজের ব্যাপারে একেবারেই সচেতন ছিলেন না। অন্যান্য মানুষের কথাই তিনি ভাবতেন, তাদের ভালো নিয়েই চিন্তা করতেন। তাঁর উপস্থিতিই ছিল বিদ্যুতের মতো! তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল বিস্ময়কর। রোমে গিয়ে যেভাবে তিনি অতি-পরিচিতর মতো করে সব চিনিয়ে দিচ্ছিলেন, তা দেখে আমরা অবাক হয়ে গেছিলাম!

তিনি আরও লিখেছেন, “যখন তাঁর কাছে জানতে ভারতে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম, তিনি লিখেছিলেন, আসতে পারো, কিন্তু নোংরা, অবক্ষয় আর দারিদ্র্য ছাড়া আর কিছুই পাবে না। এর বেশি চাইলে এসো না। আমরা আর একজনও অতিরিক্ত সমালোচককে চাই না। বলা বাহুল্য, চিঠিটা পেয়েই যে জাহাজটি প্রথম পেয়েছিলেন, তাতেই জোসেফিন ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দু’মাস তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন। বিবেকানন্দ দেখিয়ে দিয়েছিলেন, একজন পশ্চিমা নারীও কত সহজে মঠের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে। তিনি তার সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিলেন। জোসেফিনের অর্থেই স্বামীজির উদ্বোধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রেসটি কিনতে পেরেছিলেন।”

জোসেফিন লিখেছেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন, চল্লিশ পূর্ণ হওয়ার আগেই আমি চলে যাব। আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, কিন্তু বুদ্ধ তো চল্লিশ আর আশির ভেতরেই জীবনের আসল কাজগুলো করেছিলেন। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, আমার যা বলার ছিল, বলা হয়ে গেছে। এবার আমাকে যেতে হবে। আমি কোনওদিন তার শিষ্য ছিলাম না। আমি ছিলাম তাঁর বন্ধু। ভক্তি নয়, তিনি ছিলেন সেই শক্ত পাথরের মতো যার ওপর দাঁড়িয়ে আমি জীবনের উপকারিতা বুঝতে পেরেছিলাম। স্বামীজির মৃত্যুর পরও অনেকবারই তিনি বেলুড় মঠে এসে অতিথি হিসাবে বাস করেছেন। বিবেকানন্দকে জীবিতকালে বহু ব্যাপারে যেমন সহায়তা করেছেন, মৃত্যুর পরও তেমনই তার ও রামকৃষ্ণের ভাবনা-চিন্তাকে ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হয়েছেন জোসেফিন। উপনিবেশিত ভারতে মঠকে বারবার বহু সঙ্কটের মোকাবিলা করতে হয়েছে। এই বিদুষী নারীর সঙ্গে বেশ কিছু ব্রিটিশ কর্তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনিই সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে মঠকে বহু সময় বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। জোসেফিনের বোন বেটি লেগেট ছিলেন বিবেকানন্দের আরেক গুণমুগ্ধ ভক্ত। স্বামীজির মৃত্যুর পর অপরূপ সুন্দর একটি মার্বেলের সমাধি তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। বেটির স্বামী ফ্রান্সিস বিবেকানন্দকে মার্কিন সমাজে ব্যাপক পরিচিতি লাভে বিশেষ সাহায্য করেন।

আরও পড়ুন: হারিয়ে যাওয়া গবেষণাগারের খোঁজে

স্বামীজির বিখ্যাত ইংরেজ শিষ্যাদের মধ্যে ছিলেন মিসেস শার্লোট সেভিয়ের। সেভিয়ার দম্পতি দু’জনেই ছিলেন সত্যের সাধক। কিন্তু গির্জায় গিয়ে খ্রিস্ট ধর্মের ছায়ায় কিছুতেই তাঁদের আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা মিটছিল না। ১৮৯৬ সালের বসন্তে বিবেকানন্দ তাঁর দ্বিতীয় ইংল্যান্ড সফরে যান। তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘জ্ঞানযোগ’-এর ভাষণগুলি দিচ্ছিলেন, যা তাঁর শ্রোতাদের একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ করে দিয়েছিল। সেভিয়ার দম্পতি সিদ্ধান্ত নেন, এই তরুণ সাধুটিকেই তাঁরা অনুসরণ করবেন এবং তাঁর হাত ধরেই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছবেন। ১৮৯৬ সালের শেষদিকে স্বামীজি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সেভিয়ার দম্পতিই তখন তার ছ’সপ্তাহের জার্মানি, ইতালি ও সুইজারল্যান্ড ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দেন, তাঁর যাবতীয় খরচ মেটান এবং তাঁকে সঙ্গ দেন। আল্পসের সৌন্দর্য দেখে স্বামীজি হিমালয়ের কোলে একটি নতুন মঠ তৈরির স্বপ্নের কথা বলেন তাঁর দুই শিষ্যকে। সেভিয়ার দম্পতি ১৮৯৬-র ডিসেম্বরে ভারতে আসেন। আলমোরার কাছাকাছি জমি কিনে দেবদারু, পাইন ও ওক গাছে ঘেরা অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভেতর তাঁরা ‘মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৯৮ সালে। ১৮৯৯-র ১৯ মার্চ থেকে তারা ওখানেই থাকতে শুরু করেন। শার্লোট বেদান্তের প্রচারকার্যেই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ক্যাপ্টেন সেভিয়ার ১৯০০ সালে মায়াবতীতেই দেহত্যাগ করেন। সারদা নদীর তীরে হিন্দু মতে তাঁকে দাহ করা হয়। মিসেস সেভিয়ার এরপরও বহু বছর মায়াবতীতে এবং শ্যামলাতলে বাস করে পরে ১৯৩১ সালে ইংল্যান্ডে মারা যান। রামকৃষ্ণ-সংঘে তিনি ‘মা’ বলে পরিচিত ছিলেন।

শিকাগো ধর্মমহাসভা আরম্ভ হওয়ার ঠিক আগের দিন, ১৮৯৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, স্বামীজির সঙ্গে ঘটনাচক্রে মিসেস হেলের দেখা হয়। ক্লান্ত ও উদ্বিগ্ন বিবেকানন্দ রাস্তার ধারে বসে ছিলেন। ওইভাবে দেখতে পেয়ে মিসেস হেল তাঁকে নিজের বাড়ি নিয়ে আসেন, আদর-যত্ন করেন এবং ধর্মমহাসভায় তিনি যাতে হিন্দুধর্মের প্রতিনিধি হিসাবে গৃহীত হন, তার ব্যবস্থা করে দেন। বিবেকানন্দ যেখানে বসেছিলেন মিসেস হেলের বাড়িটি ছিল ঠিক তার উল্টো দিকেই। স্বামীজি মিসেস হেলকে ‘মা’ এবং তাঁর মেয়েদের ‘ভগিনী’ বলে সম্বোধন করতেন। কখনও কখনও মিসেস হেলকে ‘মাদার চার্চ এবং মিঃ হেলকে ‘ফাদার পোপ’ বলেও ডাকতেন। হেল-পরিবারের সবার সঙ্গেই তাঁর বিশেষ অন্তরঙ্গতা হয়েছিল। প্রথম দিকে অর্থাৎ ১৮৯৩ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে, এই বাড়িই ছিল বিবেকানন্দের আমেরিকার ঠিকানা। ১৮৯৪ সালে স্বামীজি লিখেছেন, “এরকম পবিত্র ও দয়ালু পরিবার পশ্চিমী দুনিয়ায় আমি আর একটিও দেখিনি।” ১৮৯৮ সালে ভারত থেকে লেখা অপর একটি চিঠিতে তিনি আরও লিখেছেন, “অতীতে আমি হয়তো তোমাদেরই পরিবারের একজন ছিলাম। হিন্দুরা তো এভাবেই ভাবে!”

আরও পড়ুন: সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের নিরিখে বিরলতমদের একজন হাসান আজিজুল হক

মাদাম কালভে ছিলেন ফরাসি দেশের বিখ্যাত গায়িকা। যদিও তাঁর জন্ম হয়েছিল স্পেনের মাদ্রিদে। বিবেকানন্দের একটি চিঠি থেকে জানা যায়, তখনকার দিনে গান গেয়ে তাঁর বার্ষিক আয় ছিল তিন থেকে চার লক্ষ টাকা। অবশ্য কালভে ছিলেন খুব উচ্চশিক্ষিত। দার্শনিক ও ধর্মীয় লেখালেখির প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। খুব দরিদ্র অবস্থা থেকে তিনি ওই বিপুল বৈভব আয়ত্ত করেছিলেন শুধুমাত্র নিজের প্রতিভা আর যোগ্যতায়। স্বামীজি লিখেছেন, ‘‘বেদনা ও দারিদ্র্যের চেয়ে উৎকৃষ্ট শিক্ষক তো আর কেউ হয় না! জীবনের এক সংকটমুহূর্তে স্বামীজির সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। তবে সেই সময়টা বিবেকানন্দের ১৮৯৪ সালের শিকাগো সফরে, না কি ১৮৯৯ সালে পশ্চিমে তাঁর দ্বিতীয় সফরে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। স্বামীজি তাঁর মনের অশান্তি দূর করেন এবং তিনি দেশ-ভ্রমণে ওই হিন্দু সাধকের সঙ্গী হন।

কালভে বিবেকানন্দকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এইভাবে, “উনি যখন শিকাগোয় বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন, তখন আমি মানসিক অবসাদে ভুগছিলাম। আমার সমবেদনার প্রয়োজন ছিল। আধ্যাত্মিক জোর খুঁজছিলাম মনে মনে। আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, কিন্তু তিনি ধ্যানস্থ ছিলেন। আমি কয়েক মুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম। কিছুক্ষণ পর আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার সন্তান, তোমাকে এতো অস্থির লাগছে কেন, আগে শান্ত হও, আর সবচেয়ে আগে জরুরি।’ তিনি আমাকে এমন সব কথা বলতে লাগলেন, যা আমার খুব কাছের মানুষেরও জানার কথা নয়। আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। তিনি আমার সঙ্গে তাঁর সন্তানের মতোই ব্যবহার করছিলেন। তারপর বললেন, নীরবে দুঃখ পেও না। আনন্দে থাকো। আমি ওনার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। কী চমৎকার করেই না উনি কথা বলেন। তিনি আমার মনের সমস্ত উদ্বেগ দূর করে দিয়েছিলেন। আমার মন আবার স্বচ্ছ হয়ে গেছিল।”

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *