‘ফোটোগ্রাফি চর্চা’র উদ্যোগে পালিত হল বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস

পারমিতা দাস

১৯ আগস্ট বাগবাজার গৌড়ীয় মঠের মিউজিয়াম অডিটোরিয়ামে কোভিড বিধি মেনে ফোটোগ্রাফি চর্চার উদ্যোগে পালিত হল বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস। এখানে ৭০০ ফোটো সংবলিত ডিজিটাল ই-বুকের উদ্বোধন করেন বিখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী ৮৫ বছর বয়সি অলোক বন্ধু গুহ। এছাড়া ডাক্তারি পাঠরত ছাত্রী থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ পাঁচ প্রজন্মের আলোকচিত্র শিল্পীর আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

ফোটোগ্রাফি চর্চার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক শ্রীযুক্ত অরূপ সাধু বলেন, আলোক চিত্রের সেকাল ও একালের মধ্যে কারিগরি দিক থেকে বিস্তর তফাত ঘটেছে, তেমনি আলোকচিত্রের দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রভেদ রয়েছে। আলোকচিত্রের পথ চলার শুরুতে ছিল পিন হোল বক্স, ক্যামেরার পিছনে কালো কাপড়ে মাথা ঢেকে স্থির হয়ে ‘স্থির চিত্র’ তোলা। আর আজ মানুষ উড়ন্ত যানে চেপে নিজস্বী তুলছে। আলোকচিত্রের এই বিবর্তন মানুষের কল্পনার অতীত ছিল। সম্পাদক এবং একাধারে আলোকচিত্র শিল্পী হিসেবে অরূপ সাধু মনে করেন— ক্যামেরার গঠনগত বিবর্তন শুধু নয়, আলোকচিত্রীদের বিষয় ভাবনার মধ্যেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছে। “সেকালের মুষ্টিমেয় বিত্তশালী রাজন্যবর্গের শৌখিন লোকেদের আলোকচিত্র চর্চার গণ্ডি এখন আমজনতায় মিশেছে। এক কথায় মুঠোফোনের দৌলতে এখন সবাই ফোটোগ্রাফার।”

আরও পড়ুন: রিপন কলেজ: কলকাতা থেকে দিনাজপুর

ফোটোগ্রাফি চর্চার সম্পাদক অরূপ সাধু ও বিশেষ অতিথি অলোকচিত্র শিল্পী অলোক বন্ধু গুহ কর্তৃক ডিজিটাল ই-বুক উদ্বোধন

প্রবীণ চিত্র সাংবাদিক অলোক বন্ধু গুহ ‘খবরের ছবি-ছবির খবর’, বইয়ের লেখক। তিনি পূর্ব ভারতে গড়ে তুলেছেন কলকাতায় ফোটো নিউজ এজেন্সি, যার নাম ‘ল্যান্ড অ্যান্ড লাইফ’। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফোটোতে তিনি আলোকচিত্রের প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে এই উপমহাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি তাঁর দীর্ঘ আলোকচিত্রের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে প্রথমেই আলোকচিত্রের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি প্রথমে পৃথিবীর প্রথম ক্যামেরার জনক ফরাসি বিজ্ঞানী নিপসের কথা বলেন। শোনালেন, পৃথিবীর প্রথম আলোকচিত্র ফরাসি বিজ্ঞানী নিপসের তৈরি জানলা থেকে আট ঘণ্টা সময় ধরে তৈরি একটানা আলোকচিত্রের কথা। তাঁর মতে, ভারতে প্রথম ক্যামেরা তৈরি করেন কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক মানস মিত্র। এই ক্যামেরা সম্পূর্ণভাবে ভারতীয়। প্রতিদিনের বাস ভাড়ার দু’আনা খরচা বাঁচিয়ে তিনি প্রথম ফিল্ম কেনেন বারো আনা দিয়ে। এই ভাবে তাঁর পথ চলা শুরু। তাঁর এই দীর্ঘ জীবনের কাজকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সম্মান জানিয়েছে ওনার তোলা সমস্ত আলোকচিত্রকে সংগ্রহ করে রাখার জন্য একটি লেখ্যাগার তৈরি করে।

পাঁচটি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে নবীন রূপমিতার বয়স ১৯ বছর অতিক্রান্ত। জ্ঞানচক্ষু খোলে যখন থেকে, ঠিক তখন থেকেই পারিবারিক সূত্রে ক্যামেরার সঙ্গে পরিচয়। তারপর শৈশবে নিতান্ত খেলার ছলে ক্যামেরার বোতাম টিপে বিভিন্ন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করার খেয়ালিপনা শুরু হয়। মেয়ের এই ভালোবাসা সার্থক রূপ পেল পঞ্চম শ্রেণিতে বাবার থেকে পাওয়া ক্যামেরা উপহার পেয়ে। তারপর থেকে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ক্যামেরাই সঙ্গী। বর্তমানে মেডিক্যাল কলেজের ব্যস্ত ছাত্রীর পাশে অবিচ্ছেদ্যভাবে রয়ে গেছে ক্যামেরা আর গিটার। নবীন আলোকচিত্র শিল্পী ক্যামেরায় বন্দি করেছে বাক্সি ইটভাঁটার শিশু থেকে শুরু করে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের থিম পুজো।

দ্বিতীয় প্রজন্মকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন আর একজন মহিলা। তিনি একজন চিত্র সাংবাদিক ও রিপোর্টারও। এর বাইরে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লেখার প্রতি অনুরাগ অনেক বছরের। ফিল্প ক্যামেরা থেকে জীবন শুরু, নিকন কুলপিক্স হয়ে ডিএসএলআরে হাতেখড়ি বন্ধু শ্রীযুক্ত রণজিৎ দাসের সান্নিধ্যে। ক্যামেরার বিস্তারিত ব্যাকরণ শিক্ষা সবার প্রিয় গুরু শ্রীসুব্রত কুমার দাসের দমদমের ইনস্টিটিউট অফ ফোটো আর্ট-এর আন্তরিক তত্ত্বাবধানে। এডিটিংয়ের শিক্ষা পেয়েছেন শ্রী তাপস বসুর হাত ধরে। ২০১৮ সালে তদানীন্তন রাজ্যপাল শ্রীকেশরীনাথ ত্রিপাঠির কাছ থেকে আলোকচিত্রের জন্য সম্মানিত হয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও পুরস্কার জিতেছেন। ফোটোগ্রাফি চর্চার  শ্রীযুক্ত অরূপ সাধুর উৎসাহে তিনি আরও এগিয়ে চলেছেন। ওনার ফোটোতে কলকাতার স্থানীয় উৎসব,  সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, গরিব শিশুদের বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্যেও আনন্দের হাসি থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ককের অ্যালকাজার শো ধরা পড়েছে।

আরও পড়ুন: প্রয়াত বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সুপূর্ণা চৌধুরী

বিশেষ অতিথি অলোকচিত্র শিল্পী অলোক বন্ধু গুহর ভাষণ

তৃতীয় প্রজন্ম শর্মিষ্ঠা সেন একজন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কর্মী এবং নিঃসন্দেহে একজন সাহসী আলোকচিত্র শিল্পী, যিনি বৃষ্টি প্লাবিত উল্টোডাঙার একহাঁটু জলের মধ্যে বেড়িয়ে পড়েছিলেন জলের মধ্যেও খেলায় মত্ত  পথশিশুদের আনন্দকে ক্যামেরাবন্দি করতে। আলোকচিত্রের অ-আ-ক-খ শিখেছেন শ্রীযুক্ত গোপাল গাঙ্গুলির কাছে। প্রখ্যাত আলোক চিত্র শিল্পী বেণু সেনের আশীর্বাদধন্য হয়েছেন। ডিজিটাল এডিটিং শিখেছেন শ্রীযুক্ত তাপস বোসের কাছে। আলোকচিত্রের নেশায় একা একা চলে গিয়েছেন সুদূর কেনিয়ার মাসাইমারাতে। তাঁর তোলা দু’টি সিংহ একটি জেব্রাকে খাচ্ছে দর্শককে বিস্মিত ও আকর্ষিত করেছে। এক সময় মঞ্চাভিনয় ও কবিতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত শ্রীমতী সেন আজ সংসার ধর্ম পালনের পাশাপাশি করে চলেছেন আলোকচিত্রের চর্চা। হাঁটুর জোর আগের মতো না থাকলেও মনের জোরে এগিয়ে চলেছেন ক্যামেরাকে সঙ্গী করে।

চতুর্থ প্রজন্ম সন্দীপ কুমার পেশাদার আলোকচিত্র শিল্পী এবং টালিগঞ্জের একজন ফিল্ম জগতের ফোটোগ্রাফার। তিনি এই বিষয় নিয়ে শিক্ষা অর্জন করেন অ্যাসোসিয়েশন অব দমদম থেকে শ্রদ্ধেয় বেণু সেনের তত্ত্বাবধানে। প্রায় ২৫ বছর ধরে এই বিষয়কে নিয়ে রয়েছেন। প্রথম ক্যামেরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে মায়ের থেকে পাওয়া হটশট ক্যামেরা। ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত তাঁর চারটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়েছে। ২০১৯ সালে ‘আজকাল’ পত্রিকা শুধু তাঁর ছবি নিয়ে একটি বিশেষ প্রদর্শনী করেছিল। সন্দীপ কুমারের ছবিতে ২৫০ জনের বেশি নাটক, কবিতা, সাহিত্য, সংগীত জগতের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব ধরা পড়েছে। বিগত সাত বছর ধরে তিনি প্রায় ১৫০টি নাটকের ছবি তুলে ধরেছেন কলকাতার সীমা ছাড়িয়ে দিল্লি, বেঙ্গালুরু গিয়ে। তবে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ পুরুলিয়া ও ঝাড়খণ্ডের ‘নাচনী’ সম্প্রদায়কে নিয়ে। এর উপর প্রায় আশিটি ছবি তুলেছেন, যার মাধ্যমে নাচনী সম্প্রদায়ের কর্মজগতে আসা থেকে শুরু করে তাঁদের সমাজ থেকে ব্রাত্য হয়ে যাওয়া দুঃখ-দুর্দশার জীবন ফুটে উঠেছে। এছাড়া তরুণ মজুমদার, চপল ভাদুড়ির উপর তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে।

এবার আসব শ্রীযুক্ত কমলেশ কামিলার কথায়। ফোটো তোলা ও ভ্রমণ, দুই নেশার উপাদান একাকার হয়ে গেছে তাঁর জীবনযাত্রায়। প্রধান বিষয় উৎসব হলেও তাঁর আলোকচিত্র বৈচিত্র্যময়। সারা ভারতবর্ষ ঘুরে ছবি তুলেছেন প্রত্যেকটি রাজ্যের উৎসবের। এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণকারী দু’টি ছবি ছিল রাত্রিবেলার আলোকিত কুম্ভমেলা এবং বারাণসীর দশাশ্বমেধ ঘাটের সন্ধ্যা আরতির অপূর্ব  ছবি। তাঁর আলোকচিত্রের মধ্যে দর্শকদের কিছুটা ভ্রমণ হয়ে গেল অরুণাচল প্রদেশ, কাশ্মীর, লাদাখ আর কার্গিল। এই ছবিগুলি দেখলে মনে হয়, উৎসব নয় প্রাকৃতিক দৃশ্য তাঁর প্রধান বিষয়। ভালো ছবি তোলার অদম্য ইচ্ছায় তিনি মিশে গেছেন স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে, তাই তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে অরুণাচলের উপজাতি সংস্কৃতি। লাদাখে গিয়ে পরিচয় দিয়েছেন নিজেকে অতীশ দীপঙ্করের দেশের মানুষ হিসেবে, যা তাঁকে স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। ক্যামেরাবন্দি করেছেন মহিলা লামা থেকে শুরু করে বৌদ্ধ সংস্কৃতিকে।

আরও পড়ুন: নদিয়ার পুতুলনাচ

সমগ্র অনুষ্ঠানটি অপূর্বভাবে সঞ্চালনা করেছেন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ডিন শেখ মকবুল ইসলাম। মুঠোফোন আর ফোটোশপের দুনিয়াতেও গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে ফোটো তোলা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে রূপমিতার প্রজন্মের কাছে। পড়াশোনা শেষ করে সংসার জীবনে প্রবেশ করেও ক্যামেরা এক অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে উঠেছে আজকের নারীদের কাছে। সমগ্র দুনিয়াকে ক্যামেরাবন্দি করবার জন্য ঘরের সীমানা ছাড়িয়ে নারী ও পুরুষ সমানভাবে এগিয়ে চলেছেন। কোথাও কোথাও আলোকচিত্রের নামকরণ জরুরি হয় না, আলোকচিত্র নিজেই কথা বলে। ছবির মধ্যে দিয়ে দুনিয়াকে দেখেন আলোকচিত্র শিল্পীরা। ফোটোগ্রাফি চর্চার কর্ণধার অরূপ সাধু একদিকে যেমন তাঁদের এগিয়ে চলাকে উৎসাহিত করছেন, আবার অন্যদিকে ফোটোগ্রাফির হাতেখড়ির জন্য প্রায়ই বিভিন্ন ওয়ার্কশপের আয়োজন করেন। সবমিলিয়ে অনুষ্ঠান ছিল কোভিড বেড়াজালের মাঝে এক আলোকরশ্মির মতো।

Facebook Twitter Email Whatsapp

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *