বিশ্ব জল দিবসে জলের মতন কিছু কথা

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

জল তো অনেক, পানীয়জল কই?

ইংরেজ কবি Samuel Taylor Coleridge ১৭৯৭-৯৮-এ ‘The Rime of the Ancient Mariner’ কাব্যে লিখছেন, “Water, water, everywhere / Nor any drop to drink.” ঠিক ১০০ বছর বাদে ২৯ আগস্ট, ১৮৯৭ সালে ওড়িশার আলভা খালে বজরায় বসে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতাখানি, “জল শুধু জল / দেখে দেখে চিত্ত তার হয়েছে বিকল।” লিখছেন, “মসৃণ চিক্কণ কৃষ্ণ কুটিল নিষ্ঠুর, / লোলুপ লোলিহজিহ্ব সর্পসম ক্রুর।” প্রায় আরও একশো বছর বাদে ১৯৮০ সালে ইউনাইটেড নেশনস বিশ্বকে উদ্বুদ্ধ করল, ‘International Drinking Supply and Sanitation Decade” পালনের জন্য। সেই দশক পালনের পরিসমাপ্তিতে ভারতীয় ডাকবিভাগ ১৯৯০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তা স্মরণীয় করে রাখতে প্রকাশ করল ডাকটিকিট ; স্বচ্ছ জল Safe Water শিরোনামে; নিরাপদ, জীবাণুমুক্ত পানীয়জল গ্রহণের বার্তা দিয়ে।

জল সংক্রান্ত ভারতীয় ডাকটিকিট

১৯৯০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ভারতীয় পোস্ট কর্তৃক প্রকাশিত ‘স্বচ্ছ জল’ (Safe Water) বিষয়ক ডাকটিকিটটির মূল্য ছিল ৪ টাকা। ১৯৯৯ সালের ২৩ নভেম্বর ৩ টাকা মূল্যের একটি ডাকটিকিট ছাপা হয়। সেটা হল অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর জেলার শ্রী সত্য সাই জল সরবরাহ প্রকল্পের ছবি। পানীয়জলের এই প্রকল্প ছিল রুখাশুখা এলাকার এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ২০০৩ সালের ৩ অক্টোবর চারটি ডাকটিকিটের একটি সিরিজে ভারতের চারটি জলপ্রপাতের ছবি আছে― ৫ টাকা দামের আথিরাপল্লী (কেরালা), ১৫ টাকা দামের যোগ (কর্নাটক), ৫ টাকা দামের কেমটি (উত্তরাখণ্ড) এবং ৫ টাকা দামের কাকোলাট (বিহার)। ২০০৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর জলবর্ষ পালন উপলক্ষে ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়, দাম ৫ টাকা।

২০১৩ সালে ৫ টাকা মূল্যের টিকিটে ভাকড়া বাঁধের ছবি। এটি ভাকড়া বাঁধের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত ডাকটিকিট। এছাড়াও ভাকড়া বাঁধ নির্মাণের চার বছর পরে এবং রজতজয়ন্তী বর্ষেও আলাদাভাবে দু’টি ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। এতগুলো ডাকটিকিট প্রকাশ করে ভাকড়া বাঁধ ভারতের কাছে কত মূল্যবান। ভাকড়া ছাড়াও ১ আনা দামের দামোদর ভ্যালি (তিলাইয়া) এবং ৩০ পয়সা দামের হিরাকুঁদ বাঁধের ছবি দিয়ে (২৩ অক্টোবর, ১৯৭৯) ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছিল (যথাক্রমে ১৯৫৫ এবং ১৯৭৯ সালে)। ২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর ৫ টাকা মূল্যের একটি টিকিটে পুণেতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় জল ও শক্তি গবেষণা কেন্দ্র (Central Water and Power Research Station, CWPRS)-র ছবি দেখতে পাওয়া যায়।

সনাতনী সংস্কৃতিতে জল

অষ্টাদশ বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী, তন্ত্র ও মন্ত্রে কীর্তিতা, নৃত্যগীত ইত্যাদি কলাবিদ্যার দেবীরূপে চিহ্নিতা হলেও আদিতে সরস্বতী ছিলেন জলের দেবী, নদীরূপে পূজিতা। “অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী।” ‘সরস’ শব্দের অর্থ জল, শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরস্বতী নদীর প্রধান ভূমিকা ছিল। উর্বর নদী তীরে আর্য ঋষিরা রূপদান করেছিলেন বৈদিক সংস্কৃতির। সেইসূত্রে জলের প্রত্যক্ষ দেবী কৃষি ও উর্বরতাকে ছাপিয়ে হয়ে গেলেন জ্ঞান ও বিদ্যার পরোক্ষ দেবী।

ভারতীয় পূজন পদ্ধতিতে জলশুদ্ধির কথা আছে, পুরোহিত দর্পণ খুলেই পাওয়া যায় অঙ্কুশ মুদ্রায় কোশার জলে তীর্থ আবাহনের মন্ত্র― “ওঁ গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরী সরস্বতী / নর্মদে সিন্ধু কাবেরী জলেহস্মিন্ সন্নিধিং কুরু।” মহাসপ্তমী তিথিতে দেবী দুর্গাকে ভৃঙ্গারে করে মহাস্নান করানো হয় তাতে উপস্থিত নানান জল-সম্ভার; নদীজল, শঙ্খজল, উষ্ণজল, গোময়, দধি, দুগ্ধ, স্বর্ণোদক, রজতোদক, পুষ্পোদক, ইক্ষু রস, তিলতৈল, পঞ্চকষায়োদক, নির্ঝরোদক, নারিকেলোদক, সর্বৌষধি জল, সহস্রধারা জল। নদীজলে স্নানের মন্ত্র এমনিতর― “ওঁ আত্রেয়ী ভারতী গঙ্গা যমুনা চ সরস্বতী /সরযূর্গণ্ডকী পুণ্যা শ্বেতগঙ্গা চ কৌশিকী।। / ভোগবতী চ পাতালে স্বর্গে মন্দাকিনী তথা। / সর্বাঃ সুমনসো ভূত্বা ভৃঙ্গায়ৈ স্নাপয়ন্তু তাঃ।” ভারতবর্ষ যখন জলের সদ্ব্যবহারের জন্য ‘নদী সংযুক্তি’-র চিন্তাভাবনা করে, তখন তার পশ্চাতে এই নদী-বোধ, নদী আবাহনের অধ্যাত্ম-দর্শন কাজ করে।

কোথায় কত জল?

বিশ্বের যে এত জল ভাণ্ডার, তার সিংহভাগই কিন্তু পানের অযোগ্য, কৃষি কাজের অযোগ্য, শিল্পে ব্যবহার হলে কলকব্জা নষ্ট হয়ে যায়, কারণ সে জল নোনা। এই গ্রহের তিন ভাগ জল, একভাগ স্থল হলেও পার্থিব জলের প্রায় সাতানব্বই শতাংশ নোনা, তা খাঁড়ি, সাগর, মহাসাগরেরই শুধু আছে তা নয়, আছে মাটির তলার জলের খানিক অংশ জুড়ে, আছে নোনাজলের হ্রদেও। পৃথিবীর এক শতাংশের কিছু কম জল স্বাদু বা মিষ্টি, পান ও মানুষের কাজের উপযুক্ত। আর দুই শতাংশ জল জমা হয়ে আছে মেরুপ্রদেশে, গ্রিনল্যান্ডে, পর্বতশিখরে।

পৃথিবীর মোট জলের পরিমাণ প্রায় ১৩৯ কোটি ঘন কিলোমিটার। সমুদ্রের নোনা জল ছাড়াও ১৩ লক্ষ ঘন কিলোমিটার নোনাজল মাটির তলায় আর নোনা হ্রদে আছে। আর মিষ্টি জলের মাত্র ০.৩% অর্থাৎ ১ লক্ষ ঘন কিলোমিটার জল আছে জলাভূমি, পুকুর, খাল, বিল, হ্রদ, নদী-নালায়। ১৩ হাজার ঘন কিলোমিটার আকাশে, জলীয়বাষ্প আর মেঘ হয়ে; এক হাজার ঘন কিলোমিটার জল আছে জীবদেহের কোষে-কোষে, জীবনের পরতে পরতে।

মেঘ সম্পর্কিত লোকাচার

বাংলায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, “আশায় মরে চাষা।” পূর্ববঙ্গের একটি লোকাচার “মেঘ্যারাণীর কুলো নামানো”; এটি নমঃশূদ্র কৃষক মেয়েদের একটি ব্রত; একটি জাদু-প্রক্রিয়া― Imitative Magic, নকল বৃষ্টির আয়োজনে বাস্তবে বৃষ্টি নামবে, এই লোকবিশ্বাস। কোচবিহার, জলপাইগুড়িতে রাজবংশী মেয়েরা কৃষিক্ষেত্রে বর্ষণদেবতা হুদুমদেও-র কাছে নগ্ন নৃত্য পরিবেশন করে। মুসলমানদের আর্জি “আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে।” কোথাও বৃষ্টি নামাতে ব্যাঙের বিয়ে, ব্যাঙের উৎসব। এদিকে মেঘবৃষ্টির কামনায় বসুধারার ব্রত পালন করে বঙ্গ-রমণী। চৈত্র বৈশাখ মাসে বন্দোবস্ত করা হয় ‘তুলসী ঝারা’-র সংস্কৃতি। মেয়েলি মন্ত্র উচ্চারিত হয়, “গঙ্গা গঙ্গা ইন্দ্র চন্দ্র বাসুকি / তিন কুলে ভরে দাও/ধনে জনে সুখী।”

সাগরের জল থেকে পানীয়

ভারতের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ সমুদ্র-জলের নোনা-মুক্তি প্রকল্প রয়েছে চেন্নাই শহরের অদূরে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে ৬০ একর জায়গা জুড়ে। Chennai Water Desalination Plant Limited এবং IVRCL উদ্যোগের এই প্রকল্প থেকে ২.৫ মিলিয়ন চেন্নাইবাসীর জন্য দৈনিক ১০০ মিলিয়ন লিটার পানীয়জল উৎপাদিত হয়; প্রতি ঘন মিটার জলের বিক্রয়মূল্য ৬০ টাকা। চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে প্রকল্প শুরুর ২৫ বছর বাদে তা রাজ্য সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এখানে জল পরিবর্তিত হয় Reverse Osmosis প্রক্রিয়ায়, যাতে সাগর-জলের লবণ ও অন্যান্য অশুদ্ধি সরিয়ে ফেলা যায়। সাগর-জলকে তেড়ে প্রবেশ করানো হয় সেমি-পারমিয়েবল মেমব্রেনের মধ্যে। এই পদ্ধতিতে ডিস্টিলেশনের তুলনায় কম শক্তি ব্যয় হয়।

জলীয়বাষ্প শোষণ করে পানীয়

ইসরাইলি প্রযুক্তিতে তৈরি বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প রূপান্তর করে জল তৈরির কৌশলে রয়েছে খুব সহজ একটি বিজ্ঞানের প্রয়োগ। মেশিন জলীয়বাষ্পকে মানুষের ব্যবহারোপযোগী করে তুলছে। এই মেশিনের দু’টি অংশ― Water Adsorption বা জলীয়বাষ্প শোষণ এবং Water Harvesting বা জল-চয়ন। শোষণ পর্যায়টি চলে মূলত রাতে, the device is opened, allowing air to flow into a porous MOF that grabs and holds water molicules. আর চয়ন পর্বটি সাধিত হয় মূলত দিনে, দিনের বেলায় চেম্বারটি বন্ধ রাখা হয়, সৌরশক্তির তাপ MOF-কে উত্তপ্ত করে, তাতে তা জলকে বাষ্পে ছেড়ে দেয়, আর তা জমে জল হয়, সেটাই পাইপ-লাইনের কল দিয়ে ধরতে হয়।

লেখক বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার ফ্যাকাল্টির বিশিষ্ট অধ্যাপক।

Facebook Twitter Email Whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *