Latest News

Popular Posts

‘লেখকেরা বড় অভিমানী, তাঁদের আত্মমর্যাদাবোধ একটু বেশি প্রখর’: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

‘লেখকেরা বড় অভিমানী, তাঁদের আত্মমর্যাদাবোধ একটু বেশি প্রখর’: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

রাহুল দাশগুপ্ত

সিউড়ি জেল থেকে বেরিয়ে এলেন তারাশঙ্কর। কলকাতায় বাসা নিলেন। প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে জানিয়ে দিলেন, ‘এ পথ আমার নয়। আমার পথ আমি চিনেছি। সে পথ সাহিত্যের পথ।’ ইতিমধ্যেই তাঁর ‘ধাত্রীদেবতা’ প্রকাশিত হয়েছে। ‘কালিন্দী’ আরও বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে পাঠকের। এই বইতে তারাশঙ্কর আভাস দিয়েছেন, ভারতবর্ষে বিপ্লব হবে। কিন্তু সে হবে অহিংস বিপ্লব। যদিও তাঁর নিজের মন তখন বিষণ্ণ। ইতিমধ্যেই সাহিত্যের বহু ক্ষেত্রে বহু স্থানে বহু অবজ্ঞা পেয়েছেন তিনি। কোনও পত্রিকা থেকেই ঠিকমতো অর্থ পান না। একই কথা প্রযোজ্য সম্পাদকদের বেলাতেও। কলকাতায় যেখানে থাকেন, তার পাশেই সাধক-শিল্পী যামিনী রায়ের বাড়ি। সংসার চালানোর জন্য এক সময় যামিনী রায়কে বিস্কুট-লজেন্স ইত্যাদির একটা ছোট দোকান দিতে হয়েছিল। তবু নিজের শিল্পসাধনা তিনি চালিয়ে গিয়েছেন। যামিনী রায়ের জীবন অনুপ্রাণিত করেছিল তারাশঙ্করকে।

May be an image of one or more people

আর সবসময় তিনি মনে রাখতেন তাঁর মায়ের কথা। তিনি বলতেন, ‘সংসারে বিশ্বাস করে ঠকা ভাল, অবিশ্বাস করে ঠকতে নেই। কাউকে বিশ্বাস করলে সে যদি ঠকায় তবে ক্ষতি তোমার হবে, কিন্তু মাথাটা সোজাই থাকবে। কাউকে অবিশ্বাস করে যদি ঠকতে হয়, যাকে চোর ভাবলে সে যদি সাধু হয়, তবে তোমার মাথাটা ধুলোয় লুটিয়ে পড়বে।’ তারাশঙ্করের জীবনে তাঁর মা ছিলেন অন্যতম প্রেরণা। তিনি লিখেছেন, ‘আমার মায়ের দেহবর্ণ ছিল উজ্জ্বল শুভ্র। আর তাতে ছিল একটি দীপ্তি। চোখ দুটি স্বচ্ছ, তারা দুটি নীলাভ। কথাবার্তা অত্যন্ত মিষ্ট, প্রকৃতি অনমনীয় দৃঢ়, অথচ শান্ত। আর আছে জীবনজোড়া একটি বিষণ্ণতা। সেটা তাঁর অনাসক্ত প্রকৃতির বিচিত্র বহিঃপ্রকাশ। আমার মা যদি উপযুক্ত বেদীতে দাঁড়াবার সুযোগ পেতেন, তবে তিনি দেশের বরণীয়াদের অন্যতমা হতেন, এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ।’

একসময় তারাশঙ্কর হয়ে উঠেছিলেন গ্রাম্য পরিব্রাজক। পিঠে বোঁচকা বেঁধে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতেন। মেলা দেখতে ভালোবাসতেন তিনি। ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছিলেন সাপুড়ে ও বেদেদের সঙ্গে। ফকির, গুণীন ও পটুয়াদের সঙ্গে। ডাইনি দেখেছিলেন তিনি, বিশদ করে লিখেছেন স্বর্ণ ডাইনির কথা, ‘দেখতাম স্বর্ণ নিজের দাওয়ায় বসে আছে আকাশের দিকে চেয়ে, অথবা আধো-অন্ধকার ঘরের দুয়ারটিতে ঠেস দিয়ে বসে আছে। নিঃসঙ্গ, পৃথিবী-পরিত্যক্ত স্বর্ণ।’ কলকাতায় এসে তারাশঙ্কর লিখলেন তাঁর প্রথম গল্প, ‘ডাইনি’। এটি প্রকাশিত হয়েছিল, ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়। স্বর্ণ ডাইনিকে নিয়ে তারাশঙ্কর লেখেন, ‘ডাইনির বাঁশী’। এই গল্পটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘ডাইনির গল্পটি ভালো হয়েছে। খুব ভালো লেগেছে আমার।’ তারাশঙ্করের নিজের ভাষায়, ‘ডাইন, ডাকিনী, ভূত, প্রেত সমাকুল আমার সে কাল। বেদে, সাপুড়ে, পটুয়া, দরবেশ তখন দেশে প্রচুর। প্রতিদিনই এদের কারুর না কারুর বা কোনও না কোনও দলের সঙ্গে দেখা হতই। আমার সাহিত্যিক জীবনে এরা দল বেঁধে ভিড় করে এসেছে ঠিক এই কারণেই।’ কলকাতায় এসে একটা আসনের ওপর পা ছড়িয়ে বসতেন। কোলের ওপর রাখতেন ফাইবারের ছোট একটা স্যুটকেস। সেটাই ছিল তাঁর টেবিল বা ডেস্ক। তারই ওপর কাগজের পর কাগজ টেনে লিখে চলতেন। এই সময় তিনি যেসব লেখা লেখেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘কবি’ উপন্যাসটি।

এ প্রসঙ্গে তারাশঙ্কর লিখেছেন, ‘নিতাই চরিত্রটি একটি সত্যকার মানুষের ছায়া নিয়ে তৈরি। আমাদের গ্রামের সতীশ ডোম ছিল এই ধরনের পাগলাটে কবিযশঃপ্রার্থী মানুষ। কালো আবলুসের মতো রঙ, অল্প-স্বল্প পড়তে পারে, স্টেশনে কুলিগিরি করে আর পথে ঘাটে আপন মনে কবিগান গেয়ে বেড়ায়।’ এই সময়ই তাঁর মনে আসে সেই বিখ্যাত লাইন, ‘কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কাঁদো ক্যানে?’ তিনি লিখেছেন, ‘রাঢ় অঞ্চলের মেলায় ঘুরে ঘুরে নিম্ন-স্তরের দেহপণ্যাদের নিদারুণ দুর্দশা আমি দেখেছি। হতভাগিনীদের উপায় নেই, পথ নেই। তারা স্বাধীন নয়, তারা বন্দীর চেয়েও পরাধীন, ক্রীতদাসীর মত অবস্থা। মেলার পর মেলা ঘুরেছি, তথ্য সংগ্রহ করেছি। ঝুমুর দলের মেয়েরা এ থেকে কিছু স্বতন্ত্র। ঝুমুর না হলে মেলা হয় না। ঝুমুর দলের মেয়েরা কবিগানে দোয়ারকি করত এবং নাচত। এরা পদাবলী জানে, খেউড় জানে, আবার আধুনিক খেমটা-টপ্পাও জানে। আজও এরা গৌরচন্দ্রিকা অর্থাৎ মহাপ্রভুর বন্দনা না করে গান শুরু করে না।’

সেই সময়কার একটা ঘটনার কথা বলেছেন তারাশঙ্কর। হাতে টাকা-পয়সা কিছুই নেই। এদিকে রাত প্রায় দু’টোর সময় বড় মেয়ে জ্বরের মধ্যে ছটফট করতে শুরু করল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মেয়েটি চিৎকার করে উঠে অজ্ঞান হয়ে গেল। হাত-পা তখন ঠান্ডা। চারদিকে অন্ধকার দেখলেন তারাশঙ্কর। পরদিন টাকা জোগাড় করতে একটি বড় কাগজের অফিসে গেলেন। দশটার আগে পৌঁছতে হবে, কারণ, কাগজের যিনি সর্বময় কর্তা, তাঁর অনুমোদন ছাড়া একটি পয়সাও বের হয় না। দশটা থেকে সাড়ে চারটে পর্যন্ত, যেকোনও সময় তিনি আসতে পারেন। দু’টো বাজার কয়েক মিনিট পর কর্তাব্যক্তিটি এলেন। তখনও তাঁর স্নান-খাওয়া কিছুই হয়নি। কর্তাব্যক্তিটি জানালেন, কুড়ি-পঁচিশ টাকা দেওয়াও সেদিন তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি তারাশঙ্করকে দশ দিন পর আসতে বললেন। তারাশঙ্কর লিখেছেন, ‘চোখ ফেটে জল এল। খিদেয় আমার পেট জ্বলছে। ক্ষোভে, দুঃখে, দুশ্চিন্তায় ব্রহ্মরন্ধ্র যেন ফেটে যাচ্ছে মনে হল। ভাগ্যবশে আমি সেদিন টাকা পেয়েছিলাম। আমার মেয়ে বেঁচেছিল।’

তারাশঙ্কর লিখেছেন, ‘লেখকেরা বড় অভিমানী, তাঁদের আত্মমর্যাদাবোধ একটু বেশি প্রখর।’ নবীন লেখকদের দিকে তাকালে, ‘শুকনো মুখ, দৃষ্টির বেদনা, এ দুটো চোখে পড়বেই।’ ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার জন্য ‘গণদেবতা’ লিখতে শুরু করলেন। ফাইবারের স্যুটকেসটা কোলের কাছে টেনে নিয়ে লিখতে বসে গেলেন। ধীরে ধীরে পরিচয় হয়েছে অহীন্দ্র চৌধুরী, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে। অহীন্দ্র চৌধুরী একদিন, শেকসপিয়র থেকে ইবসেন হয়ে বার্নার্ড শ, একটার পর একটা নাটকের চমৎকার বিশ্লেষণ করে বলে গিয়েছিলেন তারাশঙ্করকে। একদিন দেখা হল শিবরাম চক্রবর্তীর সঙ্গে। তারাশঙ্করের ভাষায়, ‘বাংলার একালের মানুষদের মধ্যে এই শিবরামের মতো মানুষ আর দ্বিতীয় নেই।’ আর শিবরাম বলেছিলেন, ‘ওরে, বাপ রে! শরৎচন্দ্রের স্থলাধিকারী চলেছেন কোথায়? আপনি মশায় গ্রেট, রিয়েলি গ্রেট। আপনি বাংলা দেশের একালে সবচেয়ে বড় লেখক, গ্রেট নভেলিস্ট। আপনার ‘কবি’ গ্রেট নভেল মশাই। একালের কেউ গল্প-উপন্যাস-নাটক তিন রকম লিখতে পারে না। প্রেমেন গ্রেট স্টোরি-রাইটার। কিন্তু উপন্যাস হয়নি ওর। ‘পাঁক’য়ে পসিবিলিটি ছিল। কিন্তু তারপর আর না। নাটক লেখেইনি।’

১৯৪২ সালে তারাশঙ্করের মনের মধ্যে তখন নানা তোলপাড় চলছে। তিনি লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক বন্ধনমুক্তির আকাঙ্খার যে দুর্নিবার আবেগ আমি জাতীয় জীবনের স্তরে স্তরে বিভিন্ন ভঙ্গিতে প্রকাশিত হতে দেখেছিলাম, তারই মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছিলাম মানুষের সনাতন জীবন-মুক্তির সাধনা। জীবন-মুক্তি বলতে দেহ-মুক্তি বা পরলোক-সাধনা নয়। জীবন-মুক্তি বলতে জীবনের চারিপাশে সকলপ্রকার ভয়ের বন্ধন, সকলপ্রকার ক্ষুদ্রতার বন্ধন, সকল অভাবের পীড়ন, জীবনে জোর করে চাপানো সকলপ্রকার প্রভাবের নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষ সংগ্রাম করে চলেছে অবিরাম। সেই তার অভিযান। সে সময়ের রাজনৈতিক পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন করার আবেগের মধ্যে সেই চিরন্তন মুক্তি-সংগ্রামকেই অনুভব করেছিলাম আমি। অন্তত মানুষকে এই শৃগালপনার ভীরুতা জয় করতে শক্তি দিক সাহিত্য। অভয় দিক, সাহস দিক। মানুষ সাহস করে ঘুরে দাঁড়াক।’ এভাবেই নিজের সাহিত্য-ভাবনার মূল কথাটি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে গেছেন তারাশংকর। সেই সংকটের সময়কার একটি ঘটনার কথা বলেছেন তারাশঙ্কর। এমন হয়েছে, তাঁকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে, বাংলা সাহিত্যের একজন খ্যাতনামা কবি-ঔপন্যাসিকের কথা বলেছেন তিনি। লেখিকা স্ত্রীকে নিয়ে অভিনয় দেখতে এসে তারাশঙ্করকে দেখে মুহূর্তে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন, ‘গল্প লিখতে বসে যারা গল্প না লেখার ভান করে তাদের দলে যে নাম লেখাওনি, তাতেই আমি বেশি খুশি হয়েছি।’ বিভূতিভূষণ সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘সে দিব্যাত্মা।’ তাঁর সম্পর্কে শহুরে লেখকরা অভিযোগ তুলেছেন, তিনি নাকি বড্ড বেশি গ্রাম্য। ওসব অগ্রাহ্য করে শুধু লিখেই চলেছেন। তাঁর নিজেরই ভাষায়, ‘‘তখন হাতের জোর ছিল অসাধারণ। অন্তত দিনে এক ফর্মা-দেড় ফর্মা অনায়াসে লিখে যেতে পারতাম। ‘গণদেবতা’র ভাবনা-কল্পনা সব কিছু সুসম্পন্ন আয়োজনের মত মনের মধ্যে থরে থরে সাজানো ছিল। সে দিক দিয়েও ‘গণদেবতা’ রচনার গতি মুহূর্তের জন্য ব্যাহত হয়নি। লেখা শেষ করে কেঁদেছিলাম। ওই শেষ কটি লাইনের মধ্যে সে দিন ভারতের স্বাধীনতা-যুদ্ধের আহ্বানধ্বনি আমার অন্তরকে যেভাবে বিচলিত করেছিল, সেই ভাবটুকু ফুটে রয়েছে।’ ‘গণদেবতা’ রচনার পিছনে ছিল তারাশঙ্করের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। এক সময় চার-পাঁচ বছর প্রায় চাষির মতোই কৃষিকাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। বৃষ্টি নামলে ঘরে থাকেননি, মাঠেই ছুটে গেছেন এবং দাঁড়িয়ে ভিজেছেন। মেঘ দেখে চিনতে শিখেছেন। ‘গণদেবতা’ পাঠ করে বাংলার বিপ্লবী দলের এক সময়কার অবিসম্বাদী নেতা যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘বিপ্লবের গোড়াটা নির্ভুল ধরেছ তুমি, নির্ভুল।’’

নিজের লেখা সম্পর্কে তারাশঙ্কর আরও বলেছেন, ‘জমিদারশ্রেণী ছাড়াও বেদে, পটুয়া, মালাকার, লাঠিয়াল, চৌকিদার, ডাকহরকরা প্রভৃতি যারা সমাজের বিশেষ অংশ জুড়ে ছিল, তাদের নিয়ে গল্প রচনা করবার প্রেরণাই হোক বা অভিপ্রায়ই হোক, আমার মধ্যে এসেছিল। বোধ করি, এদের কথা অন্য কেউ বিশেষ করে আগে লেখেননি বা লেখেন না বলে।’ এই ধরনের লেখালেখির সূত্রপাত ‘তারিণী মাঝি’ গল্পটি থেকে। তারাশঙ্করের ভাষায়, ‘সেবার ময়ূরাক্ষীতে প্রলয়ঙ্কর বন্যা, যাকে বলে হড়পা বান, হয়। তাতে কত ক্ষতি যে হয়েছিল, কত মানুষ যে ভেসে গিয়েছিল, তার হিসেব কেউ রাখেনি। সে সময়কার খবরের কাগজেও এ নিয়ে বিশেষ কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। সেই কারণে ওই বন্যার ভয়ঙ্করী এবং মর্মান্তিক ধ্বংসলীলার কথা দেশের চোখের সামনে ধরবার জন্যই গল্পটি লিখেছিলাম। এর বোধহয় বছর দুয়েকের পর নিদারুণ অনাবৃষ্টিতে বীরভূমে প্রায় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। সে ঘটনা নিয়েও একটি গল্প লিখেছিলাম। মোট কথা, সমসাময়িক ঘটনার মধ্যে মানুষের জীবনের বিচিত্র প্রকাশকে ধরা আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।’

বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় তারাশঙ্কর লিখলেন ‘মন্বন্তর’। তাঁর ভাষায়, ‘যুদ্ধের প্রভাবে সমাজে– বিশেষ করে ব্যবসায়ী মহলে, যে সর্বনাশা বিকৃত ক্ষুধা কুম্ভকর্ণের রপ নিয়ে জেগে উঠছে, এবং অন্য দিকে দরিদ্র মানুষ ক্ষুধার দায়ে অসহায়ভাবে যে আত্মবিক্রয় করছে, সেই কথাটাই বলবার কথা ছিল। এই পটভূমিতে পড়ন্ত ধনীর ঘরের বিকৃত রপ যুদ্ধের ঘাত-প্রতিঘাতে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে এক দিকে, অন্য দিকে বাঁচবার চেষ্টায় একাংশ প্রাণপণে চেষ্টা করছে।’ ওই উপন্যাসে রয়েছে, ‘দুর্যোগের মানুষই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখবে। আমি বেঁচে থাকলে আত্মনিয়োগ করব সেই কাজে। বেঁচে থাকব মানুষের মুক্তি-প্রত্যাশায়।’ ‘মন্বন্তর’ উপন্যাসে ক্ষোভ আছে কালোবাজারি ব্যবসায়ীদের ওপর। পচনশীল বিলাসীর গৃহের পতন তার বিষয়বস্তু। বিভূতিভূষণের একটি গল্প পড়ে সেই সময় তারাশঙ্কর মুগ্ধ হয়ে যান। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা।’ বৃত্তিগত, পেশাগত, কৌমগত নানা ধরনের গোষ্ঠীর কাহিনি শুনিয়েছেন তারাশঙ্কর। এই উপন্যাসের থিম হল, বাউরিদের গোষ্ঠী জীবন তার স্বাতন্ত্র ভেঙে ইতিহাসের মূল স্রোতে এসে মিশছে।

‘পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাসের শেষে আছে, ‘মানুষ বাঁচিতে চায়। মানুষের পরম কামনার মুক্তি একদিন আসিবেই। সেই দিনের দিকে চাহিয়াই মানুষ দুঃসহ বোঝা বহিয়া চলিয়াছে। নিজের দুঃখের মধ্যে জীবন শেষ করিয়াও সযত্নে রাখিয়া চলিয়াছে, পালন করিয়া চলিয়াছে আপন বংশ পরম্পরাকে। সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, অন্ন, বস্ত্র, ঔষধ, পথ্য, আরোগ্য, অভয়, এ মানুষের পাওনা। আমি যাহা শিখিয়াছি তাহা শোন, আমি কাহারও চেয়ে বড় নই, কাহারও অপেক্ষা ছোট নই। কাহাকেও বঞ্চনা করিবার আমার অধিকার নাই, আমাকে বঞ্চিত করিবারও অধিকার কাহারও নাই।’ এই ছিল তারাশঙ্করের সারা জীবনের উপলব্ধি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা এল। তারাশঙ্কর লিখলেন, ‘জাতির জীবনে যে মহিমা দেখলাম, যে ক্ষুদ্রতা দেখলাম, তা মানুষেরই মহিমা, মানুষেরই ক্ষুদ্রতা। ক্ষুদ্রতার চেয়ে মহিমাই বড়। মানুষের মহিমাকে প্রণাম জানাই। মানুষের ক্ষুদ্রতা, তাকেও প্রণাম করি। বাংলার পল্লী অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে প্রাণলীলা প্রত্যক্ষ করেছি, সাহিত্যে তাকেই রূপদানের চেষ্টা করেছি আজীবন…’

ছবি ফেসবুক এবং ইন্টারনেট

টাটকা খবর বাংলায় পড়তে লগইন করুন www.mysepik.com-এ। পড়ুন, আপডেটেড খবর। প্রতিমুহূর্তে খবরের আপডেট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন। https://www.facebook.com/mysepik

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *