ইয়াস: এক ত্রাণকর্মীর জবানবন্দি

স্নেহাশিস ভদ্র  

লড়াই। হ্যাঁ সত্যিকারের লড়াই। মোবাইলে ফ্রি ফায়ার বা গেমিংয়ের লড়াই নয়। এই লড়াই হল মানুষ ও প্রকৃতির অসম লড়াই। প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায়। এই কথা আমরা প্রত্যেকে জানি। এই লড়াইয়ের ফল কীরকম, তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ এবার পেলাম। ২০২০ ও ২০২১, এই দু’টি বছর দু’টি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আমফান ও ইয়াসের ধাক্কায় আমাদের রাজ্যের উপকূলবর্তী এলাকার মানুষ সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই ক্ষতির ক্ষতে অল্প হলেও প্রলেপ লাগাতে আমরা তিনটি পরিবার নিজেদের উদ্যোগে কিছু সাহায্য-সামগ্রী নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম গত ৬ জুন দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলি ব্লকের দেউলবাটি গ্রামের ৩ নম্বর প্লটের কয়েকটি পাড়ায়।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কংক্রিট নদীবাঁধ নাকি প্রাকৃতিক বাঁধ, জোর চর্চা

গ্রামে ঢোকার পর থেকে চারিদিকে যা চাক্ষুষ করলাম, তা অবর্ণনীয়। গ্রামটির প্রত্যেকটি চাষের জমি নোনাজলে প্লাবিত। বিস্তীর্ণ চারিদিকে শুধু জল আর জল। বাড়িঘর সব ভেঙে গেছে ইয়াসের জলোচ্ছ্বাসে। এখন কিছু উঁচু জায়গায় জল নেমে গেলেও নিচু এলাকাগুলো এবং বাঁধের আশপাশে বসবাসকারী মানুষদের এলাকাগুলো এখনও জলবেষ্টিত। ঘরে তাদের খাবার নেই। পরনের জামাকাপড় ভেসে গেছে। গৃহপালিত গবাদি পশুর অধিকাংশই মারা গেছে। মুরগির খামার, চাষের জমি সবই প্রায় শেষ। মানুষগুলো আজ নিরন্ন।

আমরা যখন পৌঁছলাম, গ্রামটির নাইয়াপাড়ায় তখন একঝাঁক ইচ্ছে ডানা নামের একটি বেসরকারি সংগঠন কমিউনিটি কিচেনের মাধ্যমে তাদের খাইয়েছিল। ওই সংগঠনের কয়েকজন বললেন, তারাও নিজেদের উদ্যোগে এই ধরনের কাজ করছেন। এরপর আমরা প্রথমে নাইয়াপাড়ায় ত্রাণসামগ্রী দেওয়ার কাজ শুরু করলাম। আমাদের তরফ থেকে চিঁড়ে, মুড়ি, বিস্কুট, ছাতু ও জলের বোতল দেওয়া হয়। মানুষগুলোর এই দুর্দিনে ও তারা কিন্তু আতিথেয়তা করতে ভোলেনি। আমাদের প্রত্যেককে দু’টি করে সেদ্ধ ডিম খেতে দিয়েছিল। আমরা তাদের আতিথেয়তা ও মানবিকতায় আপ্লুত।

আরও পড়ুন: লকডাউনে বাদাবনের বাঘ

নাইয়াপাড়ায় আমরা ১৫০ জনকে ত্রাণসামগ্রী দিয়ে এরপর আমরা এলাম নস্করপাড়ায়। সেখানে ৫০ জনের ত্রাণসামগ্রী বণ্টন করা হল। সবশেষে চামারপাড়ায় এসে আরও ৫০ জনকে সামগ্রী দেওয়া হল। কিন্তু ওই গ্রামের মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দাদের অবস্থা সবথেকে খারাপ। তারা নদীবাঁধের একদম কাছে থাকায় সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে দমদমের একটা বেসরকারি সংগঠন গত সাতদিন ধরে তাদের রান্না করা খাবার খাওয়াচ্ছে। মণ্ডলপাড়ায় সাহায্য বা ত্রাণ তেমনভাবে পৌঁছচ্ছে না অজ্ঞাত কারণবশত। আমরা গ্রামটিতে গিয়ে আরও দেখলাম যে, মাটিগুলো নোনা ছাপে ভর্তি।

আরও পড়ুন: জীবনের গাছপালা, জীবনের ডালপালা

স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, এই জমিগুলিতে চাষাবাদ ন্যূনতম ৩ বছর হওয়া সম্ভব নয়। অথচ মানুষগুলির প্রধান জীবিকা হল চাষাবাদ। তাছাড়া নদী থেকে কাঁকড়া ও মিন এবং জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করাও এঁদের জীবিকার মধ্যে পড়ে। এখন আপাতত জঙ্গলে যাওয়া বন্ধ বলে তাঁরা জানান। এখন আপাতত তাদের নৌকাগুলোর যা অবস্থা, তা খুব শোচনীয়। অধিকাংশ নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে দুয়ারে ত্রাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি দল যাচ্ছে ক্ষতির পরিমাণ দেখতে। কিন্তু সরকারি সাহায্য মানুষের কাছে পৌঁছতে বেশ খানিকটা দেরি আছে। তার ওপর স্বজন-পোষণ ও দুর্নীতির অভিযোগ গতবার আমফানে মতন না হয়, সেদিকে সবাইকে দৃষ্টি রাখতে হবে। তাই এর মধ্যে মানুষগুলোর দিন গুজরান হবে কী করে, প্রশ্নটা ওঠা কি স্বাভাবিক নয়?

আরও পড়ুন: প্রকৃতি ও পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান

প্রকৃতি তার নিজের খেয়ালে চলে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে মানুষ প্রকৃতিকে শোষণ করে সভ্যতার ইমারত গড়ে তুলেছে। যার ফলে পৃথিবী থেকে গাছের সংখ্যা কমেছে। কমেছে অক্সিজেনের পরিমাণ। বেড়েছে ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাকের আক্রমণ। আর নির্বিচারে প্রকৃতি শোষণের ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছে। হিমবাহের বরফ গলতে শুরু করেছে। ফলে নদী ও সমুদ্রে জলের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্র দূষণের ফলে সমুদ্রের জলের গড় উষ্ণতা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। যার ফল হচ্ছে আমফান ও ইয়াসের মতো সাইক্লোন। গঙ্গার বুকে টর্নেডোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। প্রকৃতির এই ভয়াল ও সর্বগ্রাসী রূপকে আমরা প্রত্যক্ষ করছি, নিজেদেরই দোষে। সমুদ্র তীরে দিঘা, শংকরপুর, তাজপুর, মন্দারমণিতে অবৈধ নির্মাণ, দিঘা বালিয়াড়ি থেকে নির্বিচারে ঝাউবন কাটা, সুন্দরবন থেকে ম্যানগ্রোভ অরণ্য কাটা প্রভৃতি এক শ্রেণির স্বার্থলোভী মানুষের কাজের ফল ভুগছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।

আরও পড়ুন: আসবে ঝড়, নাচবে তুফান…

মানুষগুলির এখন যা অবস্থা, তা সম্পর্কে যত লিখব ততই কম লেখা হবে। রাত্রে মশার হাত থেকে বাঁচার জন্য মশারি নেই। নেই মশার ধূপ বা তেল। এমনকী সবসময় তাদের সতর্ক থাকতে হচ্ছে সাপের উপদ্রব থেকে। তাই সবশেষে এ কথা বলতে চাই, প্রকৃতিকে বাঁচান। প্রকৃতি আমাদের অভিভাবক। গাছ আমাদের প্রাণ। তাই সবাই মিলে গাছ লাগিয়ে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমিয়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধে প্রচেষ্ট হন। সম্প্রতি আমরা দেখতে পাচ্ছি সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপ নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। তাই যে যাঁর মতন করে গাছ লাগিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করে পরিবেশকে রক্ষা করতে পারলে এই সর্বগ্রাসী সাইক্লোনের থাবা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব। না হলে বছরের পর বছর ধরে আয়লা, ফেনি, আমফান, ইয়াস প্রভৃতি নাম নিয়ে এক একটি সাইক্লোন আছড়ে পড়বে উপকূলে। ধ্বংস করে দিয়ে যাবে সব।

ছবি: প্রতিবেদক

Facebook Twitter Email Whatsapp

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *